১৯ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বছরে ৬ লাখ মামলা বাড়ছে আদালতে

বছরে ৬ লাখ মামলা বাড়ছে আদালতে
  • বিচারে দীর্ঘসূত্রতায় নিঃস্ব হচ্ছেন অনেকে;###;পরিস্থিতি উন্নয়নে কার্যবিধি সংস্কারের উদ্যোগ

বিকাশ দত্ত ॥ ময়মনসিংহ মুক্তাগাছার অজয় কুমার গোপ ৯ দশমিক ৬৭ একর জমি নিয়ে ১৯৮৫ সালে প্রথম মামলা করেন ময়মনসিংহের সাব জজ আদালতে। একটি গ্রুপ জাল দলিলের মাধ্যমে তার জমি গ্রাস করে। সাব জজ থেকে শুরু করে আপীল বিভাগ পর্যন্ত তিনি মামলা করে তার পক্ষে রায় পান। কিন্ত ওই গ্রুপ তার জমি ফেরত দেয়নি। স্থানীয় প্রশাসনের অসহযোগিতার কারণে জমি তো ফিরেই পাননি। উপরন্তু তিনি এখন ভিক্ষা করে খাচ্ছেন। আপীল বিভাগের দিকনির্দেশনায় তিনি ক্রিমিনাল মামলা দায়ের করেন। নিম্ন আদালত থেকে শুরু করে উচ্চ আদালত আসতে দীর্ঘ সময় লেগেছে। এমন অজয়ের মতো হাজারো অজয় করেছে। অনেকে আবার স্থানীয় মস্তান ও টাকার অভাবে মামলাও করতে পারেন না। এ ধরনের জাল দলিলের মামলা প্রায়ই আদালতে আসছে। যে কারণে মামলার সংখ্যাও বেড়ে যাচ্ছে। শুধু উচ্চ আদালত নয় মামলা জটের ধাক্কা দেশের নিম্ন আদালতে লেগেছে। ঢাকা জজকোর্ট, মেট্রো সেশন জজ, নারী ও শিশু জজসহ প্রায় ২৩টি আদালতে প্রায় ১ লাখ ৮৪ হাজার ৬৫৩টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। ঢাকা জজকোর্ট ছাড়াও ঢাকা বিভাগে ৬ লাখ ৩১ হাজার ৮৩৪টি, চট্টগ্রাম বিভাগে ৩ লাখ ৪১ হাজার ৫১২টি,২ লাখ ২৬ হাজার ৪৩৭টি, রংপুর বিভাগে ১ লাখ ২৬ হাজার ৬৯টি, খুলনা বিভাগে ২ লাখ ৪৪ হাজার ৯২৫টি, বরিশাল বিভাগে ৯৮ হাজার ৩৭৩টি এবং সিলেট বিভাগে ৮৩ হাজার ৮২৪টি। মোট ১৭ লাখ ৫৩ হাজার ৬৭৪টি। ২০১৫ সালের ১ জুলাই থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর তিন মাসের সুপ্রীমকোর্টের এই পরিসংখ্যানে থেকে এ তথ্য পাওয়া গেছে। দেওয়ানী ও ফৌজদারি মামলার গড় পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় আদালতে প্রতিবছর গড়ে ৬ লাখ মামলা বৃদ্ধি পাচ্ছে। নিম্ন আদালতে বিচারকের সংখ্যা ১৫০০ জন। একজন বিচারক গড়ে ২৪৮০টি মামলা পরিচালনা করতে পারেন। মামলা জটের অন্যতম কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে তদন্ত কাজে বিলম্ব, সঠিক সময়ে সাক্ষ্য গ্রহণ না হওয়া এবং মামলার তুলনায় এজলাসের স্বল্পতার কারণে ঢাকা কোর্টে নিষ্পত্তির অপেক্ষায় ঝুলে আছে লাখ লাখ মামলা। এ ছাড়া রাষ্ট্রপক্ষের কিছু আইনজীবীর বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ করেছেন বিচার প্রার্থীদের কেউ কেউ।

