২১ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলা-২০১৬ ॥ পণ্য বহুমুখীকরণে বাংলাদেশের সক্ষমতা

  • খায়রুল আলম

শুরু হয়েছে ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলা। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর উদ্যোগে মাসব্যাপী ২১তম ‘ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলা-২০১৬’ (ডিআইটিএফ) এই বাণিজ্যমেলার উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এই মেলার মাধ্যমে স্থানীয় এবং আন্তর্জাতিক ব্যবসার বিস্তৃতি বাড়ে। প্রতিটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান তার নিজস্ব সক্ষমতার বহির্প্রকাশ ঘটায় এই মেলায়। অর্থাৎ একটি প্রতিষ্ঠান কি পারে আর কি পারে না বা গত এক বছরে তাদের কি অর্জন তা এই মেলার মাধ্যমে দেশী-বিদেশী ক্রেতার সামনে তুলে ধরা হয়। আর তাই অর্থনৈতিক দিক বিবেচনায় এই মেলার গুরুত্ব অনেক। ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলার মাধ্যমে রফতানি পণ্য বহুমুখীকরণের সুযোগ সৃষ্টি হয়।

বাণিজ্যমেলা ২০১৬ উপলক্ষে দেয়া এক বাণীতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘মেলাটি বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক পরিম-লে সর্বাধুনিক জ্ঞান, প্রযুক্তি ও অগ্রগতির সঙ্গে সংযুক্ত রাখার একটি সময়োচিত পদক্ষেপ। এ মেলায় একদিকে যেমন দেশী-বিদেশী ভোক্তারা আমাদের দেশে উৎপাদিত বিভিন্ন পণ্যের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে পরিচিত হতে পারবেন, অপরদিকে দেশী উদ্যোক্তারা বিদেশী পণ্য, সর্বশেষ ডিজাইন, স্টাইল ও বিদেশী ক্রেতাদের রুচি, মান-চাহিদা ইত্যাদি বিষয়ে ধারণা লাভ করতে পারবেন।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এই মেলার মধ্য দিয়ে রফতানি পণ্য বহুমুখীকরণের সুযোগ সৃষ্টি হবে এবং সঙ্গে সঙ্গে দেশীয় উদ্যোক্তাগণ প্রয়োজন অনুযায়ী তাদের পণ্যের গুণগত মানোন্নয়নে তৎপর হবেন ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে দেশী পণ্যকে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে নেয়ার প্রয়াস পাবেন।’

জানা গেছে, বাংলাদেশ সরকারের গৃহীত উদার বাণিজ্য নীতির ফলে দেশে বিনিয়োগ ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। বিদেশী বিনিয়োগ ও রফতানিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশ এখন বিদেশী শিল্পোদ্যোক্তা, বিনিয়োগকারী ও আমদানিকারকদের কাছে আকর্ষণীয় গন্তব্য হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। বাণিজ্যমেলা-২০১৬ দেশীয় পণ্যের উৎপাদনকারী ও বিদেশী ক্রেতাদের মধ্যে অধিকতর আগ্রহ ও উদ্দীপনা সৃষ্টি করবে।

বর্তমান বিশ্বে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অর্থনৈতিক উন্নয়নে ব্যবসা-বাণিজ্য প্রধান নিয়ামকের ভূমিকা পালন করছে। রফতানিযোগ্য পণ্যের যথাযথ বিপণনের সুযোগ সৃষ্টিসহ রফতানি খাতে প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রাখা এবং অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটানোর জন্য নতুন পণ্য উৎপাদনে উৎসাহ প্রদানই এ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলার মূল লক্ষ্য।

দেশী ও বিদেশী পণ্য সামগ্রী প্রদর্শন, রফতানি বাজার অনুসন্ধান এবং দেশী-বিদেশী ক্রেতার সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের ক্ষেত্রে এ মেলা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। মেলায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে শিল্পপণ্য ও ভোগ্যপণ্য উৎপাদনকারীগণ একদিকে তাদের উৎপাদিত পণ্যের গুণগতমান, ডিজাইন, প্যাকেজিং ইত্যাদি প্রদর্শন ও বিপণন করতে পারবেন, অন্যদিকে শিল্পোদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীগণ পারস্পরিক সংযোগ স্থাপনসহ অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য প্রসারের সুযোগ থাকে।

