২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ঋতুরাজ বসন্তের আবাহন সকাল থেকে সন্ধ্যা-

ঋতুরাজ বসন্তের আবাহন সকাল থেকে সন্ধ্যা-

মনোয়ার হোসেন ॥ ঐশ্বর্যময় ষড়ঋতুর বাংলায় পুনরায় ঘটল প্রকৃতির পালাবদল। নবঋতুর ঝলমলে রোদের ডানায় ভর করে বিদায় নিল শীতের কাতরতা। উষ্ণতার পরশে চঞ্চল হলো হৃদয়। রূপ লাবণ্যের জোয়ারে নতুন করে সেজেছে নিসর্গ। বৃক্ষরাজির নবীন পত্রপল্লবের পাশে ঝরা পাতার দৃশ্য জানিয়ে দিল বসন্ত এসেছে। বৃক্ষরাজি পত্র-পুষ্প ফিরে পেয়েছে তার নবসজ্জা। শিমুল, পলাশ, জবা, পারুলেরা যেন ধারণ করেছে গানের সুর। কোথাও বা শোনা গেছে কোকিলের কুহুতান। দৃশ্যপটের পরিবর্তনে এভাবেই এলো বাংলা মাস ফাল্গুন, প্রকৃতিতে ছড়ালো রূপের আগুন। শনিবার ছিল ঋতুরাজ বসন্তের প্রথম দিন পয়লা ফাগুন। যদিও কংক্রিটের শহর ঢাকার নির্দিষ্ট কিছু এলাকার বাইরে সহজেই চোখে পড়ে না প্রকৃতির সবটুকু রূপ। তাই বলে থমকে যায়নি বসন্তের আগমনী আনন্দ বার্তা। নাগরিক প্রাণে কবিগুরুর আশ্রয়ে ঠিকই গুঞ্জরিত হয়েছে- মধুর বসন্ত এসেছে মধুর মিলন ঘটাতে/মধুর মলয় সমীরে মিলন রটাতে/কুহকলেখনী ছুটায়ে কুসুম তুলিছে ফুটায়ে/লিখিছে প্রণয়কাহিনী বিবিধ বরণছটাতে/ হেরো পুরনো প্রাচীন ধরণী হয়েছে শ্যামল বরণী/যেন যৌবনপ্রবাহ ছুটেছে কালের শাসন টুটাতে/ পুরনো বিরহ হানিছে, নবীন মিলন আনিছে/নবীন বসন্ত আইল নবীন জীবন ফুটাতে। এভাবেই প্রকৃতির বদলে যাওয়ার সুরে এই শহরে বিরাজ করেছে নাগরিকের মন উতলা হওয়া স্নিগ্ধতা। সেই মনটি নিজের অজান্তেই গেয়েছে ‘ওরে ভাই ফাগুন এসেছে বনে বনে’ কিংবা ‘আজি দখিন দুয়ার খোলা/এসো হে এসো হে এসো আমার বসন্ত।’ শুধু বনে নয়, মানুষের মনেও লেগেছিল ফাগুনের ছোঁয়া। রূপময় এ ঋতু বরণের সুবিধামতো সময়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছে রাজধানীবাসী। পোশাক ও মননে ছিল বসন্ত বরণের নয়নজুড়ানো দৃশ্য। বাসন্তী কিংবা হলুদ রঙের শাড়ির সঙ্গে খোঁপায় প্যাঁচানো গাঁদা ফুলের বন্ধনী অথবা মাথায় ফুলের টায়রা পরে ঘুরে বেড়িয়েছে নারীকুল। বাহারি রঙের পাঞ্জাবি বা ফতুয়া জড়িয়েছে পুরুষের শরীরে। শিশুদের পোশাকেও ছিল রঙের সমাহার। সব মিলিয়ে মন ও প্রাণের মমতায় উচ্চারিত হয়েছে বসন্তের জয়গান। আপন সংস্কৃতি ও শিকড়ের আবাহন। সেই শেকড়ের টানে বসন্তের উন্মাতাল বাতাস গায়ে মেখে রাজপথে নেমেছে শহরবাসী। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত নগরের বিভিন্ন প্রান্তে ছিল বসন্ত বন্দনার বহুমুখী আয়োজন। সংস্কৃতিপ্রেমীরা সে সব আয়োজনে শামিল হয়ে প্রকাশ ঘটিয়েছেন প্রাণপ্রাচুর্যের। মাতোয়ারা হয়েছেন বসন্ত বরণের অনাবিল আনন্দে। বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-সংলগ্ন এলাকাজুড়েই উদ্্যাপনের মাত্রাটা ছিল চোখে পড়ার মতো। সবচেয়ে আকর্ষণীয় আয়োজনটি বসেছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের বকুলতলায়। এই মঞ্চসহ রাজধানীর চারটি মঞ্চে বসন্ত আবাহনের অনন্য আয়োজনটি করে জাতীয় বসন্ত উৎসব উদ্যাপন পরিষদ। সকাল থেকে রাত অবধি নাচ-গান ও কবিতায় মুখরিত ছিল শিল্পাচার্য জয়নুলের স্মৃতিধন্য এ আঙ্গিনা। এর বাইরে বসন্তের ছোঁয়া লেগেছিল বাংলা একাডেমি ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের একুশের বইমেলায়। বসন্তের আনন্দ আবাহনের পাশাপাশি নতুন বইটি সংগ্রহের তাগিদে অনেকেই গিয়েছেন একুশে গ্রন্থমেলায়। বেড়েছে মেলার ঔজ্জ্বল্য। এর বাইরেও ঢাকাবাসীর অনেকেই কোন আয়োজনে না গিয়েও বসন্তের উদাসী হাওয়া গায়ে মেখে ঘুরে বেড়িয়েছেন আপন খেয়ালে।

