১৩ নভেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বারো জাতের ধান ॥ এক ঝাঁক দক্ষ বিজ্ঞানীর গবেষণায় উদ্ভাবন

  • এরা উচ্চ ফলনশীল ও জলবায়ু পরিবর্তনে সহনশীল ;###;গড় ফলন হেক্টরে ৭ টন পর্যন্ত ;###;স্বাদ ও গন্ধে রফতানিযোগ্য

এমদাদুল হক তুহিন ॥ মাত্র দুই বছরে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট নতুন ১২টি ধানের জাত উদ্ভাবন করেছে। উচ্চফলনশীল এ জাতগুলো জলবায়ু পরিবর্তনের পরিবর্তিত অবস্থার সঙ্গে সহনশীল এবং পরিবেশের অনুকূল ও প্রতিকূলতার সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। স্বাদ ও গন্ধের কারণে ব্রি কর্তৃক উদ্ভাবিত কয়েকটি জাতের ধান বিদেশে রফতানি যোগ্যও। একঝাঁক দক্ষ বিজ্ঞানী দীর্ঘ গবেষণা শেষে প্রতিষ্ঠানটি ২০১৪ সালে ৭টি নতুন জাতের ধান অবমুক্ত করে। সর্বশেষ ২০১৫ সালে এ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয় আরও নতুন পাঁচটি জাত। প্রতিষ্ঠানটির উদ্ভাবিত জাতের সর্বশেষ সংযোজন ব্রি ধান ৭৪। বোরো মৌসুমের উচ্চফলনশীল এ জাতের ফলন হেক্টরে ৭ টন। মধ্যম ব্লাস্ট প্রতিরোধী এ জাতের দানার আকার আকৃতি মাঝারি মোটা। জিংক সমৃদ্ধ এ জাতের ভাত অত্যন্ত ঝরঝরে। ২০১৫ সালের নবেম্বরে প্রতিষ্ঠানটি নতুন এই জাত অবমুক্ত করে, একই বছর উদ্ভাবিত অন্য চারটি জাতের মধ্যে রয়েছে- ব্রি ধান ৭০, ব্রি ধান ৭১, ব্রি ধান ৭২ ও ব্রি ধান ৭৪। আর ১৪’ সালে অবমুক্তি পাওয়া জাতগুলো হলো- ব্রি ধান ৬৩, ব্রি ধান ৬৪, ব্রি ধান ৬৫, ব্রি ধান ৬৬, ব্রি ধান ৬৭, ব্রি ধান ৬৮ এবং ব্রি ধান ৬৯।

বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের উদ্ভিদ প্রজনন বিভাগের প্রধান ও মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. তমাল লতা আদিত্য জনকণ্ঠকে বলেন, গত দুই বছরে ব্রির বিজ্ঞানীগণ ১২টি নতুন ধানের জাত অবমুক্ত করে। এর মধ্যে ২০১৪ সালে ৭টি ও ২০১৫ সালে ৫টি জাত অবমুক্ত করা হয়। এসব জাত পরিবেশের অনুকূল ও প্রতিকূলতার সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। শুধু তাই নয়, অধিক উৎপাদনশীল এসব জাতের বেশ কয়েকটি জাতের ধান স্বাদ ও গন্ধের কারণে বিদেশে রফতানি যোগ্যও।

ব্রি ধান ৭০ ॥ অধিক ফলনশীল সুগন্ধী আমন ধানের এ জাত সুগন্ধির কারণে বিদেশে রফতানিযোগ্য। এর ফলন হেক্টরে ৪ দশমিক ৮ টন। এছাড়া ধান কাটার পর মাঠে রবিশস্যও সময়মতো আবাদ করা যাবে। চালের আকার আকৃতি বেশ লম্বা ও চিকন এবং রং সাদা। এ জাতের চালে এমাইলোজের পরিমাণ ২১ দশমিক ৭ শতাংশ। ধানের গড় জীবনকাল ১৩০ দিন। বৃষ্টিনির্ভর রোপা আমন মৌসুমে ব্রি ৭০ সহজেই চাষাবাদ যোগ্য, চাষাবাদ পদ্ধতি অন্যান্য উফশী রোপা আমনের মতোই।

