২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড সেনা কর্মকর্তাদের বয়ান -মুনতাসীর মামুন

(১২ ফেব্রুয়ারির পর)

জেনারেল শফিউল্লাহই দেখুন কী বলেছেন- “বাংলাদেশের প্রথম সেনাপ্রধান মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার (অব.) মেজর জেনারেল কেএম শফিউল্লাহ বীরউত্তম বলেছেন, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কখনই সশস্ত্র বাহিনীকে সম্মান করেনি। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা মনোনয়ন বাণিজ্য করে আমাকে অপমান করেছেন। বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে বিরোধী দলের ভূমিকা নিয়ে নিজের ও দলের ক্ষতি করেছেন। দুর্নীতিমুক্ত দেশ প্রতিষ্ঠা ও সুস্থ গণতান্ত্রিক ধারা প্রতিষ্ঠার জন্য রাজনৈতিক সংস্কার খুবই দরকার। রাজনৈতিক দলে একনায়কতন্ত্রের অবসান জরুরি। আমাদের সেনাবাহিনী সুশৃঙ্খল ও সুশিক্ষিত। এই সেনাবাহিনীর কোনো রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ নেই। একটি সুন্দর দেশ গড়ার জন্য বর্তমান সরকারকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করার জন্য তিনি দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানান।

বীর মুক্তিযোদ্ধা (অব.) মেজর জেনারেল শফিউল্লাহ নয়াদিগন্তকে দেয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে দেশের সার্বিক বিষয় নিয়ে খোলামেলা কথা বলেন। ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড নিয়েও তিনি তার নিজের অবস্থান ও পরিবেশ-পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড নিয়ে এ যাবৎ যেসব তথ্য বই আকারে বা প্রবন্ধ আকারে প্রকাশিত হয়েছে তার অনেকগুলোতেই প্রকৃত সত্যকে আড়াল করা হয়েছে। ওই দিন কী ঘটেছিল, তিনি কী ভূমিকা পালন করেছেন সেগুলো নিয়ে তিনি শিগগিরই একটি বই প্রকাশ করবেন।

আপনি রাজনীতিতে এলেন কীভাবে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, আমার এলাকা হলো নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ। ঢাকার খুব কাছে অথচ এ এলাকাটি ছিল দীর্ঘদিন অবহেলিত। আমার অনুন্নত এলাকা ও এলাকার অবহেলিত মানুষের জন্য কিছু করার ইচ্ছা ছিল দীর্ঘদিনের। ১৯৯৩ সালের কোনো একদিন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা আমাকে খবর দিলেন। আমি গেলাম। তার সাথে প্রায় সাড়ে ৩ ঘণ্টা আমার আলাপ হয়। সেই আলাপ পুরোটাই ছিল ১৫ আগস্টের কালো দিনটি নিয়ে। তিনি আমার কাছ থেকে সবকিছু জানার আগ্রহ প্রকাশ করলেন। ... আমি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে সেই দূরত্ব দূর করার চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু আওয়ামী লীগে আমার মূল্যায়ন হয়নি। আমি যখন আওয়ামী লীগে যোগদান করলাম এবং সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলাম তখন আমার প্রত্যাশা ছিল হয়তো আমাকে মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে। সামরিক-বেসামরিক পর্যায়ে আমার যারা শুভাকাক্সক্ষী তাদেরও এমন প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু সে প্রত্যাশা পূর্ণতা লাভ করেনি। এ নিয়ে শেখ হাসিনার সাথে আমার কথাও হয়। তিনি আমাকে জানান, “১৫ আগস্টের ব্যাপারে আমি আপনাকে প্রটেক্ট করতে পারিনি।” [দৈনিক নয়াদিগন্ত, ২৬.৬.২০০৭]

আওয়ামী লীগ একবার তাঁকে মনোনয়ন দেয়নি দেখে তার এই ক্ষোভ। তাঁর মতে, রাজনৈতিক দলে একনায়কতন্ত্রের অবসান [অর্থাৎ শেখ হাসিনার] জরুরি। আমাদের সেনাবাহিনী সুশৃঙ্খল ও সুশিক্ষিত। এই সেনাবাহিনীর কোনো রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ নেই। জেনারেল শফিউল্লাহ ও অন্যদের বয়ান এর বিপরীত। পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তারাও এ ধরনের কথা প্রায়ই বলতেন। এবং এতদিন পরও জেনারেল শফিউল্লাহ কাকুল প্রশিক্ষিত ধারণা থেকে মুক্ত হতে পারেননি। সংসদ সদস্য হলেই মন্ত্রী করতে হবে কেন? আর তিনি রাজনীতি করেছেন কতদিন? অন্যরা কতদিন! এসব বিবেচনায় রাখতে হয়।

