১৫ আগস্ট ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

মিডিয়াই সরকারকে সঠিক পথে চালাবে -ড. জীবেন রায়

উন্নত দেশগুলোতে বিরোধী দলের ভূমিকা অনস্বীকার্য। তেমনি সেসব দেশে রয়েছে শক্তিশালী মিডিয়া। সরকারী কাজকর্মের প্রতিটি ক্ষেত্রই ম্যাগনিফাইং গ্লাস দিয়ে বিশ্লেষণ করা হয়। তাতে বিরোধী দল যেমন সমালোচনা করে, মিডিয়াও পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনা করে। তাই জনগণের অনেকটাই জানা হয়ে যায়। সবকিছু জানা না হলেও আন্দাজ করা যায়। তবে আজকের অত্যাধুনিক টেকনোলজির যুগে মিডিয়া আরও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে।

প্রেসিডেন্ট ফ্র্যাঙ্কলিন ডি রুজভেল্ট মিডিয়ার স্বাধীনতা নিয়ে বলেছিলেন, ‘যদি অন্যান্য দেশে মিডিয়াতে অর্থাৎ সব ধরনের প্রেস, বই এবং লিটারেচারে সেন্সরশিপ প্রয়োগ করা হয়; আমাদের ডবল প্রচেষ্টা হবে কি করে এই মিডিয়াকে সম্পূর্ণ মুক্ত রাখা যায়।’ তবে ম্যালকম এক্স একটা খাঁটি কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, ‘এই পৃথিবীতে সবচাইতে শক্তিশালী হলো মিডিয়া। তারা এতই শক্তিশালী যে নির্দোষকে দোষী এবং দোষীকে নির্দোষ বানাতে পারে। কারণ তারা মানুষের মনকে নিয়ন্ত্রণ করে থাকে।’ সেইজন্য মিডিয়াকে হতে হবে সত্যাশ্রয়ী। সেইজন্যই মিডিয়াকে দুর্নীতিমুক্ত হতে হবে। মিডিয়া একটি সৃজনশীল জগৎ। সৃজনশীল মানুষরাই এই পেশায় ঠিকে থাকতে পারে। সেলিব্রেটি হয়ে উঠতে পারে।

বলা হচ্ছে, বাংলাদেশে বর্তমানে উন্নয়নের গণতন্ত্র চলছে। মালয়েশিয়ার উন্নয়নের জনক মাহাথির মোহাম্মদ অতিসম্প্রতি বাংলাদেশের অতিমাত্রায় রাজনীতিকে বাদ দিয়ে উন্নয়নের দিকে মনোযোগী হতে পরামর্শ দিয়েছেন। সত্যিই তো, বাংলাদেশ গত কয়েক দশক মারামারি-কাটাকাটি-ঘর পোড়ানো-মানুষ পোড়ানোর রাজনীতিতেই নিমগ্ন ছিল। কাজের কাজ তো কিছুই হয়নি। এখন যখন উন্নয়ন হচ্ছে, সারা বিশ্বও যখন বলছে, পরিসংখ্যানও তা বলছে, তখন তা চলাই উচিত। মানুষ পোড়ানোর রাজনীতি কতটা খারাপ তা যারা করেছিল তাদের দিন শেষ। মুক্তিযুদ্ধে জনগণের দুর্দশা, সর্বোপরি ত্রিশ লাখ শহীদের বিনিময়ে বাংলাদেশ স্বাধীনতা পেয়েছে। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশে দিনের পর দিন নিরীহ জনগণকে পুড়িয়ে মারা হয়েছে এটাকি ভাবা গিয়েছিল? দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর নাৎসী বাহিনীর উত্থান কোথাও কি দেখা গিয়েছে? তাহলে বাংলাদেশে রাজাকার-আলবদর তথা পাকিস্তানীমনারা আবার জেগে উঠবে-সেটা কি করে সম্ভব?

