২২ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বিশ্বব্যাংকের ঋণে অনিশ্চয়তা

  • প্রকল্প বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানতে বিশ্বব্যাংকের চিঠি

হামিদ-উজ-জামান মামুন ॥ বিশ্বব্যাংকের প্রতিশ্রুত প্রায় ৪ হাজার ৮০০ কোটি টাকার বৈদেশিক সহায়তা শঙ্কার মুখে পড়েছে। চলতি অর্থবছরে একক প্রকল্পে সর্বোচ্চ অর্থায়ন এটি। সময়মতো জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে ‘রিভার ম্যানেজমেন্ট ইম্প্রুভমেন্ট’ প্রকল্পটি অনুমোদন না হওয়ায় বোর্ড অনুমোদনসহ চুক্তির পরবর্তী প্রক্রিয়া ব্যাহত হচ্ছে। এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানতে সম্প্রতি অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগকে (ইআরডি) চিঠি দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। চিঠিতে কবে নাগাদ প্রকল্পটি অনুমোদন দেয়া হবে সে বিষয়ে দ্রুত জানতে চাওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

অন্যদিকে এর আগে একনেকে অনুমোদনের জন্য প্রকল্পটি উপস্থাপন করা হলে সেটি অনুমোদন না দিয়ে কিছু বিষয় সংশোধনীর জন্য ফেরত পাঠানো হয় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে। পরবর্তীতে মন্ত্রণালয় থেকে সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব ডিপিপি পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হলেও সেটি পুনরায় একনেকে উপস্থাপন না করে নতুনভাবে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা করাসহ নানাভাবে সময় ক্ষেপণ করা হচ্ছে। এভাবে প্রায় তিন মাসেরও বেশি সময় পেরিয়ে যাওয়ায় বোর্ডে এ ঋণটি অনুমোদনের সুপারিশ পাঠাতে পারছে না বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিস। এ পরিপ্রেক্ষিতে তাগাদা দিয়ে ইআরডিকে চিঠি পাঠিয়েছে সংস্থাটি। আগামী মার্র্চ মাসে বিশ্বব্যাংকের বোর্ডে এই ঋণ প্রস্তাব অনুমোদন করাতে চায় ঢাকা অফিস। এজন্য যত দ্রুত সম্ভব মতামত চাওয়া হয়েছে। চিঠি পাওয়ার প্রায় দুই সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও কোন জবাব দিতে পারেনি অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ। কেননা সংশ্লিষ্টরা জানতে পারছেন না প্রকল্পটি কবে নাগাদ একনেকে অনুমোদন দেয়া হবে। ফলে অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে সহজ শর্তের এ ঋণে।

এ বিষয়ে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ সূত্র জানায়, বিশ্বব্যাংকের চিঠি পাওয়ার পর তারা পরিকল্পনা কমিশনে যোগাযোগ করেছে। কিন্তু নানা অজুহাতে কমিশনের কৃষি, পানিসম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগ একনেক উপস্থাপনে দেরি করছে।

এ বিষয়ে প্রকল্পটির দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিকল্পনা কমিশনের কৃষি, পানিসম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগের সদস্য শামসুদ্দিন আজাদ চৌধুরী জনকণ্ঠকে বলেন, এ প্রকল্পটির বিষয়ে বিভিন্ন সংশোধনী ছিল। পিইসি সভা করার পর আমরা বিভিন্ন সুপারিশ দিয়ে মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দিয়েছি। কিন্তু মন্ত্রণালয় থেকে এখনও সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) পরিকল্পনা কমিশনে আসেনি। আসার পর দেখা হবে সুপারিশগুলো কতটুকু প্রতিপালন করা হয়েছে; তারপরই অনুমোদনের জন্য পুনরায় উপস্থাপন করা হবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কবে নাগাদ অনুমোদন দেয়া যাবে সেটি এখনও বলা সম্ভব নয়। তবে জটিলতা এড়াতে বিশ্বব্যাংক বোর্ডে ঋণ অনুমোদনের জন্য পাঠানো হচ্ছে বলে ইআরডির সিনিয়র সচিবের সঙ্গে মঙ্গলবার আমার কথা হয়েছে।

সূত্র জানায়, যমুনা ও ব্রক্ষপুত্র নদীর ভাঙ্গন কমাতে নতুন প্রকল্প গ্রহণের উদ্যোগ নেয়া হয়। বিশ্বব্যাংকের ৪ হাজার ৮০০ কোটি টাকার সহায়তায় এ উদ্যোগ বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। এর মাধ্যমে দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের প্রায় অর্ধ লক্ষাধিক মানুষকে প্রতিবছর বন্যার ভয়াবহতা ও নদী ভাঙ্গন থেকে রক্ষা করা সম্ভব হবে।

