১৩ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সাফল্যে-ব্যর্থতায় মোড়ানো দেশের ফুটবল

  • ফিরে দেখা ২০১৫

রুমেল খান ॥ ‘জীবনপথের বাঁকে বাঁকে, দিন যায় কথা থাকে, থেকে যায় কত স্মৃতি, হবে না কভু ইতি।’ ক্রীড়াঙ্গনের পঞ্জিকাবর্ষ থেকে অতিক্রান্ত হলো আরেকটি ফুটবলবর্ষ। কালের আবর্তে একটি বছর হারিয়ে গেলেও হারিয়ে যায়নি মাঠে ও মাঠের বাইরে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনার রেশ। ২০১৫ সালে বাংলাদেশের ফুটবলের ক্ষেত্রে বেশ কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটে। এখন বছরান্তে এসে প্রাপ্ত-অপ্রাপ্তির হিসেব-নিকেশ মেলাতে ব্যস্ত সবাই। পাওয়া-না পাওয়ার দিকে না গিয়ে বরং চোখ বুলানো যাক সেসব আলোচিত ঘটনাগুলোর দিকে, যেগুলো নিয়ে ফুটবলমোদিদের নাড়া দিয়েছে বেশ ভালভাবেই। চলুন পড়ে ফেলা যাক বাংলাদেশের ফুটবলের সাফল্য-ব্যর্থতার মিশেলের ২০১৫।

দীর্ঘ ১৬ বছর পর ২৯ জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত হয় বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপের তৃতীয় আসর। অংশ নেয় বাংলাদেশ, মালয়েশিয়া, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর এবং বাহরাইন। ঢাকার বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়াম এবং সিলেট জেলা স্টেডিয়াম এই দুই ভেন্যুতে অনুষ্ঠিত হয় টুর্নামেন্টের ম্যাচগুলো। ৮ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে টুর্নামেন্টের ফাইনালে স্বাগতিক বাংলাদেশকে ৩-২ গোলে হারিয়ে টুর্নামেন্টের চ্যাম্পিয়ন হয় মালয়েশিয়া যুবদল। ৩ মার্চ, ২০১৫। বিদেশী কোন ক্লাবে খেলা প্রথম বাংলাদেশী ফুটবলার হলেন- বাফুফের বর্তমান সভাপতি কাজী মোঃ সালাউদ্দিন। তিনি ১৯৭৫ সালে হংকংয়ের এফসি ক্যারোলিনে খেলেছিলেন। এর ৪০ বছর পর বাংলাদেশের প্রথম মহিলা ফুটবলার হিসেবে বিদেশী কোন ক্লাবের হয়ে খেলা প্রথম খেলোয়াড়ে পরিণত হওয়ার সুখবরটি দেন বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা ফুটবল দলের সহঅধিনায়ক এবং ফরোয়ার্ড সাবিনা খাতুন। মালদ্বীপ পুলিশ ক্লাবের হয়ে একটি ফুটসাল টুর্নামেন্টে খেলেন ২২ বছর বয়সী সাবিনা। পরে আবারও দেশটিতে গিয়ে আরেকটি টুর্নামেন্টে অংশ নেন তিনি।

মার্চে এএফসি অনুর্ধ ২৩ চ্যাম্পিয়নশিপ বাছাইপর্বের এক প্রস্তুতি ম্যাচে (শেখ জামাল মাঠে অনুষ্ঠিত) ঢাকা আবাহনী লিমিটেড গোলশূন্য ড্র করে শক্তিশালী উজবেকিস্তান যুবদলের সঙ্গে, যারা পরে টুর্নামেন্টে গ্রুপ রানার্সআপ হয়।