ভোরের অলসতা কাটিয়ে রোদ ঝলমলে সকালের আলো তখন ছড়িয়ে পড়েছে বকুলতলায়। সবুজ পাতার ফাঁক গলে মিষ্টি রোদের কিরণে উদ্ভাসিত মঞ্চ। ভেসে এলো সারেঙ্গীর মোহময় সুর। যন্ত্রশিল্পী মতিয়ার রহমান রাগ বসন্ত বাহারের সুরেলা শব্দধ্বনিতে ঋতুরাজকে বরণকারীদের মনে ছড়িয়ে দিলেন ভাললাগার অনুরণন। এরপর মঞ্চে আসেন সুস্মিতা দেবনাথ। ধ্রুপদী সঙ্গীতের আশ্রয়ে জানান বসন্ত-বন্দনা। ভরতনাট্যমের নৃত্যশৈলীতে বসন্ত আবাহন করেন পূজা সেনগুপ্ত। এরপর মাদলের বোল বাজিয়ে নৃত্যতালে সাঁওতাল সম্প্রদায়ের শিল্পীরা মেলে ধরে ঋতুরাজের রূপময়তা। নেপথ্যে বেজেছে ‘দ্বার খোলো দ্বার খোলো ওরে গৃহবাসী’ গানটি। নাচ শেষে ফাগুনের রংমাখা প্রাণস্পন্দন জাগানিয়া গান নিয়ে মঞ্চে আসে সুরের ধারার শিল্পীরা। অনেকগুলো কণ্ঠ এক সুরে গেয়ে যায়Ñ ফাগুন, হাওয়ায় হাওয়ায় করেছি যে দান/তোমার হাওয়ায় হাওয়ায় করেছি যে দান/আমার আপনহারা প্রাণ আমার বাঁধন-ছেঁড়া প্রাণ...। ততক্ষণে যেন আয়োজনের সঙ্গে সমর্পিত হয়েছে বসন্ত বরণকারী দর্শকরা। গানের পর বুলবুল ললিতকলার একাডেমির শিল্পীরা নাচের অভিব্যক্তিতে প্রকাশ করেন রূপরঙা ফাল্গুনের দৃশ্যকল্প। ওরে ভাই ফাগুন লেগেছে বনে বনে/ডালে ডালে ফুলে ফুলে পাতায় পাতায় রে/আড়ালে আড়ালে কোণে কোণে... গানের সুরে নাচ করা শিল্পীর মঞ্চে ছড়িয়ে দেন ফুলের পাপড়ি।

