১৪ নভেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

’১৯ সালের নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতির তাগিদ ইইউর

’১৯ সালের নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতির তাগিদ ইইউর
  • গার্মেন্টস শিল্পের সংস্কার প্রক্রিয়ায় সন্তোষ প্রকাশ

কূটনৈতিক রিপোর্টার ॥ ২০১৯ সালের জাতীয় নির্বাচনের জন্য এখন থেকেই প্রস্তুতি নিতে হবে বলে মত দিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। তবে নির্বাচন কোন পদ্ধতিতে হবে সেটা বাংলাদেশের জনগণই ঠিক করবে। নির্বাচন পদ্ধতির বিষয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন কোন মতামত দেবে না। এছাড়া মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিতে গণমাধ্যম, লেখক-ব্লগারদের সুরক্ষা দেয়ার আহ্বান জানিয়েছে ইইউ। প্রতিটি ব্লগার হত্যার সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়েছে তারা। এছাড়া কোন সুনির্দিষ্ট ব্যক্তি নয়, সকলের জন্যই মৃত্যুদ- প্রথা বিলোপ চেয়েছে সংস্থাটি। এদিকে মিয়ানমারে নতুন সরকার আসার পর রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে আশা প্রকাশ করেছে ইইউ।

ঢাকায় তিনদিনের সফর শেষে শুক্রবার হোটেল সোনারগাঁওয়ে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের প্রতিনিধি দল এক সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিমত প্রকাশ করে। এ সময় ইউরোপীয় পার্লামেন্টের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক কমিটির চেয়ারম্যান জিন ল্যামবার্ট বক্তব্য রাখেন। ঢাকা সফরের বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরেন জিন ল্যাম্বার্ট।

সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও মানবাধিকার, শ্রমমানের অগ্রগতি, ব্লগার ও মুক্তমনা লেখকদের নিরাপত্তা, ইউরোপের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য, বৈশ্বিক সন্ত্রসাবাদ দমন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়ে তারা আলোচনা করেছেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষ থেকে তাদের বক্তব্য সরকারের কাছে তুলে ধরা হয়েছে বলেও তিনি জানান। সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের উত্তরে জিন ল্যাম্বার্ট বলেন, আগামী ২০১৯ সালের জাতীয় নির্বাচনের জন্য এখন থেকেই প্রস্তুতি নিতে হবে। তবে কোন পদ্ধতিতে নির্বাচন হবে, সেটা আমরা বলতে পারি না। সেটা বাংলাদেশের জনগণকেই ঠিক করতে হবে। এ বিষয়ে আমরা কোন মতামতও দেব না। এছাড়া সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের জন্য নির্বাচন কমিশন শক্তিশালীসহ সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকেও আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন বলে তিনি মন্তব্য করেন।

যুদ্ধাপরাধের দায়ে জামায়াতে ইসলামী নেতা কাদের মোল্লার মৃত্যুদ-ের সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন কেন বিবৃতি দিয়েছিল, এমন প্রশ্নের উত্তরে জিন ল্যাম্বার্ট বলেন, মৃত্যুদ- বিলোপের ক্ষেত্রে কোন সুনির্দিষ্ট ব্যক্তির বিষয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কোন দাবি নেই। এটা সকলের জন্যই প্রযোজ্য। ইউরোপীয় ইউনিয়ন সকল নাগরিকের ক্ষেত্রেই মৃত্যুদ- বিলোপ দাবি করে আসছে। আর এটা শুধু বাংলাদেশই নয়, বিশ্বের সকল দেশের ক্ষেত্রেই মৃত্যুদ- বিলোপে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সমান অবস্থান বলে উল্লেখ করেন তিনি।

বাংলাদেশে মত প্রকাশের স্বাধীনতার বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে জিন ল্যাম্বার্ট বলেন, বাংলাদেশে লেখক-প্রকাশক ও ব্লগার হত্যার বিষয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের উদ্বেগ রয়েছে। এদের প্রতিটি হত্যাকা-ের সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার করতে হবে। এছাড়া গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিতের বিষয়ে জোর দেন তিনি।

অপর এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, মত প্রকাশের স্বাধীনতার বিষয়টি শুধু যে ব্লগার ও লেখকদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য সেটা নয়, গণমাধ্যমও এর অন্তর্ভুক্ত।

এক প্রশ্নের উত্তরে জিন ল্যাম্বার্ট বলেন, মিয়ানমারে এখন নতুন সরকার এসেছে। নতুন সরকার রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার লক্ষ্যে অগ্রণী ভূমিকা রাখবে বলে ইউরোপীয় ইউনিয়ন প্রত্যাশা করে। রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পরে পোশাক খাতের কর্মপরিবেশ উন্নয়নে বাংলাদেশ সরকার থেকে অনেক পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, পোশাক খাতের শ্রমিক অধিকার নিশ্চিতে যেসব পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে, তা ইতিবাচক। তবে রফতানি প্রক্রিয়াজাত অঞ্চলে এখনও পুরোপুরি ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার নিশ্চিত হয়নি। ইউরোপীয় ইউনিয়ন এখানে ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার নিশ্চিতের প্রত্যাশা করে।

