২৩ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

নতুন বছরের শুরু এবং শেষের সালতামামি

  • তাপস মজুমদার

কথাটা প্রথম বলেছিলেন রাম মাধব। পরে বললেন রাম বিলাস পাসোয়ান। কথাটার মধ্যে চমক বা গিমিক আছে : একদিন ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ মিলে একাকার হয়ে যাবে। নিদেনপক্ষে ‘মহাসংগঠন বা ফেডারেশন’। কে এই রাম মাধব? আর কেই-বা পাসোয়ান? রাম মাধব ভারতের ক্ষমতাসীন দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) জাতীয় সাধারণ সম্পাদক এবং রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের কেন্দ্রীয় প্রভাবশালী নেতা। তিনি কাতারভিত্তিক টিভি চ্যানেল আল জাজিরার সঙ্গে এক সাক্ষাতকারে বলেছিলেন এ কথা। তার মতে, ৬০ বছর আগে যে ভুল করেছিলেন এই ত্রিদেশীয় রাজনৈতিক দলের নেতারা, সেই ভুল শুধরে দেবে উপমহাদেশের সাধারণ মানুষ। আর এর জন্য আদৌ কোন যুদ্ধের প্রয়োজন পড়বে না। রাম বিলাস পাসোয়ান ভারতের কেন্দ্রীয় ভোক্তা, খাদ্য ও সরবরাহমন্ত্রী এবং লোক জনশক্তির পার্টি প্রেসিডেন্ট। তদুপরি বিজেপি জোটের প্রভাবশালী নেতা। পিটিআইকে দেয়া এক সাক্ষাতকারের ভিত্তিতে ইকোনমিক টাইমস জানিয়েছে, ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ মিলে ‘এক দেশ’ না হোক, অন্তত একটি ‘মহাসংগঠন’ গড়ে তুলতে পারে, যাতে থাকবে মুক্ত বাণিজ্য ও অভিন্ন মুদ্রা ব্যবস্থা। সেটা করা সম্ভব হলে বন্ধ হবে সন্ত্রাস। উন্মুক্ত ও সুগম হবে মানুষের চলাচল। পাসোয়ান ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সাম্প্রতিক পাকিস্তান সফরের প্রশংসা করে বলেন, সীমান্তের উভয় দিকের মানুষ শান্তি চায়। সন্ত্রাসীরাই শুধু দিল্লী ও ইসলামাবাদের মধ্যে সুসম্পর্কের বিরোধিতা করে। পাসোয়ান যা বলেননি তা হলো- একদল স্বার্থান্বেষী মতলববাজ রাজনীতিকও এর বিরোধিতা করে থাকে। আর সবাই জানেন, তৎকালে ব্রিটিশদের কূটনৈতিক দুরভিসন্ধি যাই ছিল না কেন, এদেশীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের অদূরদর্শিতা ও হঠকারিতার জন্যই শেষ পর্যন্ত এই সুবৃহৎ উপমহাদেশের সাধারণ মানুষকে মেনে নিতে হয়েছিল অনিবার্য দেশ বিভাগ। বাস্তবতা হলো, এর মধ্যে মিশে আছে কোটি কোটি মানুষের হতাশা, দীর্ঘশ্বাস, রক্ত, এমনকি অশ্রুপাত। যারা খুশবন্ত সিংয়ের ‘এ ট্রেন টু পাকিস্তান‘ কিংবা অমিয়ভূষণ মজুমদারের গড় শ্রীখ- পড়েছেন, তারা মর্মে মর্মে অনুধাবন করতে পারবেন দেশ বিভাগের যন্ত্রণা ও যাতনা। ২০১৫ সালের প্রান্তে অথবা ২০১৬ সালের প্রারম্ভে রাম মাধব কিংবা রাম বিলাসের প্রস্তাব অবাস্তব ও অকল্পনীয় মনে হতেই পারে। হতে পারে শতাব্দীর সেরা কৌতুক। তাদের এই বক্তব্য নিয়ে বিভিন্ন মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনার ঝড়ও কম বয়ে যায়নি। এমনকি ভারতের বিরোধী দল জাতীয় কংগ্রেসও এর তীব্র সমালোচনা করেছে। নিঃসন্দেহে বিজেপি জোটের এই বক্তব্য একেবারেই অবান্তর, অগ্রহণযোগ্য, সর্বোপরি আকাশকুসুম কল্পনা। তবে এর পেছনে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে একটা যুদ্ধ নয়, বরং শান্তির প্রচ্ছন্ন প্রচেষ্টা থাকলেও থাকতে পারে।

