১৭ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

পুঁজিবাজারে নেতিবাচক প্রভাব- দায়ী নিয়ন্ত্রক সংস্থার সমন্বয়হীনতা

অপূর্ব কুমার ॥ দেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলো বিভিন্ন সরকারী নিয়ন্ত্রক সংস্থার নিয়ন্ত্রণে কাজ করে। খাতভিত্তিক কোম্পানিগুলো আলাদা আলাদা নিয়ন্ত্রক সংস্থার আইন-কানুন দ্বারা পরিচালিত। তবে সার্বিকভাবে পুুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ এ্যান্ড একচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) দায়িত্ব পালন করে থাকে। এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংক, বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন ও রেজিস্ট্রার এ্যান্ড জয়েন্ট স্টক কোম্পানির মতো সংস্থাগুলোর স্ব স্ব খাতের কোম্পানিগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করে। সরকারী এসব সংস্থার কাজের সমন্বয় না থাকলে কোন একটি সংস্থার সিদ্ধান্তে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলো বড় ধরনের প্রভাব ফেলে। তাই তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে সংস্থাগুলোর মধ্যে এক ধরনের সমন্বয় জরুরী। গত কয়েক বছর ধরেই সরকারী এই সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাব দেখা গেছে। যার কারণে ভুগতে হয়েছে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের। অথচ সরকারী নির্দেশনায় বলা হয়েছে, তালিকাভুক্ত কোন কোম্পানি সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিতে পুুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে জানাতে হবে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সেটির ছিটেফোঁটাও দেখা যাচ্ছে না।

বিএসইসির আইন অনুযায়ী তালিকাভুক্ত কোন কোম্পানির ব্যবসা সম্পর্কিত যে কোন তথ্য ও সিদ্ধান্ত মূল্য সংবেদনশীল তথ্য হিসেবে বিবেচিত হয়। আর আইন অনুযায়ী বিনিয়োগকারীদের স্বার্থে এসব তথ্য ও সিদ্ধান্ত অবিলম্বে বিএসইসিকে জানাতে হয়। কিন্তু এসব নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো কোন সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে বিএসইসির সঙ্গে কোন ধরনের যোগাযোগ কিংবা সমন্বয় করছে না। ২০১৫ সালে সমন্বয়হীন এ ধরনের কিছু সিদ্ধান্ত বিএসইসিকে অপদস্ত করার পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদেরও ব্যাপক ক্ষতি করেছে। আর এ নিয়ে পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা বিভিন্ন সভায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। জানা গেছে, বর্তমানে দেশে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে রয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক, বীমা খাতে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ), বিদ্যুত ও জ্বালানি খাতে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি), টেলিযোগাযোগ খাতে বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি কমিশন (বিটিআরসি), ওষুধ ও রসায়ন খাতে ওষুধ প্রশাসক, এয়ারলাইন্স খাতে বেসরকারী বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) ইত্যাদি ছাড়াও রেজিস্টার্ড এ্যান্ড জয়েন্ট স্টক কোম্পানি (আরজেএসসি), জাতীয় রাজস্ব বোর্ড রয়েছে। বিদায়ী বছরে এসব নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসিকে না জানিয়ে বেশকিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছে যার নেতিবাচক পরিণতি বিনিয়োগকারীরা বহন করেছে। পাশাপাশি বিএসইসির ক্ষমতাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক ॥ বাংলাদেশ ব্যাংক বিএসইসির সঙ্গে কোন আলোচনা না করেই পুঁজিবাজারে ব্যাংকের বিনিয়োগের লাগাম টেনে ধরে। আর এ কাজ করতে গিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক পুঁজিবাজারের ব্যাপক ক্ষতি করে। এছাড়া তালিকাভুক্ত আইসিবি ইসলামিক ব্যাংককে মার্জার কিংবা লিকিউডিউশনের কার্যক্রম গ্রহণ করলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিএসইসিকে এখনও কিছু জানায়নি। এছাড়া সম্প্রতি বাংলাদেশ আরও একটি প্রজ্ঞাপন জারি করেছে সেখানে বলা হয়েছে, কোন ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান মিউচুয়াল ফান্ড বা বন্ডের ট্রাস্টি হতে পারবে না। কিন্তু তারা বন্ড ছেড়ে টাকা উত্তোলন করতে পারবে। সিকিউরিটিজ আইন অনুসারে ব্যাংক ফান্ডের ট্রাস্টি হতে পারবে। এক্ষেত্রেও বাংলাদেশ ব্যাংক কমিশনের সঙ্গে আলোচনা না করেই প্রজ্ঞাপন জারি করেছে।

