১৫ নভেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

২০১৫ ॥ কী পেলাম কী হারালাম

  • মুহম্মদ শফিকুর রহমান

এ লেখা যখন ছাপা হওয়ার কথা তখন ইংরেজী নতুন বছরের যাত্রা শুরু হবে। ২০১৬ শুরু হবে। এগিয়ে যাওয়ার আরেকটি বছর এবং জাতি এগিয়ে যাবেই। তবে এগিয়ে যেতে হলে পেছনে তাকাতে হয়। বিগত বছরটিতে আমরা কী হারিয়েছি, কী অর্জন করেছি, অর্জন করতে গিয়ে কতখানি ব্যর্থ হয়েছি তার একটা চিত্র দরকার, এগিয়ে যাওয়ার পথে যাতে পায়ে কাঁটা না ফোটে। কেননা, অর্জন সে যত বড়ই হোক মানুষ মনে রাখে না, বরং মনে রাখে যা অর্জন করা যায়নি এবং ব্যর্থতাগুলো। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, ব্যর্থতা যত ক্ষুদ্রই হোক বিশাল বিশাল অর্জনের চেয়েও তা শক্তিশালী হয়ে মানুষের জীবন আবর্তিত করে।

এ লেখা যখন লিখছি তখন ২০১৫’র শেষ সূর্য অস্তমিত হয়ে যাবে। রাত পোহালে ২০১৬’র প্রথম সূর্য প্রথম প্রভাত। এই প্রথম সূর্য বা প্রথম প্রভাত পহেলা বৈশাখের মতো উদযাপন না হলেও মাঝখানের রাতটি দারুণভাবে রঙিন হয়ে ওঠে। অবশ্যই বড় বড় হোটেলগুলোতে। এটা তাদের ব্যবসা। বিদেশী খদ্দের ধরার ব্যবসা। এই ব্যবসা বা খদ্দের ধরার বিষয়টি বড় বড় শহরের অভিজাত এলাকার কোন কোন বাড়িতেও ঘটে। ওই সব বাড়িতে সেলার কর্নারগুলো দেখার মতো এবং থরে থরে সাজানো নানান ব্রান্ডের বোতল। বিদেশী মদ। হোটেলগুলো বিনিময় নিলেও ব্যক্তিপর্যায়ের বাড়িতে বিনিময়ের বিষয়টি থাকে না। তাতে আমন্ত্রিত হন এক শ্রেণীর ঔপন্যাসিক, রাজনীতিক, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন পেশার ব্যক্তিবর্গ; এমনকি শিক্ষার সঙ্গে সম্পৃক্ত কিছু উঠতি বুদ্ধিজীবী, যারা মনে করেন গলায় পানি না পড়লে কি বুদ্ধি বেরোয়?

