১৭ জানুয়ারী ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

লালফিতার ফাঁস

লালফিতার ফাঁস
  • ঢাকা শহরের ভূমি কম্পিউটারাইজড করার কাজ কার্যত বন্ধ;###;সংসদীয় কমিটির সুপারিশ কাজে আসেনি, উপেক্ষিত হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশও

ফিরোজ মান্না ॥ ভূমি ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়নের প্রকল্পগুলো মুখথুবড়ে পড়েছে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আড়াই বছরের প্রকল্প চার বছরেও শেষ হয়নি। ঢাকা মহানগরের ভূমি কম্পিউটারাইজড করার জন্য হাতে নেয়া প্রকল্পের কাজ শুরু হয়ে আবার তা বন্ধ হয়ে গেছে। ভূমি ব্যবস্থাপনা কম্পিউটারাইজড হলে জমির মালিকরা লাভবান হবেন। তখন তাদের আর ভূমি অফিসে দৌড়াতে হবে না। নিজের জমির তথ্য নিজেই দেখতে পারবেন। এ কারণেই দেশের সাতটি সিটি কর্পোরেশনে ২৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে ভূমি ব্যবস্থাপনা কমপিউটারাইজড করার প্রকল্প হাতে নেয়া হয়। প্রকল্প দু’টি সফলভাবে বাস্তবায়ন করার পর পর্যায়ক্রমে সারা দেশেই ভূমি ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়ন ও কম্পিউটারাইজড করার প্রকল্প হাতে নেয়ার কথা ছিল। সূত্র জানিয়েছে, ঢাকা মহানগরের জমি কম্পিটারাইজড কাজ শুরু করা হয়েছিল চার বছর আগে। একই সঙ্গে দেশের সাত বিভাগের সাতটি সিটি করপোরেশনের জমিও কম্পিটারাইজড করার জন্য প্রকল্প হাতে নেয়া হয়। গত চার বছরে প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি তেমন একটা হয়নি। ভূমি মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, ভূমি বিষয়টি জটিল। এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে কিছুটা সময় বেশি লাগবে। তবে দুঃখের বিষয় হচ্ছে প্রকল্প বাস্তবায়নের সব কিছু চূড়ান্ত হলেও অদৃশ্য কারণে তা বাস্তবায়নে হচ্ছে না। আমলাতান্ত্রিক জটিলতার জালে আটকে গেছে ভূমি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির নানা সুপারিশ। উপেক্ষিত হচ্ছে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশও। ভূমি ব্যবস্থাপনা এবং আধুনিকায়নের দু’টি প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। আড়াই বছর মেয়াদের দু’টি প্রকল্পের অনুমোদন দিয়েছে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়। প্রকল্প দু’টি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হলে ভূমি বিরোধ এবং মানুষের ভোগান্তি অনেকাংশে কমে যাবে।

ভূমি বিশেষজ্ঞরা বলেন, কৃষিপ্রধান এই দেশে প্রতিদিন চাষযোগ্য জমি হারিয়ে যাচ্ছে। ভূমি হচ্ছে মৌলিক প্রাকৃতিক সম্পদ, যা মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী, শিল্পপণ্য, ভোগবিলাস, স্বাস্থ্য রক্ষার উপকরণ। এক কোটি ৪৪ লাখ হেক্টরের জমি নিয়ে বাংলাদেশের আয়তন। আর এই আয়তনের মধ্যে ১৬ কোটি মানুষের বসবাস। এখানে চাষযোগ্য জমি রয়েছে মাত্র ১৭ শতাংশ। মানুষ বাড়ার কারণে দিন দিন মাথাপিছু জমির পরিমাণ কমে যাচ্ছে। অর্থনৈতিক অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে নগরায়ণের প্রবণতা বাড়ছে। একই সঙ্গে শিল্পায়ন, রাস্তাঘাট, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং হাসপাতাল ক্রমাগত সম্প্রসারণ হচ্ছে। ফলে চাষের জমি কমতে কমতে এখন এক কোটি ৪৫ লাখ একরে এসে দাঁড়িয়েছে। অদূর ভবিষ্যতে ভূমির প্রাপ্যতা এবং চাষযোগ্য জমি হারিয়ে যাবে। তাই এখনই সময় ভূমির ব্যবহার যথাযথভাবে নিশ্চিত করা। আগামী প্রজন্মের জন্য চাষযোগ্য জমি না রেখে যেতে পারলে পরিস্থিতি ভয়াবহ অবস্থায় চলে যাবে।