বিইআরসি ॥ বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন বিএসইসির সঙ্গে কোন আলোচনা না করেই পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত তিতাস গ্যাসের ট্রান্সমিশন চার্জ কমিয়ে দেয়। আর এতে কোম্পানিটির ব্যবসা আশঙ্কাজনকহারে কমে যায়। কোম্পানিটি সমাপ্ত হিসাব বছরে ভাল লভ্যাংশ দিতে ব্যর্থ হয়েছে। এদিকে বিইআরসির এমন সিদ্ধান্তের কারণে তিতাস গ্যাসের শেয়ার দরে হঠাৎ ব্যাপক পতন ঘটে।

আইডিআরএ ॥ বীমা খাতের এ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির সঙ্গে কোন আলোচনা না করেই তালিকাভুক্ত স্ট্যান্ডার্ড ইন্স্যুরেন্সের লাইসেন্স বাতিল করেছে। এতে কোম্পানিটির বিনিয়োগকারীরা ব্যাপক অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। কারণ এ বিষয়ে বিএসইসির পক্ষ থেকেও কোন বক্তব্য দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। এছাড়া অনুমতি ছাড়া পরিশোধিত মূলধন বাড়ান অভিযোগে বাংলাদেশ ন্যাশনাল ইন্স্যুরেন্সের আইপিও স্থগিতের আবেদন জানায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে বিএসইসি ইন্স্যুরেন্সটির আইপিও স্থগিত করে দেয়। পরে অবশ্যই আইডিআরএ কোম্পানিটিকে জরিমানা করে আইপিও অনুমোদনের জন্য ছাড় দিয়েছে। এর ফলে কোম্পানির আইপিওর মাধ্যমে টাকা উত্তোলনের অনুমোদন মিললেও চাঁদা গ্রহণের তারিখ ঘোষণা করা হয়নি।

বিটিআরসি ॥ মোবাইল কোম্পানির ব্যবসা নিয়ন্ত্রণে এ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিন্তু এসব সিদ্ধান্ত মূল্য সংবেদনশীল তথ্য হওয়া সত্ত্বেও তারা বিএসইসিকে না জানিয়ে এসব সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।

আরজেএসসি ॥ কোন কোম্পানির মূলধন ২০ কোটি টাকার ওপরে বাড়াতে হলে বিএসইসির অনুমোদন নিতে হয়। কিন্তু আরজেএসসি বিএসইসির অনুমোদনপত্র ছাড়াই কোম্পানিগুলোর মূলধন বাড়ানোর সনদ দিচ্ছে। এছাড়া জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বিএসইসির সঙ্গে আলোচনা না করেই বিনিয়োগকারী এবং তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর বিভিন্ন ইস্যুতে করারোপ করছে।

ভারতের পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা সিকিউরিটিজ এ্যান্ড এক্সচেঞ্জ বোর্ড অব ইন্ডিয়া (সেবি) চেয়ারম্যান উপেন্দ্র কুমার সিনহার আগমন উপলক্ষে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর সমন্বয় বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, শিল্পে অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগের ক্ষেত্রে পুঁজিবাজার খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এর সঙ্গে বিনিয়োগকারী হিসেবে দেশের সাধারণ মানুষ জড়িয়ে রয়েছে। অন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো যখন কোন সিদ্ধান্ত নেয় এর প্রভাব বিনিয়োগকারীদের ওপর প্রত্যক্ষভাবে পড়ছে। তাই এসব সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থার সঙ্গে আলোচনা করা জরুরী। ভারতে এ বিষয়ে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হয়।

নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতার বিষয়ে এক অনুষ্ঠানে বিএসইসির কমিশনার হেলাল উদ্দিন নেজামী বলেন, সরকার পুুঁজিবাজার নিয়ে আন্তরিক হলেও কোম্পানি সংশ্লিষ্ট খাতগুলোর আলাদা নিয়ন্ত্রক সংস্থার নিজস্ব কিছু সিদ্ধান্ত বাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। কারণ তালিকাভুক্ত কোম্পানির বিষয়ে কোন সিদ্ধান্ত নিতে হলেও পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থার জানানোর নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু সেটি জানানো হচ্ছে না। ফলে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। সাধারণ বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, তিতাস গ্যাস ও স্ট্যান্ডার্ড ইন্স্যুরেন্সের বিষয়ে দুটি সিদ্ধান্তই বাজারকে প্রভাবিত করেছে।