২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ক্ষমতা ধরে রাখতেই দ্বন্দ্ব জাপায়, মন্ত্রীরা পদত্যাগে নারাজ

  • ভাঙ্গন ঠেকাতে কৌশলী এরশাদ

রাজন ভট্টাচার্য ॥ দলে তিনটি পক্ষ। তিন ধরনের মতামত। সবার মন রক্ষা করতে গিয়েই বেকায়দার দল প্রধান। কার মন রাখবেন তিনি? অর্থাৎ শ্যাম রাখি না কূল রাখি অবস্থা! শেষ পর্যন্ত সবার মন জয় করতে গিয়ে নিজেই অনেকটা বেকায়দায় আছেন জাপা চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদ। তবে নিজেকে নিরাপদ রাখতে সব চেষ্টাই চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। কিন্তু সব কিছুতেই ব্যর্থ হচ্ছেন। কোন অবস্থাতেই দলের মধ্যে বিভেদ দূর করতে পারছেন না এক সময়ের দোর্দ- প্রভাবশালী স্বৈরশাসক ও সেনাপ্রধান এরশাদ। ইতোমধ্যে মন্ত্রিপরিষদ ও নিজের বিশেষ দূত হিসেবে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছেন। দলকে টিকিয়ে রাখতে আরও কিছুদিন সময় নেবেন তিনি। সর্বশেষ ১৬ এপ্রিল দলের জাতীয় সম্মেলনে সবাইকে কাছে টানার মধ্য দিয়ে সঙ্কট নিরসনের দিকে যেতে চান সাবেক এই রাষ্ট্রপতি।

মূলত দশম জাতীয় সংসদকে কেন্দ্র করে দলের মধ্যে প্রকাশ্য বিভেদ সৃষ্টি হয়েছে, যা গেল দুই বছরের বেশি সময়েও নিরসন হয়নি। শেষ মুহূর্তে জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে সরে আসার ঘোষণার পর পরই রওশনের নেতৃত্বে নির্বাচন করে জাপা। ৪০টি আসন নিয়ে জাতীয় পার্টি এখন বিরোধী দলে। কথা আছে ক্ষমতা ছাড়ার পর রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে সুসময় পার করছে দলটি। সর্বশেষ গেল ১৯ জানুয়ারি রংপুরে এক সফরে গিয়ে ভাই জি এম কাদেরকে দলের কো-চেয়ারম্যান হিসেবে ঘোষণা করেন এরশাদ। পাশাপাশি ১৬ এপ্রিল দলের জাতীয় কাউন্সিলের জন্য জি এম কাদের কে আহ্বায়ক ও রুহুল আমিন হাওলাদারকে সদস্য সচিব করা হয়। এতে চটে যান রওশনপন্থীরা। বিরোধী দলের নেতার নেতৃত্বে দফায় দফায় বৈঠক হয়। এক পর্যায়ে মহাসচিব জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু রওশনকে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান করেন। এ কারণে ক্ষুব্ধ এরশাদ বাবলুকে মহাসচিবের পদ থেকে বাদ দিয়ে হাওলাদারকে এ পদে ফিরিয়ে আনেন। এরশাদের সিদ্ধান্ত দলের সংসদীয় দলের বৈঠকে নাকচ হয়। সর্বশেষ রবিবার রাতে সংসদীয় দলের সঙ্গে আরেক দফা বৈঠক করেন রওশন। ৪০ জন এমপির মধ্যে সেখানে ২৭ জন উপস্থিত ছিলেন। সংসদীয় দল এরশাদকে তিনটি শর্ত দেন। এর মধ্যে প্রধান শর্ত হলো জাপার প্রধান কো-চেয়ারম্যান করতে হবে রওশনকে। অন্যথায় তারা সোমবার দলের যৌথ সভায় যোগ দেবেন না।

২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটাম কর্ণপাত করেননি প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত এরশাদ। বৈঠক করেছেন রওশনপন্থীদের ছাড়াই। পাশাপাশি দলের সিদ্ধান্ত অমান্যকারীদের প্রতি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন তিনি। দেখিয়েছেন বহিষ্কারের ভয়। অর্থাৎ তবুও যদি সমাধান হয়!

দলের একাধিক সিনিয়র নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এরশাদ ছাড়া জাপায় এখন তিনটি ধারা। সবক’টি পক্ষই ক্ষমতা কেন্দ্রিক। তাই সংকটের সমাধান হচ্ছে না। দলের নেতারা বলছেন, রওশনের সঙ্গে আছেন জাপার চীফ হুইপ তাজুল ইসলাম চৌধুরী, কাজী ফিরোজ রশীদসহ কয়েকজন সংসদ সদস্য। তারা কোন অবস্থাতেই রওশনকে এরশাদের কাছে ঘেঁষতে দিচ্ছেন না। সেই সঙ্গে সরকারের সমর্থন ছাড়ারও পক্ষে নন তারা। রওশনের নেতৃত্বে আগামী সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে চাপ অনেক এমপির। অর্থাৎ ক্ষমতায় থাকা ও ক্ষমতার লোভই এখানে মোক্ষ। অপর পক্ষটি হলো জাপার প্রেসিডিয়াম সদস্য ও পানি সম্পদমন্ত্রী ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, প্রতিমন্ত্রী মশিউর রহমান রাঙা, মুজিবুল হক চুন্নু, জিয়াউদ্দিন বাবলু। তাদের বক্তব্য কোন অবস্থাতেই মন্ত্রিপরিষদ থেকে পদত্যাগ করা যাবে না। তাছাড়া সরকারের পক্ষ থেকে এরশাদকে চাপ সৃষ্টি করে নিজেদের কব্জায় রাখার দায়িত্ব তারা আগে থেকেই পালন করে আসছেন। অর্থাৎ দলের মন্ত্রীসহ কয়েকজন সংসদ সদস্যের কাছে অনেকটা জিম্মি রওশন। সেইসঙ্গে নিজের বিরোধী দলের নেতার লোভনীয় পদটিই বা কিভাবে ছাড়বেন তিনি! তাই এমপি ও মন্ত্রীদের কথা বলে তিনি এরশাদকে নানাভাবে ভয় ভীতি দেখিয়ে বশে আনার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