২০০৫ সাল থেকে ২০১৫ সালের ৩১ মার্চ পযন্ত দেশের সকল জেলা জজশিপে বছরের শুরুতে বিচারাধীন দেওয়ানী ও ফৌজদারি মামলার সংখ্যা এবং বছর শেষে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা গত পরিসংখ্যানে দেখা যায়। ২০০৫ সালের বছরের শুরুতে ছিল ৪ লাখ ১৪ হাজার ৭৮৩টি আর বছর শেষে ছিল ৪লাখ ৩৮ হাজার ৯৬টি। ২০০৬ সালের বছরের শেষে ছিল ৪ লাখ ৬৬ হাজার ৬৯১টি, ২০০৭ সালে ৪ লাখ ৫৬ হাজার ৬০৪টি, ২০০৮ সালে ৫ লাখ ৫ হাজার ৮৬টি, ২০০৯ সালে ৬লাখ ৫ হাজার ৮৫৯টি, ২০১০ সালে ৬ লাখ ৪৬ হাজার ৯২৩টি, ২০১১ সালে ৭ লাখ ১ হাজার ৭৮৯টি, ২০১২ সালে ৮ লাখ ৬৯ হাজার ৬১৪টি, ২০১৩ সালে ১০ লাখ ১৮ হাজার ৬২৩, ২০১৪ সালে ১১ লাখ ২০ হাজার ১৫৯টি এবং ২০১৫ সালে ১১ লাখ ৫৩ হাজার ২০০টি (৩১ মার্চ পর্যন্ত)।

২০১২ সালের ১ জানুযারি পর্যন্ত বিচারাধীন মামলাগুলোর মধ্যে রয়েছে, ঢাকা বিভাগ দেওয়ানী মামলা- ২ লাখ ১১ হাজার ৩৩৯টি। ফৌজদারি ১ লাখ ৪২ হাজার ৯৮৬টি। চট্টগ্রাম বিভাগে দেওয়ানী মামলা ১ লাখ ৩০ হাজার ৭৩০টি। ফৌজদারি ৭৪ হাজার ৫২৭। রাজশাহী বিভাগে দেওয়ানী মামলা ১ লাখ ৬৫ হাজার ১৪৮টি। ফৌজদারি মামলা ৭৮ হাজার ৫৪৬টি। খুলনা বিভাগে দেওয়ানী মামলা ১ লাখ ১৪ হাজার ৯৮টি। বরিশাল বিভাগে দেওয়ানী মামলা ৫১ হাজার ১৫৮টি। ফৌজদারি ১৩ হাজার ৪৮০টি। সিলেট বিভাগে দেওয়ানী মামলা ৩০ হাজার ৩১৬টি। ফৌজদারি ১৯ হাজার ১শ’ ৬১টি। মোট দেওয়ানী ৭ লাখ ১ হাজার ৭৮৯টি। ফৌজদারি ৩ লাখ ৭৪ হাজার ৩৭৫টি।

পাশাপাশি এ বছর ঢাকা বিভাগে সিভিল মামলা দায়ের হয়েছে ৩৮ হাজার ৮শ’। নিষ্পত্তি হয়েছে ১৪ হাজার ৫৯টি। এক বছরে ২৪ হাজার মামলা বেশি ফাইল হয়েছে। চট্টগ্রাম বিভাগে দায়ের হয়েছে ১৭ হাজার ৮৬২টি। নিষ্পত্তি হয়েছে ৭ হাজার ১২৭টি। রাজশাহী বিভাগে দায়ের হয়েছে ২৪ হাজার ২৪১টি। নিষ্পত্তি হয়েছে ১৩ হাজার ৭৩৪টি। খুলনা বিভাগে দায়ের হয়েছে ২৭ হাজার ২৮৯টি। নিষ্পত্তি হয়েছে ১৯ হাজার ৫০৯টি। বরিশাল বিভাগে দায়ের হয়েছে ১০ হাজার ৭৭১টি। নিষ্পত্তি হয়েছে ৭ হাজার ৩৯৮টি। সিলেট বিভাগে দায়ের হয়েছে ১১ হাজার ৯৭৯টি। নিষ্পত্তি হয়েছে ৮ হাজার ৫টি। এ মামলাগুলো জেলা ও দায়রা জজ এবং সমমনা ট্রাইব্যুনালে হয়েছে।

