২০ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

জিহাদ-নীরবের করুণ মৃত্যুতেও টনক নড়েনি ঢাকা ওয়াসা ও সিটি কর্পোরেশনের

স্টাফ রিপোর্টার ॥ শিশু জিহাদ আর নীরবের করুণ মৃত্যুতেও টনক নড়েনি রাজধানীর ম্যানহোল ও স্যুয়ারেজ লাইনের দায়িত্বে থাকা ঢাকা ওয়াসা ও সিটি কর্পোরেশনের। তাদের উদাসীনতায় অরক্ষিত রয়েছে নগরীর অর্ধেকেরও বেশি ম্যানহোল। উন্মুক্ত থাকা এসব ম্যানহোলে পড়ে করুণ মৃত্যুসহ দুর্ঘটনার ফাঁদে পড়ছেন নগরবাসী। এ বছর এই দুই শিশুর মৃত্যু দেশবাসীকে কাঁদালেও মোটেও ভাবাতে পারেনি সেবাদানকারী এ দুটি প্রতিষ্ঠানকে। এ দুটি ঘটনায় সব অর্জনই ম্লান করে দিয়েছে ওয়াসা-ডিসিসি। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, রাজধানী ঢাকায় ৫০ হাজারেরও বেশি ম্যানহোল রয়েছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) গভীর ও অগভীর ড্রেন রয়েছে প্রায় এক হাজার ৫০০ কিলোমিটার। এরমধ্যে ডিএসসিসির ১৪ হাজার ২৪০টি ম্যানহোল রয়েছে। ঢাকা ওয়াসার গভীর ড্রেন রয়েছে ৩৪৬ কিলোমিটার। এরমধ্যে ম্যানহোল রয়েছে ১৮ হাজার ৩৫৮টি। ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) গভীর-অগভীর ড্রেনের পরিমাণ দুই হাজার ৬০০ কিলোমিটার। এসব ড্রেনের ওপর সø্যাব সিস্টেমের ম্যানহোল তৈরি করেছে সংস্থাটি। এর বাইরেও ডেসা, টিএ্যান্ডটি, বিটিসিএ ও বেসরকারী মোবাইল অপারেটর কোম্পানিসহ বিভিন্ন সংস্থার প্রায় ৫শ’ সাধারণ আকৃতির ম্যানহোল রয়েছে।

তবে ২০১৪ সালে করা ডিএসসিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংস্থার মোট ম্যানহোলের মধ্যে ৩৪টি ও ওয়াসার ৫৭টি ম্যানহোল ঢাকনা ছাড়া রয়েছে। তবে ওই হিসাবের সঙ্গে বাস্তবতার মিল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এর অর্ধেক ম্যানহোলের ঢাকনা নেই। দায়িত্বহীনতার কারণে এসব ম্যানহোল ও স্যুয়ারেজলাইন এখন অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে। কেউ কেউ এসব ম্যানহোল বা স্যুয়ারেজলাইনের গভীর পাইপে পড়ে করুণ মৃত্যুর শিকার হয়েছে। আবার অনেকেই চিরতরে হারিয়ে গেছে বলেও ধারণা করা হচ্ছে।

রাজধানী ঢাকার ম্যানহোল ও স্যুয়ারেজলাইনের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব ঢাকা সিটি কর্পোরেশন ও ঢাকা ওয়াসাসহ কয়েকটি সেবাদানকরী প্রতিষ্ঠানের। কিন্তু প্রতিষ্ঠানগুলোর উদাসীনতায় দিন দিন বাড়ছে দুর্ঘটনা। গত বছর শাহজাহানপুরে ঢাকা ওয়াসার ডিপ টিউবওয়েলের পরিত্যক্ত পাইপে আটকে শিশু জিহাদের করুণ মৃত্যুর পর মুগদায় ম্যানহোলের ভেতরে আরও দু’জন পরিচ্ছন্নকর্মীর নির্মম মৃত্যু হয়েছে। এরপর সম্প্রতি শ্যামপুরের স্যুয়ারেজলাইনে পড়ে শিশু ইসমাইল হোসেন নীরবের মৃত্যু আবারও নগরবাসীকে নাড়িয়ে দেয়। এরপরও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোন টনক নড়ছে না।

দুর্ঘটনার পর দুর্ঘটনাকবলিত ম্যানহোল ও স্যুয়ারেজলাইনটি কার তা স্বীকার করতে কেউ রাজি হয় না। শাহজাহানপুরের ঘটনায় ঢাকা ওয়াসা প্রথমে তার দায় এড়িয়ে রেলওয়ের ওপর দায় চাপাতে চেয়েছিল। যদিও পরে তারা স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে। তবে এসব মৃত্যুর জন্য নগরবাসীর পক্ষ থেকে বার বারই সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বয়হীনতাকেই দায়ী করা হয়েছে। তাদের মধ্যে স্যুয়ারেজের দায়িত্ব একটি সংস্থার হাতে দেয়া হলে সে সংস্থাটি এর দায়দায়িত্ব এড়াতে পারবে না।

নগরীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, একাধিক এলাকায় গভীর ড্রেন, নর্দমা, ম্যানহোল খোলা অবস্থায় রয়েছে। ওয়াসার বক্স কালভার্টগুলোও অবস্থা একই। অনেক বাসাবাড়ি, স্কুল, কিন্ডারগার্টেন, গার্মেন্ট ঘেঁষেই রয়েছে খোলা নর্দমা ও ম্যানহোল। আবার ব্যস্ততম রাস্তার পাশেও দেখা মিলছে গভীর নর্দমা। বর্ষায় রাস্তা আর নর্দমা-খোলা ড্রেন আলাদা করে দেখারও উপায় থাকে না। স্কুলগামী শিশুরা প্রায়ই এসব খানাখন্দে পড়ে গুরুতর আহত হচ্ছে। অনেকে এসব স্যুয়ারেজলাইনের গভীর পাইপে পড়ে গিয়ে হারিয়ে গেছেন বলেও মনে করছেন অনেকেই। এসব দেখার যেন কেউ নেই।

অনুসন্ধানে জানা যায়, রাজধানীর অলিগলি সর্বত্রই এমন ঢাকনাবিহীন ম্যানহোল ছড়িয়ে রয়েছে। এসব ম্যানহোলের মধ্যে পা পিছলে পড়ে প্রতিনিয়ত কেউ না কেউ আহত হচ্ছে। পুরান ঢাকা, শ্যামপুর, যাত্রাবাড়ী, শাহজাহানপুর, ভাটারা, নূরেরচালা, শাহজাদপুর, রামপুরাসহ প্রায় এলাকায় এ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ ড্রেন, নর্দমা, খোলা স্যুয়ারেজ ও ম্যানহোল রয়েছে, যা এখন মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নগরীর পানি ও পয়ঃনিষ্কাশনের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ম্যানহোল ও স্যুয়ারেজলাইন স্থাপন করে এর ঢাকনা দিয়ে দায়িত্ব শেষ করে। এরপর এসব ঢাকনা বিভিন্ন কারণে ভেঙ্গে বা চুরি হয়ে গেলে পুনরায় সহজে তা স্থাপন করে না, যে কারণে এসব ম্যানহোল এখন মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে।

তবে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো বলছে, ম্যানহোলের এসব ঢাকনা চুরি হয়ে যায়। এতে স্থানীয় ফেরিওয়ালা, মাদকাসক্ত এবং ডিসিসির কিছু পরিচ্ছন্নকর্মী জড়িত। ডিসিসি এগুলো পুনর্¯’াপনে আগ্রহ দেখায় না। বার বার অভিযোগ করেও কোন লাভ হয় না। তারা দায় চাপায় ওয়াসার ওপর। ওয়াসাও উল্টো দেখিয়ে দেয় ডিসিসিকে। ফলে দিনের পর দিন রাজধানীর ঢাকনাবিহীন ম্যানহোল ও স্যুয়ারেজলাইন অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে থাকে। ঢাকনাবিহীন এসব ম্যানহোলের অধিকাংশ স্থানে স্থানীয় বাসিন্দারা নিজ উদ্যোগে বাঁশের কঞ্চির মাথায় লাল কাপড় বেঁধে সতর্কচিহ্ন দিয়ে রাখেন। কিন্তু অসতর্কতার কারণেও বিভিন্ন দুর্ঘটনা ঘটছে।

অনুসন্ধানে আরও দেখা গেছে, রাজধানীর এসব স্যুয়ারেজলাইন ময়লা-আবর্জনায় ভরে গিয়ে সেখানে তৈরি হয় বিষাক্ত গ্যাস। সেসব স্থানে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর শ্রমিকদের নামিয়ে বিভিন্ন সময় পরিষ্কারের কাজ করে। কিন্তু জমে থাকা বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে অনেকেই মৃত্যুমুখে পতিত হয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, ঝুঁকিপূর্ণ এ কাজে শ্রমিকদের নিযুক্ত করা হলেও শ্রমিকদের মধ্যে অক্সিজেন মাস্ক, হ্যান্ডগ্লাভস, হেলমেটসহ প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি সরবরাহ করা হয় না, যে কারণেই দুর্ঘটনায়র শিকার হন শ্রমিকরা।

এ বিষয়ে অবশ্য শেষ পর্যন্ত টনক নড়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের। সম্প্রতি এক সভায় ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকন বলেছেন, ‘সেবাদানকারী প্রতিটি সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। সব সংস্থার প্রধানদের নিয়ে একত্রে কাজ করা হবে। ফলে এসব খুঁটিনাটি বিষয়াদি আর বাকি থাকবে না। এজন্য নগরবাসীকে দুর্ভোগ পোহাতে হবে না।’

এই মাত্রা পাওয়া