সত্যি বলতে কি, প্যারিসে জাতিসংঘের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনকে উপলক্ষ করে নরেন্দ্র মোদি-নওয়াজ শরীফের আকস্মিক দেখা-সাক্ষাত ও করমর্দনকে উপলক্ষ করে এর সূত্রপাত। এর পর পরই ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ এক আকস্মিক ও অভাবিত সফরে পাকিস্তানে যান। সুষমার এই সফর ছিল যথেষ্ট ফলপ্রসূ ও ইতিবাচক। মনে রাখতে হবে, এ সময় দুই দেশের সীমান্ত ও কাশ্মীর নিয়ে উত্তেজনা ছিল তুঙ্গে। এটা কোন কাকতালীয় ঘটনা নয় যে, নওয়াজ শরীফের আম্মা এবং সুষমা স্বরাজ ভারতের পাঞ্জাবের একই গ্রামের মানুষ! এ রকম অগণিত উদাহরণ রয়েছে এই ভাগ্যবিড়ম্বিত উপমহাদেশে। যা হোক, নওয়াজ শরীফের মা সুষমাকে অনুরোধ করেছিলেন দু’দেশের মধ্যে বিরাজমান যুদ্ধের উত্তাপ বন্ধে ইতিবাচক সম্পর্ক গড়ে তুলতে তথা ভূমিকা রাখতে। সুষমা বোধ করি সে কথা রেখেছেন। এরই পরিণতিতে দু’দেশের উত্তেজনার বরফ গলতে শুরু করে, যার চূড়ান্ত পরিণতি রাশিয়া-আফগানিস্তান সফর শেষে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আকস্মিক ও নাটকীয় লাহোর অবতরণ, নওয়াজ শরীফকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা বার্তা পৌঁছে দেয়া, সর্বোপরি নাতির বিয়েতে যোগদান। ভারতের নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা মোদির এই সফরে নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। পাকিস্তানের সেনাবাহিনী বিশেষ করে গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইও ভালভাবে মেনে নেয়নি মোদির এই সফরকে। এরপরও বলতেই হয় যে, এটি নাটক বা উপন্যাসের চেয়েও বাস্তব। নওয়াজ ইতোমধ্যেই তার মন্ত্রীদের সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, ভারতের বিরুদ্ধে উল্টাপাল্টা কিছু না বলার জন্য। তেহরিক-ই-ইনসাফ পার্টির চেয়ারম্যান এবং বিরোধীদলীয় নেতা ইমরান খানও দিল্লী সফরে গিয়ে এনডিটিভির সঙ্গে এক সাক্ষাতকারে বলেছেন, ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে প্রায় অবাধ বাণিজ্য সম্পর্ক গড়ে তুলতে, দু’দেশের সাধারণ মানুষ যাতে চলাচলসহ ব্যবসা-বাণিজ্য করতে পারে এবং তাতে করে উত্তেজনা ও সন্ত্রাস প্রশমিত হবে।

এই পর্যন্ত পড়ে মনে হতে পারে যে, নতুন বছরের শুরুতে পরিস্থিতি বুঝি ভালর দিকেই অগ্রসরমান। বিশেষ করে তখন, যখন আগামী সার্ক শীর্ষ সম্মেলন হওয়ার কথা রয়েছে পাকিস্তানের ইসলামাবাদে। এ প্রসঙ্গে আপাতত অধিক মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন। তবে শেষ করতে চাই বিখ্যাত বাঙালী রম্যলেখক শিবরাম চক্রবর্তীর একটি মন্তব্য দিয়ে, ‘ভালোর ভালো বলে কিছু নেই, মন্দের ভালো সত্যিকারের ভালো।’