এ প্রকল্পের জন্য মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৫ হাজার ২০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব তহবিলের অর্থায়ন থেকে ব্যয় হবে ৪০০ কোটি টাকা। বাকি টাকা বিশ্বব্যাংক (আইডিএ) সহজ শর্তের ঋণ হিসেবে প্রদান করবে। প্রকল্পের আওতায় তিন ধাপে বরাদ্দে অর্থ ব্যয় করবে পাউবো। সিরাজগঞ্জের সদর, কাজিপুর এবং বগুড়ার সারিয়াকান্দি ও ধুনটকে প্রকল্পের এলাকা হিসেবে নির্বাচন করা হয়েছে।

পাউবো সূত্র জানায়, অনুমোদন পেলে প্রকল্পের কাজ তিনটি ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। প্রধম ধাপেÑ ব্রহ্মপুত্র নদীর ডান তীরে ও যমুনা সেতু হতে ১৭ কিলোমিটার দূরে ৫০ কিলোমিটারব্যাপী নদী রক্ষা বাঁধের উন্নয়ন (সিরাজগঞ্জের সিমলা হতে বগুড়ার হাসনাপাড়া পর্যন্ত) করা হবে। উন্নয়ন কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছেÑ যমুনা নদীর ডানদিকে ৫০ কিলোমিটার সার্ভিস রোড পূর্ণনির্মাণ করা, যা বিআরই নামে পরিচিত। যমুনা নদীর ডান তীরে নদী শাসনের লক্ষ্যে সার্ভিস রোডসহ ৩৬ দশমিক ৫৬ কিলোমিটার প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত জনগণকে পুনর্বাসনের লক্ষ্যে ১৫টি রি-সেটেলমেন্ট ভিলেজ (গুচ্ছগ্রাম) প্রতিষ্ঠা করা হবে।

দ্বিতীয় ধাপে-যমুনা ব্রিজ হতে সিরাজগঞ্জের সিমলা পর্যন্ত ১৭ কিলোমিটার ও বগুড়ার হাসনাপাড়া থেকে তিস্তা আউটফল পর্যন্ত ৭০ কিলোমিটার বাঁধ পুনর্নির্মাণ হবে। তৃতীয় ধাপে বাঁধের ভেতরের অংশ বরাবর ১৩৭ কিলোমিটার ৪ লেন বিশিষ্ট রাস্তা নির্মাণ করা হবে।

পরিকল্পনা কমিশন সূত্র জানায়, প্রথম প্রস্তাবে প্রকল্পের আওতায় কম্পোনেন্ট (অঙ্গ) হিসেবে পরামর্শক সেবায় ৭৬৫ কোটি টাকা, ভূমি অধিগ্রহণে ৪৪১ কোটি টাকা, বাঁধ নির্মাণে ১ হাজার ৫৪১ কোটি টাকা, নদীর তীর সংরক্ষণে ১ হাজার ৯৫৮ কোটি টাকা, গুচ্ছগ্রাম নির্মাণে ১৪৩ কোটি টাকা এবং ৩২টি যানবাহন ক্রয় ও মেরামত বাবদ ৫২ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) সূত্রে জানা গেছে, বিশ্বব্যাংকে আইডিএ ঋণের বিপরীতে বার্ষিক শূন্য দশমিক ৭৫ শতাংশ হারে সার্ভিস চার্জ প্রদান করতে হবে। এ ঋণের অর্থ ৬ বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ ৩৮ বছরে পরিশোধের সুযোগ থাকে। বর্তমানে বিশ্বব্যাংকের ঋণের ওপর কোন কমিটমেন্ট চার্জ নেই।

প্রথম পিইসি সভায় প্রকল্পের ব্যয় ও কম্পোনেন্ট নিয়ে বেশ কয়েকটি পরামর্শ দেয়া হয়েছিল। এর মধ্যে রয়েছে- প্রকল্পের আওতায় প্রতি কিলোমিটার নদী তীর সংরক্ষণ বাবদ ৫৩ কোটি ৫৭ লাখ টাকা করে বরাদ্দ করা হয়েছে। এ বরাদ্দ অত্যাধিক বেশি বলে মনে করে কমিশন। এছাড়া পরামর্শ সেবা বাবদ বরাদ্দে অর্থ হ্রাস করে বৈদেশিক সহায়তা থেকে ব্যয় করা ও প্রকল্পের আওতায় বাঁধ নির্মাণ, পুনর্নির্মাণ ও পুনর্বাসনের বিষয়টি পাউবোর পক্ষ থেকে স্পষ্টকরণের কথা বলা হয়েছিল।