১৬ নভেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

মীরসরাইয়ে স্পেশাল ইকোনমিক জোন প্রতিষ্ঠায় বিশাল কর্মযজ্ঞ

  • শীঘ্রই শুরু হচ্ছে বিদ্যুত উৎপাদন প্রকল্পের কাজ

আহমেদ হুমায়ুন, মীরসরাই থেকে ফিরে ॥ বিশেষ অর্থনৈতিক জোন (স্পেশাল ইকোনমিক জোন) প্রতিষ্ঠার কাজ শুরুতেই পাল্টাতে শুরু করেছে মীরসরাই উপজেলার ইছাখালির দৃশ্যপট। দুই মাস আগেও যেখানে গরু-মহিষ চরত, ছিল জনমানবশূন্য একটি এলাকা। সেখানে এখন বাড়ছে কোলাহল। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত শোনা যায় স্কেভেটর আর ট্রাকের আওয়াজ। শ্রমিকদেরও কর্মব্যস্ত সময় পার করতে দেখা যাচ্ছে সেখানে। বর্তমান সরকারের নেয়া পদক্ষেপে সাগর পাড়ের ধু ধু চর এখন পরিণত হতে যাচ্ছে দেশের বৃহৎ শিল্প নগরীতে। রবিবার সরেজমিন গিয়ে এমন দৃশ্যই চোখে পড়েছে।

সরেজমিন দেখা গেছে বন্দর নগরী চট্টগ্রাম থেকে মাত্র ৬০ কিলোমিটার দূরত্বে ইছাখালীর পীরের চর, সাধুর চর, শিল্প চর এবং চর মোশারফে পরিকল্পিত এই শিল্প শহরটির কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। ৫৫০ একর জমিতে এখন চলছে ভূমি উন্নয়ন, এলাকায় যাওয়ার জন্য সড়ক নির্মাণ, সুপেয় পানির সরবরাহ ও বাঁধ নির্মাণের কাজ। বাঁধ নির্মাণের কাজে ১৫ থেকে ২০টি স্কেভেটর ব্যবহার করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে অর্ধেকের বেশি কাজ সম্পন্ন হয়েছে। মঘাদিয়া থেকে প্রকল্প এলাকায় যাওয়ার জন্য ৬ কিলোমিটার পাকা সড়ক নির্মাণের কাজও চলছে জোরেশোরে। এ ছাড়া চর জেগে ওঠার কারণে সেখানকার জমি অনেক নিচু। তাই ভূমি উঁচু করতে এখন সেখানে ফেলা হচ্ছে মাটি।

বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) সূত্রে জানা গেছে, ২০১২ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত গবর্নিং বোর্ডের সভায় মীরসরাইয়ে একটি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এখানে মোট সাত হাজার একর জমির ওপর গড়ে উঠবে অর্থনৈতিক অঞ্চল। প্রাথমিকভাবে ৫৫০ একর জমির ওপর অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার কাজ শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে তিনটি টেন্ডারের মাধ্যমে সেখানে যোগাযোগের জন্য পাকা সড়ক নির্মাণ, বেড়িবাঁধ নির্মাণ ও মাটি ভরাটের কাজ শুরু করেছে কর্তৃপক্ষ। ভবিষ্যতে যাতে পানির কারণে ইকোনমিক জোন ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সে জন্য চলছে বাঁধ নির্মাণের কাজ। বাঁধে থাকছে স্লুইস গেট কাম সেতু। এই কাজের জন্য বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ২২ কোটি ৬৬ লাখ ৯৪ হাজার ৩শ’ ১টাকা। এ ছাড়া অর্থনৈতিক জোনের অধিভুক্ত জায়গায় মাটি ভরাটের কাজ শুরু হয়েছে। ২২ কোটি ৫ লাখ ৪৯ হাজার টাকা ব্যয়ে ওই মাটি ফেলা হচ্ছে।