বাংলাদেশ বুঝি সেই মন্দের ভাল অবস্থানে। যে যাই বলুন না কেন, শত্রুর মুখে ছাই দিয়ে অন্তত এই উপমহাদেশে বেশ সুদৃঢ়, শক্ত ও শান্তিপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। কেননা বাংলাদেশের সঙ্গে পাকিস্তানের কোন সীমান্ত নেই। শুধু পাকিস্তানের সঙ্গে সীমান্ত থাকার কারণে আফগানিস্তান ও ভারতের জনগণ বেশ ভাল বোঝে যে, তারা কী অসহনীয় অশান্তি ও শঙ্কায় দিনযাপন করে থাকে। অস্ত্র, অর্থ, মাদক, হেরোইন, মানবপাচার, সর্বোপরি সন্ত্রাসসহ হেন কোন অপকর্ম নেই, যা পাকিস্তান করে না এবং এসবের পেছনেই ইন্ধন যুগিয়ে থাকে সে দেশের সেনাবাহিনী তথা আরও সঠিক অর্থে আইএসআই। সুদূরে অবস্থান হলেও বাংলাদেশও পাকিস্তানের এই অপকর্মের আওতার বাইরে নয়। সম্প্রতি ঢাকায় পাকিস্তান দূতাবাসের কার্যক্রম, অবৈধ অর্থ ও অস্ত্রের যোগান, সর্বোপরি জেএমবিসহ সন্ত্রাসী ও জঙ্গী কার্যক্রমে সরাসরি মদদদানের অভিযোগে একাধিক কূটনীতিক (নারীসহ) বহিষ্কার তথা প্রত্যাহারের মাধ্যমে এর প্রমাণ মিলেছে। এরপরও বলতেই হয় যে, ভাল আছে বাংলাদেশ, আমাদের সকলের প্রিয় মাতৃভূমি। ইতোমধ্যে নিজস্ব অর্থায়নে দেশের বৃহত্তম যোগাযোগের মাধ্যম পদ্মা সেতুর কার্যক্রম চলছে বেশ জোরেশোরে। রাশিয়ার সঙ্গে রূপপুরে ২৪০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন পারমাণবিক বিদ্যুতকেন্দ্র বিনির্মাণের সবচেয়ে বড় একক প্রকল্প চুক্তিও স্বাক্ষরিত হয়েছে। সর্বোপরি গত কয়েক বছর ধরে জাতীয় গড় প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ ধরে রেখে মাথাপিছু আয় ১,৩১৪ ডলার হওয়ায় নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ থেকে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীতকরণের জোর প্রচেষ্টা চলছে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে। ৬.২ শতাংশ মূল্যস্ফীতি সীমিত আয়ের সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দিয়েছে অনেকটা। তদুপরি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ২,৭৩৫ কোটি ডলার নিয়ে সরকারও রয়েছে শক্ত অবস্থানে। শেষ পর্যন্ত যদি জঙ্গী কার্যক্রম ও সন্ত্রাস দমনসহ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জন ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা যায়, তাহলে জাতীয় প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশে উন্নীত করাসহ মধ্যম আয়ের সঙ্গতি অর্জন করা অসম্ভব হবে না বলেই মনে হয়। দুর্মুখেরা যা-ই বলুন না কেন, গত বছরের শুরুতে ৫ জানুয়ারির জ্বালাও-পোড়াও-সহিংস জাতীয় নির্বাচনের চেয়ে বছর শেষের দেশব্যাপী পৌরসভা নির্বাচন যে অল্পবিস্তর সহিংসতা ব্যতিরেকে প্রায় অবাধ ও শান্তিপূর্ণ হয়েছে, এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না।

