২১ নভেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

আওয়ামী লীগে স্বস্তি উল্লাস, চরম হতাশা বিএনপিতে

  • পৌর নির্বাচনের ফল বিশ্লেষণ

শরীফুল ইসলাম ॥ পৌর নির্বাচনের ফলে শাসক দল আওয়ামী লীগে স্বস্তি ও উল্লাস। অন্যদিকে চরম ভরাডুবিতে উদ্বিগ্ন ও হতাশায় বিএনপি। নির্বাচনে বিপুল বিজয়ের মাধ্যমে সারাদেশে তৃণমূল পর্যায়ে আওয়ামী লীগ রাজনৈতিকভাবে নিজেদের ভিত্তি শক্তিশালী করতে সক্ষম হলেও নির্বাচনে ভরাডুবির কারণে বিএনপির সাংগঠনিক দুর্বলতা ও ভঙ্গুর দশা দেশবাসীর সামনে আবারও প্রকাশ পেয়েছে। তবে ফলাফল যাই হোক, প্রথমবারের মতো দলীয় প্রতীকে হওয়া এ নির্বাচনী যুদ্ধে দেশের প্রধান দুই দলের অংশগ্রহণের বিষয়টিকে দেশের মানুষ ইতিবাচক হিসেবেই দেখছে।

পৌর নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে এখন রাজনৈতিক অঙ্গনে চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে। সেই বিশ্লেষণে বিএনপির দেশব্যাপী চরম ভরাডুবির বিভিন্ন কারণ উঠে এসেছে। বিশ্লেষকদের মতে, বিদায়ী বছরের শুরুতে সরকারবিরোধী আন্দোলনের নামে টানা ৯২ দিনের ভয়াল সহিংসতা, যুদ্ধাপরাধীদের নিয়ে রাজনৈতিক জোট গঠন, যুদ্ধাপরাধের বিচার সমর্থন না করা, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে খালেদা জিয়ার বিতর্কিত মন্তব্য, সর্বোপরি দলের ভঙ্গুর সাংগঠনিক শক্তি এবং অনেক এলাকায় মেয়র প্রার্থী নিয়ে জোটের শরিক দল জামায়াতের সঙ্গে মতবিরোধের কারণেই বিএনপির এমন ভরাডুবি হয়েছে। আর দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর দেশের উন্নয়নমূলক প্রতিটি ক্ষেত্রে সূচক বৃদ্ধিসহ সার্বিক উন্নয়ন, যুদ্ধাপরাধের বিচার করা, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিকে নিয়ে রাজনৈতিক জোট করা, সর্বস্তরের মানুষের আয় বৃদ্ধি করা, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের মর্যাদা বৃদ্ধি, যোগ্য প্রার্থী মনোনয়ন, দলীয় প্রতীকে নির্বাচন, নির্বাচনকে জনপ্রিয়তা প্রমাণের চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়ে কেন্দ্র থেকে শুরু করে সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের মধ্যে ঐক্য এবং প্রচার কৌশলে অগ্রসর থাকাসহ বিভিন্ন কারণে পৌর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ এমন মহাবিজয় ঘরে তুলতে সক্ষম হয়েছে।

পৌরসভা নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকেই দীর্ঘ সাত বছর পর সারাদেশে নৌকা-ধানের শীষের মধ্যে ভোটযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি এ নির্বাচনকে তাদের রাজনৈতিক শক্তি ও জনপ্রিয়তা যাচাইয়ের চ্যালেঞ্জ হিসেবে নেয়। তবে ২৩৪ পৌরসভায় বিজয়ের লক্ষ্যে দুই দলই নিজ নিজ কৌশল নিয়ে অবতীর্ণ হয়। সরকারী দল আওয়ামী লীগ প্রতিটি পৌরসভায় যোগ্য মেয়র প্রার্থী দিয়ে তাদের পক্ষে জোর প্রচারে নামে। সেই সঙ্গে কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি বেশ কয়েকজন বিদ্রোহী প্রার্থীর বিরুদ্ধে সাংগঠনিক শাস্তির ব্যবস্থা করা হয়। বিএনপিও এ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন পর দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের মাঠে নামিয়ে নিজেদের প্রার্থীদের পক্ষে প্রচার জোরদার করে। বিশেষ করে ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন বর্জনের মাধ্যমে তারা রাজনৈতিকভাবে যে বেকায়দায় পড়ে তা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করে। এছাড়া তারা তফসিল ঘোষণার পর থেকে প্রায় প্রতিদিনই সরকার ও নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ এনে সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য চাপ সৃষ্টি করে।

স্থানীয় সরকার আইন সংশোধনের পর এবারই প্রথম দেশে দলীয় প্রতীকে পৌর নির্বাচন হওয়ায় জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতোই মেয়র প্রার্থীরা দলীয় প্রতীক নিয়ে অংশগ্রহণ করেন। বিএনপি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন করায় সাত বছর পর নৌকা ও ধানের শীষ প্রতীকের লড়াই নিয়ে দেশবাসীর মধ্যেও ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা ছিল পৌর নির্বাচন ঘিরে। দেশের মোট ভোটারের মাত্র ৭ শতাংশের অংশগ্রহণে এ নির্বাচন হলেও সবগুলো জেলায় ভোট হওয়ায় তা মর্যাদার লড়াইয়ে পরিণত হয় চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দুই রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির জন্য। ভোটাররাও দুই দলের এ নির্বাচন যুদ্ধকে ভালভাবেই নিয়েছিল। আর এ কারণেই এবার বিপুলসংখ্যক ভোটার ভোটকেন্দ্রে যায়।

