২৪ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বহুমুখী ও মানোন্নয়ন করে পণ্যের নতুন বাজার খুঁজতে হবে

বহুমুখী ও মানোন্নয়ন করে পণ্যের নতুন বাজার খুঁজতে হবে
  • বাণিজ্য মেলার উদ্বোধনীতে প্রধানমন্ত্রী

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের ব্যবসায়ীদের পণ্য বহুমুখীকরণ, পণ্যের মানোন্নয়ন, নিজস্ব ব্রান্ড তৈরি এবং সেগুলো বাজারজাত করতে নতুন নতুন বাজার খোঁজার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, আওয়ামী লীগ সরকার ব্যবসাবান্ধব। আমরা ব্যবসা করতে ক্ষমতায় আসিনি। দেশের উন্নয়নে কাজ করতে এসেছি। আমরা ব্যবসায়ীদের জন্য পরিবেশ সৃষ্টিতে কাজ করতে এসেছি। তাই পণ্যের বহুমুখীকরণ করতে হবে। আমাদের উৎপাদিত পণ্যের জন্য বিশ্বে নতুন নতুন বাজার খুঁজতে হবে। কোন দেশে কোন পণ্যের চাহিদা আছে তা বিশ্লেষণ করতে হবে। সে অনুযায়ী রফতানিযোগ্য পণ্য উৎপাদনে দৃষ্টি দিতে হবে। বাংলাদেশ ২০৫০ সালে পশ্চিমা দেশগুলোকেও উন্নয়নে ছাড়িয়ে যাবে।

শুক্রবার বিকেলে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে মাসব্যাপী ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা-২০১৬-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। ব্যবসায়ীদের উদ্দেশে তিনি আরও বলেন, আমাদের পণ্যের মান বাড়াতে হবে, ব্রান্ডিংয়ের প্রতিও গুরুত্ব দিতে হবে। পণ্যের মান বাড়লেই চাহিদা বাড়বে। এখন সেদিকেই দৃষ্টি দিতে হবে। তিনি বলেন, আমাদের এগিয়ে যাওয়ার একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য আছে। জাতির পিতার নেতৃত্বে আমরা মুক্তিযুদ্ধ করে স্বাধীন হয়েছি। আমরা বিজয়ী জাতি। মাথা উঁচু করেই আমরা নিজেদের গড়ে তুলবো। এজন্য আরও ব্যবসা-শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে।

বরাবরের মতো এবারও মেলার ২১তম আসরের আয়োজন করে রফতানি উন্নয়ন ব্যুরো ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। উদ্বোধন শেষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাণিজ্য মেলার বিভিন্ন স্টল ঘুরে ঘুরে পরিদর্শন করেন। এ সময় মেলার বাইরে উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা যায়। প্রধানমন্ত্রী মেলাস্থল ত্যাগ করার পরই (সন্ধ্যায়) বাণিজ্য মেলা সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়।

পণ্য ও ইন্ডাস্ট্রিজ বহুমুখীকরণের মাধ্যমে বৈশ্বিক বাজার দখল করার জন্য ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা হয়তো এক একটি পণ্য বিশেষভাবে ধরে বসে থাকি। শুধু এটাই মনে করি, এটাই বুঝি চিরদিন বাজার পাবে, রফতানি পাবে। এটা কিন্তু ঠিক না। আমাদের দেশের পণ্যের অনেক সুনাম আছে। পাট এক সময় রফতানি হতো বিভিন্ন দেশে। মসলিন এক সময় খুব নামকরা ছিল। তাই আমাদের যেসব পণ্য আছে, সেগুলো বহুমুখীকরণ করতে হবে। আমাদের নতুন নতুন বাজার খুঁজতে হবে। পৃথিবীর কোন দেশে কি কি পণ্যের চাহিদা আছে সেটাও আমাদের জানতে হবে। সে চাহিদা অনুসারে আমাদের কোন কোন পণ্য রফতানি, উৎপাদন বা প্রক্রিয়াজাতকরণ সম্ভব, রফতানি করা সম্ভবÑ সেদিকে বিশেষভাবে নজর দিতে হবে।

বাণিজ্য মেলার গুরুত্ব দিন দিন বেড়েই চলেছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ মেলা নিয়ে অন্যদের আগ্রহও সৃষ্টি হয়েছে। বিদেশীদের অংশগ্রহণের ফলে অভিজ্ঞতা বিনিময় করা যায়। বাংলাদেশী পণ্য বাইরে প্রচুর রফতানি হচ্ছে। এতে নতুন পণ্য রফতানির সম্ভাবনাও বাড়ছে। বিষয়টি মাথায় রেখে ব্যবসায়ীদের কাজ করতে হবে। শুধু একটি পণ্যকে ধরেই নয়, যেসব পণ্য রফতানি করা যায় তা নিয়ে ভাবতে হবে। কোন দেশে কোন পণ্যের চাহিদা আছে তা বিশ্লেষণ করতে হবে ব্যবসায়ীদের। কোন রফতানিযোগ্য পণ্য উৎপাদন করা যায়, সেদিকে দৃষ্টি দিতে হবে।