সবই প্রসঙ্গ কথা। এ লেখা মূলত বক্তব্যে। প্রথমেই তুলে ধরব বিদায়ী বছরের সমাপ্তিটা হয়েছে এমন এক সাফল্য দিয়ে, যা নতুন বছরের অভিযাত্রাকে আরও উদ্যমী, আরও সাহসী করে তুলবে, তা হলো গণতন্ত্রের অভিযাত্রা। ৩০ ডিসেম্বরের পৌর নির্বাচন জাতিকে সেই সাহস এনে দিয়েছে। এগিয়ে যেতে আর কোন বাধা থাকবে না। এ নির্বাচন যেমন বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে পেট্রোলবোমা সন্ত্রাসের পথ ছেড়ে গণতন্ত্রের পথে এনে দাঁড় করিয়েছে, তেমনি জামায়াত-শিবিরের রগকাটা রাজনীতি থেকে পেট্রোলবোমাবাজির রাজনীতিতে আসার পথকে কিছুটা হলেও রুদ্ধ করবে। যদিও খালেদা জিয়াকে বিশ্বাস নেই কতদিন তিনি গণতন্ত্রের পথে থাকবেন? আরও যাদের মুখে এই নির্বাচন তালা মারল তাদের নাম সিভিল সোসাইটি বা সুশীল সমাজ, যারা এতদিন গলা ভিজিয়ে এসে টকশোতে বসে গণতন্ত্রের জন্য গলা ফাটাচ্ছিলেনÑ ইনক্লুসিভ ইলেকশন চাই, ইনক্লুসিভ ইলেকশন চাই। এবার সে দাবি পূর্ণ হলো। তবে হ্যাঁ, বেগম খালেদা জিয়া এরই মধ্যে নির্বাচনের ফল প্রত্যাখ্যান করেছেন। আমি মনে করি এতে দোষের কিছু নেই। বরং গণতান্ত্রিক কার্যক্রম বা ইনক্লুসিভ ইলেকশনেরই কালচার। যে জিতবে সে খুশি হবে, যে জিতবে না সে অখুশি হবে, ফল প্রত্যাখ্যান করবে, পুরো নির্বাচন বাতিলের দাবি তুলবে, আন্দোলন করবে- এটাই স্বাভাবিক। আমাদের মতো উঠতি অর্থনীতির দেশের জন্য এটি অলঙ্কার। সরকারী দল নির্বাচনে অনিয়ম হলেও বলবে হয়নি, বিরোধী দল না হলেও বলবে হয়েছে। তবু এই নির্বাচনের যেটি ইতিবাচক দিক তা হলো, এতদিন সরকারী দলকে অপবাদ মাথায় নিয়ে চলতে হচ্ছিল যে, ২০১৪’র ৫ জানুয়ারির নির্বাচন ছিল একদলীয় এবং পার্লামেন্টের ৩০০ আসনের মধ্যে যারা ১৫৩ আসনেই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন তারা সবাই ক্ষমতাসীন ১৪ দলীয় মহাজোটের এবং প্রধানত আওয়ামী লীগের। সে নির্বাচনে বিএনপিসহ ২০ দলীয় জোট অংশ নেয়নি। দেশে-বিদেশে এ অপবাদ সরকারকে বয়ে বেড়াতে হচ্ছিল। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আপ্রাণ চেষ্টা সত্ত্বেও বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া নির্বাচনে যাননি। পপুলার ধারণা হচ্ছে, খালেদা নিজ দল বিএনপির চেয়ে জামায়াত-শিবিরের ওপর বেশি নির্ভরশীল। জামায়াত-শিবিরই তাকে যেতে দেয়নি। তারা বলেছে, ক্যাডারভিত্তিক আন্দোলন করে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা থেকে নামাবে। তাদের সেই আন্দোলন জাতি দেখেছেও। পেট্রোলবোমায় পুড়ে দেড় শতাধিক মানুষ নিহত হয়েছে, সহস্রাধিক যান পুড়ে ছাই হয়েছে, এমনকি নিরীহ গরুবাহী গাড়িও পেট্রোলবোমায় গরুসহ ছাই হয়েছে। তাই যা হওয়ার তাই হয়েছে, জনগণ রাজপথে নামেনি, খালেদার আন্দোলন ব্যর্থ হয়েছে। এবারের পৌরসভা নির্বাচনে ঠেলায় পড়ে হোক বা ভুল সংশোধনের লক্ষ্যে হোক অংশ নিয়েছে। এটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক আবহাওয়ার জন্য ইতিবাচক দিক। তারচেয়েও বেশি ইতিবাচক শেখ হাসিনার নেতৃত্বের জন্য। তার রাজনৈতিক দূরদর্শিতা আরেকবার প্রমাণিত হলো। এই প্রথম তিনি দলীয় প্রতীক ও মনোনয়ন দিয়ে দেশব্যাপী পৌরসভা নির্বাচন করালেন। একদিকে নৌকা, আরেকদিকে ধানের শীষ। এখানেই শেখ হাসিনা নেতা আর খালেদা জিয়া ব্যর্থতার কাতারে। খালেদা জিয়া এতদিন বলেছেন ধানের শীষে ভোট দিতে জনগণ এক পায়ে দাঁড়িয়ে, এমনকি এই নির্বাচনের দু’দিন আগেও বলেছেন, ৮০ শতাংশ আসন তারা পাবেন। ফল দেখা গেল উল্টোটা। ইংরেজী ডেইলি স্টারের তথ্য হলোÑ আওয়ামী লীগ নৌকা প্রতীক নিয়ে ১৭৯ এবং বিএনপি ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে ২১টি আসনে জয়ী হয়েছে। দৈনিক জনকণ্ঠের তথ্য হলোÑ আওয়ামী লীগ ১৭৮+বিদ্রোহী ১৮ এবং বিএনপি ২৪Ñবিদ্রোহী ১। অর্থাৎ খালেদা জিয়ার ভাষ্য টেকেনি। নৌকার কাছে ধানের শীষ মার খেয়েছে। গণতান্ত্রিক রাজনীতির কাছে হারল পেট্রোলবোমার রাজনীতি।

