২০ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বিনামূল্যের বই সঠিক সময়ে বিতরণ ও নিয়মিত পাঠদান

  • সাফল্যের নেপথ্যে-

বিভাষ বাড়ৈ ॥ গেল কয়েক বছরের ধারাবাহিকতায় পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণীর সমাপনী পরীক্ষায় এবার ক্ষুদে শিক্ষার্থীদের আকাশচুম্বী সাফল্য চমকে দিয়েছে সকলকে। সৃজনশীল পদ্ধতিতে পরীক্ষা নেয়ার ভীতিকে জয় করে পাসের হার, জিপিএ-৫ প্রাপ্তি, নারীদের সামনে চলে আসা, ঝরেপড়া কমে যাওয়া থেকে শুরু করে ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটেছে অগ্রগতির সকল সূচকেই। কোন পরীক্ষাতেই ছিল না প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ। পরীক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়লেও কমেছে ফেল করা শিক্ষার্থীর সংখ্যা। মফস্বলের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো দেখিয়েছে চমক। ফলে নেই বিভাগীয় শহরের শিক্ষার্থীদের একচেটিয়া সাফল্য। প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় দেশের ৯২ উপজেলায় একজন শিক্ষার্থীও ফেল করেনি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিক্ষার এই চিত্র ইতিবাচক।

কিন্তু প্রাথমিক ও নিম্ন মাধ্যমিক স্তরের পাবলিক পরীক্ষার এ সাফল্যের পেছনের কারণ কী? খাতা মূল্যায়নকারী শিক্ষক ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের অভিমত, সরকার বিশেষত শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নেয়া পদক্ষেপ শিক্ষার গুণগতমানে পরিবর্তন এনেছে- এ নিয়ে কোন সন্দেহ নেই। তবে কঠোর মনিটরিংয়ে শ্রেণীকক্ষে নিয়মিত পাঠদান নিশ্চিত করা, দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ ক্লাস, শিক্ষক প্রশিক্ষণ জোরদার, ইংরেজী ও গণিতসহ বিজ্ঞান বিষয়ে ভাল ফল, গ্রেডিং ও সৃজনশীল পদ্ধতি সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা অর্জন- এসবই সাফল্যের পেছনে কাজ করেছে। শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সহায়তায় সাফল্যের কারণ হিসেবে বেশকিছু বিষয়কে চিহ্নিত করেছেন। তিনি বলেছেন, পুরো শিক্ষাব্যবস্থার জন্য এবারের ফলের তথ্যগুলো খুবই ইতিবাচক। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নেয়া নানা পদক্ষেপ, শিক্ষার্থী-শিক্ষক-অভিভাবকদের অক্লান্ত চেষ্টাসহ শিক্ষা পরিবারের সার্বিক সহযোগিতায় এ অবস্থানে পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে। একই সঙ্গে শিক্ষামন্ত্রী জোর দিয়েছেন সৃজনশীল পদ্ধতি সম্পর্কে শিক্ষক প্রশিক্ষণের ওপর।

শিক্ষামন্ত্রী বলছিলেন, গত বছরের তুলনায় এ বছরের ফলের মান বৃদ্ধির সূচকে বেশকিছু ইতিবাচক লক্ষণ প্রকাশ পেয়েছে। এর পেছনে মন্ত্রণালয়ের বেশকিছু উদ্যোগ ভূমিকা রেখেছে। এর মধ্যে রয়েছে বিনামূল্যে সঠিক সময়ে শিক্ষার্থীদের হাতে পাঠ্যপুস্তক পৌঁছে দেয়া, টেলিভিশনে দেশের সেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সেরা শিক্ষকদের পাঠদান প্রচার, নকলবিরোধী ব্যাপক প্রচারসহ নকল প্রতিরোধে বিভিন্নমুখী উদ্যোগ ও তথ্যপ্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার অন্যতম। মন্ত্রণালয়ের গৃহীত নানা পদক্ষেপ, শিক্ষার্থী-শিক্ষক-অভিভাবকদের অক্লান্ত প্রচেষ্টাসহ সমগ্র শিক্ষা পরিবারের সার্বিক সহযোগিতায় এ অবস্থায় পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে বলে মনে করেন শিক্ষামন্ত্রী। তিনি বলেন, শিক্ষানীতির আলোকে প্রণীত সিলেবাস অনুযায়ী গত দুই বছরে শারীরিক শিক্ষা ও স্বাস্থ্য, চারু ও কারুকলা, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়গুলো পরীক্ষায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। গত বছর থেকে গণিত বিষয়ে সৃজনশীল প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এ বছর কর্ম ও জীবনমুখী শিক্ষা নামে একটি নতুন বিষয়ে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়, শিক্ষা বোর্ড, জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের সমন্বিত প্রচেষ্টার কারণে পরীক্ষার সার্বিক ব্যবস্থাপনায় ক্রমশ উন্নতির ধারা অব্যাহত রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।