এছাড়া জি এম কাদের ও রুহুল আমিন হাওলাদারসহ আরেকটি পক্ষ চায় জাতীয় পার্টিকে শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যেতে। তাদের পর্যবেক্ষণ হলো, সারাদেশে দলের সংগঠন আছে। সাংগঠনিক অবস্থা জোরদার করতে পারলে ঘুরে দাঁড়াবে দল। তাছাড়া ভবিষ্যতে জাপাকে টিকিয়ে রাখতে হলে সংগঠন শক্তিশালী করারও বিকল্প নেই। তিন পক্ষের অবস্থান যখন অনেকটাই ভিন্ন ভিন্ন। এই প্রেক্ষাপটে কি চান এরশাদ? এ প্রশ্নই এখন সবার কাছে।

এরশাদের ঘনিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, নিরাপদে থাকতে চান তিনি। রাজনৈতিক জীবনের পড়ন্ত সময়ে খাল কেটে কুমির আনতে চান না তিনি। অর্থাৎ দ্রুত মন্ত্রিপরিষদ থেকে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত কিংবা প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূতের পদ থেকে পতদ্যাগ এর কোনটিই এখন নয়। কারণ এ রকম সিদ্ধান্ত নিলে চাঙ্গা হতে পারে তার বিরুদ্ধে চলমান একাধিক মামলা। যে কোন ইস্যুতে আবাবও জেলে যেতে হতে পারে তাকে। তিনি নিজেও একাধিকবার বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বলেছেন, জীবনের শেষ সময় নিরাপদে থাকতে চাই। জেল, জুলুম চাই না।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক প্রেসিডিয়াম সদস্য জানিয়েছেন, জাপাকে টিকিয়ে রাখতে হলে সাংগঠনিক অবস্থা জোরদার করার বিকল্প নেই। তাই তৃণমূলে রওশনের কোন গ্রহণযোগ্যতা নেই, যতটা আছে ভাই হিসেবে গোলাম মোহম্মদ কাদেরের। তাছাড়া মহাসচিব হিসেবে রুহুল আমিন হাওলাদারকে সব বয়সের নেতাকর্মীরা পছন্দ করেন। পার্টির ভবিষ্যতের কথা ভেবেই তাদের দু’জনকে দলের হাল ধরতে সামনে এনেছেন এরশাদ। তাছাড়া মন্ত্রিপরিষদে থেকেও দলকে চাঙ্গা করা যাবে না। নেতাকর্মীদের দীর্ঘদিনের দাবি মন্ত্রিপরিষদ থেকে বেরিয়ে এসে সত্যিকারের বিরোধী দলের ভূমিকা রাখার। কিন্তু স্ত্রীকে কিভাবে বোঝাবেন তিনি। এজন্য বহু কৌশল অবলম্বন করছেন চতুর এরশাদ। কিছুতেই বশে আসছেন না তিনি। যদিও এরশাদ বলেছেন, স্ত্রীর সঙ্গে কোন বিরোধ নেই। তিনি যে সিদ্ধান্ত নেবেন তাই রওশন মানবেন। সর্বশেষ উপজেলা নির্বাচনে একটি মাত্র আসনে জাপার প্রার্থী বিজয়ী হতে পেরেছেন। মেয়র নির্বাচনেও ৭০ জনের বেশি প্রার্থীর মধ্যে মেয়র হয়েছেন মাত্র একজন। জাপার ঘাঁটি হিসেবে পরিচিতি বৃহত্তর রংপুরেও দলের অবস্থা বেহাল। আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনেও প্রার্থী দিতে পারছে না দলটি। সবকিছু মিলিয়ে দল বাঁচিয়ে রাখার চিন্তা এরশাদের। বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে তার তিন মন্ত্রী ও নিজের স্ত্রীসহ সাংসদরা। অর্থাৎ আগামী নির্বাচনের আগে এরশাদের হয়ত আর করার কিছুই নেই। পরিস্থিতি বেগতিক হলে দলে আরেক দফা ভাঙ্গনের আশঙ্কাও করছেন অনেকে। এসব বিষয়ে দলের মহাসচিব ও মুখপাত্রও এ বি এম রুহুল আমিন হাওলাদার জনকণ্ঠ’কে বলেন, সময়ের প্রয়োজনে সবাই এক কাতারে আসবেন বলে আমি বিশ্বাস করি। তখন কোন বিরোধ থাকবে না। তাছাড়া জাতীয় পার্টিতে বিরোধ ছিল অনেক আগে থেকেই। এখন নতুন কিছু নয়। সবকিছু পাশ কাটিয়ে মানুষের ভালবাসা নিয়ে দল টিকে আছে। ভবিষ্যতেও থাকবে। জাতীয় সম্মেলনের মধ্যদিয়ে জাপা এক কাতারে আসবে এমন প্রত্যাশার কথা জানান তিনি।