১৪ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

মায়াবী চায়ের কেটলি

  • কবীর চৌধুরী

অনেকদিন আগের কথা। এক বৃদ্ধ পুরোহিত ছিলেন, যিনি চা পান করতে খুব ভালবাসতেন। নিজের চা তিনি সর্বদা নিজে বানাতেন এবং চায়ের পেয়লা-চামচ-কেটলি ইত্যাদির ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন অতিশয় খুঁতখুঁতে। একদিন তিনি একটা পুরনো জিনিসপত্র বেচাকেনার দোকানে একটি ভারি সুন্দর লোহার কেটলি দেখতে পেলেন। চায়ের জল গরম করার জন্য ওই কেটলি ছিল খুবই উপযুক্ত। তবে কেটলিটা ছিল অত্যন্ত পুরনো এবং মরচে পড়া। পুরনো এই কেটলির আসল সৌন্দর্য কিন্তু বৃদ্ধ পুরোহিতের দৃষ্টি এড়ায়নি। তিনি বেশ কম দামে কেটলিটি কিনে সেটা তার মন্দিরে নিয়ে এলেন। তিনি সযতেœ ঘষেমেজে কেটলিটা উজ্জ্বল ঝকঝকে করে তুললেন। তারপর তার দুই শিষ্যকে কাছে ডেকে আনলেন। ওরা পুরোহিতের সঙ্গে এই মন্দিরেই বাস করত।

পুরোহিত শিষ্যদের লক্ষ্য করে বললেন, ‘দেখ, আজ অমি কী সুন্দর একটা কেটলি কিনে এনেছি। এখন আমি এই কেটলিতে ভাল করে জল ফুটিয়ে চমৎকার চা বানাব, তারপর তিনজনে মিলে ওই চা খাব।’

পুরোহিত একটা কাঠকয়লার উনুনের ওপর কেটলি বসিয়ে দিলেন। ওরা সবাই গোল হয়ে বসে জল ফুটবার জন্য অপেক্ষা করে। কেটলি ক্রমান্বয়ে গরম থেকে অধিকতর গরম হয়ে উঠতে থাকে। তারপর হঠাৎ একটা অদ্ভুত কা- ঘটে। কেটলির মুখ দিয়ে একটা ব্যাজারের মাথা বেরিয়ে আসে। ব্যাজার হলো ক্ষুদ্র ধূসর বর্ণের গর্তবাসী একটি জন্তুবিশেষ। কেটলির মুখে শুধু ব্যাজারের মাথায় নয়, সেখানে দেখা গেল ব্যাজারের চারটি ছোট হাত-পা এবং একটা ছোট ঝাঁকড়া লেজ।

কেটলির চিৎকার শোনা গেল ‘উহ! কী গরম। আমার সর্বাঙ্গ জ্বলে যাচ্ছে।’ তারপরই কেটলিটা লাফ দিয়ে উনুন থেকে বেরিয়ে এসে ব্যাজারে পরিণত হলো। ব্যাজার তার পা নিয়ে ঘরময় ছোটাছুটি করতে লাগল।

বৃদ্ধ পুরোহিত খুব অবাক হয়ে যান! কিন্তু তিনি তার সাধের কেটলি হারাতে রাজি নন। তিনি তার দুই শিষ্যকে লক্ষ্য করে বললেন, ‘এই, তোমরা তাড়াতাড়ি ওটাকে পাকড়াও করো। সাবধান, ওটা যেন কিছুতেই পালিয়ে যেতে না পারে।’

এক শিষ্য একটা ঝাঁটা হাতে তুলে নেয়, আরেকজন আগুন থেকে কয়লা তোলার একটা চিমটা। তারপর ওরা দু’জন কেটলির পেছন পেছন ছুটল। তারপর ওরা দু’জন ওটাকে যখন পাকড়াও করতে সক্ষম হলো তখন দেখ গেল ব্যাজারের মাথা, তার ঝাঁকড়া লেজ, তার ছোট ছোট দুটি পা আর দুটি হাত অদৃশ্য হয়ে গেছে। জিনিসটা আবার একটা সাধারণ কেটলিতে রূপান্তর হয়েছে।