বসন্ত উদ্্যাপনের সঙ্গে মিশে আছে সঙ্গীতজ্ঞ ওয়াহিদুল হকের নামটি। সেই সূত্রে তাঁর প্রকৃতিবিষয়ক রচনাকে পরিবেশনায় বেছে নেন আবৃত্তিশিল্পী নায়লা তারান্নুম চৌধুরী কাকলী। তার ভরাট কণ্ঠে উচ্চারিত হয়Ñ প্রকৃতি বিষয়ে অবচেতন মানুষ না জেনে প্রচুর ক্ষতি করে পরিবেশের। অর্থাৎ মানুষের বাঁচার ব্যবস্থার। অথচ প্রকৃতিমনস্কতাই হচ্ছে আনন্দের। মানুষ কেন আনন্দপন্থী হয় না? এই অজ্ঞতা থেকে ব্যক্তি বাধাগ্রস্ত হয়, সমাজ ঢাকে অসুস্থতায়। প্রকৃতি অবচেতন মানুষ সমাজের বোমা, কেবল প্রকৃতির শত্রু নয়, সমাজের শত্রু। প্রকৃতিবান্ধব হওয়া ছাড়া মানুষের কোন উপায় নেই। প্রকৃতির সম্মিলনের এই উৎসবে মানুষ কি করবে? সেও সাজবে, তবে মনের ভেতরেই তার প্রকৃত সজ্জা।

পাঠ শেষে পুরনায় নাচ-গান-কবিতার সম্মিলনে ফিরে যায় আয়োজন। জোসেফ কমল রড্রিক্স গেয়ে শোনান ‘মম মায়াময় স্বপনে কার বাঁশি বাজে গোপনে।’ নাচের মুদ্রায় নবীন বসন্তকে বরণ করে নটরাজের শিল্পীবৃন্দ। নীল দিগন্তে ওই ফুলের আগুন লাগল/বসন্তে সৌরভের শিখা জাগল গানের সুর ধরে পরিবেশিত হয় মনমাতানো নাচ। ঋতুরাজের বন্দনায় সালমা আকবরের কণ্ঠে গীত হয় ‘এ কি লাবণ্যে পূর্ণ প্রাণ এসো হে।’ সুরেলা অনুরণ শেষ হতেই কবিতার দোলায়িত ছন্দকে সঙ্গী করে মঞ্চে আসেন বাকশিল্পী ভাস্বর বন্দোপাধ্যায়। পাঠ করেন রবিঠাকুরের ‘বসন্ত’ কবিতাটি। বসন্ত বন্দনায় নজরুলের বাসন্তী কবিতাকে বেছে নেন বাকশিল্পী আহ্্কাম উল্লাহ্। ‘আজি দখিন দুয়ার খোলা‘ গানে সুরে নাচ করে নৃত্য সংগঠন ভাবনা। সম্মেলক কণ্ঠে ‘জীবন নদী বয়ে চলে নতুন দিনের সুরে’ গানটি পরিবেশন করে সত্যেন সেন শিল্পীগোষ্ঠী। স্পন্দনের নাচের উপস্থাপনায় উঠে আসে বাউলসাধক শাহ আবদুল করিমের অনন্য সেই গানটি ‘বসন্ত বাতাসে সই গো/বন্ধুর বাড়ির ফুলের গন্ধ আমার বাড়ি আসে।’ তুমি কি দখিনা পবন দুলে ওঠে দেহলতা ফুলে ফুলে ফুল্ল হয়ে ওঠে মন গানের সুরে নাচ করে নৃত্যালোক। রাঙিয়ে দিয়ে যাও গানের তালে নাচ করে কাদামাটি নামের সংগঠন। বিদ্যার দেবী সরস্বতীর বন্দনায় মোহনীয় প্রকাশে গৌড়ীয় নৃত্য পরিবেশন করেন প্রিয়াঙ্কা র‌্যাচেল। এ ছাড়া সকালের অধিবেশনে সমবেত নৃত্য করে নৃত্যম, ভাবনা, ধৃতি, স্পন্দন, নৃত্যাক্ষসহ বিভিন্ন সংগঠনের শিল্পীরা। দলীয় সঙ্গীত পরিবেশন করে সুর সপ্তক, গীতাঞ্জলী ও নিবেদনের শিল্পীবৃন্দ। নজরুলসঙ্গীত পরিবেশন করেন পশ্চিমবঙ্গের শিল্পী সুশান্ত সরকার। এছাড়া শ্রোতাকে সুরের আলোয় সিক্ত করে একক কণ্ঠে বসন্তের গান শোনান বুলবুল ইসলাম, বিজন চন্দ্র মিস্ত্রী, লাইসা আহমদ লিসা, ইন্দ্রানী কর্মকার প্রমুখ। কবিতার দোলায়িত ছন্দে একক আবৃত্তি করেন রূপা চক্রবর্তী ও জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়। এভাবেই সকালের লম্বা সাংস্কৃতিক পরিবেশনায় ছিল বসন্ত নিয়ে নানা ধাঁচের গান, কবিতা ও নৃত্যের উপস্থাপনা।