পণ্য পরিচিতি ও বহুমুখীকরণের জন্য প্রতি বছর জানুয়ারি মাসে, মাসব্যাপী ঢাকায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলার আয়োজন করা হয়ে থাকে। বিশ্বের উন্নত দেশের স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানসমূহ এই মেলায় অংশগ্রহণ করে এবং তাদের কাছ থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রফতানি আদেশ পাওয়া যায়।

আয়োজকরা জানান, এবার ৫টি মহাদেশ থেকে ২১টি দেশ মেলায় অংশ নিচ্ছে। সেই সঙ্গে বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তো আছেই। এবার প্রথমবারের মতো অংশ নিচ্ছে ৭টি দেশ। এগুলো হচ্ছেÑ ভারত, পাকিস্তান, চীন, মালয়েশিয়া, ইরান, থাইল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র, তুরস্ক, সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, দক্ষিণ কোরিয়া, জার্মানি, মরিশাস, ঘানা, নেপাল, হংকং, জাপান, মরক্কো, ভুটান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত।

জানা গেছে, বিশ্বের উন্নত দেশে বাংলাদেশের রফতানি বাজারকে বহুমুখীকরণের লক্ষ্যে ইউরোপ, আমেরিকা, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, জাপান, হংকং, ভারত, চীন, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, দক্ষিণ. আফ্রিকা, রাশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, ব্রাজিলসহ বিভিন্ন দেশে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলায় বাংলাদেশ নিয়মিত অংশগ্রহণ করছে। এছাড়া কোন কোন দেশে বাংলাদেশী পণ্যের একক প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। এমনকি উন্নত দেশে নতুন নতুন বাজার অন্বেষণের লক্ষ্যে সরকারী ও ব্যবসায়ী প্রতিনিধির সমন্বয়ে বাণিজ্যিক মিশন পাঠানো হয়ে থাকে।

এদিকে বাণিজ্যমেলায় প্রতিবছরই বিদেশী ক্রেতারা এসে থাকেন। ওইসব ক্রেতারাও বাংলাদেশের বাণিজ্যমেলার জন্য মুখিয়ে থাকেন। কারণ তারা এসে তাদের পছন্দের পণ্যটি এখানে এসে দেখে সরাসরি যাচাই বাছাই করার সুযোগ পান। এতে করে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশী পণ্যের সুনামও ছড়িয়ে পড়ে। প্রতিবছরই এই বাণিজ্যমেলায় রফতানি আদেশের পরিমাণ বাড়ছে।

গত বছর (২০১৫ সাল) বাণিজ্যমেলা চলছিল এক অস্থির পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে। ওই বছরের ৫ জানুয়ারি থেকে বিএনপি-জামায়াত জোটের পেট্রোলবোমা আর সন্ত্রাসের কারণে মেলায় কিছুটা ধাক্কা লাগে। যদিও পরে এই ক্ষতি কাটিয়ে ওঠে। কিন্তু এত বড় ধাক্কার পরেও কিন্তু সর্বোচ্চ ৯৫ কোটি ডলারের রফতানির আদেশ পাওয়া গিয়েছিল। এর আগের বছর (২০১৪) পাওয়া গিয়েছিল ৮০ কোটি ডলারের রফতানি আদেশ। আর দেশবিরোধী একটি চক্র ওইসময় আন্তর্জাতিক পরিম-লে বাংলাদেশে যাতে বিদেশীরা আসতে না পারেন সেজন্য অপপ্রচারও চালিয়েছিল। কিন্তু তাদের সেই অপপ্রচার ধোপে ঠেকেনি। চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে বাণিজ্যমেলায় আগতদের এমন উপস্থিতি বড় অর্জন বলে দাবি করছিলেন আয়োজকরা। শেষ সময়ে বাণিজ্যমেলার মাধ্যমে প্রমাণ হয়েছে, হরতাল-অবরোধকারীদের পেট্রোলবোমা নিক্ষেপসহ কোন বাধাই এ আয়োজনকে বাধাগ্রস্ত করতে পারেনি। বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে, আগামীতে আরও এগিয়ে যাবে। ২০২১ সাল নাগাদ বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তরিত হবে।

লেখক : উন্নয়নকর্মী