পাশাপাশি ম্যাজিস্ট্রেসি কোর্টে ফৌজদারি মামলা জানুয়ারি পর্যন্ত ঢাকা বিভাগে বিচারাধীন আছে ৩ লাখ ১১ হাজার ৬৬টি। আগের বছর অর্থাৎ ২০১১ সালের দায়েরকৃত মামলা ২ লাখ ৮২ হাজার ৫৮৮টি। নিষ্পত্তি হয়েছে ২ লাখ ৪৪ হাজার ২০৫টি। এর মধ্যে আগের বছর বাকি রয়েছে ৩৮ হাজার মামলা। চট্টগ্রাম বিভাগে দায়ের হয়েছে ১ লাখ ১৯ হাজার ৪৭৭টি। নিষ্পত্তি হয়েছে ১ লাখ ১৮ হাজার ৬৬টি। বিচারাধীন রয়েছে ১ লাখ ২৪ হাজার ৪৭৮টি। রাজশাহী বিভাগে মামলা দায়ের হয়েছিল ১ লাখ ৪৫ হাজর ৮৭৯টি। নিষ্পত্তি হয়েছে ১ লাখ ৪৬ হাজার ৩৭০টি। বিচারাধীন রয়েছে ১ লাখ ৪২ হাজার ২০টি। খুলনা বিভাগে মামলা দায়ের হয়েছে ৭২ হাজার ৪৭৮টি। নিষ্পত্তি হয়েছে ৭৮ হাজার ৪৫৮টি। বিচারাধীন রয়েছে ৭৯ হাজার ৬৭৪টি। বরিশাল বিভাগে দায়ের হয়েছে ৫০ হাজার ৭০৭টি। নিষ্পত্তি হয়েছে ৫০ হাজার ৮শ’ ২৩টি। বিচারাধীন আছে ৫৪ হাজার ২৯টি। সিলেট বিভাগে দায়ের হয়েছে ৩৪ হাজার ৯৪০টি। নিষ্পত্তি হয়েছে ৩৩ হাজার ৭০৭টি। বিচারাধীন রয়েছে ৫২ হাজার ২৫১টি।

অপরদিকে সূত্র মতে ২০০৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত হাইকোর্টে বিচারাধীন ছিল ২ লাখ ৬২ হাজার ৩৪৫টি। পরের বছর ২০০৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর সে সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২ লাখ ৯৩ হাজার ৯০১টি। ২০০৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর মামলার সংখ্যা দাঁড়ায় ৩ লাখ ২৫ হাজার ৫৭১টিতে। এর মধ্যে ফৌজদারি মামলার সংখ্যা ১ লাখ ৯৯ হাজার, দেওয়ানী ৮০ হাজার ২৮৮টি। ২০০৮ সালে হাইকোর্টে দায়ের হয় ৫২ হাজার ৫৯০টি মামলা। এর মধ্যে দেওয়ানী মামলার সংখ্যা ৬ হাজার ৭২৮টি এবং ফৌজদারি মামলার সংখ্যা ৪৫ হাজর ৮৬২টি। ২০০৯ সালে নতুন মামলা জমা হয় ৫২ হাজার ৪৮৮টি। এর মধ্যে দেওয়ানী ৭ হাজার ৩২টি। রিট ও ফৌজদারি মামলার সংখ্যা ৪৫ হাজার ৪৫৬টি। এ বছর ৩০ জুন পর্যন্ত মোট মামলা ২ লাখ ৮৬ হাজার ৪৫০টি। নিষ্পত্তি হয় ৩৫৩১টি। এখন পেন্ডিং আছে ২ লাখ ৮২ হাজার ৯১৩টি মামলা।

সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহম্মেদ বলেছেন, মামলাজট দূর করতে দেওয়ানী ও ফৌজদারি মামলার কার্যবিধি সংস্কারের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এখন থেকে মামলা পরিচালনায় সময়সীমা বেঁধে দেয়ার পাশাপাশি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি। এতে করে তুচ্ছ ঘটনা নিয়ে মামলা করার প্রবণতা দূর হবে।

নির্বাহী বিভাগ হতে ম্যাজিস্ট্রেসি পৃথক হওয়ার পর দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও এখন পর্যন্ত পৃথক কোন চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্র্রেসি ভবন তৈরির কাজ শেষ না হওয়ায় প্রত্যেক বিচারকের জন্য পৃথক এজলাস এবং খাস কামরার অভাবে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বিচারককে একই এজলাসে পালাক্রমে বসতে হচ্ছে। বর্তমানে সারাদেশের ৫৪টি জেলায় ৩৪২ জন বিচারক মাত্র ১৬৪টি এজলাসে দিনের বিভিন্ন সময়ে পালাক্রমে বিচার কাজ পরিচালনা করছেন। এতে আদালতের সময় নষ্ট হচ্ছে এবং মামলা নিষ্পত্তির হারে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