নানা পরিবেশনার সঙ্গে ছিল সংক্ষিপ্ত কথন। পরিষতের সভাপতি কাজল দেবনাথের সভাপতিত্বে এতে অংশ নেন পরিষতের সহ-সভাপতি স্থপতি সফিউদ্দিন আহমেদ, সহ-সাধারণ সম্পাদক মানজার চৌধুরী সুইট, কলকাতা থেকে আগত শিল্পী সুশান্ত সরকার।

বসন্ত কথনে আলোচকরা বলেন, এদেশের অসাম্প্রদায়িক ও সম্প্রীতির চিত্রটি তুলে ধরাই এ উৎসবের মূল লক্ষ্য। বাঙালীর শেকড়সন্ধানী এমন উৎসব জাতিকে অসাম্প্রদায়িক ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ করে। এবারের উৎসবে যেভাবে অসংখ্য মানুষের সম্পৃক্ত ঘটেছে তা থেকে বোঝা যায় আমরা পূর্বপুরুষের ঐতিহ্য ভুলিনি। বক্তারা আরও বলেন, ফাল্গুন মাস হচ্ছে ভাষার মাস, এ মাস প্রতিরোধের মাস, এ মাস লড়াই-সংগ্রামের। এ মাসেই বাঙালীর ভাষাসত্তার প্রবল বোধ থেকে জাতিসত্তা গঠনের দিকে পা বাড়ায়। এ জাতিসত্তাই আমাদের পৌঁছে দেয় মহান মুক্তিযুদ্ধের একাত্তরে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয়ে।

বসন্ত আবাহনের এ আয়োজনে অতিথিদের ফুলের প্রীতি বন্ধনী পরিয়ে দেয় নির্মল মন ও প্রাণের শিশুরা। এরপর কিছুক্ষণের জন্য চলে গানের সুরে সুরের আবির মাখিয়ে দেয়ার পর্ব। একে অন্যের কপালে ও গালে নানা রঙের আবির দিয়ে উৎসবটিকে যেন আরও রাঙিয়ে দন। সব শেষে বের করা হয় বর্ণাঢ্য বসন্ত শোভাযাত্রা। চারুকলা অনুষদ থেকে বেরিয়ে টিএসসি ঘুরে পুনরায় মঞ্চের কাছে এসে শেষ হয় শোভাযাত্রাটি।

বকুলতলায় বিকেলের পর্বেও বসন্ত উদযাপনে ব্যাপক জনসমাগম ঘটে। ছাড়া বিকেলে রবীন্দ্র সরোবর মঞ্চেও ছিল বসন্ত উৎসবের আয়োজন। এতে দলীয় সঙ্গীত পরিবেশন করে পঞ্চ ভাস্কর, ওস্তাদ মোমতাজ আলী খান একাডেমি, স্বভূমি লেখক শিল্পী কেন্দসহ বিভিন্ন সংগঠন। দলীয় নৃত্য পরিবেশন করে নৃত্যজন, সুর বিহার, আনন্দ ধারা, ধৃতি নর্তনালয়সহ বিভিন্ন সংগঠনের শিল্পী। একক কণ্ঠে গান শেনান আরিফ রহমান, মহাদেব ঘোষ, অনিমা রায়, সঞ্জয় কবিরাজ, মামুন মাহিদ খান। একক আবৃত্তি পরিবেশন করে মাসকুর-এ-সাত্তার কল্লোল, রফিকুল ইসলামসহ প্রমুখ।

এছাড়া একই সময়ে পুরনো ঢাকার বাহাদুর শাহ পার্কেও ছড়িয়ে পড়ে বসন্ত উৎসবের রং। বসন্ত কথনের সঙ্গে দলীয় সঙ্গীত, একক সঙ্গীত দলীয় আবৃত্তি ও সমবেত নৃত্য। আধুনিক ঢাকার ও উত্তরার ৭ নম্বর পার্ক মাঠেও অনুষ্ঠিত হয় নানা পরিবেশনায় বসন্ত উৎসব।

এদিকে গত কয়েক বছর ধরেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবন প্রাঙ্গণকে কেন্দ্র করে ফাল্গুনের প্রথম দিনটিতে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘সমগীত’। কলাভবনের সম্মুখের বটতলায় তাদের আয়োজনে ছিল দেশীয় নাচ, গান পরিবেশনা।