ব্রি ধান ৭১ ॥ ব্রি ধান ৭১ একটি খরা সহনশীল জাত। খরাপ্রবণ বৃষ্টিনির্ভর এলাকায় এ জাতের ধান আবাদের ফলে আবাদ-পরবর্তী সময়ে একই মাঠে মসুর, ছোলা, বার্লি ও তিসি আবাদের সুযোগও তৈরি হবে। এ প্রজাতির ধানের গড় জীবন কাল ১১৪ থেকে ১১৭ দিন। প্রজনন পর্যায়ে ২১ থেকে ২৮ দিন বৃষ্টির অভাবে খরা হলে হেক্টরে ৩ থেকে সাড়ে ৩ টন ফলন পাওয়া যাবে। তবে উপযুক্ত পরিচর্যা পেলে এবং খরা না হলে ব্রি ধান ৭১-এর ফলন হেক্টরে ৫ থেকে ৬ টন পর্যন্ত যেতে পারে। অধিক ফলনশীল এ জাতের চালের আকৃতি মাঝারি লম্বা ও মোটা এবং সাদা। আর চালে এমাইলোজের পরিমাণ ২৪ শতাংশ।

ব্রি ধান ৭২ ॥ এটি অধিক ফলনশীল জিংক সমৃদ্ধ আমন ধানের জাত। এ জাতের চালে শতকরা ৮ দশমিক ৯ ভাগ প্রোটিন রয়েছে; আর জিঙ্কের পরিমাণ ২২ দশমিক ৮ মিলিগ্রাম যা প্রচলিত অন্যান্য জাতের চেয়ে ৬ মিলিগ্রাম এবং জিংক সমৃদ্ধ আমন ধানের জাত ব্রি ধান ৬২ এর চেয়ে প্রায় ৩ মিলিগ্রাম বেশি। জাতটি গড়ে হেক্টরপ্রতি ৫ দশমিক ৭ টন পর্যন্ত ফলন দিতে সক্ষম, তবে উপযুক্ত পরিচর্যায় ৭ দশমিক ৫ টন পর্যন্ত ফলন পাওয়া যায়। চালের আকার আকৃতি লম্বা, মোটা এবং রং সাদা; আর চালে এমাইলোজের পরিমাণ ২৬ শতাংশ। এছাড়া এ জাতের আমন রোপণ করা হলে তা কেটে অনায়াসে গম, সরিষা বা ডাল জাতীয় ফসল আবাদ করাও সম্ভব।

ব্রি ধান ৭৩ ॥ ব্রি ৭৩ একটি অধিক ফলনশীল আমন মৌসুমের উপযুক্ত লবণাক্ততা সহনশীল জাতের ধান। এর মূল বৈশিষ্ট্য হলো চারা অবস্থায় ১২ ডিএস/মি. লবণাক্ততা সহ্য করতে পারে। এছাড়া অংগজ বৃদ্ধি থেকে প্রজনন পর্যায় পর্যন্ত লবণাক্ততা সংবেদনশীল সকল ধাপে ৮ ডিএস/মি. মাত্রায় লবণাক্ততা সহ্য করে ফলন দিতে সক্ষম। অন্যদিকে এ জাতের ধানের জীবনকাল কম হওয়ায় উপকূলীয় লবণাক্ত অঞ্চলে ফসল কর্তনের পর উঁচু জমিতে সূর্যমুখী ও লবণ সহনশীল সরিষা আবাদের সুযোগ তৈরি হবে। এ জাতের ধানের জীবনকাল ১২০ থেকে ১২৫ দিন। উপযুক্ত পরিচর্যা পেলে হেক্টরপ্রতি গড়ে ৪ দশমিক ৫ টন ফলন পাওয়া যায়। তবে লবণাক্ততার মাত্রাভেদে হেক্টরপ্রতি সর্বনিম্ন ২ দশমিক ১ টন এবং কম লবণাক্ততায় সর্বোচ্চ ৬ দশমিক ১ টন পর্যন্ত ফলন পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