বিশ্বকাপ ও এশিয়া কাপ ফুটবলের বাছাইপর্বের ফরমেট পরিবর্তন করায় বাংলাদেশের জন্য বিশ্বকাপ ফুটবলে না হোক, অন্তত এশিয়ান কাপের মূলপর্বে ঠাঁই করে নেয়ার উজ্জ্বল সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়। কয়েকমাস আগে ফিফার ঘোষিত র‌্যাঙ্কিং বাংলাদেশ ফুটবলের জন্য সুখবর বয়ে আনে। দেখা যায়, র‌্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশ অবস্থান করছে ১৬৫ নম্বরে (এশিয়ান র‌্যাঙ্কিং ৩৪)। গত বছরের ডিসেম্বরে ঘোষিত র‌্যাঙ্কিং থেকে এক ধাপ পিছিয়ে গেলেই নিয়ম অনুযায়ী বাংলাদেশকে খেলতে হতো ২০১৯ (সংযুক্ত আরব আমিরাতে অনুষ্ঠিত হবে) এশিয়ান কাপ বাছাইয়ের প্লে অফ। কিন্তু ১৬৫ তম (৩৪) অবস্থান ধরে রাখায় বাংলাদেশ দল সুযোগ পায় সরাসরি গ্রুপ পর্বে খেলার। গত ৮ জানুয়ারি ঘোষিত ফিফা র‌্যাঙ্কিংকে ভিত্তি ধরেই এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন (এএফসি) এ সিদ্ধান্ত নেয়। এখন থেকে এশিয়ান কাপ এবং বিশ্বকাপের বাছাইপর্বের খেলাগুলো একইসঙ্গে অনুষ্ঠিত হবে। বাছাইপর্বে সরাসরি খেলার সুযোগ পায় বাংলাদেশ। এশিয়ার সেরা ৩৪ দেশের মধ্যে স্থান করে নেয়াতেই বাংলাদেশের জন্য খুলে যায় এই উজ্জ্বল সম্ভাবনার ক্ষেত্র। প্লে অফ খেলতে হবে না বলে বাংলাদেশ বেশি ম্যাচ খেলার সুযোগ পায়। তৃতীয় রাউন্ড হোম এ্যান্ড এ্যাওয়ে পদ্ধতিতে হবে কি না তার ওপর নির্ভর করছে বাংলাদেশ শেষ পর্যন্ত কত ম্যাচ খেলার সুযোগ পাবে। তবে নিশ্চিতভাবেই বাংলাদেশ গ্রুপ পর্বে কমপক্ষে ৮ ম্যাচ খেলার সুযোগ পাচ্ছে। দল বদলসহ নানা জটিলতায় এ বছর বিলম্বেই হয়েছে ফেডারেশন কাপ। হয়েছে পেশাদার লীগও। তবে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আসর আর বাংলাদেশ জাতীয় দলের ব্যস্ত সূচীর জন্য মাঠে গড়ায়নি ঘরোয়া ফুটবলের অন্যতম দুই জনপ্রিয় আসর সুপার কাপও স্বাধীনতা কাপ। যে কারণে দেশের অন্যতম দুই ক্লাবের সঙ্গে দ্বন্দ্বের সূত্রপাত হয় বাফুফের।

এ বছর বাংলাদেশ জাতীয় দলের কোচের পদে দেখা গেছে তিনজনকে : ডাচ্ কোচ লোডভিক ডি ক্রুইফ, ইতালিয়ান কোচ ফ্যাবিও লোপেজ এবং দেশী কোচ মারুফুল হক। ক্রুইফের সঙ্গে চুক্তি নবায়ন করা হয়নি। দলের খেলোয়াড়দের নিয়ে অতিমাত্রায় পরীক্ষা-নিরীক্ষা আর বাজে ফলের কারণে সাফের আগেই বরখাস্ত হন লোপেজ। আর সাফে গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নেয়ায় স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেন মারুফুল।

এ বছর জাতীয় ফুটবল দল মোট ১৮ আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছে। বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপ, বিশ্বকাপ বাছাই, সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ আর আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচ।

এ বছর এএফসি কাপের বাছাইপর্বে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন আসরের মূলপর্বে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছে শেখ জামাল ধানম-ি ক্লাব লিমিটেড।

দুই ঘরোয়া টুর্নামেন্ট অনুষ্ঠিত না হওয়া, বিশ্বকাপ বাছাইয়ে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ম্যাচের আগের দিন জাতীয় দলের ক্যাম্প থেকে শেখ জামাল ক্লাবের খেলোয়াড়দের নিজ ক্লাবে নিয়ে যাওয়া নিয়ে বাফুফের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন শেখ জামাল ধানম-ির সভাপতি মনজুর কাদের। বাফুফে কর্তাদের বিপক্ষে বিভিন্ন অভিযোগ পেশ করেন এবং বাফুফে থেকে মোটা অঙ্কের পাওনা দাবি করেন। তার সঙ্গে মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের ডিরেক্টর ইনচার্জ লোকমান হোসেন ভূঁইয়াও যোগ দেন। যে কারণে বাফুফে তাদের দুজনকেই শোকজ নোটিস পাঠায়।