ঢাকা সফরকালে প্রতিনিধি দলের সদস্যরা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, জাতীয় সংসদের স্পীকার ড. শিরিন শারমীন চৌধুরী, বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী, আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী বীর বাহাদুর সিং, মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমানসহ সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের প্রতিনিধি ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন।

উল্লেখ্য, রাজনীতি, মানবাধিকার, পোশাক শিল্পের কর্মপরিবেশ, নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে চার সদস্যের ইউরোপীয় ইউনিয়ন পার্লামেন্টের প্রতিনিধি দল তিনদিনের সফরে মঙ্গলবার রাতে ঢাকায় আসেন। বুধবার থেকেই প্রতিনিধি দলের সদস্যরা বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে বৈঠক শুরু করেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পার্লামেন্ট সদস্য ও দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক প্রতিনিধি দলের চেয়ারপার্সন জিন ল্যাম্বার্টের নেতৃত্বে প্রতিনিধি দলের সদস্যরা ঢাকা সফর করেন। ইউরোপীয় পার্লামেন্ট প্রতিনিধি দলে রয়েছেন যুক্তরাজ্যের লেবার পার্টির সদস্য রিচার্ড হাউয়িট, ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্রেট পার্টির সদস্য ইভান স্টিফেন্স ও কনজারভেটিভ পার্টির সদস্য সাজ্জাদ করিম। শুক্রবার প্রতিনিধি দল ঢাকা ত্যাগ করে। ঢাকা ত্যাগের আগে সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয় প্রতিনিধি দল। সংবাদ সম্মেলনে ঢাকায় নিযুক্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত পিয়েরে মায়াদুনও উপস্থিত ছিলেন।

বিজিএমইএ’র সঙ্গে বৈঠক ॥ পোশাক কারখানায় নিরাপত্তা নিশ্চিতে চলমান সংস্কার প্রক্রিয়ায় সন্তোষ জানিয়েছেন ইউরোপীয় পার্লামেন্টের (ইপি) সফররত প্রতিনিধিরা। শুক্রবার পোশাক রফতানিকারকদের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএ’র নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের পর এ কথা জানান প্রতিনিধি দলটির নেতৃত্বদানকারী জিন লাম্বার্ট।

তিনি সাংবাদিকদের বলেন, তৈরি পোশাক শিল্পে চলমান সংস্কার প্রক্রিয়ায় তারা সন্তুষ্ট। তবে তারা মনে করেন, শ্রমিক অধিকার ও মজুরির বিষয়ে আরও কাজ করতে হবে। বৈঠকে পোশাক পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিয়েও আলোচনা হয় জানিয়ে বিজিএমইএ সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান বলেন, দেশে ফিরে পোশাকের মূল্য নির্ধারণের বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করার আশ্বাস দিয়েছে ইউরোপের প্রতিনিধি দলটি।

তাজরীন ফ্যাশন্সে অগ্নিকা- ও রানা প্লাজা ধসের পর বিশ্ব ক্রেতা গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে এ্যাকর্ড ও এ্যালায়েন্স নামে দুটি পর্যবেক্ষক সংস্থা গঠন করা হয়। কারখানার মানোন্নয়নে গৃহীত নীতিমালার বাস্তবায়ন কাজের দেখভাল করছে সংগঠন দুটি।

বিজিএমইএ বলে আসছে, এ্যাকর্ড ও এ্যালায়েন্সকে সঙ্গে রেখে নিরাপদ কর্মপরিবেশ তৈরিতে প্রতিটি কারখানার জন্য গড়ে অতিরিক্ত প্রায় ৫ কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে। ইউরোপের প্রতিনিধি দলটির সঙ্গে বৈঠকে বিষয়টি তুলে ধরার কথা জানিয়ে বিজিএমইএ সভাপতি বলেন, বিদেশী ক্রেতারা এটা-সেটা শর্ত জুড়ে দিয়ে এর বাস্তবায়ন চান। কিন্তু সেই তুলনায় পোশাকের ন্যায্যমূল্যের বিষয়টি তারা ভাবেন না। বৈঠকে ন্যায্যমূল্য নিয়েও ইউরোপীয় প্রতিনিধি দলের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়।

তিনি বলেন, আগামী দুই বছরেই বিজিএমইএভুক্ত পোশাক কারখানাগুলোর আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিতে সক্ষম হবেন তারা। ফলে ২০১৮ সালের পর এ্যাকর্ড-এ্যালায়েন্স প্রয়োজন হবে না। কারখানার আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিতের বিষয়টি আমলে না নিয়ে কেউ ব্যবসা করতে পারবেন না বলেও এ সময় সতর্ক করেন বিজিএমইএ সভাপতি।