সূত্রমতে, সরকার চার বছর আগে ভূমি ব্যবস্থাপনা ও ভূমি প্রশাসন আধুনিকায়নের কাজ হাতে নেয়। ভূমি ব্যবস্থাপনা নিয়ে সংসদীয় কমিটি বিভিন্ন সুপারিশও ছিল। কমিটি তাদের সুপারিশ দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য বারবার তাগিদও দিয়েছে। কিন্তু ভূমি মন্ত্রণালয় কমিটির তাগিদ সংশ্লিষ্টরা আমলেই নিচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। এ অবস্থায় গৃহীত প্রকল্প শেষ না হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এছাড়া দেশজুড়ে ভূমির শ্রেণীবিন্যাসকরণ বা ল্যান্ড-জোনিং পরিকল্পনাও পড়েছে অনিশ্চয়তার মধ্যে। কোন জমিকে কৃষি, কোন জমি জলাভূমি আর কোন জমি বাড়ি করার এটাই বিভক্ত করতে ভূমি মন্ত্রণালয় হিমশিম খাচ্ছে। চার বছর ধরে তারা এই কাজটিই শেষ করতে পারেনি। এমন কি খাস জমির পরিমাণ, শত্রু সম্পত্তি ও অর্পিত সম্পতির হিসাবও তাদের কাছে নেই।

ভূমি মন্ত্রণালয়ের এক যুগ্ম সচিব বলেন, ভূমি ব্যবস্থা আধুনিকায়ন না করতে পারলে সমাজে বিরোধ বাড়তেই থাকবে। আদালতে যে মামলা করা হচ্ছে তার অর্ধেকেরও বেশি জমিজমা নিয়ে। এই ব্যবস্থা আধুনিকায়ন হলে কার কতটুকু জমি সহজেই জানা যাবে। তখন আর কাউকে ভূমি অফিসের কারও দ¦ারস্থ হতে হবে না। নিজের জমির অবস্থা নিজেই বুঝে নিতে পারবেন।

মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, দীর্ঘদিনের নানা প্রক্রিয়া ও পদক্ষেপের ধারাবাহিকতায় সরকার দেশের ভূমি ব্যবস্থাপনা ও ভূমি প্রশাসন আধুনিকায়নের লক্ষ্যে বেশ কিছু নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে রেজিস্ট্রেশন অফিস ও সেটেলমেন্ট অফিসের সমন্বয়ে ওয়ানস্টপ সার্ভিস চালু, গতানুগতিক জরিপ ব্যবস্থার পরিবর্তে ‘কন্টিনিউয়াস আপডেটিং অব ম্যাপস এ্যান্ড রেকর্ডস’ পদ্ধতি প্রবর্তন, বিভিন্ন ধরনের জমির শ্রেণীবিন্যাসকরণ, সরকারী খাস ও বন বিভাগের জমি এবং নদী ও খাল চিহ্নিতকরণ, সীমানা বিরোধ ও ভূমিদস্যুতা প্রতিরোধে জনগণের প্রয়োজন মতো নির্ধারিত ফি’র বিনিময়ে জমির আইল-সীমানা পরিমাপের ব্যবস্থা চালুকরণ ইত্যাদি।