এ বছরই প্রথমবারের মতো দেশ-বিদেশের বিভিন্ন ক্লাবকে নিয়ে শুরু হয় ‘শেখ কামাল আন্তর্জাতিক ক্লাব কাপ টুর্নামেন্ট।’ ২০ অক্টোবর চট্টগ্রামের এমএ আজিজ স্টেডিয়ামে হয় টুর্নামেন্টটি। অংশ নেয় ঢাকা মোহামেডান স্পোটিং ক্লাব, কলকাতা মোহামেডান স্পোটিং ক্লাব, আফগানিস্তানের ডি স্পিঙ্গার বাজান, শ্রীলঙ্কার সলিড এফসি ক্লাব, ঢাকা আবাহনী, চট্টগ্রাম আবাহনী এবং ভারতের কিংফিশার ইস্ট বেঙ্গল ও পাকিস্তানের করাচী ইলেকট্রিক ক্লাব। কলকাতার কিংফিশার ইস্ট বেঙ্গলকে ৩-১ গোলে হারিয়ে টুর্নামেন্টের চ্যাম্পিয়ন হয় স্বাগতিক চট্টগ্রাম আবাহনী। টুর্নামেন্টটি যুক্ত হয় বাফুফের বর্ষপঞ্জিকায়।

কমলাপুরে বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ সিপাহী মোস্তফা কামাল স্টেডিয়ামে এ বছরই শেষ হয় আর্টিফিশিয়াল টার্ফ স্থাপনের কাজ। এই মাঠে ইতামধ্যেই শুরু হয়েছে বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়নশিপ লীগের খেলা।

সিলেটে অনুষ্ঠিত সাফ অনুর্ধ ১৬ চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা জেতে বাংলাদেশের কিশোররা। পিছিয়ে ছিল না কিশোরীরাও। এ বছরই প্রথম বড় কোন টুর্নামেন্টের শিরোপা জেতে বাংলাদেশের মেয়েরা। এএফসি অনুর্ধ ১৪ আঞ্চলিক টুর্নামেন্টের ফাইনালে নেপালকে হারিয়ে টুর্নামেন্টের চ্যাম্পিয়ন হয় বাংলাদেশের কিশোরীরা। ওদিকে মালয়েশিয়ায় অনুষ্ঠিত ‘সুপার মক কাপ’-এ অনুর্ধ ১৩ বিভাগেও চ্যাম্পিয়ন হয় বাংলাদেশ।

গত ২২ ডিসেম্বর বাফুফে ভবন ভাংচুর করে আরামবাগ ক্রীড়া সংঘের উগ্র সমর্থকরা। চ্যাম্পিয়নশিপ লীগের এক ম্যাচকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনে ভবনে তা-ব লীলা চালায় ক্লাবটির দুই শতাধিক সমর্থক। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় বাফুফে ভবনের বেশকিছু অংশ। এরপর বাফুফে নিষিদ্ধ করে আরামবাগকে। থানায় জিডি করে এবং ২৫ লাখ টাকা জরিমানাও দাবি করে।

বছরটা শেষ হয় একরাশ হতাশা-লজ্জা দিয়ে। ‘দক্ষিণ এশিয়ার বিশ্বকাপ’ খ্যাত সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে গ্রুপ পর্ব থেকেই ছিটকে পড়ে বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দল। প্রথম ম্যাচে সাফ চ্যাম্পিয়ন আফগানিস্তানের কাছে ৪-০ গোলে এবং দ্বিতীয় ম্যাচে মালদ্বীপের কাছে ৩-১ গোলে হারে। শেষ ম্যাচে ভুটানকে ৩-০ গোলে হারিয়ে সান্ত¡নার জয়। এই ফলে কোচ ও অধিনায়করে পদ থেকে সরে দাঁড়ান মারুফুল হক এবং মামুনুল ইসলাম।