এটি অবশ্যই বাংলাদেশের অগ্রসর রাজনীতির জন্য মাইলফলক। আরেকটি হলো কয়েকজন যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসির রায় কার্যকর করা। বহু সুশীল বাবুর মুখে শুনেছি, যে যাই বলুক সাকা চৌধুরীকে ফাঁসি দেয়া যাবে না। ইঙ্গিতটা ছিল শেখ হাসিনার পরিবারের সঙ্গে সাকা পরিবারের সম্পর্ক, যদিও তা ছিল নেহাতই সৌজন্যমূলক, অর্থাৎ বঙ্গবন্ধু ও সাকার পিতা ফজলুল কাদের চৌধুরী বা ফকা চৌধুরীর মধ্যকার রাজনৈতিক সম্পর্ক। যদিও তা দুই বিপরীতমুখী রাজনীতি। ২০১৫ সালে সাকার সঙ্গে জামায়াত নেতা আলবদর কমান্ডার মুজাহিদ ও কামারুজ্জামানের ফাঁসি কার্যকর হলো। বছরের শেষদিন ব্লগার রাজীব হত্যার রায়ও হলো এবং রায়ে রানা (পলাতক) এবং দ্বীপ এই শিবির-আনসারল্লাহ ক্যাডারের ফাঁসি, একজনের যাবজ্জীবন। অন্যান্যেরও বিভিন্ন মেয়াদে সাজা হলো। যদিও মূল পরিকল্পনাকারী বলে বহুল আলোচিত জসিম উদ্দিন রাহমানির অপরাধ নাকি প্রমাণিত হয়নি, যে কারণে এ রায়ে রাজীবের পরিবার এবং লেখক-ব্লগার কেউ সন্তুষ্ট হয়নি। জানা গেছে, রাজীবের বাবা বলেছেন, সরকারের আন্তরিকতা থাকলেও তদন্তকারী সংস্থার গাফিলতির জন্য সুষ্ঠু বিচার পাওয়া যায়নি। তৃতীয় ইতিবাচক দিক হলো শত চেষ্টা করেও বিএনপি-জামায়াত বাংলাদেশে আইএস-আল কায়েদার অস্তিত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। হিযবুল মুজাহিদীন বা আনসারুল্লাহ বাংলাটিম বা হিযবুল্লাহর হুমকি বিস্তার লাভ করতে পারেনি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতায় তাদের একটার পর একটা আস্তানা গুঁড়িয়ে গেছে। যদিও এ বছর দু’জন বিদেশী হত্যা এবং মসজিদ-মন্দির-গির্জায় বোমার বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছে। এছাড়া আরও কয়েকজন লেখক-ব্লগারকে হত্যা করা হয়েছে। চতুর্থত, দেশের আর্থ-সামাজিক অগ্রগতির ক্ষেত্রে এমডিজি-এসডিজির সাফল্য, নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ, জাতীয় প্রবৃদ্ধি, মাথাপিছু আয়, খাদ্য উৎপাদন, বিদ্যুত উৎপাদন, দেশকে ডিজিটালাইজড করা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ- সবই অতীতের সকল রেকর্ড ছাড়িয়ে এগিয়ে চলছে। পদ্মা সেতু কেবল একটি সেতুই নয়, এগিয়ে যাওয়ার এক মহাসেতু। যে কারণে বিশ্বব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ কৌশিক বসু বলতে বাধ্য হচ্ছেন, চীনের সঙ্গে সমানতালে পাল্লা দিয়ে এগিয়ে চলেছে বাংলাদেশ। সর্বোপরি খালেদা জিয়া ও তার সহযোগী জামায়াত-শিবিরের নাশকতা সাফল্যজনকভাবে দমন করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে অনেক উচ্চতায় অবস্থান করছেন। রাশিয়ার ভøাদিমির পুতিন এবং জার্মানির চ্যান্সেলর এ্যাঞ্জেলা মার্কেলের কাতারে এখন শেখ হাসিনা। ‘চ্যাম্পিয়নস অব দ্য আর্থ’ বা ‘ধরিত্রীর আদরের কন্যা’ একইভাবে ত্বরিত সিদ্ধান্ত গ্রহণে ক্ষমতাধর শত নেতৃত্বের কাতারে তেরোতম। তার এই অবস্থান বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্য সুভবিষ্যতেরই নিশ্চয়তা দিচ্ছে। বাংলাদেশ আজ মধ্যম আয়ের গ্রুপে পা রেখে এগিয়ে চলেছে।