তবে সুখের কথা, বাংলাদেশের জনগণ সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্তই নিতে পারে। হরতাল শব্দটি হয়ত ইতিহাসের পাতায় হারিয়ে যাবে। হারিয়ে যাওয়াই উচিত। বাংলাদেশের জনগণকে এখন আর অতি সহজে বোকা বানানো যাবে না। সুতরাং বর্তমান সরকার দেশের উন্নয়নে কাজ করে যাবে আগামী নির্বাচন অবধি। তবে উন্নয়নের নামে অনুন্নয়নÑ সেটার দেখভাল বা আলোচনা-সমালোচনা কে করবে? সরকারের খারাপ কাজগুলো নিয়ে কারা সোচ্চার হবে? আমি বলতে চাই এর জন্য বিরোধী রাজনৈতিক দলের প্রয়োজন নেই। বিশুদ্ধ মিডিয়াই যথেষ্ট। বিশুদ্ধ মিডিয়াই সরকারকে সঠিক পথে চলতে সাহায্য করবে। নতুন নতুন আইডিয়া জেনারেট করবে। যেমন ধরুন, বেশ ক’বছর আগে বিশ্বজিৎকে ছাত্রলীগের ছেলেরা যে নৃশংসভাবে হত্যা করেছিল, মিডিয়ার ভূমিকার কারণেই সেই হত্যাকা-ের বিচার হয়েছে। ঠিক তেমনি ছোট্ট ছেলে রাজনকে পিটিয়ে মারার বিচারও মিডিয়ার কারণেই হয়েছে। আর অতিসম্প্রতি বাবুল নামক একজন চা বিক্রেতাকে পুড়িয়ে মারার অভিযোগ এসেছে পুলিশের ওপর। এর আগেও মিডিয়ার মতে একজন ব্যাংক কর্মচারীকে এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের একজন ইন্সপেক্টরকে পুলিশ পিটিয়েছে। এই যে নিরীহ সাধারণ মানুষকে সরকারী পুলিশ নির্যাতন করেছে বা করছে তার জন্য কথা বলবে কে? বিরোধী দল তো লাশের রাজনীতি করে। সুতরাং মিডিয়াই একমাত্র বন্ধু সাধারণ জনগণের জন্য।

বাংলাদেশের পুলিশ বাংলাদেশের জনগণেরই একটা অংশ। এক সময় বাংলাদেশের রাজনীতিকরা যেমন ধরাছোঁয়ার বাইরে ছিল, আর তখন পুলিশ বাহিনী তো আরও এক ডিগ্রী উপরে থাকত। রাজনীতিক অনেকেই কারাদ- ভোগ করেছে এবং করছে; কিন্তু পুলিশ বাহিনীর কোন সদস্যের কৃতকর্মের জন্য কারও কি কারাদ- বা মৃত্যুদ- হয়েছে? এমনকি বিচার হয়েছে? আইন নিয়ন্ত্রণকারীরা যখন আইন লঙ্ঘন করে তাদের শাস্তি তো আরও বেশি হওয়া উচিত। এর জন্য পেট্রোলবোমায় নিরীহ মানুষ পোড়ানো বিরোধী রাজনৈতিক দলের কথা শোনার দরকার নেই। মিডিয়াই তাদের আধুনিক টেকনোলজি দিয়ে, ইন্ভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম দিয়ে সত্যকে সামনে নিয়ে আসতে পারবে। তবে একটা কথা না বললেই নয়, এই সরকার মিডিয়ার ভাষ্যকে তুচ্ছার্থে ব্যবহার করছে না। তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতেও পিছপা হচ্ছে না এবং এ পর্যন্ত কোন ‘জজ মিয়া নাটক’ মঞ্চায়িত হয়নি। এমনকি মন্ত্রী, এমপিরাও ঘটনাগুলোকে ঝেরে ফেলে দিচ্ছেন না। কথাবার্তায় ভাষাগত পরিবর্তন আনছে।

এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না, মিডিয়াকে নিয়েই সরকারকে চলতে হবে। একটি উন্নয়নকামী দেশে বিশাল জনগোষ্ঠীতে অত্যাচার, অনাচার, মানুষে মানুষে হানাহানি থাকবেই। উন্নত দেশগুলোতেও প্রতিনিয়ত তা ঘটছে। কোন সরকারই তা রোধ করতে পারবে না। তবে দেখার বিষয়, যেহেতু কেউই আইনের উর্ধে নয়, সুতরাং সব ঘটনারই নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া দরকার এবং বিচারের সম্মুখীন হওয়াটাই বাঞ্ছনীয়। চা বিক্রেতা বাবুল মাতব্বরের ঘটনাটা মানুষ মাত্রকেই অশ্রুসিক্ত করেছে। একজন সাধারণ মেহনতি মানুষ সাধারণভাবে স্বাধীন দেশে বেঁচে থাকতে পারবে না এটাও ভাবা যায় না। বরং পুলিশ বাহিনীর সততার খবর মিডিয়াতে আসবে, আমি সে আশাই করছি।

লেখক : আমেরিকান প্রবাসী অধ্যাপক

ৎড়ুলরনবহ@ুধযড়ড়.পড়স