ব্রি ধান ৭৪ ॥ ব্রি কর্তৃক উদ্ভাবিত জাতের সর্বশেষ সংযোজন ব্রি ধান ৭৪, যা বোরো মৌসুমের উচ্চফলনশীল ধানের জাত। ২০১৫ সালের নবেম্বরে অবমুক্ত করা এ জাতটির ফলন হেক্টরে ৭ টন। মধ্যম ব্লাস্ট প্রতিরোধী এ জাতের ধানের দানার আকার আকৃতি মাঝারি মোটা। জিংক সমৃদ্ধ এ জাতের ভাত অত্যন্ত ঝরঝরে। এ জাতের ধানের জীবনকাল ১৪৭ দিন। ২০১৪ সালে অবমুক্ত ৭ জাত ॥ ২০১৪ সালে ব্রি কর্তৃক অবমুক্তি পাওয়া জাতগুলো হলো-ব্রি ধান ৬৩, ব্রি ধান ৬৪, ব্রি ধান ৬৫, ব্রি ধান ৬৬, ব্রি ধান ৬৭, ব্রি ধান ৬৮ এবং ব্রি ধান ৬৯। এর মধ্যে ব্রি ৬৩ একটি অধিক ফলনশীল সরু বালাম ধানের জাত, রান্না করার পর যার ভাত প্রায় দেড় গুণ বেড়ে যায়। তবে এর চাষাবাদ পদ্ধতি অন্যান্য উফশী বোরো ধানের জাতের মতোই। পরবর্তী ব্রি ৬৪ একটি উচ্চফলনশীল জিংক সমৃদ্ধ বোরো ধানের জাত, এর ফলন হেক্টরপ্রতি সর্বোচ্চ সাড়ে ৭ টন। প্রচলিত অন্যান্য যে কোন জাতের তুলনায় এ জাতের চালে কেজিপ্রতি ৮ মিলিগ্রামের বেশি জিঙ্ক থাকায় তা মানুষের চাহিদার শতকরা ৪০ ভাগ জিঙ্কের চাহিদাই পূরণ করতে সক্ষম। ব্রি ধান ৬৫ আধুনিক উফশী ধানের সকল বৈশিষ্ট্য বহন করে। একইভাবে ব্রি ৬৬, ৬৭, ৬৮ ও ৬৯ আধুনিক উফশী ধানের এক একটি উন্নতর জাত; যার সবটিই অধিক ফলনশীল ও ভিন্ন ভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য বহনকারী।

উদ্ভাবিত নতুন জাত প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে ড. তমাল লতা আদিত্য জনকণ্ঠকে বলেন, ব্রি কর্তৃক উদ্ভাবিত এসব জাতের মধ্যে খরা সহনশীল ও উপকূলীয় অঞ্চলের লবণাক্ততার মাত্রা সহ্য করে অধিক ফলন দিতে সক্ষমÑ এমন জাতও রয়েছে। ব্রি ধান ৭১ একটি খরা সহনশীল জাত, যা খরাপ্রবণ বৃষ্টিনির্ভর এলাকায় ধান আবাদের পর একই মাঠে মসুর, ছোলা, বার্লি ও তিসি আবাদের সুযোগ তৈরি করে দেবে। এছাড়া ব্রি ধান ৭৩ একটি লবণাক্ততা সহনশীল জাত। যা আমন মৌসুমে সাতক্ষীরা, পটুয়াখালী ও বরগুনা এলাকায় রোপণযোগ্য।