১৬ নভেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

লেবাননে বাংলাদেশী নারী শ্রমিকরা ধর্ষণ ও নির্যাতনের শিকার

লেবাননে বাংলাদেশী নারী শ্রমিকরা ধর্ষণ ও নির্যাতনের শিকার
  • জীবন নিয়ে ফিরে আসা এক মোসলেমার করুণ কাহিনী

মিজানুর রহমান, সাতক্ষীরা থেকে ॥ বাংলাদেশ থেকে লেবাননে কাজ করতে যাওয়া বাংলাদেশী নারী শ্রমিকদের শারীরিকভাবে নির্যাতনের পাশাপাশি সর্বস্ব হারাতে হচ্ছে। পারিশ্রমিকের পরিবর্তে চলে নির্যাতন। নির্যাতনের পাশাপাশি প্রতি সপ্তাহে মালিক বদল করে তাদের বিক্রি করে দেয়া হয় চড়া দামে। অসুস্থ হলেও চিকিৎসা মেলে না। এমনই এক নির্যাতনের শিকার সাতক্ষীরার মোসলেমা খাতুন জীবন নিয়ে লেবানন থেকে দেশে ফিরে ভর্তি হয়েছেন সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালে। সারা শরীরে রক্তজমা নির্যাতনের কালশিরে দাগ। দীর্ঘ নির্যাতনের পাশাপাশি অনাহারে অর্ধাহারে গায়ের চামড়া ঢিলে হয়ে গেছে। সারাশরীর যেন কাপড়ে মোড়ানো কঙ্কাল। কোন রকমে জীবন নিয়ে লেবানন থেকে ঘরে ফেরা মোসলেমার আকুতি দেশের মাটিতে না খেয়ে মৃত্যু হলেও বাংলাদেশের কোন নারী যেন লেবাননে না যায়। সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালে বিছানায় বসে সারাশরীরে শুকিয়ে যাওয়া কালো দাগগুলো দেখাতে দেখাতে সাংবাদিকদের কাছে এভাবেই আর্তি জানান সদর উপজেলার কুশখালি গ্রামের গ্রাম পুলিশ নজরুল ইসলামের স্ত্রী মোসলেমা খাতুন (৩৬)।

মোসলেমা জানান, মাসিক দেড় শ’ ডলার (বাংলাদেশী মুদ্রায় প্রায় ১০ হাজার টাকা) পারিশ্রমিকের বিনিময়ে সংসারে সচ্ছলতা ফিরিয়ে আনার প্রলোভন দেখান বৈকারী ইউপি সদস্য ও কাথ-া গ্রামের ইব্রাহীম খলিল। স্বামী গ্রাম পুলিশ নজরুল ইসলামও রাজি হন এই প্রস্তাবে। একপর্যায়ে পাসপোর্টসহ অন্যান্য কাগজপত্র তৈরির জন্য ইব্রাহীম মেম্বরকে দিতে হয় ২০ হাজার টাকা। ঢাকার ২নং মীরপুরে ফাতেমা এজেন্সির একটি হোস্টেলে থেকে ভাষাসহ বিভিন্ন আচরণবিধি শেখার জন্য পাঁচ হাজার টাকা ও লেবাননে যাওয়ার জন্য ফ্লাইটে ওঠার আগেই দিতে হয় ২০ হাজার টাকা। মোসলেমার বড় ছেলে আবু মুছা (১৯) অভাবের তাড়নায় দিন মজুর খাটে। মেঝ মেয়ে সেলিনা খাতুন খলিলনগর আমিনিয়া মহিলা দাখিল মাদ্রাসার সপ্তম শ্রেণীর ছাত্রী। সোনালী পারভীন কুশখালি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণীতে পড়ে। আবু সাঈদ পড়ে ওই স্কুলের প্রথম শ্রেণীতে। ছোট মেয়ে সাঞ্জিদার বয়স চার বছর। এই অভাবের সংসারে সচ্ছলতা আনতে গতবছর ১৮ জুন মোসলেমা পাড়ি দেন লেবাননে।