ইতোপূর্বে বিশ্বব্যাংকের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ও প্রধান অর্থনীতিবিদ কৌশিক বসুর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও অগ্রগতি বিষয়ক কিছু মন্তব্য নিয়ে আলোকপাত করেছিলাম। সেই তিনি সম্প্রতি ওয়াশিংটনে এক মন্তব্যে বলেছেন, বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম পড়ে যাওয়ার বিষয়টি বাংলাদেশ ও ভারতের জন্য ইতিবাচক হবে। সবাই জানেন, ২০০৮ সালের বৈশ্বিক মন্দার পর আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১১৫ মার্কিন ডলারে পৌঁছে। সেই তেলের দাম বর্তমানে নেমে এসেছে ব্যারেলপ্রতি ৩৬ ডলার ৫ সেন্টে, যা গত কয়েক বছরে সর্বনিম্ন। এ প্রেক্ষাপটে কৌশিক বসুর মন্তব্য, দামের এই রেকর্ড পতনে ওপেকভুক্ত দেশগুলোর অর্থনীতি চাপের মুখে থাকলেও বাংলাদেশ ও ভারতের জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে রাখবে ইতিবাচক ভূমিকা। তাতে ২০২০ সালের মধ্যে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশ অর্জন করা সম্ভব।

সব ভাল তার, শেষ ভাল যার। এবার একটু মজার ও মিষ্টিমুখের খবর দিয়ে শেষ করতে চাই। বিশ্বের অনেক দেশে বিশেষ করে মঙ্গোলীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে যেমন- চীন, হংকং, তাইওয়ান, ব্যাংকক, কোরিয়ায় পশু-পাখি-প্রাণীর নামে বর্ষবরণ ও নামকরণের রেওয়াজ রয়েছে আদিকাল থেকে। ভারতবর্ষ তা থেকে ব্যতিক্রম হবে কেন? পাঁজি বা পঞ্জিকায় যাই থাক না কেন, ভারতে ইয়াহু ২০১৫ সালের সেরা ব্যক্তিত্ব ঘোষণা করেছে ‘গরুকে’। নামীদামী মানবসন্তানদের কয়েক শ’ মাইল দূরে ঠেলে দিয়ে ইয়াহুর বিচারে গত বছরের পার্সোনালিটি অব দ্য ইয়ার নির্বাচিত হয়েছে গরু আর ইস্যু অব দ্য ইয়ার বীফ কন্ট্রোভার্সি বা গরু বিতর্ক এবং এ থেকে সৃষ্ট অসহিষ্ণুতা। সুতরাং সকলের প্রতি পরামর্শ, অসহিষ্ণুতা থেকে দূরে থাকুন।

সবশেষে, গিনেস বুকে বিশ্বের বৃহত্তম লাড্ডুর খবর, ওজন ৮ হাজার ৩৬৯ কেজি। বানিয়েছেন ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশের তপেশ্বরম গ্রামের ভক্ত জ্ঞানীয় সুইটসের গর্বিত মিষ্টি ব্যবসায়ী সালাদি ভেঙ্কটেশ্বরা রাও ওরফে শ্রীনি বাবু। ২৬ লাখ রুপী ব্যয়ে প্রস্তুত অতিকায় এই লাড্ডুতে দিতে হয়েছে ২ হাজার ৯০০ কেজি চিনি, ২ হাজার ৩০০ কেজি ডাল, ১ হাজার ১০০ কেজি ঘি, ৭০০ কেজি মিছরি, ৮০০ কেজি কাজু ও কিশমিশ, ৪০ কেজি এলাচ এবং ১০ কেজি কর্পূর। অতঃপর সবাই আসুন, খ্রিস্টীয় নতুন বছরে লাড্ডু খাই, লাড্ডু বিলাই। মধুরেণ সমাপয়েৎ।

নির্বাচিত সংবাদ