২১ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ওপরের নির্দেশে অবৈধ গ্যাস সংযোগ কাটে না তিতাস কর্তৃপক্ষ

  • তদন্ত রিপোর্টে খোদ ‘তিতাস সিন্ডিকেটের’ জড়িত থাকার তথ্য উঠে এসেছে

রশিদ মামুন ॥ ওপরের নির্দেশে শিল্পের অবৈধ সংযোগ কাটে না তিতাস গ্যাস বিতরণ কোম্পানি। কোম্পানির পরিচালনা বোর্ড তদন্ত করে বলছে, গৃহস্থালির চেয়ে শিল্পেই বেশি অবৈধ সংযোগ রয়েছে। আর তিতাস গ্যাস বিতরণ কোম্পানির মদদে বছরের পর বছর ধরে এক শ্রেণীর শিল্প মালিক অবৈধ গ্যাস ব্যবহার করছেন। রাষ্ট্রকে রাজস্ব নয়, শুধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ঘুষ দিয়ে এসব কর্মকা- চলছে অবাধে। তিতাস গ্যাস বিতরণ কোম্পানির পরিচালনা বোর্ড সাড়ে তিন মাসের তদন্ত শেষে জমা দেয়া প্রতিবেদনে এসব অব্যবস্থাপনার কথা তুলে ধরা হয়েছে। অবৈধ সংযোগ নিয়ে আলোচনায় বসতে চাইলেও তিতাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পাত্তাও দেননি। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, ‘অবৈধ সংযোগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক এবং স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গের নামের আড়ালে তিতাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের নেতৃত্বে কতিপয় অসাধু কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। এ বিষয়ে কমিটির কাছে একাধিক ভুক্তভোগী গ্রাহক কমিটির আহ্বায়ক এবং সদস্যের কাছে অভিযোগ দাখিল করেছেন।’

বিদ্যুত জ্বালানি এবং খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ সম্প্রতি জনকণ্ঠকে বলেন, ২০১৬ সাল হবে দুর্নীতি থেকে মুক্তির বছর। এ বছর তার মন্ত্রণালয়কে যে কোন মূল্যে দুর্নীতিমুক্ত করা হবে। এজন্য পৃথক একটি দুর্নীতিবিরোধী সেল প্রতিষ্ঠা করা হবে। প্রতিমন্ত্রীর এ ধরনের ঘোষণার মধ্যে তিতাসের পরিচালনা বোর্ড বড় দুর্নীতির প্রমাণ হাজির করল। সংশ্লিষ্টরা বলছে, এখন দেখার বিষয় আদৌ এসব দুর্নীতি থেকে মুক্তি মেলে কি না। তদন্ত কমিটি গত সোমবার তদন্ত প্রতিবেদন জ্বালানি বিভাগে জমা দেয়। তিতাস গ্যাস বিতরণ কোম্পানির পরিচালনা বোর্ডের সদস্য তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক খান মঈনুল ইসলাম মোস্তাক তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়ার কথা জানিয়ে জনকণ্ঠকে বলেন, এখন পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবে মন্ত্রণালয়। তিনি জানান, তিতাস গ্যাস বিতরণ কোম্পানি এবং গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি অব বাংলাদেশের (জিটিসিএল) ব্যবস্থাপকের অসহযোগিতার কারণে তদন্ত বাঁধাগ্রস্ত হয়েছে।

গত বছর ২০ অক্টোবর খান মঈনুল ইসলাম মোস্তাককে আহ্বায়ক করে গঠিত তদন্ত কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন তিতাস বোর্ডের পরিচালক লিয়াকত ভূঁইয়া এবং মহাব্যবস্থাপক (প্রকৌশল) পেট্রোবাংলা যাবেদ চৌধুরী। কমিটি তদন্তের সুপারিশে বলছে, কমিটির চাহিদা অনুযায়ী তথ্য সরবরাহ না করায় পূর্ণাঙ্গ তদন্ত পরিচালনা করা সম্ভব হয়নি। তবে কমিটি দীর্ঘ তদন্তে মনে করছে আবাসিক খাতে যত অবৈধ সংযোগ রয়েছে তার চেয়ে বেশি সংযোগ এবং লোড বৃদ্ধি করা রয়েছে শিল্পখাতে। তিন পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদনের দ্বিতীয় পৃষ্ঠায় ৪.১ এ বলা হয়েছে, ‘তিতাসের গাজীপুরের মহাব্যবস্থাপক’ তদন্ত কমিটির কাছে স্বীকার করেছেন তার এলাকায় কতিপয় শিল্প কারখানায় অবৈধ গ্যাস সংযোগ রয়েছে, যা ‘উপরস্থ কর্তৃপক্ষের’ নির্দেশ অনুযায়ী স্থিতি অবস্থায় রাখা হয়েছে।

