২০ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

একুশ শতক ॥ ডিজিটাল রূপান্তর ও ডিজিটাল অপরাধ

  • মোস্তাফা জব্বার

॥ পাঁচ ॥

ডিজিটাল অপরাধ: আমরা যদি একটু চারপাশে তাকাই তাহলে ডিজিটাল অপরাধ খোঁজার জন্য খুব বেশি দূরে যেতে হবে না। নিজের পরিবারের উঠতি বয়সের মেয়েটি, স্ত্রী-ভগ্নি বা পাশের বাড়ির কোন মহিলার প্রতি নজর দিলেই ডিজিটাল অপরাধের ভিকটিম খোঁজে পাব। এদের প্রায় সকলেই কোন না কোনভাবে এমন অপরাধের শিকারে পরিণত হয়ে থাকে। সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থাটি হচ্ছে প্রায় সকলের হাতে থাকা মোবাইল ফোন নিয়ে। এর বাইরে প্রতিদিন সম্প্রসারিত হচ্ছে সকল প্রকারের ডিজিটাল প্রযুক্তিতে ডিজিটাল অপরাধ । আমাদের দেশেও এর একটি বড় বাহনের নাম ফেসবুক। ব্লগ, ওয়েব পোর্টাল, টুইটার, গুগল প্লাস ইত্যাদিও এর সঙ্গে যুক্ত। শুধু তাই নয়, ডিজিটাল অপরাধ এখন রাজনীতি ও অর্থের জগতেও ব্যাপকভাবে বিস্তৃত হচ্ছে।

ডিজিটাল অপরাধ বলতে কেবল ডিজিটাল প্রযুক্তিনির্ভর চেনা জানা ছোটখাটো অপরাধ নয়, অনেক অপরাধকে ডিজিটাল অপরাধ বলে গণ্য করা হয়। ডিজিটাল যন্ত্র ব্যবহার করে অপরাধ করা বা প্রতারণা করা কিংবা হ্যাকিং ও পাইরেসি করাকেও এর আওতায় গণ্য করা হয়। স্প্যাম, ম্যালওয়্যার বা ভাইরাস ছড়ানোকেও এই ধরনের অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়। প্রতারণা, মিথ্যা পরিচয় প্রদান, সন্ত্রাস ও সাম্প্রদায়িকতার বিস্তার ইত্যাদিও ডিজিটাল অপরাধের আওতায় পড়ে। ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতি, ইন্টারনেট ব্যাংকিং জালিয়াতি, মোবাইলে ইভ টিজিংসহ অনেক কিছুই ডিজিটাল অপরাধের আওতায় পড়ে।...

অনেকেরই ধারণা ছিল যে, সাইবার অপরাধ মানে হচ্ছে কেবল ইন্টারনেটভিত্তিক অপরাধ। কিন্তু বস্তুত সেটি সঠিক নয়। প্রথমত. ইন্টারনেট ব্যবহার এখন কেবল কম্পিউটারে সীমিত নেই- দ্বিতীয়ত. মোবাইল ফোন অপরাধের একটি বিশাল বাহন হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। রাষ্ট্রের জন্য এসব অপরাধকে মোকাবেলা করাটা বিশাল বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে পড়েছে।

সে জন্যই কেবল ফেসবুক বা ইন্টারনেট নয়, আরও অন্য ডিজিটাল ডিভাইস যেমন মোবাইল ফোন, আইপ্যাড, ট্যাবলেট পিসি, স্মার্ট ফোন ইত্যাদি ব্যবহার করে প্রতিনিয়ত ডিজিটাল অপরাধ করা হচ্ছে। অন্যদিকে এসব যন্ত্রের ব্যবহারকারীরা ডিজিটাল অপরাধের শিকারে পরিণত হচ্ছে। আমরা ক্রমান্বয়ে বর্তমান ধারার ডিজিটাল অপরাধ নিয়ে আলোচনা করব।