৬৪টি জেলায় চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্র্রেট আদালত ভবন নির্মাণের জন্য ২০১০ সাল থেকে উদ্যোগ গ্রহণ করা হলেও এখন পর্যন্ত ৫টি জেলা (টাঙ্গাইল, ঝিনাইদহ, খুলনা, সিলেট ও ব্রাক্ষণবাড়িয়া) ম্যাজিস্ট্রেসি বিল্ডিং ছাড়া আর কোন ম্যজিস্ট্র্রেসি বিল্ডিংয়ের কাজ শেষ হয়নি। এখন পর্যন্ত ৩৪টি জেলায় আদালত ভবনের নির্মাণ কাজ অত্যন্ত ধীরগতিতে সম্পন্ন হচ্ছে। ৩০ জেলায় বিভিন্ন মহলের অসহযোগিতায় কারণে এখন পর্যন্ত জমি অধিগ্রহণের কাজটি সম্পন্ন করা হয়নি।

বিচারকদের বাসস্থানের অপর্যাপ্ততা ॥ বিচারকদের কাজের প্রকৃতিগত কারণেই সমাজের অন্যান্য পেশার লোকজনদের সঙ্গে স্বাভাবিক দূরত্ব বজায় রেখে চলতে হয়। কিন্তু দেশের কয়েকটি জেলা ব্যতীত অন্যান্য জেলাতেও বিচারকদের জন্য পৃথক কোন আবাসন ব্যবস্থা নেই। সে জন্য প্রতিটি জেলায় জাজেস কমপ্লেক্স স্থাপন করাটা জরুরী।

প্রয়োজনীয় সরঞ্জামাদির অভাব ॥ মামলাজট ও দ্রুত নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে বর্তমান প্রযুক্তির যুগে কম্পিউটারের প্রয়োজনীয়তা উপেক্ষা করার কোন অবকাশ নেই। কিন্তু লক্ষ্য করা যায় যে, অধস্তন আদালতে বিচারকদের জন্য পর্যাপ্ত কম্পিউটার সরবরাহ করা হয়নি। যার ফলে তাদের প্রযুক্তির সাহায্য ছাড়াই মান্ধাতা পদ্ধতিতে কাজ করে যেতে হচ্ছে। এর ফলে কাজের পরিমাণ প্রত্যাশার চেয়ে অনেক কম হচ্ছে।

আইনের প্রয়োজনীয় সংশোধন করা ॥ মামলা দ্রুত ও ন্যায়ভিত্তিক বিচারের জন্য বিদ্যমান আইনের অধীনে কিছু কিছু বিধান সংশোধনের প্রয়োজন। সম্প্রতি সময়ে দেখা গেছে দ-বিধির বিভিন্ন ধারা (৪০৬, ৪০৮, ৪২০, ৪৬৭, ৪৬৮, ৪৭১সহ অন্যান্য) দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) আইনের অফসিলভুক্ত করে গেজেট প্রণয়ন করা হয়েছে এবং সেখানে বলা হয়েছে যে, বর্ণিত ধারাগুলোর অধীনে আনা মামলা দুদক কর্তৃক পরিচালতি হবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, অধস্তন আদালতগুলোতে প্রাইভেট ব্যক্তির ক্ষেত্রে দ-বিধির ৪০৬, ৪০৮, ৪২০, ৪৬৭, ৪৬৮, ৪৭১ থারার অধীনে ম্যাজিস্ট্র্রেসি আদালতে সিআর মামলা বা জিআর মামলা হিসেবে দায়ের হয়ে তা দীর্ঘদিন ধরে পরিচালিত হয়ে আসছে। সম্প্রতি লক্ষ্য করা গেছে যে, শিশু আইনসহ অনেক আইনের সংশোধনসহ অনেক নতুন নতুন আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। প্রণীত সংশোধনী ও আইনগুলোর সঙ্গে বিদ্যমান আইনের সাংঘর্ষিকতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তাই উক্ত সাংঘর্ষিক তা দূর করার জন্য বিভিন্ন আইনের মধ্যে সামঞ্জস্যতা বজায় রাখার স্বার্থে প্রণীত আইন ও সংশোধনীর সংশোধন করা একান্ত কাম্য।