খালেদ মোশাররফ সম্পর্কে তিনি যা বলেছেন তা আগে উদ্ধৃত করেছি। সবশেষে তিনি রক্ষীবাহিনীর তৎকালীন উপপ্রধান আনোয়ার আলম শহীদের একটি চিঠি উদ্ধৃত করেছেন। ১৫ আগস্ট সকালে ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ রক্ষীবাহিনীর দুই উপ-পরিচালক শহীদ ও সরোয়ার মোল্লাকে ডেকে পাঠান উদ্ভূত পরিস্থিতিতে তাদের করণীয় সম্পর্কে ব্রিফিং করার জন্য। তারপর তিনি যে মন্তব্য করেন তা আনোয়ার উল আলম শহীদ লিখেছেন যা আগে উল্লেখ করেছি-

“শহীদ, সরোয়ার,

আমি জানি তোমরা দেশপ্রেমিক, কিন্তু আমাদের এই কাজটি করতে হয়েছে। কারণ আমরা চাইনি এ দেশটি একটি রাজতন্ত্রে পরিণত হোক।

কে. এম।”

Shaheed, Sarwar

I know you are patriots, but we had to do it because we do not want this country to be a kingdom.

K. M]

মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন।

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে শফিউল্লাহকে নিয়ে বিতর্ক হয়েছে আর এখন জিয়াউর রহমানকে একজন ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। জিয়া ষড়যন্ত্রে ছিলেন এখন এটি আর অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু শুধু তার কথা বললে অন্যদের আড়াল করা হয়। ১৯৭৫ সালের পর অন্য চার কর্মকর্তা তাহের, মনজুর, খালেদ ও শাফায়াত জামিলকে জিয়ার বিরুদ্ধচারী হিসেবে চিহ্নিত করে তাদের ‘দেশপ্রেম’ রাজনীতি ‘বৈপ্লবিক চিন্তাধারা’ ইত্যাদি দিয়ে মহিমান্বিত করা হয়। কিন্তু ঘটনা পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে এ ধারণা ভুল। কর্নেল তাহের বঙ্গবন্ধুকে উৎখাত করতে চেয়েছিলেন ও জিয়াকে রক্ষা করতে চেয়েছিলেন। জিয়া সে সুযোগ নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী তাহেরকে অন্যায়ভাবে ফাঁসি [হত্যা] দেন। মনজুর শেষতক জিয়ার সঙ্গেই ছিলেন। এরশাদের পরিকল্পনায় তিনি এলিমিনেটেড হন। জিয়া ক্ষমতায় গিয়ে শাফায়াত জামিলকে বরখাস্ত করেন। সুতরাং ওই দিক থেকে দেখলে কেউই বিপ্লবী নন। সবাই বঙ্গবন্ধুর উৎখাতকারী বা উৎখাতে সহায়তাকারী।

বঙ্গবন্ধু হত্যার পর বিদ্রোহ দমন করা যেত। কিন্তু তাতে কেউ উৎসাহী ছিলেন না। এই বিদ্রোহ দমনে বিমানবাহিনী ভূমিকা রাখতে পারত, বিশেষ করে বিমান বাহিনীপ্রধান ছিলেন তখন একে খন্দকার। কারণ সেনাবাহিনীতে গোলাবর্ষণের দিক থেকে বিমানবাহিনীর স্থান প্রথম। লিয়াকত এবং আরেকজন বৈমানিক এ কারণে উড্ডয়নও করেছিলেন। কিন্তু তাদের নামিয়ে আনা হয়। আমি শুনেছি বিভিন্ন সূত্রে যে, তারা সীমান্ত পেরিয়ে পালিয়ে যান। লিয়াকতের সঙ্গে খুব সম্ভব জাসদের এক নেতার যিনি এখন খুবই গণমান্য ব্যক্তি- তার যোগ ছিল। তার মাধ্যমে ‘কিছু হবে না’ এই আশ্বাসে তাদের ডেকে আনা হয়। সীমান্ত পেরুলেই তাদের গ্রেপ্তার করা হয় এবং সামরিক আইনে দণ্ডাদেশ দেয়া হয়। এই কাহিনীর সত্যতা কাগজপত্রে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। যা হোক, একে খন্দকারও কোনো ব্যবস্থা নেননি যদিও জেনারেল শফিউল্লাহর মতো তার হাত-পা বাঁধা ছিল না। হয়তো আকস্মিক এই ঘটনায় সবাই হকচকিত হয়ে গিয়েছিলেন।

