১৭ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

অতীত একটা ভিনদেশ সম্ভাবনাময় গল্পগ্রন্থের প্রতিচ্ছবি

  • মুহাম্মদ ফরিদ হাসান

ইতোমধ্যেই যাঁরা সাহিত্য জগতের বিশিষ্টজন, শক্তিমান লেখক হয়েছেন- আমরা তাঁদের লেখায় এমন সম্মোহনী ক্ষমতার পরিচয় পেয়েছি। মোজাফ্ফর হোসেন তরুণ লেখক। তাঁর লেখার বিশেষ বৈশিষ্ট্য এই সম্মোহনী ক্ষমতা। যে পাঠক একবার তাঁর গল্পের প্রথম দুই লাইন কি তিন লাইন পড়েছেন, সে-পাঠককেই পেয়ে বসেছে সেই সম্মোহনী জাদু। ফলে তার গল্পটা সম্পূর্ণ শেষ না করে পাঠক আর উঠতে পারবেন না। ২০১৬ সালের বইমেলায় প্রকাশিত মোজাফ্ফর হোসেনের ‘অতীত একটা ভিনদেশ’ গ্রন্থের গল্পগুলোই আমাদের এই সম্মোহনী শক্তির কথা জোরালোভাবেই জানান দেয়।

‘অতীত একটা ভিনদেশ’-এ মোট ১৪টি গল্প স্থান পেয়েছে। আঙ্গিক বিচারে গল্পগুলো নানামুখী, নানা চিন্তা ও চর্চা, সংস্কার ও সময়কে ধারণ করে আছে। লেখক গল্পগুলোর শুরুতেই তার পাঠককে চমকে দিতে চেয়েছেন। অবশ্য সেটা তিনি পেরেছেনও। এই চমকের জোরেই পাঠককে গল্পের শেষ পর্যন্ত যেতে হয় অথবা গল্পই পাঠককে শেষ পর্যন্ত টেনে নিয়ে যান। ‘বাঁশিওয়ালা মজ্জেল’ গল্পের শুরুটাই এ ক্ষেত্রে উদাহরণ হিসেবে দেখানো যেতে পারে। গল্পটির শুরু হয়েছে এভাবে : ‘আজ এতকাল পর মজ্জেলের সঙ্গে দেখা। যতদূর মনে পড়ে, ও মারা গিয়েছিল বছর পনেরো আগে, মে কি জুন মাসে। দিনটি ছিল ওই বছর সবচেয়ে গরমপড়া দিনগুলোর একটি। অবশ্য ওর সঙ্গে আমার শেষ দেখা হয় ওর মৃত্যুরও বছরদুয়েক আগে। দুই বছর নিরুদ্দেশ থাকার পর আমাদের ব্যাঙগাড়ির মাঠে এক শ্যালো মেশিনের পাশে লাশটা মেলে। শরীরের কোন অংশে কাটাছেঁড়ার দাগ ছিল না।’ এতটুকু পাঠেই পাঠক মনে বিস্মিত প্রশ্ন জাগে- যে পনেরো বছর আগে মারা গেছে তার সঙ্গে দেখা হয় কীভাবে? এমন প্রশ্ন মনে উত্থাপিত হওয়ায় স্বাভাবিক। প্রশ্নের উত্তর অবশ্য শেষ পর্যন্ত পাঠক পানও। তবে এমন অদ্ভুত শুরু করলেও গল্পটি অবিশ্বাস্যও মনে হয় না। বরং গল্পটি রবীন্দ্রনাথের কঙ্কাল গল্পের মতোই আমাদের কাছে বিশ্বাস্য মনে হয়। মোজাফ্ফর হোসেন ঐতিহ্য সচেতন লেখক। ফলে তার গল্পের অনেক চরিত্রকে ‘ক্ষয়ে যাওয়া অতীতের জন্যে’ হাহাকার করতে দেখা যায়। তবে আলোচ্য অংশে ‘ছুঁয়ে দেখা জীবন’-এর দিকে দৃষ্টি দেয়া যাক। লেখক এ গল্পে অসুস্থ রাহমানের ঘোরগ্রস্ত প্রলাপের মধ্য দিয়ে অতীতকে ফিরিয়ে এনেছেন। রাহমান অসুস্থতার জন্য মানসিক ভারসাম্যহীন। তিনি অসুস্থতার ঘোরের মধ্যে ফিরে যান তাঁর অতীতের দিকে। যেখানে প্রেমময়ী একজন মধুবালা আছে। তার সঙ্গে রহমানের খুনসুটি, ভাল লাগার সম্পর্ক সেই কিশোর বয়সেই। আছেন রাহমানের দুঃখী মা। আর আছে দুরন্ত রাহমান। যে কিনা পাখি ধরতে বন-বাদাড়ে ঘুরে বেড়ায়। মাটির সঙ্গে ঘুঘুর ডাকে সে নিবিষ্ট হয়। রাহমান চরিত্রটি অসুস্থতার মধ্য দিয়ে ফিরে গেছে তার অতীতে, তার স্মৃতিবিজড়িত স্থানে। বিশেষত উপস্থাপন কৌশল বিচারে সব গল্পের তুলনায় অসম্ভব পারঙ্গমতায় এ গল্পটি লেখক উপস্থাপন করেছেন। গল্পটি পাঠে একই সঙ্গে মানুষের অতীতচারী স্বভাব ও প্রেমময়তা, স্বার্থ ও লোভ পাঠককে কখনও নস্টালজিক করবে, কখনও ব্যথিত করবে। আর এমন আবেদন সৃষ্টির মধ্য দিয়ে লেখক তার লিখনীর স্বার্থকতা খুঁজে পান। গল্পে আরও বিচিত্রতাকে ধারণ করে থাকেন মোজাফ্ফর হোসেন। জীবনের কথকতা বলার পর তিনি একই সঙ্গে গল্পে এঁকেছেন বাংলার নিরক্ষর মানুষের কুসংস্কারের চিত্র। তার গল্পগুলোতে ধর্মীয় গোঁড়ামির চিত্র ও হুজকতা এমন বয়ানে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এ ছাড়াও তার গল্পে ‘কর্পোরেট শক্তি, আমলাতন্ত্রের শক্তি এবং মিডিয়াশক্তি’র কাছে একজন ব্যক্তির যে অবস্থান, সেটি নানাভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। এমন উপস্থাপনের একটি গল্প ‘লাশটি জীবিত, বাকিরা মৃত’।

