২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

নেত্রকোনার স্কুলছাত্র আজিমকে দেয়া হয় রাসটিকেট

ভাষা আন্দোলন বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার দাবিতে সংগঠিত রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন। ১৯৫২ সালে এ আন্দোলন চূড়ান্ত পরিণতি লাভ করলেও এর সূত্রপাত ঘটে ’৪৭-এ পাকিস্তান নামক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর পরই। ঢাকা থেকে শুরু আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়ার সর্বত্র। এর বাইরে ছিল না নেত্রকোনা।

ঢাকায় গঠিত ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’-এর আহ্বানে ’৫২-এর ২১ ফেব্রুয়ারি নেত্রকোনাতেও ছাত্র ধর্মঘট পালিত হয়। আব্দুল খালেক, ফজলুর রহমান খান, গাজী মোস্তফা হোসেন, আব্দুল কদ্দুস, আব্দুল গনি, শাহ্ আব্দুল মোত্তালিব, গাজী মোশারফ হোসেন, শান্তি রায়, এম তাহের উদ্দিন, আব্দুল আলী, পেয়ারা মিয়া প্রমুখ ধর্মঘটের নেতৃত্ব দেন। তাদের নেতৃত্বে নেত্রকোনা কলেজ, চন্দ্রনাথ উচ্চ বিদ্যালয়, আঞ্জুমান উচ্চ বিদ্যালয়, নেত্রকোনা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও দত্ত উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ক্লাস বর্জন করে দত্ত উচ্চ বিদ্যালয়ে জমায়েত হয়ে ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ দাবিতে বিক্ষোভ করে। মিছিল শেষে ধর্মঘটীরা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি না দেয়া পর্যন্ত ক্লাসে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। ওই আন্দোলনে জোরালো সমর্থন দেন চন্দ্রনাথ উচ্চ বিদ্যালয়ের রেক্টর সুখরঞ্জন চক্রবর্তী ও দত্ত উচ্চ বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি। সন্ধ্যায় পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয় আঞ্জুমান উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র কিতাব আলী ও নেত্রকোনা কলেজের ছাত্র আব্দুল কদ্দুস। ওই দিনই ঢাকায় সালাম, বরকত, রফিক, শফিক, জব্বারদের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হওয়ার খবরে প্রতিক্রিয়া আরও তীব্র হয়। ২২ ফেব্রুয়ারি রাতে নেত্রকোনা কলেজের অধ্যাপক আমীরুল্লাহ বাহার চৌধুরীকে আহ্বায়ক ও অছিম উদ্দিনকে যুগ্ম আহ্বায়ক করে গঠন করা হয় সংগ্রাম কমিটি। কমিটির অন্য সদস্যদের মধ্যে ছিলেন ওয়াজেদ আলী, আব্দুল খালেক, সত্যকীরণ আদিত্য, কুমুদ রঞ্জন বিশ্বাস, নকূল চন্দ্র সিংহ, এম এ মজিদ, ফজলুর রহমান খান প্রমুখ। আমীরুল্লাহ বাহার চৌধুরী দায়িত্ব পালনে অপারগতা প্রকাশ করলে পরবর্তীতে অছিম উদ্দিনকে আহ্বায়ক এবং গাজী মোস্তফা হোসেনকে যুগ্ম আহ্বায়ক করে কমিটি পুনর্গঠন করা হয়। এ সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র কেএম ফজলুল কাদেরও তাদের সঙ্গে এসে আন্দোলনে যোগ দেন। শহরে প্রতিদিন চলতে থাকে মিছিল-মিটিং। ক্রমে তা ছড়িয়ে পড়ে আটপাড়া, মদন, কেন্দুয়া, বারহাট্টা, মোহনগঞ্জসহ অন্যান্য থানা সদরে। ২৫ ফেব্রুয়ারি আন্দোলনকারীরা তখনকার এমএলএ আহসান আলী মোক্তারকে চেম্বারে ঘেরাও করলে পুলিশ রুকন উদ্দিনকে গ্রেফতার করে। আন্দোলনকারী বেদানা পুলিশের লাঠিচার্জে গুরুতর আহত হন। পরবর্তীতে ফজলুর রহমান খান ও আব্দুল কুদ্দুসসহ আরও কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়। এ ছাড়া গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয় সত্যকিরণ আদিত্য, আমীরুল্লাহ বাহার চৌধুরী, শাহ আব্দুল মোত্তালিবসহ অনেকের নামে। ওই সময় নেজামে ইসলামের পক্ষ থেকে আন্দোলনের বিরোধিতা করে উর্দুর পক্ষে প্রচারপত্র বিলি করলে ছাত্র-জনতা আরও বিক্ষুব্ধ হয়ে পড়ে। তারা নেজামে ইসলামের কয়েক নেতাকে ধাওয়া করে। নেত্রকোনায় ভাষা আন্দোলনে আরও যারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত ছিলেনÑ তারা হলেন সত্যব্রত রায় চৌধুরী, মিহির মজুমদার, আল আজাদ, পুলিন বিহারী চৌধুরী, মোহিনী মোহন সেন, রমেশ ধর, আব্বাছ আলী খান, এনআই খান, রামশংকর সরকার, বাদশা মিয়া, সুধীর মোক্তার, বাবলু ধর, ডা. মৃণাল বিশ্বাস, আব্দুস শহীদ, ফুলে হুসেন, আজিম উদ্দিনসহ অনেকে। ভাষা আন্দোলনের উত্তাল দিনগুলোতে আরেকটি ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটে আঞ্জুমান উচ্চ বিদ্যালয়ে। ওই বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণীর ছাত্র আজিম উদ্দিন সভায় সরকারকে ব্যঙ্গ করে স্বরচিত কবিতা আবৃত্তি করলে সরকার ‘রাসটিকেট’ (জঁংঃরপধঃব) দিয়ে আজীবনের জন্য তার ছাত্রত্ব বাতিল করে। ৬২ বছর পর ২০১৫ সালে বিদ্যালয়টির শতবর্ষপূর্তি উৎসবে কর্তৃপক্ষ ওই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে তাকে সম্মাননা জানায়।

Ñসঞ্জয় সরকার, নেত্রকোনা থেকে