বৃদ্ধ পুরোহিত বললেন, ‘এ তো বারি অদ্ভুত ব্যাপার! এটা নিশ্চয়ই কোন মায়াবী চায়ের কেটলি হবে। তো, আমরা আমাদের মন্দিরে এ রকম কোন জিনিস রাখতে চাই না। এটাকে বিদায় করতে হবে।’

ঠিক ওই সময় পুরনো জিনিসপত্রের বেচাকেনা করা এক ব্যবসায়ী মন্দিরের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। বৃদ্ধ পুরোহিত কেটলিটা তার কাছে নিয়ে গিয়ে বললেন, ‘দেখো, আমি আমার এই কেটলিটা বিক্রি করতে চাই। আমি কোন দরদস্তর করব না। তুমি খুশি হয়ে যে দাম দেবে আমি সেই দামেই তোমার কাছে এটা বেচে দেব।’

ব্যবসায়ী তার দাঁড়িপাল্লা বের করে কেটলিটা ওজন করল, তারপর নিতান্ত স্বল্পমূল্যে সে ওই কেটলি বৃদ্ধ পুরোহিতের কাছ থেকে কিনে নিল। সে খুশিমনে শিস দিতে দিতে নিজের বাড়ির পথ ধরল।

সেদিন রাতে ব্যবসায়ী এবং তার বাড়ির সবাই যখন ঘুমিয়ে তখন একটা বিচিত্র কণ্ঠস্বর শুনে ব্যবসায়ী গৃহকর্তার ঘুম ভেঙ্গে যায়। সে শুনতে পায় কে যেন তাকে ডাকছেÑ‘ও ভাই, শুনুন! শুনুন!’

সে চোখ খুলে দেখতে পায় যে, তার বালিশের পাশে একটা কেটলি দাঁড়িয়ে আছে। তার মাথা, হাত-পা ও লেজ একটা ব্যাজারের। ব্যবসায়ী বলল, ‘আরে! গতকাল বুড়ো পুরোহিতের কাছ থেকে আমি যে পুরনো কেটলিটা কিনেছিলাম তুমি সেটা না?’

কেটলি বলল, ‘হ্যাঁ স্যার,আমি সেটাই, তবে আমি সাধারণ কেটলি নই। আমি আসলে একটা ব্যাজার, ছদ্মবেশ ধরে আছি। আমার নাম বুমবুকু,যার অর্থ সৌভাগ্য। বৃদ্ধ পুরোহিত আমাকে উনুনে চাপিয়ে আমার সর্বাঙ্গ প্রায় পুড়িয়ে দেয়, তাই আমি ওর ওখান থেকে পালিয়ে এসেছি। আপনি যদি আমার সঙ্গে সহৃদয় আচরণ করেন, আমাকে ভাল করে খাওয়ান-দাওয়ান,আমাকে কখনও উনুনের ওপর না বসান, তাহলে আমি আপনার কাছে থাকব, আপনাকে সাহায্য করব, আপনাকে একজন খুব ধনী মানুষ বানিয়ে দেব।’

ব্যবসায়ী বলল, ‘এ তো বড় আশ্চর্য কথা! তো, তুমি কিভাবে আমাকে ধনী মানুষ বানাবে?’

কেটলি তার ঝাঁকড়া ব্যাজার পুচ্ছ দোলাতে দোলাতে বলল, ‘আমি নানা রকম খেলা দেখাতে পারি। আপনি একটা ক্রীড়া প্রদর্শনীর আয়োজন করুন। ঘোষণা দিন যে, দর্শকবৃন্দ অত্যাশ্চর্য কিছু খেলা দেখবেন, তবে তাদের টিকেট কেটে ক্রীড়াঙ্গনে ঢুকতে হবে।’

পুরনো জিনিসপত্রের ব্যবসায়ী ভাবল যে, প্রস্তাবটা মন্দ নয়। সে তার বাড়ির আঙ্গিনায় একটা প্রদর্শনীস্থল গড়ে তুলল। তারপর তার সামনে বড় বড় অক্ষরে লেখা একটা বিজ্ঞপ্তি ঝুলিয়ে দিলÑ ‘সৌভাগ্য বয়ে আনা মায়াবী চায়ের কেটলি বুমবুকুর বিস্ময়কর ক্রীড়া প্রদর্শন। দলে দলে দেখতে আসুন।’

