২০ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

দুর্গম চরে উন্নয়নের ছোঁয়া, প্রযুক্তির আলোয় কাটল আঁধার

দুর্গম চরে উন্নয়নের ছোঁয়া, প্রযুক্তির আলোয়  কাটল আঁধার
  • হারিকেন ও কুপিবাতির জায়গায় সোলার প্যানেল

বাবু ইসলাম

বিদায় হারিকেন! বিদায় কেরোসিনের কুপি! তথ্য প্রযুক্তির উন্নয়নের ছোঁয়া লেগেছে দুর্গম চরেও। মান্ধাতা আমলের কেরোসিনের বাতি আর হারিকেনের পরিবর্তে ঘরে ঘরে এখন জ্বলছে সৌরবাতি। সোলারের আলোয় আলোকিত হচ্ছে আধুনিক সুবিধাবঞ্চিত যমুনা চরের মানুষ। দিনের সূর্যের আলো সংগ্রহ করে রাতের অন্ধকার দূর করছেন সিরাজগঞ্জের দুর্গম যমুনা চরের প্রায় ২ লাখ মানুষ। বদলে গেছে চরের মানুষের জীবনযাত্রা। দুর্গম চরাঞ্চল এখন অনেকটা আধুনিকতার ছোঁয়ায় উদ্ভাসিত হয়েছে। সৌর শক্তি বা সোলার বিদ্যুত, কম্পিউটার ইন্টারনেট সার্ভিস, তথ্য সেবা কেন্দ্র, মোবাইল ফোন, টেলিভিশন, পাকা সড়ক, উঁচু বাড়ি-ঘর গড়ে উঠেছে। খবরের কাগজও এখন পাওয়া যায় চরাঞ্চলে। গত পাঁচ বছরে এই আধুনিক প্রযুক্তির প্রচলন হয়েছে। তবে পুরো পরিস্থিতি পাল্টাতে মূল বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রমত্তা যমুনা। এঁকে বেঁকে চলা এই যমুনা সমতল ভূমির সঙ্গে বিভক্ত করে রেখেছে চরের মানুষকে।

শুধু অন্ধকার নয়, শিক্ষা ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকা এ জনগোষ্ঠীর জীবন মান উন্নয়নে অবদান রাখছে এই সৌরশক্তি। সোলারের আলোয় আলোকিত হয়ে শিক্ষার্থীরাও চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন শিক্ষার মান উন্নয়নে। শিক্ষার্থীদের কাছে রাতের বেলায় পড়াশোনার জন্য হারিকেন ও কুপি বাতির চেয়ে সোলারবাতির আলো ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। সৌরশক্তির বদৌলতে গ্রামীণ জনজীবনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মোবাইল, টেলিভিশন, কম্পিউটার, ইন্টারনেটসহ নানা সুযোগ সুবিধা। চরের মানুষের এখন আর শহরে যেতে হয় না ইন্টারনেট সুবিধার জন্য। ইউনিয়ন পরিষদ এবং ব্যক্তিগতভাবে ইন্টারনেট সুবিধা ছড়িয়ে পড়েছে অবহেলিত যমুনার চরে।

ইন্টারনেট সুবিধা, রাস্তাঘাটের উন্নয়নের কারণে পাল্টে যাচ্ছে যমুনা নদীর চরাঞ্চলের চেহারা। গত ১৫ বছরে এই চরে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। বিস্তীর্ণ চরে সোনালী ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখছে এখানকার মানুষ। জেলা শহর থেকে বিচ্ছিন্ন এই চরগুলোকে এক সময় অন্ধকারাচ্ছন্ন দ্বীপ বলা হতো। এখন এই চরে প্রায় দেড় লাখ লোকের বসবাস। আছে ইন্টারনেট সুবিধা ও বিদ্যুত ব্যবস্থা। রাস্তাঘাট, ব্যবসা-বাণিজ্যের ব্যাপক উন্নতি ঘটেছে।