বিশ্বব্যাংক, ডিএফআইডি ও সরকারী অর্থায়নে এসব কাজ করছে মেসার্স আতাউর রহমান খান নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। এই কাজের জন্য সর্বমোট ৭ মাস সময় বেঁধে দেয়া হয়েছে। অন্যদিকে মঘাদিয়া থেকে ইছাখালী সিডিএসপি বাঁধ পর্যন্ত সাড়ে ৪ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণের জন্য বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ১২ কোটি টাকা। সড়ক নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। নিয়াজ ট্রেডার্স নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সড়ক নির্মাণের কাজ করছে। এ ছাড়া ইকোনমিক জোনে বিদ্যুত সরবরাহের জন্য সেখানে ৬৬০ মেগাওয়াটের দুটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুত প্রকল্প স্থাপনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। ইছাখালীর চরে ১৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুতকেন্দ্র স্থাপনে চীনের জিজিয়ান জিনডোন হোল্ডিং গ্রুপের সঙ্গে বেজার চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। জিনডোন গ্রুপ গত মাসে প্রকল্প এলাকা সার্ভে করে একটি রিপোর্ট প্রদান করেছে। বাংলাদেশ বিদ্যুত উন্নয়ন বোর্ডের অনুমতি পেলে প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র নিয়ে দ্রুত কাজ শুরু করবে জিনডোন গ্রুপ। এখানে কয়েকটি ধাপে প্রতিষ্ঠা পাবে ৫০টি বিশেষায়িত উপ-অর্থনৈতিক অঞ্চল। আন্তর্জাতিক মানের বিমানবন্দর, মেডিক্যাল কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও পূর্ণাঙ্গ আবাসিক এলাকা। আগামী ১৫ বছরে এখানে কর্মসংস্থান হবে অন্তত ৩০ লাখ লোকের।

বেজার যুগ্ম সচিব হারুনুর রশীদ বলেন, সড়ক তৈরি, বেড়ি বাঁধ নির্মাণ ও মাটি ভরাটসহ প্রাথমিক কাজ শুরু হয়েছে। খুব শীঘ্রই কয়লাভিত্তিক বিদ্যুত উৎপাদন প্রকল্পের কাজ শুরু হবে। চীনের জিনডোন গ্রুপ ১৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুত উৎপাদনের কাজটি করবে। তারা প্রকল্প এলাকায় তারা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছে। তারা কার্যক্রম শুরু করার জন্য বিদ্যুত বিভাগের আবেদন করেছে। সেখান থেকে অনুমতি পাওয়ার পর প্রকল্প সংলগ্ন এলাকায় কয়লা আমদানির জন্য একটি জেটি তৈরি করা হবে। এর পরই বিদ্যুত উৎপাদন প্রকল্পের কাজ শুরু হবে। তবে এর জন্য বেশি সময় লাগবে না বলে তিনি জানান।

বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান পবন চৌধুরী বলেন, ‘মীরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চল চট্টগ্রাম বন্দর থেকে কাছে। তাই এখানে বিনিয়োগ করতে দেশের বড় বড় ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান অত্যন্ত আগ্রহী। আমরা খুব দ্রুত এ ইকোনমিক জোনের কাজ শেষ করার পক্ষে। ইতোমধ্যে প্রকল্প এলাকায় বেড়িবাঁধ নির্মাণ, মাটি ভরাটের কাজ চলছে। যাতায়াতের জন্য পাকা সড়ক তৈরি করা হচ্ছে। একটি সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যানের মাধ্যমে নাগরিকের জন্য সব ধরনের সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা থাকবে। এখানে শিল্প-কারখানা, স্কুল, আবাসিক ভবন, মসজিদ, হাসপাতালসহ সব ধরনের সুবিধা রাখা হবে।

সরকারের গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন এমপি বলেন, ‘২০১০ সালে মহামায়া সেচ প্রকল্প উদ্বোধন করতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মীরসরাইয়ে আসলে আমি ইছাখালী চরে অর্থনৈতিক জোন গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা জানাই। পরবর্তীতে প্রকল্পের একটি পরিকল্পনা আমি সরকারের কাছে তুলে ধরি। ২০১২ সালে প্রধানমন্ত্রী নিজে ইছাখালীতে দেশের সর্ববৃহৎ শিল্পনগরী গড়ে তোলার ব্যাপারে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেন। ইতোমধ্যে সেখানে প্রাথমিক পর্যায়ের বিভিন্ন ধরনের কাজ চলছে।

নির্ধারিত সময়ে মীরসরাই অর্থনেতিক জোনের কাজ শেষ হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

উল্লেখ্য, মীরসরাই অর্থনৈতিক জোনে ১৫ হাজার একর খাস জমিতে ৫০টি উপ-অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে বেজার। ইতোমধ্যে ৬ হাজার ৩৯০ একর বেজার কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। বাকি নয় হাজার একর জমি আগামী ২ বছরের মধ্যে তাদের কাছে হস্তান্তর করা হবে। হস্তান্তর করা ৬ হাজার ৩৯০ একর জমির মধ্যে পীরের চরের ১৩৯০ একর, সাধুর চরের ১৬৪৪ একর, শিল্প চরের ১৮৫২ একর এবং চর মোশারফের ১৫০৪ একর জমি হস্তান্তর করা হয়।