এ সময় জাহাজ ও সিরামিক শিল্পের সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ মিঠাপানির মাছ রফতানিতে চতুর্থ স্থানে রয়েছে। আন্তর্জাতিক মানে প্রক্রিয়াজাত করতে পারলে এটা বিশ্ববাজারে আরও সমাদর পাবে। আর তা করতে পারলে কর্মসংস্থানও বাড়বে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। এতো খাল-নদী বিশ্বের আর কোথাও নেই। আমাদের বিশাল সমুদ্রসীমা রয়েছে। এটাও সম্ভাবনাময় খাত। আওয়ামী লীগ সরকার এসব খাত নিয়ে গবেষণায় গুরুত্ব দিচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে অনেক শাক-সবজি উৎপাদন এবং তা রফতানি হচ্ছে। এ খাত নিয়ে আরও কাজ করতে হবে। আর অনেক মুসলিম দেশ রয়েছে যারা বাইরের দেশ থেকে হালাল মাংস কেনে। তবে আমরা কেন সেটি করতে পারছি না? চামড়া শিল্পের সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, আমরা কেবল চামড়া কেন রফতানি করবো? এটি প্রক্রিয়াজাত করে পণ্য উৎপাদন করেও তো রফতানি করতে পারি। এক্ষেত্রেও ব্যবসায়ীদের নজর দিতে হবে। তিনি বলেন, আমরা অনেক ক্ষুদ্র যন্ত্রাংশ তৈরি করতে পারি। আরও সুযোগ রয়েছে। ব্যবসায়ীরা যে সুযোগ নিতে পারেন। আমরা তরুণদের দক্ষ করে তুলে তাদের কাছ থেকে কাজ আদায় করে নিতে পারি। এতে বাংলাদেশ যথেষ্ট অগ্রগতি লাভ করবে।

আওয়ামী লীগ সরকারের নেতৃত্বে গত সাত বছরে বাংলাদেশ অনেক এগিয়ে গেছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আগে এ দেশ ছিল ঘূর্ণিঝড়, দুর্যোগের দেশ। কিন্তু এখন অনেক উন্নত দেশের তুলনায় বাংলাদেশ ভালো করছে, সেটা বিশ্বদরবারেই বলা হচ্ছে। বিশ্বের অর্থনৈতিক মন্দার মধ্যেও আমরা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছি। মাথাপিছু আয় বেড়েছে। বর্তমানে মাথাপিছু আয় ১ হাজার ৩১৪ মার্কিন ডলারে উন্নীত করতে সক্ষম হয়েছি। ছেলেমেয়েদের বিনামূল্যে বই পৌঁছে দিচ্ছি। অনেকে অবাক হয়ে যায়। আমাদের ছেলেমেয়েরা নতুন নতুন বই পেয়ে ভালভাবে পড়াশুনা করে সুশিক্ষিত হয়ে দেশের নেতৃত্ব দেবে, এটাই আমরা চাই।

গবেষণা করে সব অসাধ্য সাধন করা যায়Ñ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা যখন ১৯৯৬ সালে সরকার গঠন করি তখন দেখলাম, গবেষণার জন্য একটি টাকাও দেয়া হতো না সরকার থেকে। এরপর আওয়ামী লীগ সরকারই প্রথম গবেষণার ওপর গুরুত্ব দেয়। ফলে আজকে বাংলাদেশে বারো মাস বিভিন্ন কৃষিপণ্য বাজারে পাওয়া যাচ্ছে। যেগুলো সবজি শুধু শীতকালীন হিসেবে পরিচিত ছিল, আজকে কিন্তু এগুলো বারো মাস উৎপাদন করছি।

গবেষণা খাতে বেসরকারী খাতকে আরও বেশি এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, আমাদর সরকার কিন্তু ব্যবসা করতে আসেনি। আমি অন্তত আমার কথা বলতে পারি। আমি এখানে ব্যবসা করতে আসিনি। আমি দেশের উন্নয়নের জন্য কাজ করতে এসেছি। ব্যবসায়ীদের জন্য আমরা সুযোগ সৃষ্টি করে দিতে এসেছি। আওয়ামী লীগ যেহেতু ব্যবসাবান্ধব সরকার। কাজেই আমরা ব্যবসায়ীদের ব্যবসার জন্য যথেষ্ট সুযোগ করে দেই। যার ফলে আমাদের বিনিয়োগ বাড়ছে, উৎপাদন বাড়ছে ও রফতানিও বাড়ছে।