এবারের ফলাফলের অগ্রগতির একটি বড় সূচক হচ্ছে দেশের সর্ববৃহৎ এ দুই পাবলিক পরীক্ষাতেই ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের ফল ভাল। ফলের এ চিত্রের দিকে তাকালেই শিক্ষার অগ্রগতি স্পষ্ট হয়ে ওঠে বলে বলছেন বিশেষজ্ঞরা। ফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, জেএসসি-জেডিসি পরীক্ষার ফল ও অংশগ্রহণসহ সবদিক থেকেই ছাত্রদের থেকে এবার ছাত্রীরা এগিয়ে রয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষায় ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের পাসের হার প্রায় ১০ শতাংশ বেশি। ছাত্রদের পাসের হার যেখানে ৯৮ দশমিক ৪৫ সেখানে ছাত্রীদের পাসের হার ৯৮ দশমিক ৫৮ শতাংশ। অন্যদিকে পাস করা শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছেলেরা আছে ৪৫ শতাংশ আর মেয়েরা ৫৫ শতাংশ।

জেএসসি ও জেডিসিতে অংশগ্রহণকারী ২২ লাখ ৭২ হাজার ২৮৯ জনের মধ্যে ১২ লাখ ১১ হাজার ৪৯৩ জনই ছাত্রী। এর মধ্যে পাস করেছে ১১ লাখ ১৯ হাজার ৬৩৩ জন ছাত্রী, জিপিএ-৫ পেয়েছে এক লাখ ১১ হাজার ৩০৩ জন। ছাত্রের তুলনায় এক লাখ ৫০ হাজার ৬৯৭ জন ছাত্রী বেশি অংশগ্রহণ করেছে, এক লাখ ৪১ হাজার ১৮৪ জন ছাত্রী বেশি পাস করেছে, শতকরা হিসেবে পাসের হার দশমিক ১৮ শতাংশ বেশি। ছাত্রদের তুলনায় ২৬ হাজার ৩৮৪ জন ছাত্রী বেশি জিপিএ-৫ পেয়েছে। ছাত্রীদের এ অগ্রগতিকে ‘চমকপ্রদ’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন শিক্ষামন্ত্রী নূরুল ইসলাম নাহিদ। তিনি বলেন, মেয়েদের অংশগ্রহণ সমানতালে বাড়ছে, ভাল ফল করছে। প্রতিবছর এ হার স্থিতিশীল, হঠাৎ করেই নয়। তারা সকল ক্ষেত্রে এগিয়ে যাচ্ছে। ভবিষ্যতেও ভাল করবে, ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে তা আমরা দেখতে পাচ্ছি। সমাজের অগ্রগতির জন্য এটি বড় বিষয়। ২০১২ সাল থেকে জেএসসি-জেডিসি পরীক্ষার ফলাফল পর্যালোচনা করে দেখা যায়, প্রতিবছরই বাড়ছে ছাত্রীদের পাসের হার।

ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু বকর সিদ্দিক বলছিলেন, ফল ভাল করতে আমরা কঠোর অবস্থান নিয়েছিলাম। শিক্ষক প্রশিক্ষণ, নিয়মিত মনিটরিং এক্ষেত্রে একটা বড় ভূমিকা পালন করেছে। আর সৃজনশীল প্রশ্ন পদ্ধতিতে শিক্ষক প্রশিক্ষণ জোরদার করার ফলে ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে। জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটির সদস্যসচিব শিক্ষাবিদ অধ্যাপক শেখ ইকরামুল কবীর বলছিলেন, শিক্ষার প্রায় সকল সূচকে শিশুরা ভাল করেছে। নারীদের অবস্থান খুবই আশাপ্রদ। এসবই আমাদের আশা জাগায়।

এই মাত্রা পাওয়া