ভূমি মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, ভূমি ব্যবস্থা আধুনিকায়ন করা না হলে এসএ ও সিএস খতিয়ান নষ্ট হয়ে যাবে। আড়াই শ’ কোটি টাকা ব্যয়ে গৃহীত প্রকল্প পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় অনুমোদন দিয়েছে। কাজটি আড়াই বছরের মধ্যে শেষ করতে হবে। এই প্রকল্পের আওতায় সাতটি জেলার ৪৫ উপজেলার ২ লাখ মৌজা নক্সা এবং ১২ কোটি খতিয়ান সংরক্ষণ করা হবে। যে গতিতে কাজ চলছে তাতে প্রকল্পটি আদৌ বাস্তবায়ন সম্ভব হবে কিনা এ নিয়ে আশঙ্কা তৈরি হযেছে। অন্য প্রকল্পের আওতায় ৫৪ জেলায় মৌজা নক্সা, খতিয়ানসহ প্লট বাই প্লট তথ্য সংযোজন করা হবে। যাতে একজন ব্যক্তি ইউনিয়ন সেবা কেন্দ্র থেকেই তার জমির সব তথ্য জানতে পারেন। এই প্রকল্প বাস্তবায়ন কাজ শেষ হবে সরকারের ভিশন-২০২১। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে কয়েক হাজার কোটি টাকা ব্যয় হবে। ভূমি ব্যবস্থাপনা ও আধুনিকায়নের পরিকল্পনাগুলো সঠিকভাবে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে দেশের প্রতিটি উপজেলায় স্বতন্ত্র ও স্থায়ী সেটেলমেন্ট অফিস স্থাপনের প্রস্তাব করা হয়। এসব অফিসের জন্য সব মিলিয়ে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার স্থায়ী জনবল এবং সাড়ে ১৭ হাজার মৌসুমী কর্মচারী নিয়োগ করার সুপারিশও ছিল। এরমধ্যে প্রতিটি উপজেলা সেটেলমেন্ট অফিসে ৩৯ এবং জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসগুলোতে ৬ জন করে অতিরিক্ত লোকবল নিয়োগ দেয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট সব পর্যায় থেকে চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়া হয়েছে। কিন্তু ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ না নেয়ার ফলে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন পুরোপুরিই থমকে আছে।

মন্ত্রণালয় সূত্রমতে, জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসগুলোতে বর্তমানে ৩ জন করে সেটেলমেন্ট অফিসার (প্রশাসন ক্যাডারের উপ-সচিব) রয়েছেন। কিন্তু এসব অফিসের কাজে অধিকতর গতিশীলতা সৃষ্টির লক্ষ্যে আরও ৬ জন করে সেটেলমেন্ট অফিসার এবং ৯ জন করে চার্জ অফিসার (সিনিয়র সহকারী সচিব) ডেপুটেশনে নিয়োগের জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়ে অনুরোধ জানিয়েছিল। কিন্তু এই ক্ষেত্রেও কোন অগ্রগতি নেই। এছাড়া জরিপ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও গতিশীলতা আনার লক্ষ্যে সেটেলমেন্ট বিভাগের দ্বিতীয় শ্রেণীর কর্মকর্তাদের বদলিও পদায়নের ক্ষমতা ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদফতরের মহাপরিচালকের হাতে অর্পণ এবং নতুন কাঠামোয় সহকারী সেটেলমেন্ট অফিসারের সংকট থাকায় কাজের স্বার্থে আপাতত জ্যেষ্ঠ উপ-সহকারী সেটেলমেন্ট অফিসারদের সাময়িকভাবে সহকারী সেটেলমেন্ট অফিসারের চলতি দায়িত্ব প্রদানের জন্য সুপারিশ করা হয়।

ভূমি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির এক সদস্য বলেন, ভূমি ব্যবস্থাপনা ও ভূমি প্রশাসনের কাক্সিক্ষত আধুনিকায়ন সম্ভব হলে দেশে সামাজিক সংঘাত-সহিংসতা বহুলাংশে হ্রাসে পাবে। তাৎপর্যপূর্ণভাবে কমে যাবে খুনোখুনী এবং মামলা-মোকদ্দমার ঘটনাও। এ জন্যই বর্তমান সরকার বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেছে। প্রধানমন্ত্রী নিজেও এসব পরিকল্পনা অনুমোদন করেছেন। কিন্তু এখনও পর্যন্ত এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নে মন্ত্রণালয়ের কোন আগ্রহ নেই। বার বার তাগিদ দিয়েও প্রকল্পে অগ্রগতি আনা যাচ্ছে না।