‘উপরস্থ কর্তৃপক্ষ’কে জানতে চাইলে কমিটির এক সদস্য বলেন, তিনি তিতাসের বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী নওশাদ ইসলাম। তার নেতৃত্বেই চলছে তিতাসের সমস্ত অবৈধ কর্মকা-। তিনি সব কিছু জানার পরও চুপ করে থাকেন কেন বলে জানান ওই সদস্য।

তদন্ত প্রতিবেদনের তৃতীয় পৃষ্ঠায় ৪.৪ এ বলা হয়েছে, কমিটি তদন্ত চলাকালে গাজীপুরের আঞ্চলিক ডিভিশন পরিদর্শন করে স্থানীয় মহাব্যবস্থাপককে কয়েকটি শিল্প কারখানা পরিদর্শনে সহায়তা চাওয়া হয়। ওই সময় মহাব্যবস্থাপক জানান, অবৈধ গ্যাস লাইন বিচ্ছিন্নকরণ ছাড়া অন্য কোন বিষয়ে সহায়তা করতে হলে কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালকের অনুমতির প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। এর আগে যেসব তথ্য চাওয়া হয়েছে সে সম্পর্কে ওই সময় জানতে চাইলে গাজীপুরের মহাব্যবস্থাপক জানান, তিতাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের অনুমতি ছাড়া এ ধরনের তথ্য দেয়া সম্ভব নয়। পরবর্তীতে ভালুকা এলাকা পরিদর্শন করে আঞ্চলিক ব্যবস্থাপক জানান তিনিও ব্যবস্থাপনা পরিচালকের অনুমতির বাইরে গিয়ে তথ্য সরবরাহ করতে পারবেন না।

তদন্ত কমিটি তাদের প্রতিবেদনের ৪.৬ এ বলছে তিতাসের সচিবের মাধ্যমে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সঙ্গে আলোচনার প্রস্তাবে তিতাসের পক্ষ থেকে কোন প্রকার সদুত্তর ও সহযোগিতা পাওয়া যায়নি।

তদন্ত কমিটি বলছে, তিতাসের আওতাধীন সকল এলাকায় অবৈধ গ্যাসের সংযোগ রয়েছে। তবে এর মধ্যে সাভার, নারায়ণগঞ্জ ও কালীগঞ্জ এলাকায় অবৈধভাবে স্থাপিত বিতরণ লাইন সব থেকে বেশি। তদন্ত সূত্র বলছে, ছয় সদস্যর একটি সিন্ডিকেট খুঁজে পাওয়া গেছে। সিন্ডিকেটের সদস্য হলেন, ভালুকার ব্যবস্থাপক মশিউর রহমান ঝন্টু, গাজীপুরের ব্যবস্থাপক আ. ম. সাইফুল ইসলাম, ফতুল্লার ব্যবস্থাপক শহিরুল, চন্দ্রার উপ ব্যবস্থাপক তোরাব আলী, সিবিএ নেতা ফারুক হাসান। তদন্ত কমিটি মনে করছে সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করেন তিতাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী নওশাদ ইসলাম।

তদন্ত কমিটি সুনির্দিষ্ট কয়েকটি অভিযোগের তদন্ত শেষে বলছে বর্তমান সরকারের দুর্নীতি বিরোধী অবস্থানের তোয়াক্কা না করেই তারা এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে হয়রানি করে অবৈধ পন্থায় শত শত কোটি টাকার বাণিজ্য করছে। এদের প্রায় সকলেই ট্রুথ কমিশনে গিয়ে নিজের অবৈধ সম্পদের কথা স্বীকারও করে এসেছিল। সিন্ডিকেটের মাধ্যমে সাধারণ গ্রাহককে হয়রানি করে বিপুল পরিমাণ বিত্ত বৈভবের মালিক বনে গেলেও দুর্নীতির দায় চাপাচ্ছে সরকার এবং সরকারপন্থীদের ওপর।