১. মোবাইলে ডিজিটাল অপরাধ: মোবাইল এখন বিশ্ববাসীর দৈনন্দিন যন্ত্র। এমনকি আমাদের দেশেও ১৬ কোটি লোকের মাঝে ১৩ কোটির বেশি মোবাইল কানেকশন রয়েছে। বিশ্বের ৭২৬ কোটি লোকের মাঝে ৭০৬ কোটি মোবাইল সংযোগ রয়েছে। বস্তুত রাতে ঘুমাতে গেলেও বালিশের কাছে এই যন্ত্রটি আমাদের রাখতে হয়। আমাদের নিজেদের পরিচিতিও একটি মোবাইল নাম্বারের মাঝে সীমিত হয়ে যাচ্ছে। তবে এই যন্ত্রটি এরই মাঝে ডিজিটাল অপরাধের এক বিশাল বাহক হয়ে পড়েছে। মোবাইলে মিস কল প্রদান, কল করে অশ্লীল মন্তব্য ও কুপ্রস্তাব করা, বাজে ও কুপ্রস্তাবসহ এসএমএস পাঠানো, ভিডিও চিত্র ধারণ ও প্রচার করা, কুৎসা বা গুজব রটানো, মানহানি এসব অহরহ হচ্ছে। প্রায় প্রতিদিন মোবাইলে সংঘটিত অপরাধের বিবরণ এখন মিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখা যায়। মেয়েদের জন্য এই প্রযুক্তিটি কোন কোন সময় ভয়ঙ্কর বিপদের বস্তু হয়ে পড়ে। একে ব্যবহার করে এমনকি সন্ত্রাস-চাঁদাবাজি এবং বোমাবাজি হচ্ছে। মোবাইল ব্যবহারের মাধ্যমে গুম-খুন ও অপহরণের ঘটনা প্রতিদিন বাড়ছে। মিডিয়ায় প্রায়ই গ্রামে-গঞ্জের খবরেও এসব বিষয়ে মামলা-মোকদ্দমার বিবরণ দেখা যায়। বিশেষ করে মোবাইলে ছবি তুলে সেই ছবি দিয়ে ব্ল্যাকমেল করা প্রায় নিয়মিত ঘটনা।

মোবাইলের সহায়তায় ইন্টারনেটের অপরাধও অহরহ হচ্ছে। মোবাইলের ইন্টারনেটের সহায়তায় ফেসবুকে, টুইটারে, গুগল প্লাসে, হাই-৫-এ বা অনেক সামাজিক নেটওয়ার্কে হাজার হাজার ছাত্রী-কর্মজীবী ও গৃহিণী এমন অত্যাচার ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। ইউটিউবে, ব্লগে এমন অসংখ্য ভিডিও, ছবি বা মন্তব্য আছে যার নাম অপরাধ। এর সঙ্গে মোবাইলে ব্যাংককিং, টাকা তোলায় জালিয়াতি ইত্যাদিতেও এখন অপরাধের মাত্রা বাড়ছে।

বাংলাদেশে মোবাইল ব্যাংককিং ব্যাপকভাবে প্রসারিত হওয়ায় মোবাইলে আর্থিক অপরাধের পরিমাণও বাড়ছে। কদিন আগে প্রখ্যাত কবি অসীম সাহা তার ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে জানান যে কেউ একজন মিথ্যা পরিচয় দিয়ে মোবাইলের সহায়তায় ২২ হাজার টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।

২. হ্যাকিং: বাংলাদেশে এখন বেশ ব্যাপকভাবে হ্যাকিং হয় এবং হ্যাকাররা গর্ব করে হ্যাকিংয়ের দায়িত্ব নেয়। কিছুদিন আগে সীমান্তে বাংলাদেশী হত্যা নিয়ে ভারতীয় ওয়বসাইটের হ্যাকিং হয়েছে। অহরহ দেশীয় বিভিন্ন ওয়েবসাইট হ্যাকিং হচ্ছে। মেইল-ফেসবুক হিসাব, টুইটার হিসাব, পোর্টাল ইত্যাদি হ্যাক করে দখল করার ঘটনা অহরহ ঘটছে। প্রতিদিন এমন ঘটনা ঘটছে যা আগে কখনও ভাবা যেত না। তবুও অনেকে মনে করেন, আমাদের দেশে হ্যাকিং এখনও খুব বড় সমস্যা হয়নি। কিন্তু সরকারের কোন কোন ওয়েবসাইট শৌখিন বা পেশাদারী হামলার শিকার হয়েছে। পুলিশ বা র‌্যাব এসব হামলা থেকে রেহাই পায়নি। কোম্পানি বা ব্যক্তিগত ওয়েবসাইট হ্যাকিং হচ্ছে। গণমাধ্যমের ওয়েবসাইটও হ্যাক করা হচ্ছে। একের ফেসবুক হিসাব অন্যের দখলে যাওয়া বা একের মেইল এ্যাকাউন্ট অন্যের দখলে নেয়া বা ওয়েবসাইটের বিষয়বস্তু বদলে ফেলার মতো ঘটনা একেবারে কম ঘটছে না। বরং মনে হচ্ছে, দিনে দিনে প্রবণতা খুব ভাল দিকে যাচ্ছে না। কোন কোন ক্ষেত্রে এটি অন্য দেশের চাইতে খারাপ দিকে যাচ্ছে। অন্য দেশে যা ঘটে না এখানে তাও ঘটে। আমাদের দেশে অন্যের সম্পদ নিজের বলে দাবি করার অনেক দৃষ্টান্ত রয়েছে, যা অন্য কোন দেশে ঘটে না।