মানুষ ভিড় করে বুমবুকুর খেলা দেখতে আসে। ক্রীড়াঙ্গনে জনতায় পূর্ণ হয়ে গেলে ব্যবসায়ী ভেতরে গিয়ে একটা বড় ঢোল বাজাতে শুরু করে, আর তখন বুমবুকু দৌড়ে বেরিয়ে আসে এবং বিচিত্র সব শারীরিক কসরত দেখায়। দর্শকবৃন্দ সব চাইতে উল্লসিত হয় যখন তারা বুমবুকুকে একহাতে একটা ছাতা আর অন্য হাতে একটা পাখা নিয়ে নাচের ভঙ্গিতে একটা টান টান দড়ির একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে যাওয়া-আসা করতে দেখে। সমস্ত ক্রীড়াঙ্গন করতালিতে মুখর হয়ে ওঠে। ক্রীড়া প্রদর্শনী শেষে ব্যবসায়ী বুকবুকুকে সুস্বাদু চালের পিঠা খেতে দেয়।

প্রদর্শনীতে এত বেশি টিকেট বিক্রি হয় যে, দেখতে দেখতে পুরনো জিনিসপত্রের ওই ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী একজন বিশাল ধনী ব্যক্তি হয়ে ওঠেন। তিনি একদিন বুমবুকুকে কাছে ডেকে বললেন, ‘দেখো, আমার মনে হয় দিনের পর দিন এসব খেলা দেখাতে দেখাতে তুমি ক্লান্ত হয়ে পড়েছ। আর আমার হাতে এখন অনেক টাকা-পয়সা জমেছে। এখন আমি যদি তোমাকে মন্দিরে ফিরিয়ে নিয়ে যাই তাহলে কেমন হয়? তুমি সেখানে বেশ শান্তিতে বাস করতে পারবে।’

বুমবুকু বলল, ‘সত্যি বলতে কি, আমিও এই খেলা দেখাতে দেখাতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। মন্দিরে চুপচাপ শান্তিতে থাকতে পারলে আমার ভালই লাগবে,কিন্তু ওই বুড়ো পুরোহিত যদি আমাকে আবার উনুনে চাপায়, তাহলে কি হবে? তাছাড়া উনি কি আমাকে আপনার মতো এত মজাদার চালের পিঠা খেতে দেবেন?

ব্যবসায়ী বললেন, ‘এসব নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না। যা করার আমি করব।’ পরদিন সকালে ব্যবসায়ী বুমবুকুকে নিয়ে মন্দিরে ফিরে গেলেন। তিনি বৃদ্ধ পুরোহিতকে সমস্ত ঘটনা সবিস্তারে বললেন। সব শেষে তিনি বললেন, ‘এবার আমার অনুরোধ, আপনি ওকে এই মন্দিরে শান্তিতে বাস করতে দিন, তাকে নিয়মিত সুস্বাদু চালের পিঠা খেতে দিন, আর কখনও তাকে উনুনের ওপর বসাবেন না, ঠিক আছে?’

বৃদ্ধ পুরোহিত তার সানন্দ সম্মতি জানিয়ে বললেন, ‘আমাদের এই মন্দিরে যত ধনরতœ সাজানো আছেÑ আমরা বুমবুকুকে তার মধ্যে একটা বিশেষ সম্মানীয় আসন দেব। বুমবুকু যথার্থই একটা গুণী মায়াবী কেটলি। আমি যদি ওর সম্পর্কে আগে সঠিকভাবে জানতাম, তাহলে কখনই ওকে উনুনের ওপর বসিয়ে কষ্ট দিতাম না।

বৃদ্ধ পুরোহিত তার দুই শিষ্যকে ডেকে এনে একটা সুন্দর কাঠের স্ট্যান্ড তৈরি করালেন, তারপর বুমবুকুকে তার ওপর সাদরে বসালেন, আর তার পাশে সাজিয়ে দিলেন কয়েকটা সুস্বাদু চালের পিঠা। মানুষ বলে যে, ওই মন্দিরে গেলে এখনও সেখানে বুমবুকুকে দেখা যাবে। সে প্রশান্ত চিত্তে বসে আছে, তার চারপাশে সাজানো রয়েছে বেশ কয়েকটা চালের পিঠা।

জাপানী রূপকথা অবলম্বনে

অলঙ্করণ : নাসিফ আহমেদ