২০১৫ সালের নেতিবাচক দিক হলো- বছরটি শুরু হয়েছিল খালেদা জিয়ার পেট্রোলবোমা মেরে মানুষ হত্যার মধ্য দিয়ে। একটানা ৯২ দিন মানুষ উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার মধ্যে দিনাতিপাত করেছে। একের পর এক ব্লগার, লেখক ও প্রকাশক হত্যা, সিলেটের শিশু রাজন হত্যা, খুলনার শিশু রাকিব হত্যা, দুই বিদেশী হত্যা ছাড়াও ধর্মযাজককে হত্যার হুমকি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তল্লাশি চৌকি এলাকায় বোমা হামলা, তাজিয়া মিছিলে বোমা হামলা, শিয়া মসজিদ, আহমদিয়া মসজিদে বোমা হামলা, যেগুলোর সুরাহা বা দায়ী ব্যক্তিদের আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো সম্ভব হয়নি। এগুলো অবশ্যই নেতিবাচক দিক। সবচেয়ে উদ্বেগের ব্যাপার হলো- এক শ্রেণীর পুরুষের নারী ধর্ষণ, কন্যাশিশু ধর্ষণ, গৃহকর্মী ধর্ষণ, নির্যাতন এসব ঘটনা। তারচেয়েও বেশি করে জাতিকে চিন্তিত করেছে দেশব্যাপী মাদকদ্রব্যের প্রসার। ইয়াবা, হেরোইন, ফেনসিডিল, গাঁজা, প্যাথিড্রিন ইনজেকশন তরুণ-তরুণীদের মধ্যে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। এমনকি বিশ্ব ক্রিকেটের নাম্বার ওয়ান অল রাউন্ডার সাকিব এবং পপ ব্যক্তিত্ব আইয়ুব বাচ্চুর এ্যালকোহলিক ‘টাইগার’ পানীয়ের প্রচার কি অশোভন নয়? যার ফলশ্রুতিতে টিন-এজ তরুণীর বাবা-মাকে হত্যা করতে বুক কাঁপে না। ঐশীদের ফাঁসি হয়, যারা ঐশীদের বানায় তারা ধরা পড়ে না। ধরা পড়লেও অর্থ এবং ক্ষমতা তাদের কেশাগ্রও স্পর্শ করতে পারে না। এসব ক্ষেত্রে পুলিশের ভূমিকাও সন্দেহজনক। পুলিশ ইচ্ছা করলে বাংলাদেশ মাদকমুক্ত করতে পারে। করছে না কেন এটাই প্রশ্ন। এটাই আমাদের নৈতিবাচক অবস্থান।

যে বিষয়টির যথাযথ পর্যালোচনা দরকার তা হলো- পাকিস্তানকে হোয়াইটওয়াশ করে ক্রিকেট মোড়ল দেশের পর দেশ ভেঙ্গেচুরে ক্রিকেটের তাক লাগানো উত্থান, টাইগার মুস্তাফিজের ভয়ঙ্কর কিলিং বোলিং; স্বাধীনতার ৪৪ বছর পর অবরুদ্ধ ছিটমহলবাসীদের হাতে জাতীয় পতাকা, মুখে জাতীয় সঙ্গীত, বিশ্বব্যাংকের রক্তচক্ষুকে হেলা করে পদ্মা সেতু নির্মাণে শেখ হাসিনার সাহসী দূরদর্শী নেতৃত্ব, সাকা চৌধুরীসহ তিন যুদ্ধাপরাধীর মৃত্যুদ- কার্যকর; বড় বড় অর্জনের ওপর কালো ছায়া নামিয়েছে জঙ্গীবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা, এসব ভাববার বিষয়। বিষয়গুলো একেবারেই হেলা করার নয়।

ঢাকা ॥ ৩১ ডিসেম্বর ২০১৫

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও সভাপতি, জাতীয় প্রেসক্লাব