৩. রাজনৈতিক অপপ্রচার : ইন্টারনেটে রাজনৈতিক মিথ্যাচারের তো কোন হিসাব নিকাশই নেই। ইন্টারনেটে ইচ্ছেমতো কাহিনী বানিয়ে, ইচ্ছেমতো ব্যাখ্যা দিয়ে যা খুশি তাই মন্তব্য করা হচ্ছে। ফেসবুক ও ব্লগিং সাইটগুলোতে এসব ঘটনা ঘটছে বেশি। আমাদের দেশে বেশ কিছু ব্লগিং সাইটে যাকে খুশি তাকে, যখন খুশি তখন, যা খুশি তাই গালি দেয়া হচ্ছে। ফেসবুকে মিথ্যা তথ্য বা বিকৃত তথ্য বা প্রতারণামূলক ভিডিও প্রচারিত হচ্ছে। ইউটিউব হচ্ছে তার সবচেয়ে বড় বাহন। ফেসবুকে কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে গ্রুপ তৈরি করে বলা হচ্ছে- অমুককে ঘৃণা করি। মানুষের ঘৃণা করার অধিকার যদিওবা থাকে তবু তারও একটি পরিশীলিত প্রকাশ থাকা উচিত।

খুব সম্প্রতি ‘ইনোসেন্স অব মুসলিম’ নামক একটি ছবি তৈরি করে মুসলমানদের ধর্মানুভূতিতে আঘাত দেয়ার ঘটনাটির উৎস ফেসবুক। ওখানে ১৪ মিনিটের একটি ভিডিও ক্লিপ দিয়ে আক্রমণটি করা হয়। অন্যদিকে বাংলাদেশেও তথ্যপ্রযুক্তিকে ব্যবহার করে অপরাধ তৈরি করা হচ্ছে। সম্প্রতি ফেসবুকে উত্তম বড়ুয়া নামক একজন পবিত্র কোরান পোড়ানোর ছবি ফেসবুকে তার নিজের দেয়ালে যুক্ত করেছে এই অভিযোগে রামু-উখিয়ায় লঙ্কাকা- ঘটানো হয়েছে। কেউ একবার এটি খোঁজেও দেখেনি যে, উত্তম বড়ুয়া এই কাজটি করেছে কিনা এবং তার নামে ফেসবুকে একটি ভুয়া এ্যাকাউন্ট খোলে এই ছবি পোস্ট করে হামলার প্রেক্ষিত তৈরি করা হয়েছে কিনা।