মোসলেমাকে ১৮ জুন বিমানযোগে ঢাকা থেকে লেবাননে নিয়ে যাওয়া হয়। বিমান থেকে নামার পর তাকে পার্শ্ববর্তী একটি ঘরে রাখা হয়। সেখানে তার মতো আরও কয়েকজন নারী আগে থেকে অবস্থান করছিল। সেখান থেকে তাকে ৫০০ ডলারে এক খ্রীস্টান মহিলা কিনে নিয়ে তার ছেলে আল আমিন ও পুত্রবধূ রেহেনার কাছে নিয়ে যায়। সেখানে ভাল কাজ করলেও তার ওপর নানা ধরনের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হতো। দিনের পর দিন গরমের মধ্যে রেখে তাকে গোসল করতে দেয়া হতো না। এরপর তাকে নাবাতিয়া অফিসে নিয়ে গিয়ে তার বিরুদ্ধে কাজ না করার অভিযোগ আনা হয়। সেখান থেকে দু’মাস পর তাকে নাবাতিয়া অফিসের পাশে আলী বক্সের কাছে ৭০০ ডলারে বিক্রি করা হয়। লেবাননে যাওয়ার পর প্রথম মাসে বেতন দেয়া হলেও পরবর্তীতে তাকে বেতন দেয়া হতো না। এমনকি মোবাইল ফোনটি কেড়ে নেয়া হয়। যোগাযোগ করতে দেয়া হতো না পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে। আলী বক্স তাকে বড় লাঠি দিয়ে পিটিয়ে জখম করত। নির্যাতনের পর হাঁটতে না পারলে আলী বক্সের কিছু পোষা মহিলা তাকে হাত ও চুলের মুঠো ধরে টানতে টানতে নিয়ে যেত। খেতে না দিয়ে তাকে কঙ্কালসার করে দেয়া হয়।

নির্যাতনের একপর্যায়ে মোসলেমা মারা যাচ্ছেন ভেবে তাকে একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। কিন্তু চিকিৎসার নামে চলে প্রতারণা। এ সময় তার পরিচয় হয় টাঙ্গাইলের এক মহিলা আয়েশার সঙ্গে। তার শারীরিক অবস্থা ও নির্যাতনের কাহিনী শুনে হতবাক আয়েশা তাকে সার্বিক সহযোগিতার আশ্বাস দেন। মোবাইল ফোনে বিষয়টি মোসলেমার স্বামীকে অবহিত করেন আয়েশা। বিষয়টি জানতে পেরে লেবাননের একটি বিমানবন্দরে নিয়ে আবারও ফিরিয়ে নিয়ে যায় আলি বক্স। তার মৃত্যু লেবাননে হলেও দেশে ফিরতে দেয়া হবে না বলে জানানো হয় তাকে। এ ধরনের নির্যাতনের শিকার বাংলাদেশের বহু নারী লেবাননে আছেন বলে জানান মোসলেমা। তিনি ধর্ষিত না হলেও লেবাননে কর্মরত অধিকাংশ নারীই ধর্ষিত হন বলে বিভিন্ন রোমহর্ষক ঘটনার কথা তুলে ধরে মোসলেমা। দেশে ফিরতে পারলে এসব নারী তাদের ওপর নির্যাতনের কথা বাংলাদেশ সরকার প্রধানকে জানাবেন বলে জানিয়েছেন লেবাননে বসবাসরত বাংলাদেশী নির্যাতিত মহিলারা।

মোসলেমার স্বামী গ্রাম পুলিশ নজরুল ইসলাম জানান, এক মাস আগে স্ত্রীর শোচনীয় অবস্থার কথা জানতে পারেন তিনি। তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করার জন্য তিনি ইউপি সদস্য ইব্রাহীম খলিলের শরণাপন্ন হন। বিষয়টি সাতক্ষীরা জেলা সমাজসেবা কর্মকর্তাকেও জানানো হয়। এরপরও ইব্রাহীম তার স্ত্রী মোসলেমাকে ফিরিয়ে আনতে রাজি না হওয়ায় স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের শরণাপন্ন হন নজরুল। মোসলেমাকে ফিরিয়ে আনতে ৩০ হাজার টাকা বিমানের টিকেট দাবি করেন ইব্রাহীম। একপর্যায়ে গত বুধবার ভোরে মোসলেমাকে ঢাকার শাহজালাল বিমানবন্দরে ফিরিয়ে আনা হয়। রাতে তাকে সাতক্ষীরায় নিয়ে আসা হয়। ১১টার দিকে মোসলেমাকে সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

মোসলেমা জানান, ইব্রাহীম মেম্বরের নেটওয়ার্ক অনেক দূর বিস্তৃত। লেবাননে গিয়ে কোন নারী কঠিন নির্যাতনের শিকার হলেও ইব্রাহীমের কথা ছাড়া দেশে পাঠানো হয় না ওই সব নারীকে। সাতক্ষীরা জেলা ছাড়াও দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ইব্রাহীম মেম্বর মহিলাদের ভাল চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে তার ডেরায় রেখে দেয়। লেবাননে সুন্দরী ও স্বাস্থ্যবতী নারীদের কদর বেশি হওয়ায় তাদেরই বেশি করে পছন্দ করেন ওই মেম্বর। লেবাননে নামার পরপরই ওই সব মহিলাকে বিশেষ স্থানে নিয়ে বেশি দামে বিক্রি করা হয়। যৌন নির্যাতনের শিকার ওই সব নারী দেশে ফিরতে চাইলে তাদের ওপর পাশবিক নির্যাতন বাড়িয়ে দেয়া হয়। সপ্তাহ অন্তর ওইসব নারীর মালিক বদল করা হয়।