বিএনপির সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়াই টানা দ্বিতীয় মেয়াদে সরকার গঠনকারী আওয়ামী লীগ পৌর নির্বাচনকে দেখেছিল সরকারের কাজের প্রতি জনগণের সমর্থন প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন মাধ্যম থেকেও সরকারের জনপ্রিয়তা যাচাইয়ের একটি উপলক্ষ খোঁজা হচ্ছিল। আর দীর্ঘদিন ধরে নির্দলীয় সরকারের অধীনে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দাবি জানিয়ে আসা বিএনপির কাছে এই নির্বাচন ছিল সরকারবিরোধী আন্দোলনের প্রস্তুতির অংশ। এ নির্বাচনে বিজয়ী হলে তারা বলতে পারত, তাদের দাবির প্রতি জনগণের সমর্থন রয়েছে। সেই সঙ্গে দলের নিষ্ক্রিয় নেতাকর্মীদের আবার সংগঠিত করে রাজনৈতিক শক্তি বৃদ্ধিরও সুযোগ পেত দলটি। কিন্তু এখন সে পথে বড় ধরনের বাধা সৃষ্টি হয়ে গেছে।

বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা বাদ দিলে এবারের পৌর নির্বাচন মোটামুটি সুষ্ঠু হয়েছে বলে অভিজ্ঞ মহল মনে করছেন। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি এ নির্বাচনে প্রার্থী দিয়ে সরাসরি ভোটযুদ্ধে নামে দীর্ঘদিন পর। স্থানীয় সরকারের এ নির্বাচনে দলীয় অবস্থান ছাড়াও প্রার্থীদের আত্মীয়স্বজনদের মধ্যে যারা অন্য দল করেন তারাও সরাসরি মাঠে নেমে যান। তাই এ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সারাদেশে উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হয়। এ কারণে এবারের নির্বাচনে ভোট পড়ে প্রায় ৭৪ ভাগ, যা দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের চেয়ে অনেক বেশি।

ভোটের দিন বিএনপির পক্ষ থেকে পৌর নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপি হয়েছে অভিযোগ করার পর জনমনে আশঙ্কা ছিল ওই দলটি হয়ত আবার আন্দোলন কর্মসূচী দিয়ে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি অশান্ত করে তুলবে। কিন্তু বৃহস্পতিবার দলটি সংবাদ সম্মেলন করে পৌর নির্বাচনের ফল প্রত্যাখ্যান এবং সরকার ও নির্বাচন কমিশনের পদত্যাগ দাবি করলেও কোন আন্দোলন কর্মসূচী না দেয়ায় জনমনে স্বস্তি ফিরে আসে। অবশ্য আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বিএনপিকে নির্বাচনের ফলাফল মেনে নেয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। এদিকে বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া বৃহস্পতিবার এক বাণীতে দেশবাসীকে ইংরেজী নববর্ষের শুভেচ্ছা জানানোর পাশাপাশি গণতন্ত্র রক্ষায় দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। বছরের শুরুতে আন্দোলনে না গিয়ে দেশবাসীর সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনার বিষয়টিও ইতিবাচক বলে মানুষ মনে করছে।

এদিকে পৌর নির্বাচনকে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দুই দলই তাদের রাজনৈতিক বিজয় বলে মনে করছে। আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ বৃহস্পতিবার দলের ধানম-ি কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, পৌর নির্বাচন আওয়ামী লীগের বড় অর্জন। হানিফ বলেন, বিএনপি সরকারকে মানে না। নির্বাচন কমিশনকে মানে না। অথচ বর্তমান সরকার ও নির্বাচন কমিশনের অধীনে পৌরসভা নির্বাচন করতে বাধ্য হয়েছে। তারা এ নির্বাচনে অংশ নিয়ে প্রমাণ করেছে বর্তমান সরকার বৈধ। এ নির্বাচনের ফলাফলের মাধ্যমে প্রমাণ হয়েছে পাকিস্তানের ভাবধারার এবং সন্ত্রাসসর্বস্ব বিএনপির রাজনীতি এ দেশের মানুষ মেনে নেবে না। অপরদিকে বিএনপি চেয়ারপার্সনের গুলশান কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, পৌর নির্বাচনে অংশ নিয়ে আমরা রাজনৈতিকভাবে বিজয়ী হয়েছি। এ নির্বাচনে ভোট কারচুপির মাধ্যমে সরকারের ফ্যাসিবাদী চরিত্র প্রকাশ পেয়েছে। আর আমরা এ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জনগণের কাছে যেতে পেরেছি। আর প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছি বর্তমান সরকার ও নির্বাচন কমিশনের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। এটাই আমাদের বড় বিজয়। তিনি বলেন, এ নির্বাচনে পরাজয়ের কারণে বিএনপির নেতাকর্মীরা হতাশ হবে না বরং আরও উজ্জীবিত হবে।