সম্প্রতি ধর্মীয় অনুভূতি নিয়ে দ্বিমাত্রিক ঘটনা ঘটে চলেছে ইন্টারনেটে। প্রথমত ইসলাম ধর্ম ও তার নবীকে অপমান করে একটি চলচ্চিত্রের অংশবিশেষ দেখানো হলো ইউটিউবে। ইন্টারনেটে এটি খুব সহজ কাজ। যে কেউ এটি যখন তখন করে বসতে পারে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে ইউটিউব কর্তৃপক্ষ বা গুগল ১৪ মিনিটের একটি ক্লিপ যাতে দুনিয়ার মুসলমানরা অপমানিত বোধ করছে, সেটি সরাতে রাজি হল না। বাংলাদেশসহ অনেক মুসলিম দেশ তার নাগরিকদের আবেগের কারণে ইউটিউব বন্ধ করে দিতে বাধ্য হলো। এর ফলে সামান্য একটি ভিডিও এসব দেশের সাধারণ ইউটিউব ব্যবহারকারীদের নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করল। আমি গুগলের মতো প্রকাশের স্বাধীনতার যুক্তিটি সমর্থন করতে পারি না। তথাকথিত বাক স্বাধীনতার নামে গুগলের এই মানসিকতা প্রকারান্তরে পশ্চিমা ধনবাদী সমাজের বিকারেরই নামান্তর। এমনকি ইউটিউব কর্তৃপক্ষ আপত্তিকর, অসত্য, মানহানিকর, আক্রমণাত্মক, পাইরেটেড ও বিভ্রান্তিকর উপাত্ত ইউটিউব থেকে সরানোর নীতিমালা মেনে চলে। কিন্তু বিশ্বের কোটি কোটি মুসলমানের অনুভূতিকে তারা সম্মান দেখায়নি। আমি মনে করি, এখানে প্রশ্নটি আসলে মত প্রকাশের নয়, এটি ধনবাদী সাম্রাজ্যবাদের পেশীশক্তির চর্চা। আমি নিজে খুব ধর্মপ্রাণ নই। কিন্তু এজন্য অন্যের ধর্মপ্রাণতাকে আমি আঘাত করতে পারি না। এটি কোনভাবেই কারও মত প্রকাশের স্বাধীনতা হতে পারে না। একজন মুসলিমবিদ্বেষীকে যদি ইসলামকে আঘাত করতে উৎসাহিত করা হয় তবে একজন খ্রীস্টানবিদ্বেষীও খ্রীস্টানদের আঘাত করার অজুহাত পাবে। অথচ কারোরই কোন ধর্মকে আঘাত করার অধিকার নেই। এই পৃথিবীতে অন্যের প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান দেখানোর বিষয়টি অনুপস্থিত হয়ে গেলে সেটি বাসযোগ্য থাকবে না-সভ্যতা নামক কিছু থাকবে না।

অন্যদিকে একটি ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত অঞ্চলের ছবি দেখিয়ে ফেসবুকে কিছু লোক বলার চেষ্টা করল যে, এই হলে ইসলামকে অবমাননাকারী সিনেমাটি দেখানোর আয়োজন চলছিল বলে সেই ভবনটি আল্লাহর কুদরতে সেটি বিধ্বস্ত হয়ে গেছে। প্রচারকারীরা এটির মধ্য দিয়ে আল্লাহর মাহাত্ম্য প্রচার করতে সচেষ্ট হলো। কিন্তু এতে যে খোদ আল্লাহকে অসম্মান করা হয়েছে সেটি তারা বোঝেননি। একইভাবে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ঘটনা নিয়ে মিথ্যা তথ্য প্রচার করা হয়েছে।

গত ফেব্রুয়ারিতে শাহবাগে গণজাগরণ মঞ্চ স্থাপিত হবার পর সেটিকে প্রতিরোধ করার জন্য জামাত শিবিরের পক্ষ থেকে প্রচার করা হলো যে শাহবাগের আন্দোলনকারীরা ব্লগার এবং তারা নাস্তিক মহানবীর বিরুদ্ধে কুৎসা রটনার দায় চাপিয়ে রাজীবকে হত্যা করে বলা হলো নাস্তিককে হত্যা করা হয়েছে। এই অপপ্রচারে ১৮ দলীয জোট সমর্থন দিল এবং হেফাজতে ইসলাম নামের একটি সংগঠন ব্লগারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করল। ৬ এপ্রিল ৩১ ঢাকায় মহাসমাবেশ ও ৫ মে ১৩ ঢাকা অবরোধ করার পর শাপলা চত্ব¡র দখল করে সরকার উৎখাতের চেষ্টাও করা হয়। তারই পাশাপাশি ইন্টারনেটে ব্লগারদের বিরুদ্ধে ব্যাপকভাবে অপপ্রচার চালানো হতে থাকে। শাপলা চত্ব¡রে ৩ হাজার মানুষকে হত্যা করার অপপ্রচারের পাশাপাশি মিথ্যা ছবি ব্যবহার করে রাজনৈতিক অপপ্রচার চালানো হতে থাকে।

ঢাকা, ৩১ ডিসেম্বর, ২০১৫

লেখক : তথ্যপ্রযুক্তিবিদ, দেশের প্রথম ডিজিটাল নিউজ সার্ভিস আবাস-এর চেয়ারম্যান, বিজয় কীবোর্ড ও সফটওয়্যারের জনক ॥

mustafajabbar@gmail.com, www.bijoyekushe.net, www.bijoydigital.com