২৪ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

তত্ত্বের ব্যবচ্ছেদ

  • এস এম ফরিদুজ্জামান

মানব মনের অচেতন অংশের কথা মানুষের কাছে অজানা ছিল না। প্রাচীন যুগে প্লেটোর ‘রিপাবলিক’ গ্রন্থের ‘আত্মার তিনস্তর’ তত্ত্বে বা আমাদের লালন ফকিরের ‘আরশি নগর’-এ তার প্রমাণ পাওয়া যায়। কিন্তু এই অচেতন মনই যে ব্যক্তি বা সমাজের মূল চালিকাশক্তি তা ছিল সিগমুন্ড ফ্রয়েডের ‘আবিষ্কার’। সিগমন্ড ফ্রয়েডের এই আবিষ্কার মনস্তত্ত্বের বিষয় হলেও তিনি সেটাকে নৃ-তত্ত্ব, সমাজতত্ত্ব সবকিছুতেই প্রয়োগ করেন। ইউরোপে এই তত্ত্বের বিকাশ হলেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তা গ্রহণযোগ্যতা পায় বেশি। বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে তা ব্যাপক আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। লুই আলতুসার অচেতন মনের আবিষ্কারকে জবাড়ষঁঃরড়হধৎু আখ্যা দিয়ে বলেছিলেন ‘নতুন মহাদেশ’ আবিষ্কার। ফ্রয়েড নিজেও তার আবিষ্কারকে কোপারনিকাস ও ডারউইনের আবিষ্কারের সঙ্গে তুল্য বলে দাবি করেন।

ফ্রয়েড-উত্তর কালে তার উত্তরসূরিরা যেমন ইয়ুং, এডলার, ফ্রম, লাকা ঈষৎ ভিন্নতা নিয়ে আবির্ভূত হলেও মূলগতভাবে ফ্রয়েডের অনুসারী হিসেবেই থেকে যান। বর্তমানে দর্শন, নৃ-তত্ত্ব, সমাজত্ত্ব প্রভৃতিতে ফ্রয়েডের ভাবনার প্রয়োগ এটিকে একটি ভাবাদর্শ হিসেবে দাঁড় করিয়েছে। পোস্ট-মডার্নিজম বা উত্তর-আধুনিকতাবাদ নামে যে চটকদারি ভাবধারা এখন প্রতিষ্ঠা পেয়েছে তার ভিত্তিমূলে রয়েছে ফ্রয়েডের চিন্তাধারা।

ফ্রয়েডের চিন্তা বিজ্ঞানের ছদ্মবেশে অবৈজ্ঞানিকতা, নিরীশ্বরবাদীতার ছদ্মবেশে ভাববাদিতা- যা তৈরি করেছে এক ঈধসড়ঁভষধমব. তাতে বিভিন্ন জন হন বিভ্রান্ত। ফ্রয়েডের মৃত্যুর (১৯৩৯) এত বছর পরেও তাই তাকে অবহেলা করা যায় না। বাংলাদেশে ফ্রয়েড নিয়ে আলোচনা থাকলেও পর্যালোচনা নেই। বিরঞ্জন রায় তার ‘ফ্রয়েডবাদ : দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের আলোকে’ বইটিতে সেই পর্যালোচনাই করেছেন। ফ্রয়েডের তত্ত্ব অবৈজ্ঞানিক। তিনি নিজেও এটাকে বলছেন সবঃধঢ়ংুপযড়ষড়মু বা অধিমনস্তত্ত্ব। তারপরও তার কদর অনেক। কারণ এটা দিয়ে কারো কারো স্বার্থ হাসিল হয়। সমাজ সচেতন বিরঞ্জন রায় তাই বইটির মুখ বন্ধে বলছেন, ‘ নিজেদের স্বার্থবিরোধী কোন স্পষ্ট সত্যকেও বিতর্কিত করে তোলাটা কায়েমি স্বার্থবাদীদের বহু ব্যবহৃত পুরনো কৌশল।’ মানুষের যে একটি মস্তিষ্ক আছে এবং সেটাই যে তার মানসিক ক্রিয়াকলাপের ভিত্তি; সিগমুন্ড ফ্রয়েড তা আমলে নেননি। মানুষ যে সামাজিক মানুষ, সমাজ দ্বারা সে প্রভাবিত হয় এবং নিজেও সমাজকে প্রভাবিত করার মধ্য দিয়েই সে ‘মানুষ’ হয়ে ওঠে; তা তিনি গ্রাহ্য করেন না। মানুষের আচরণ ব্যাখ্যায় তিনি সে জন্য পুরাতন কিছু নৃ-তাত্ত্বিক মিথ ও পৌরাণিক কাহিনীর আশ্রয় নেন। প্রাজ্ঞজন অধ্যাপক যতীন সরকার বইটির ভূমিকায় তাই বলছেন, ‘ স্নায়ু বিজ্ঞানকে বাদ দিয়ে মনের কার্যকলাপের সন্ধান করতে যাওয়া তো অন্ধকার ঘরে অস্তিত্বহীন কালো বেড়াল খুঁজে বেড়ানোর মতোই উদ্ভট ও হাস্যকর ব্যাপার।’

বিরঞ্জন রায় ফ্রয়েড ও তার অনুগামীদের তত্ত্ব উপস্থাপন, বিশ্লেষণ ও মূল্যায়ন করেছেন তীক্ষèভাবে। তার যুক্তি ও ক্ষুরধার লেখনীর মধ্য দিয়ে ফ্রয়েডবাদকে জানা ও বোঝার সুযোগ করে দিয়েছেন। লেখক নিজে বিজ্ঞান চর্চা করেন, বিজ্ঞান-মনস্কতা প্রসারের চেষ্টা করেন। মনোবিজ্ঞানকে অবৈজ্ঞানিক ধারা থেকে মুক্ত করে দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদী ধারায় ফিরিয়ে আনতে তার প্রচেষ্টার নিদর্শন এই বইটি। এদেশে যারা জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা করেন তাদের অবশ্যই বইটি পাঠ করা উচিত।

কিছু মুদ্রণ প্রমাদ ছাড়া সুখপাঠ্য বইটির বহুল প্রচার কামনা করি।