১৯ আগস্ট ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

পানিশূন্য পদ্মা

এককালের প্রমত্তা পদ্মার কথাটি কেবল মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কালজয়ী উপন্যাস ‘পদ্মা নদীর মাঝি’-তেই খুঁজে পাওয়া যাবে, বাস্তবে তার দেখা মিলবে নাÑ এমন আশঙ্কা বড় হয়ে উঠছে। পদ্মায় বড় বড় স্টিমার চলত একদিন এ কথা কি বিশ্বাস করবে আজকের প্রজন্ম! না করারই কথা। কারণ এখন শুষ্ক মৌসুমে পদ্মায় পার হয় গরুর গাড়ি। পদ্মাসহ বরেন্দ্র অঞ্চলের ওপর দিয়ে প্রবাহিত বারোটি নদী পানিশূন্য হওয়ার চিত্র উঠে এসেছে সম্প্রতি জনকণ্ঠের প্রতিবেদনে। পানিশূন্যতার কারণে সেচ কাজে বিপর্যয় দেখা দিয়েছে, মৎস্য সম্পদ প্রভূত ক্ষতির সম্মুখীন এবং পরিবেশের ওপর পড়ছে বিরূপ প্রভাব।

যৌথ নদী কমিশনের তথ্য অনুযায়ী- এবারের শুষ্ক মৌসুমের শুরুতেই জানুয়ারি মাসের প্রথম ১০ দিনে ইতিহাসের সবচেয়ে কম পানি প্রবাহ ছিল ফারাক্কা পয়েন্টে। এর আগে জানুয়ারি মাসে পানি এত কম প্রবাহ হয়নি। গত বছর জানুয়ারি মাসের প্রথম ১০ দিন ফারাক্কায় গঙ্গার গড় পানি প্রবাহ থেকে বাংলাদেশ পেয়েছিল ৫৯ হাজার কিউসেক। চলতি বছর সেই পানির প্রাপ্যতা কমে দাঁড়িয়েছে ৩২ হাজার ৫১৬ কিউসেক। ২০১৪ সালে এই সময়ে বাংলাদেশের পানির প্রাপ্যতা ছিল ৭০ হাজার ৮৫৩ কিউসেক। এভাবে চলতে থাকলে ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসে পানির প্রাপ্যতা আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রায় ২০টি জেলার ১২৩টি নদীর পানির উৎস গঙ্গা নদী। ২ হাজার ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ গঙ্গার ২৪০ কিলোমিটার বয়ে গেছে বাংলাদেশে। কলকাতা বন্দরের নাব্য রক্ষায় গঙ্গার অংশ হুগলি নদীতে পানি প্রবাহের জন্য ‘ফারাক্কা ব্যারেজ’ কাজ শেষ হয় ১৯৭৫ সালে। এর পর নানা আলোচনার পর ১৯৯৬ সালে গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি হয়।

পাশাপাশি আমাদের নদী সমস্যার ভিন্ন দিকেও দৃষ্টি দিতে হবে। নদীবহুল বাংলাদেশের অসংখ্য নদী দূষণের শিকার হয়ে বিপন্ন-বিপর্যস্ত; মানুষের অপরিণামদর্শিতার কারণে বহু নদী ধুঁকে ধুঁকে মরছে। বিশ্বের আর কোথাও এদেশের মতো এমন নদী হত্যার নজির নেই। বহির্বিশ্বে প্রকৃতির উপহার সংরক্ষণের জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা নেয়া হয়। নদীকে প্রাণবন্ত, দূষণমুক্ত রাখা এবং তার প্রবাহ অবাধ রাখার জন্য রীতিমতো আইন প্রণয়ন করা হয়। দেশের অনেক নদীর বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে জেগে উঠেছে অসংখ্য চর। ফসলি মাঠ আর ইটের ভাঁটিসহ নানা বাণিজ্যিক তৎপরতায় যেন রূপান্তরিত হয়ে গেছে এক সময়ের খরস্রোতা নদীগুলোর দেহ বাঁক।

এ কথা আমাদের বারবার উচ্চারণ করতে হবে যে, নদীকে বইতে দিতে হবে তার নিজস্ব ছন্দে। প্রকৃতির ওপর অত্যাচার চালানো হলে এক পর্যায়ে প্রকৃতি প্রতিশোধ নিতে বাধ্য হয়Ñ এমন উদাহরণ যথেষ্ট রয়েছে। তারপরও মানুষের স্বেচ্ছাচারী ব্যবসায়িক কর্মকা- থেমে নেই। প্রশাসনের পক্ষ থেকে নদী দখলকারীদের স্থাপনা ভেঙ্গে দেয়াসহ বিভিন্ন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়ে থাকে মাঝে-মধ্যে। তবে প্রয়োজনের তুলনায় তা অপ্রতুল। আমরা মনে করি দেশের মৃতপ্রায় নদনদীকে বাঁচানোর জন্য আশু পদক্ষেপ নিতে হবে। সুনির্দিষ্ট একটি নদী নয়, দেশের মরণাপন্ন সব নদীর অস্তিত্বের স্বার্থে সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে। কালবিলম্ব না করে নদী খনন করা দরকার। পদ্মায় পানির প্রবাহ বাড়ানোর জন্য চুক্তি অনুযায়ী ভারত থেকে পানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করার বিকল্প নেই। আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে এ সঙ্কটের সমাধান করা দরকার।

এই মাত্রা পাওয়া