আরো মনে রাখা দরকার আওয়ামী লীগের একাংশ খুনিদের সঙ্গে ষড়যন্ত্র করেছিল, হাত মিলিয়েছিল। সেক্ষেত্রে শুধু জেনারেল শফিউল্লাহকে দোষারোপ করলে অন্যদের আড়াল করা হয়।

হ্যাঁ, শফিউল্লাহ তাদের অধীনে চাকরি গ্রহণ না করলে হয়তো বলা যেত তিনি তাদের সঙ্গে যাননি। কিন্তু ওই পরিস্থিতিতে তা তার পক্ষে সম্ভব হয়নি। সে জন্যই তাকে অভিযুক্ত করা হয় বারবার। সবাই তো আর বীরপুরুষ হন না জাতীয় চার নেতার মতো। বীর একবারই মরেন। কাপুরুষ বারবার। তবে সেনাপ্রধান হিসেবে তার একটি দায় থেকে যায়। তিনি কিন্তু সে দায় স্বীকার করেছেন। এখানে মূল বিষয় দুটি। এক. এ হত্যা শুধু সেনাবাহিনীর একটি চক্রই করেনি। এর পেছনে আন্তর্জাতিক মদদ ছিল। কোন দেশের মদদ ছিল তা নির্দিষ্ট করে বলা হয়তো যাবে না তবে অনুমান, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ছিল না যেসব দেশ তারাই এ হত্যাকাণ্ডে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ মদদ দিয়েছে। পাকিস্তান তো বটেই। বঙ্গবন্ধুর একজন খুনি কর্নেল রশীদ এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, “সে রকম যদি কিছু হতো তাহলে খারাপ হতো না। আফটার অল আমরা দুই ভাগেই ইস্ট পাকিস্তান অ্যান্ড ওয়েস্ট পাকিস্তান একটা মুসলমান দেশ এবং মুসলমানের মধ্যে একটা ভালো সহযোগিতা রাখা এবং কনফেডারেশন স্টেট হলে বাংলাদেশ এটা ডাইরেক্ট স্বাধীন না হলেও ইনডাইরেক্ট স্বাধীনতার মতোই।”

দুই. আজকাল খুনিদের বলা হয় ‘সেনাবাহিনীর বিপথগামী অংশ।’ এর অর্থ সেনাবাহিনী-এর দায়দায়িত্ব নিচ্ছে না। কিন্তু অন্তিমে এটাও তো ঠিক সেনাবাহিনী এদের বাধা দেয়নি। এর অর্থ এ নয় যে, সেনাবাহিনীর সমস্ত সৈনিক বা কর্মকর্তা বঙ্গবন্ধু হত্যা সমর্থন করেছিলেন বা চেয়েছিলেন। কয়েকজন বাধা দিতে চেয়েছেন। কিন্তু খুনিদের বিদেশ চলে যেতে দেওয়া, তাদের ইনডেমনিটি দেওয়া এবং সরকারি সাহায্য দেয়া এগুলোর প্রতিবাদ কোনো সেনা কর্মকর্তাই করেননি। ‘চেইন অব কমান্ড’ ‘ডিসিপ্লিন’ ইত্যাদি অনেক শব্দ ব্যবহার করে ওই সময়ের সেনা কর্মকর্তারা তাদের অক্ষমতার কথা বলেছেন। কিন্তু তাতে মূল বিষয়টি এড়ানো যায় না। কারণ যারা ক্যু করছেন তারা সামরিক শৃঙ্খলা ও চেইন অব কমান্ডের বিরুদ্ধে কাজ করছেন। শৃঙ্খলা ও চেইন অব কমান্ড ফেরাবার স্থানে তাদের অবশ্যই দমন করা যায়। তখন তো শৃঙ্খলার কথা আসে না। তখন তো সবাই শৃঙ্খলা ভঙ্গকারীকেই স্যালুট করেন। আসলে সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাদের একটি বড় অংশের সায় ছিল এই হত্যাকাণ্ডে। এটি আজ পরিষ্কার। বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার দায় সেনাবাহিনীরই।

(সমাপ্ত)