১৮ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

একাত্তরে রংপুরে প্রথম শহীদ শংকুর পরিবার ভাতা পায় না

মানিক সরকার মানিক, রংপুর ॥ দীপালি সমাজদার। মুক্তিযুদ্ধে রংপুরের প্রথম শহীদ শংকু সমাজদারের গর্বিত মা। এ মায়ের বুকের ভেতর সার্বক্ষণিক দাউ দাউ আগুন নিভছে না। যুদ্ধ শুরুর প্রাক্কালে ইয়াহিয়া খান পূর্ব নির্ধারিত জাতীয় পরিষদের অধিবেশন মুলতবি করার প্রতিবাদে ৩ মার্চ সারাদেশে হরতাল ডেকেছিলেন শেখ মুজিব। সেই হরতালের মিছিলে গিয়ে অবাঙালীদের গুলিতে শহীদ হয়েছিলেন এ মায়ের ছোট ছেলে সপ্তম শ্রেণীর ছাত্র শংকু সমাজদার। পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণেও তার কথা বলা হয়েছে। রাষ্ট্রীয়ভাবেও বলা হয়েছে ‘স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রাক্কালে শহীদ শংকুর আত্মদান আমাদের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধকে বেগবান ও ত্বরান্বিত করেছিল’। যুদ্ধ শেষে ’৭৫ সালে শহীদ পরিবার হিসেবে সরকার দরিদ্র দীপালী সমাজদারের বসবাসের জন্য একটি সরকারী বাড়ি লিজ দিয়েছিল। ৮৫ সালে সরকার ২৫ বছরে ২৫ কিস্তিতে বাড়ির মূল্য পরিশোধ সাপেক্ষে বাড়িটি তার কাছে বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নেয়। ২০০৭ সালে ২৫ কিস্তি পূর্ণ হওয়ার আগেই তিনি তার সেই কিস্তির সমুদয় টাকা এবং দলিল রেজিস্ট্রি বাবদ যাবতীয় পাওনা সরকারী কোষাগারে জমা করেন। এরপর ২০০৯ সালে জেলা প্রশাসন দলিল রেজিস্ট্রি করে দেয়ার উদ্যোগ নিয়ে জানতে পারেন শংকু গেজেটভুক্ত শহীদ কিংবা মুক্তিযোদ্ধা নন। ফলে তাকে ওই বাড়ির দলিল করে দেয়া যাবে কী না এ নিয়ে শুরু হয় মন্ত্রণালয়ে চিঠি চালাচালি এবং সকল প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পরও এক পর্যায়ে ‘গেজেটতত্ত্বে’ আটকে যায় দলিল রেজিস্ট্রি।

এরপর ২০১০ সালে পরিবারের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে শংকুকে গেজেটভুক্তকরণের উদ্যোগ নেন তৎকালীন জেলা প্রশাসক বিএম এনামুল হক। পরে তাও আটকে থাকে মন্ত্রণালয়ে। পরে আবারও দৌড়ঝাঁপে সে বছরের ২৩ আগস্ট শংকুকে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গেজেটভুক্ত করা হয়। এরপর গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের অপেক্ষায় আটকা পড়ে দলিল রেজিস্ট্রির কাজ। পরবর্তীতে পরিবারের চাপে একই বছরের ১৪ ডিসেম্বর গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধিশাখার উপ-সচিব হেমায়েত উদ্দিন স্বাক্ষরিত চিঠিতে জেলা প্রশাসককে দলিল সম্পাদনের অনুমোদনের বিষয়টি অবহিত করলে পরদিন ১৫ ডিসেম্বর বিকেলে জেলা প্রশাসক দীপালি সমাজদারের নামে বাড়ির দলিল রেজিস্ট্রি করে দেন এবং বিজয়ের ৪০ বছর পূর্তি উপলক্ষে ১৬ ডিসেম্বর আয়োজিত শহীদ মুক্তিযোদ্ধা পরিবার, বীর মুক্তিযোদ্ধা (মরণোত্তর) এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে তৎকালীন বিভাগীয় কমিশনার জসীম উদ্দিন আহমেদ এবং জেলা প্রশাসক বিএম এনামুল হক আনুষ্ঠানিকভাবে দীপালির হাতে তুলে দেন শহীদ মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গেজেটভুক্ত হবার গেজেট এবং বাড়ির দলিল। এসব পেয়ে আবেগাল্পুত দীপালি কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। বর্তমানে ৮৪ বছর বয়সী দরিদ্র এই শহীদ মাতা তার অপর মানসিক প্রতিবন্ধী সন্তান এবং তার স্ত্রী ও নাতি নাতনিদের নিয়ে চরম কষ্টে দিনাতিপাত করছেন।