আমাদের যে লক্ষ্য তা সুনির্দিষ্ট করে দিয়েছি উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যে কোনো দেশেরই একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য থাকতে হবে। আমাদের এগিয়ে যাওয়ার একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য আছে। বাংলাদেশ আমরা স্বাধীন করেছি বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে। আমরা বিজয়ী জাতি। আমরা কারও কাছে মাথা নিচু করি না, মাথা উঁচু করে চলবেÑ সেভাবেই আমরা নিজেদের গড়ে তুলবো। এটা আমাদের সব সময় মাথায় রাখতে হবে। এজন্য আরও ব্যবসা-শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে। তিনি বলেন, বিএনপির আমলে রফতানি আয় ছিল ১০ দশমিক ৫৩ বিলিয়ন ডলার। এখন তা ৩১ দশমিক ৩ বিলিয়নে উন্নীত হয়েছে। নতুন মার্কেট খুঁজলে তা আরও বাড়বে। পরমুখাপেক্ষী হয়ে চলতে হবে না। রিজার্ভ বেড়েছে। বাজেট চারগুণের বেশি বেড়েছে।

গার্মেন্টস শিল্পপল্লী স্থাপনের বিষয়টি উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী ব্যবসায়ীদের উদ্দেশে বলেন, এখানে গার্মেন্টস শিল্পের যারা আছেন তাদের আমি বলবোÑ বহু আগে জায়গা দিয়েছি গার্মেন্টস শিল্প পার্ক তৈরির জন্য। কিন্তু আপনাদেরই যেন একটু গরজের অভাব আছে। তারা একটা পয়সাও খরচ করতে চান না। আপনাদেরও ( গার্মেন্টস ব্যবসায়ী) কিছু খরচ করতে হবে, আমরাও তো কিছু দেব। তবেই না একটি ভাল গার্মেন্টস পল্লী হবে। লাভবান তো আপনারা ব্যবসায়ীরাই হবেন। কাজেই আপনারা একটু বেশি এগিয়ে আসেন, গার্মেন্টস পল্লী হলে আমরা অনেক বেশি রফতানি বৃদ্ধি করতে পারব।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশকে এক সময় যারা কটাক্ষ করতো, এখন তারা ভাল আখ্যা দিয়ে প্রশংসা করছে। উন্নয়নের দিক দিয়ে বাংলাদেশ ২০৫০ সালে পশ্চিমা দেশগুলোকেও ছাড়িয়ে যাবে। ২০২১ সালে বাংলাদেশ একটি মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হবে। ইতোমধ্যেই বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশকে নিম্নমধ্য আয়ের দেশে উন্নীত করেছে, কিন্তু বাঙালী জাতি নিম্ন থাকবে না। উঁঁচু স্তরে যাবে। ব্যবসায়ীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, আমাদের পণ্যের মান বাড়াতে হবে, ব্রান্ডিংয়ের প্রতিও গুরুত্ব দিতে হবে। পণ্যের মান বাড়লেই চাহিদা বাড়বে। এখন সেদিকেই দৃষ্টি দিতে হবে।

শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশে দারিদ্র্য হ্রাস পাচ্ছে। গ্রামের মানুষের ক্রয় ক্ষমতা বেড়েছে। ৮ হাজার পোস্ট অফিস ডিজিটাল সেন্টারে পরিণত হবে। আড়াই হাজার ইতোমধ্যে হয়ে গেছে। বাকিগুলো হচ্ছে। অনলাইনে সবকিছুই করা হচ্ছে। ডিজিটাল বাংলাদেশ এখন বাস্তব। সবই অনলানেই কেনা যাবে। আমরা চাই আমাদের দেশ আরও সামনের দিকে এগিয়ে যাক। সেদিক লক্ষ্য রেখেই আমরা বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি। আমরা আশা করি, বাংলাদেশ সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আরও এগিয়ে যাবে। বিশ্বের বুকে উন্নত-সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে মাথা উঁচু করে চলবে।

বক্তব্য শেষে বাণিজ্য মেলার সফলতা কামনা করে শুভ উদ্ধোধন ঘোষণা করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। অনুষ্ঠানে শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) ভাইস চেয়ারম্যান শুভাশীষ বোস। আরও বক্তব্য রাখেনÑ বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব হেদায়েতুল্লাহ আল মামুন, ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স এ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের (এফবিসিসিআই) সভাপতি আবদুল মতলুব আহমেদ প্রমুখ।

বাণিজ্য মেলায় অংশগ্রহণকারী দেশগুলো তাদের সর্বশেষ পণ্য মেলায় দেশী-বিদেশী ক্রেতাদের প্রদর্শন করবে। এবার বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, পাকিস্তান, চীন, মালয়েশিয়া, ইরান, থাইল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র, তুর্কি, সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, দক্ষিণ কোরিয়া, জার্মান, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ ২১টি দেশ অংশ নেবে। এবছর সাতটি দেশ মরিসাস, ঘানা, নেপাল, হংকং, জাপান, মরোক্ক ও ভুটান মেলায় অংশ নিচ্ছে। মেলায় প্রবেশের জন্য পূর্ণ বয়স্কদের প্রবেশ ফি ৩০ টাকা ও শিশুদের জন্য ২০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এবার মেলায় থাকছে ১১১টি প্যাভেলিয়ান, ৫৭টি মিনি প্যাভেলিয়ন, ৮০টি প্রিমিয়ার প্যাভেলিয়ান ও ২৭৬টি স্টল।