২০ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

নতুন বইয়ের গন্ধে ফুলের মতো ফুটব

নতুন বইয়ের গন্ধে ফুলের মতো ফুটব

স্টাফ রিপোর্টার ॥ শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটির দিন। তাতে কি? ‘নতুন বইয়ের গন্ধ শুঁকে ফুলের মতো ফুটব, বর্ণমালার গরব নিয়ে আকাশ জুড়ে উঠব’ এই প্রত্যয় নিয়ে সকাল থেকে ছুটে আসা ক্ষুদে শিক্ষার্থীদের পদচারণায় মুখর সারাদেশের স্কুল প্রাঙ্গণ। শিক্ষার্থীরা নেচে-গেয়ে, আনন্দ-উল্লাসে, প্ল্যাকার্ড- ফেস্টুন নেড়ে, বেলুন উড়িয়ে শামিল উৎসবে। বই পেয়ে তারা আনন্দে উদ্বেলিত। টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া রূপসা থেকে পাথুরিয়া দেশজুড়ে প্রতিটি স্কুল শিক্ষার্থীর কেবলই আনন্দ। বছরের প্রথম দিন খালি হাতে স্কুলে যাওয়া, আর সহপাঠীদের সঙ্গে পাঠ্যপুস্তক উৎসবে শামিল হয়ে হাতে পাওয়া পুরো এক সেট ঝকঝকে নতুন বই। বছরের প্রথম দিন দেশজুড়ে স্কুলে স্কুলে ছিল এমনই এক উৎসব, যার আমেজ থাকবে সপ্তাহজুড়ে। সারাদেশে উৎসব শুরু হলেও কেন্দ্রীয়ভাবে রাজধানীতে সকালে প্রথমে গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরী স্কুলে হাজার হাজার শিক্ষার্থীকে নিয়ে উৎসবের উদ্বোধন করেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। এরপর মিরপুরে ন্যাশনাল সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে উৎসব করেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান। বছরের প্রথম দিনই শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন বই তুলে দিয়ে শিক্ষামন্ত্রী বলেছেন, বছরের প্রথম দিন নতুন বই হচ্ছে আমাদের শিশুদের জন্য নববর্ষের শুভেচ্ছাস্বরূপ। সকল বই চলে গেছে স্কুলে। সরকারীভাবে এতো বই ছাপিয়ে বাঁধাই করে প্রত্যন্ত অঞ্চলের সবগুলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সকল শিক্ষার্থীর হাতে বছরের প্রথম দিন বিতরণের নজির বিশ্বে কোথাও নেই। এই উদ্যোগে বছরের প্রথম দিনেই হাসিমুখে বাড়ি ফিরছে ছেলে-মেয়েরা, যা আমাদের পরিতৃপ্ত করে। শিক্ষার্থীদের দেশের জন্য গড়ে ওঠার উপদেশ দিয়ে তাদের সেই সুযোগ করে দিতে অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান জানান শিক্ষামন্ত্রী। বলেন, জ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষার পাশাপাশি তাদের নৈতিক মূল্যবোধ ও দেশপ্রেমিক করে গড়ে তুলতে হবে। নতুন এ প্রজন্মই বাংলাদেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। এজন্য তাদের প্রকৃত মানুষ হওয়ার সুযোগ করে দিতে হবে। সকালে উৎসবের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদসহ অন্য অতিথিরা গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরী স্কুল প্রাঙ্গণে আসার সঙ্গে সঙ্গে স্কাউটের একটি সুসজ্জিত বাদক দল তাদের নিয়ে যায় সাজানো মূল মঞ্চে। অতিথিদের পরিয়ে দেয়া হয় লাল-সবুজ কাপড়ের উত্তরীয়। এরপর জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশন, ধর্মগ্রন্থ থেকে পাঠ। বেলুন উড়িয়ে ব্যাপ্টিস্ট মিশন স্কুলের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী তাসনিম বিনতে রাশেদের হাতে বই তুলে দিয়ে মন্ত্রী উৎসবের উদ্বোধন করেন। উৎসব উপলক্ষে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ পরিণত হয়েছিল হাজারো কোমলমতি শিক্ষার্থী, অভিভাবক, শিক্ষা প্রশাসনের কর্মকর্তা ও স্থানীয় নাগরিকদের মিলনমেলায়। শিক্ষামন্ত্রী উৎসবমঞ্চে বিভিন্ন স্কুলের ১৪ জন শিক্ষার্থীর হাতে নতুন বই তুলে দেন। মঞ্চের সামনে বসে থাকা কয়েক হাজার শিক্ষার্থীর হাতে তখন পৌঁছে যায় নতুন রঙ্গিন বই। তাদের বাম হাতের কব্জিতে বাঁধা ছিল সবুজ ফিতা, ডান হাতে ছোট্ট লাল পতাকা। এই পতাকা তুলে ধরে থেকে থেকে উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়ছিল তারা। ছাত্র-ছাত্রীদের নাচ-গান, আনন্দ-উল্লাস আর লাল-সবুজ প্ল্যাকার্ড-ফেস্টুন, রঙ্গিন বেলুনে তৈরি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ। শিক্ষার্থীদের কারও হাতে ছিল নতুন বই, কারও হাতে বেলুন, কারও হাতে জরির ফিতা। বই পেয়েছে- এমন কয়েকজন শিক্ষার্থী বলে, তাদের খুব ভাল লাগছে। এ সময় শিক্ষামন্ত্রী শিক্ষার্থীদের ভাল মানুষ করে গড়ে তোলার জন্য শিক্ষকদের প্রতি আহ্বান জানান। নতুন বই পেয়ে অগ্রণী হাইস্কুল এ্যান্ড কলেজের সপ্তম শ্রেণীর ছাত্রী ঝিনুক আহমেদ অনুভূতি ব্যক্ত করে বলছিল, বছরের প্রথম দিনেই সব বই হাতে পেয়েছি, খুবই ভাল লাগছে। ছুটির দিন এসেও খারাপ লাগছে না, ক্লান্তি লাগছে না। আমরা যে নতুন বই পেয়ে গেছি।

গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরী স্কুল মাঠে অনুষ্ঠিত বই উৎসবে বিশেষ অতিথি ছিলেন মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতরের (মাউশি) মহাপরিচালক অধ্যাপক ফাহিমা খাতুন। শিক্ষা মন্ত্রণালয় আয়োজিত অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন শিক্ষা সচিব সোহরাব হোসাইন। উৎসবে শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) সদ্যবিদায়ী চেয়ারম্যান অধ্যাপক নারায়ণ চন্দ্র পাল।

এই উৎসবে ল্যাবরেটরি স্কুল ছাড়াও বিসিএসআইআর হাইস্কুল, ধানম-ি সরকারী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, কামরুন নেছা সরকারী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, আজিমপুর সরকারী গার্লস স্কুল এ্যান্ড কলেজ ও হাফেজ আবদুর রাজ্জাক দাখিল মাদ্রাসার ছাত্র-ছাত্রীরা অংশ নেয়। শিক্ষামন্ত্রী বলেন, এবার চার কোটি ৪৮ লাখ ১৬ হাজার ৭২৮ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ২৯১ বিষয়ের ৩৩ কোটি ৩৭ লাখ ৬২ হাজার ৭৬০টি বই বিতরণ করা হচ্ছে। মন্ত্রণালয়ের সাফল্যের কথা তুলে ধরার পাশাপাশি নতুন বছরে ব্যর্থতাগুলো শুধরানোর চেষ্টা করার প্রত্যয় ব্যক্ত করে নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেন, শিক্ষার্থীদের জ্ঞান, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে বিশ্বমানের হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। নতুন প্রজন্মই বাংলাদেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। আমরা এখন আর দরিদ্র নয়। মেধা, জ্ঞান ও প্রযুক্তিতেও পিছিয়ে নেই।

এদিকে নতুন বই পেয়ে আনন্দে অত্মহারা শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকরাও। ল্যাবরেটরি স্কুলের চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্র ফারদিন আজমের সঙ্গে বই উৎসবে এসেছিলেন সিলভার কম্পোজিট টেক্সটাইল মিলসের ব্যবস্থাপক নুরুল আজম শামীম ও হুমায়রা বেগম। নুরুল আজম শামীম বলছিলেন, ছুটির দিন, তার মধ্যে আনন্দের উপলক্ষ সেজন্য সবাই এসেছি। বছরের প্রথম দিনে বই পাওয়ার আনন্দ অন্যরকম। ল্যাবরেটারী স্কুলের পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্র শ্রেষ্ঠ হাসান বলল, নতুন ক্লাসে উঠে নতুন বই পাইছি। অনেক মজা লাগছে। তৃতীয় শ্রেণীর রাকিব বলছিল, আজকে আমাদের বই দিয়েছে স্যাররা। ক্লাস হবে আগামীকাল। আমাদের খুব আনন্দ লাগছে। সন্তানকে পাঠ্যবই উৎসবে নিয়ে এসেছিলেন কাঁচামাল বিক্রেতা মমতাজ উদ্দিন। আপনার সন্তান বই পেয়েছে? এমন প্রশ্ন করতেই তার অভিব্যাক্তি ছিল, মেয়েকে স্কুলে নিয়ে এসেই বই পেয়েছি। মেয়ে এবং আমরা অভিভাবকরাও খুশি। শিক্ষার্থী রুবেল, শিশির ধন্যবাদ দিল প্রধানমন্ত্রী, শিক্ষামন্ত্রীকে। তারা দু’জনই বলছিল, মা-বাবা আমাদের বলেছে প্রধানমন্ত্রী ও শিক্ষামন্ত্রীর কারণেই আমরা এই সুন্দর বই পাইছি। নতুন বই হাতে বন্ধুদের নিয়ে মোবাইল ফোনে অনেকগুলো ছবি তোলে শিশু শরিফুল হাসান। লাল ফ্রেম কাগজ দিয়ে নতুন বইয়ে মলাট দেবে ষষ্ঠ শ্রেণীর শিক্ষার্থী শেখ হামিদও। তার ছোট্ট কথা, বইয়ে মলাট না দিলে কি বই ভাল থাকে? বলছিল, বছরের প্রথম দিনেই নতুন পেয়ে খুব আনন্দ লাগছে।

গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বই উৎসব ॥ মিরপুর ন্যাশনাল বাংলা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বেলুন ও পায়রা উড়িয়ে প্রাথমিকের বই উৎসবের উদ্বোধন করেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান। এ সময় উৎসবে শামিল হয়েছিলেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি মোতাহার হোসেন, সংসদ সদস্য কামাল আহমেদ মজুমদার, আ খ ম জাহাঙ্গীর হোসেন, ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লাহ, উম্মে রাজিয়া কাজল, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব হুমায়ুন খালিদ, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের মহাপরিচালক মোঃ আলমগীর। উৎসবের উদ্বোধন ঘোষণার পর মাঠে অপেক্ষায় থাকা শিক্ষার্থীদের কাছে নতুন বই নিয়ে কার কী ভাবনা- তা জানতে চান মন্ত্রী। পরে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, অনেক সময় বই বাঁধাই ও ছাপার মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। ২৫ থেকে ৩০টি কোম্পানি কাজগুলো করে। তাই তাদের চিহ্নিত করা কঠিন। তবে মন্ত্রণালয়ের গঠন করা একটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটি এ নিয়ে কাজ করছে। মিরপুর এলাকার ২০টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ন্যাশনাল সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এই উৎসবে যোগ দিতে আসে। তারা নতুন বই হাতে নিয়ে ফিরে যায়।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি মোতাহার হোসেন শিক্ষকদের উদ্দেশে বলেন, তিন মাস ছেলে-মেয়েদের বই মুখস্ত করাবেন। এতে তারা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসও জানতে পারবে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, সারা দেশে মোট ২ কোটি ২৩ লাখ ২২ হাজার ৪২৮ জন প্রাথমিক শিক্ষার্থীর মাঝে ১০ কোটি ৮৭ লাখ ১৯ হাজার ৯৯৭টি বই বিতরণ করবে তারা। এছাড়া ৩২ লাখ প্রাক প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের হাতে ৩ কোটি ২৮ লাখ ৮ হাজার ৫৩টি বই ও অনুশীলন খাতা বিতরণ করা হবে।

এদিকে মিরপুর ন্যাশনাল সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক নাসমীন সুলতানা জানান, গতবারের তুলনায় এবার বইয়ের বাঁধাই ভাল হলেও কাগজের মান আগের তুলনায় কমেছে বলে তার মনে হয়েছে। প্রথম দিন অনেক শিক্ষার্থীর হাতে মাত্র একটি বই তুলে দেয়া হলেও ধীরে ধীরে সব বই পৌঁছে দেয়া হবে বলে শিক্ষকরা জানান। এ স্কুলের পঞ্চম শ্রেণীর শিক্ষার্থী শাকিল আহমেদ জানায়, বছরের প্রথম দিন নতুন বই হাতে পেয়ে সে খুবই খুশি। একদিনও অপেক্ষা করা লাগল না। গতকাল পরীক্ষার রেজাল্ট দিল, আর আজ বই পেলাম। তাই আনন্দ।

কল্যাণপুর মডেল সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা হাসিনা পারভীন বলছিলেন, উৎসবে যোগ দিতে কিছু শিক্ষার্থী নিয়ে তারা এখানে এসেছেন। নতুন বছরের এ উৎসব শিক্ষার্থীদের পড়ালেখার আগ্রহটাও বাড়িয়ে দেবে। তার স্কুলের ২২ জন শিক্ষিকার সবাই একই রঙের শাড়ি পরে এসেছেন বলেও জানান হাসিনা পারভীন। এছাড়াও মিরপুরের আব্দুল মান্নান সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, মনিপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকারাও পরে আসেন এক রঙের শাড়ি।

উৎসবের সময় বই পেয়ে কেমন লাগছে একথা জিজ্ঞেস করেছিলাম চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্র রাহাতকে। রাহাতকে দেখে রীতিমতো সেখানে বই নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল তার সহপাঠীরা। সকলেরই এক কথা, আমাদের খুব আনন্দ লাগছে। একই শ্রেণীর আকিব, অরুণাময়, ইশতিয়াক, শাফিউল, মিনহাজ, পল্লব, ইফতেখার বলছিল, আমাদের আজ খুব আনন্দ লাগছে।