অনেক প্রখ্যাত গল্পকাররাই স্বীকার করেছেন যে, গল্পে সংলাপের যথার্থ ব্যবহার কষ্টসাধ্য কাজ। আমরা দেখি মোজাফ্্ফর হোসেন তাঁর গল্পগুলোতে সংলাপের ব্যবহার করেছেন প্রচুর। তাঁর এ গ্রন্থের প্রতিটি গল্পেই সংলাপের প্রাচুর্য দেখা যায়। আবার কখনও কখনও সে সংলাপ, চরিত্রের মুখের বুলি লেখকের রসবোধকে তুলে ধরে। গল্পপাঠের সময় এক অনিন্দ্য আনন্দের ভেলায় ভাসিয়ে নিয়ে চলে পাঠককে। পাঠক মুগ্ধ হন, বিস্মিত হন। ‘ভ্যাদা কবির প্রস্থান কবিতা’ গল্পে ভ্যাদা কবিরাজ-এর কথা এখানে উল্লেখযোগ্য : ‘‘বাড়ি ফিরলে বৌ বা ফেরার পথে কেউ যখন জিজ্ঞেস করে, ‘আজ কি কাব্য বানালি শুনাও দেখি নি?’ ভ্যাদা সরলভাবে উত্তর করে, ‘সেকি, শুনাবু কেমুন করি, আজ তো আমি শব্দদি’ কাব্য করিনি। আজ কাব্য করিচি গন্ধ দি।’ কোন কোন দিন বলে, ‘আজকাব্য করিচি ফড়িং আর দুধধানের নেঙোর দি। যা রঙ হলু না, সে মুখে বুলি বুঝানু যাবে না! সূর্য্যরি আলো ফুটার সঙ্গে সঙ্গে সব উবে গিছে। থাকলি না দেকাব!’ যেদিন নদীর ধারে বসে, সেদিন কেউ জিজ্ঞেস করলে উত্তর করে, ‘আজকাব্যটা খুব জমিলো বটে। কেন্ত সব তো জল দি নির্মাণ করিলাম, তাই ভেসি গিছে দখিনের হাওয়াই গা এলি দি। কিছু তো ধরি রাখতি পারিনি!’’

গল্পের ভেতর গল্প বলার অভ্যেস ‘অতীত একটা ভিনদেশ’ রচয়িতার। তিনি নিজের গল্পের ভেতরই হঠাৎই নিয়ে আসেন আরও একটি গল্প। সেই গল্পটি হয়ত কোন ইংরেজ কবির, কখনও কোন কুকুর ছানার। তবে গল্পের ভেতরের গল্পটা বলার কৌশল তার মোহনীয়। এ ক্ষেত্রে ‘একটা কুকুর অথবা একজন কবির গল্প’, ‘মৎস্যজীবন’ গল্পের কথা উল্লেখ্য। বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক জাহানারা নওশিন এই গল্পগ্রন্থ সম্পর্কে পাঠকথনে বলেছেন : ‘গল্পই হোক আর উপন্যাসই হোকÑ বিষয়বস্তু বিস্তারে নির্মাণ বলে একটা ব্যাপার আছে।...কিন্তু মোজাফ্ফরের গল্পে নির্মাণ বলে কিছু নেই। সমস্ত বিষয়টি ভেঙ্গেচুুড়ে দিয়ে যা তিনি সৃষ্টি করে ওঠেন, তা যেন অস্থিহীন একটি অবয়ব। যেন ‘দেহহীন লাবণ্য বিলাস’।

অবয়বটিও যেন বায়বীয়। স্বপ্ন আর ঘন কুয়াশার ভেতর দিয়ে দেখা বাস্তবের প্রায় বিনির্মাণ বাস্তব।’ এই গ্রন্থের গল্পগুলো পাঠে আমরা তাঁর এমন কথার সঙ্গে যেমন সাজুয্য খুঁজে পেয়েছি, তেমনি পেয়েছি অস্থিসমেত গল্পও। বিশ্বগল্পের পাঠ নেয়া তরুণ লেখক মোজাফ্ফর হোসেন। তিনি তার গল্প নিয়ে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করবেন এটাই স্বাভাবিক। তার আলোচ্য গল্পগুলো পাঠককে নতুন কিছু নতুন করে আস্বাদনের সুযোগ করে দেবে বলেই আমাদের প্রত্যাশা।