সিরাজগঞ্জ জেলার কাজিপুর উপজেলার যমুনা নদীর এই চরে রয়েছে চরগিরিশ, নাটুয়াপাড়া, মনসুর নগর, নিশ্চিন্তপুর, খাসরাজবাড়ি, মাইজবাড়ি ও তেকানী ইউনিয়ন। এক সময় এসব চরে মানুষ বসবাস করতে ভয় পেত। এখন সেখানে দেড় লাখ লোকের বসবাস। স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা সবকিছু আছে এসব চরে। এমনকি ইউনিয়ন তথ্য ও সেবা কেন্দ্রের মাধ্যমে ইন্টারনেট সুবিধা পাচ্ছে এসব চরের মানুষ। চরবাসীকে কষ্ট করে আর জেলা বা উপজেলায় আসতে হয় না। সব কিছু এখন চরেই পাওয়া যাচ্ছে।

জেলা বা উপজেলা শহরের মতো বিদ্যুত প্লান্টে যান্ত্রিক সমস্য, লোডশেডিং ও লো-ভোলটেজ বিড়ম্বনা নেই যমুনা চরে। দিন রাত ২৪ ঘণ্টায় বিদ্যুত পাচ্ছে সৌর প্লান্টের মাধ্যমে। কোন আবেদন, জামানত ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ছাড়াই সহজ কিস্তিতে পাওয়া যায় সোলার প্যানেল। সংযোগ দেয়া এবং সার্ভিসিংসহ প্রয়োজনীয় সব সেবাই পাওয়া যায় ঘরে বসে।

যমুনা নদীর নাটুয়াপাড়া চরে গড়ে উঠেছে বিশাল হাট-বাজার। ছোট-বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানেই সোলার বাতির ব্যবহার হচ্ছে। এমন কোন বাড়ি বা দোকান নেই যে সোলার প্যানেল লাগানো হয়নি। সোলার বাতি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে এনে দিয়েছে ব্যাপক পরিবর্তন। চায়ের দোকানগুলোতে সব সময় চলছে টেলিভিশন। এতে ব্যবসাও হচ্ছে ভাল। যে সব এলাকায় কখনও বিদ্যুৎ সুবিধা পাওয়া সম্ভব নয়, সেসব এলাকার লোকজনও সৌর শক্তির মাধ্যমে বিদ্যুত সুবিধা নিচ্ছেন। একবার সৌর প্যানেল বসালে ২০ বছর এর সুবিধা ভোগ করা যায়, যে কারণে এর চাহিদা বেড়েই চলেছে। ৮৫ ওয়াটের একটি সৌর প্যানেলে একটি সাদা কালো টিভি, ৭-৮ টি লাইট ও একটি ফ্যান চলে। ৫০ হাজার টাকার ৮৫ ওয়াটের প্যানেল ২০ বছর আলো সরবরাহ করে থাকে। ছোট, বড় ও মাঝারি ধরনের সোলার প্যানেল রয়েছে। যার যার সাধ্য মতো মানুষ ক্রয় করছে। গত কয়েক বছরে চরে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। সোলার বিদ্যুত ব্যবসা বাণিজ্যের পরিধি বাড়িয়ে দিয়েছে।

কাজিপুর উপজেলা চেয়ারম্যান মোজাম্মেল হক বকুল সরকার জানান, চরের হাট-বাজার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ইউনিয়ন পরিষদ সব জায়গায় সোলার প্যানেল বসানো হয়েছে। রাতের বেলায় এখন আর চরবাসীকে ‘হারিকেন’ কিংবা কুপি বাতি জ্বালাতে দেখা যায় না। সোলার বিদ্যুতের কারণে ইউনিয়ন পরিষদ থেকে ইন্টারনেট সুবিধা পাচ্ছে চরের মানুষ। ধীরে ধীরে এর চাহিদাও বাড়ছে।

কাজিপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার শাফিউল ইসলাম বলেন, অতীতের চেয়ে বর্তমান সময়ে চরাঞ্চলে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। সোলার প্যানেলের মাধ্যমে ছাত্র-ছাত্রী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ সবাই এখন ইন্টারনেট সুবিধা পাচ্ছে চরে বসেই। জেলা বা উপজেলা শহর থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ায় চরে বিদ্যুৎ সংযোগ দেয়া সম্ভব হয়নি। কিন্তু সোলার প্যানেল চরের মানুষের দীর্ঘ দিনের সেই স্বপ্ন পূরণ করেছে। দিনের সূর্যের আলো দিয়ে রাতের অন্ধকার চরাঞ্চলকে আলোকিত করেছে এই সোলার প্যানেল। এ কারণে এখানে ব্যবসা বাণিজ্যে প্রসার লাভ করেছে।