১৫ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

মুক্তিযোদ্ধার জবানবন্দী হানাদার শিবিরে চল্লিশ দিন

মুক্তিযোদ্ধা গিয়াসউদ্দিন এলাহী ১৯৭১ সালে পটুয়াখালী জেলার গলাচিপা থানা ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলেন। মুক্তিযোদ্ধাদের একটি গ্রুপে যোগ দিতে যাওয়ার পথে আগস্ট মাসের প্রথম সপ্তাহের এক রাতে গলাচিপা ডিগ্রী কলেজের কাছে রাজাকারদের হাতে গ্রেফতার হই। গ্রেফতারের পর থানা হাজতে নেয়া হয়। পরদিন পাকিস্তানী সেনারা আমাকে পিছমোড়া করে বেঁধে পটুয়াখালী নিয়ে যায়। আরও কয়েকজন গ্রেফতারকৃতের সঙ্গে সার্কিট হাউসে নেয়া হয়। সে সময়ে সার্কিট হাউস পাকিস্তানী সেনারা ক্যাম্প হিসেবে ব্যবহার করে। আমাদের গাড়ি বারান্দার পাকা মেঝেতে বসানো হয়। সবারই হাত-পা বাঁধা। মিনিট কয়েকের মধ্যে পাকিস্তানী সেনা মেজর ইয়ামিন দুই সঙ্গীসহ ছড়ি ঘোরাতে ঘোরাতে কাছে এলো। সাচ বাতো...। হুঙ্কার ছাড়ল মেজর। কিন্তু সে হুঙ্কারের অর্থ বুঝতে পারিনি। কয়েক সেকেন্ডের নীরবতা। উত্তর না পেয়ে মেজর ইয়ামিন পাগলা কুকুরের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল আমার ওপর। পিঠের ওপর সপাং সপাং শব্দে পড়ল ছড়ির আঘাত। সঙ্গে সমানে বুটের লাথি। তলপেটের লাথি মুহূর্তে পরনের লুঙ্গি ভিজিয়ে দিল। পায়ের হাঁটুর ওপর মোটা লাঠির আঘাত যেন হাতুড়ি দিয়ে ইট ভাঙছে। কানের ওপরের জুলফি ধরে হেঁচকি টান; চোখের ওপর সরষে ফুলের মতো জ্বলে উঠল। এভাবে কতক্ষণ নির্যাতন চলেছে বলতে পারি না। যখন মার থামল, দেখতে পেলাম লুঙ্গি-জামা সব রক্তে ভেসে যাচ্ছে। কানে শুনতে পেলাম গ্রেফতারকৃত সঙ্গী এলাকার বিশিষ্ট রাজনীতিক মোজাম্মেল হকের কণ্ঠস্বর। আমাকে লক্ষ্য করে বলছেন, গিয়াস তুই সত্য কথা সব বলে দে। মেজর ইয়ামিন উর্দুতে জিজ্ঞাসা করল, তুমি কি মুক্তিযোদ্ধার ট্রেনিং নিয়েছ? এক শব্দে বললাম, হ্যাঁ। আবার প্রশ্ন। কে ট্রেনিং দিয়েছে? সেকেন্ডের মধ্যে মাথায় এলো দুষ্টুবুদ্ধি। বললাম, থানার বর্তমান ওসি। শুনে গুম মেরে গেল মেজর ইয়ামিন। এরপর এক এক করে কয়েকজন আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ নেতার নাম জিজ্ঞাসা করল।

জানতে চাইল- ওরা কোথায়। বললাম, জানি না। ওরা কে কোথায় গেছে আমি তা জানি না। ওদের সঙ্গে আমার কোন যোগাযোগ নেই। উত্তর শুনে পেছন ফিরল মেজর। সামনে দাঁড়ানো এক ক্যাপ্টেনকে কী যেন নির্দেশ দিল। ক্যাপ্টেন এগিয়ে এলো। হাতের ছড়ি দিয়ে পেটে গুতো মেরে ইশারা করল, সোজা হয়ে দাঁড়াতে। চুলের মুঠি ধরে টেনে দাঁড় করাল। কিন্তু সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারলাম না। ধপাস করে পড়ে গেলাম পাকা মেঝের ওপর। পাগলা মোষের মতো ক্ষেপে উঠল ক্যাপ্টেন। শরীরের সব শক্তি জড়ো করে দু’হাতে চাবুক ধরে পেটাল গরুর মতো। যতক্ষণ গায়ে শক্তি ছিল ততক্ষণই পেটাল। জ্ঞান হারালাম। যখন জ্ঞান ফিরল তখন বাইরের পৃথিবী গাঢ় অন্ধকারে ঢেকে গেছে। আস্তে আস্তে চোখ মেলে দেখতে পেলাম মাথার ওপর ছাদে জ্বলছে টিমটমে বিদ্যুতের ভাল্ব। পাকা মেঝে। চারদিকে পাকা দেয়াল। একটি কক্ষ। পাশ ফিরে তাকালাম। দেখলাম আমার মতো আরও ৬/৭ বন্দী। বুঝে নিলাম এটি সার্কিট হাউসেরই একটি কক্ষ। গ্রামে বসে আগেই শুনেছি এ কক্ষটির কথা। এটি টর্চার সেল। পরবর্তী দীর্ঘ ৪০ দিন কেটেছে সার্কিট হাউস আর জেলখানায়। পাকিস্তানী সেনারা এরমধ্যে কয়েকবারই বন্দুকের নলের সামনে দাঁড় করিয়েছে। সঙ্গী অনেককে মেরে ফেলেছে। কিন্তু সৌভাগ্যক্রমে আমি বেঁচে গেছি। তবে নির্মম নির্যাতন সইতে হয়েছে। পাকিস্তানী সেনারা দু’হাতের দশ আঙ্গুলে সুই ঢুকিয়েছে। মোমের আলোয় সুইয়ের মাথা পুড়িয়ে গরম করে দিয়েছে। পা দু’খানা বেঁধে উল্টা করে ঝুলিয়ে পিটিয়েছে। পানির পিপাসায় মুখে প্রস্রাব করে দিয়েছে। নির্যাতনের এমন কোন পন্থা নেই, যা হায়েনারা আমার ওপর চালায়নি। একপর্যায়ে বন্দীদশা থেকে মুক্তি পেয়ে আবার যোগ দিই মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে।

Ñশংকর লাল দাশ, গলাচিপা থেকে