১৫ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

পছন্দের বইয়ের সঙ্গে বসন্ত, উৎসবে মাতোয়ারা...

পছন্দের বইয়ের সঙ্গে বসন্ত, উৎসবে মাতোয়ারা...

মোরসালিন মিজান ॥ ফাল্গুনের প্রথম দিন। গোটা রাজধানী সেজেছিল বাসন্তী রঙে। রঙের এই উৎসব যথারীতি ছুঁয়ে দিয়ে যায় অমর একুশে গ্রন্থমেলাকে। ১৩তম দিবসে শনিবার মেলা শুধু বইয়ের ছিল না। বসন্তের হয়ে উঠেছিল। বই আর বসন্ত মিলে অন্যরকম দিন। দারুণ কেটেছে সবার। উপচেপরা ভিড়ের মধ্যেই বই দেখেছেন পাঠক। বিক্রিও ছিল খুব ভাল।

নানা কারণেই ফাগুন দিনের জন্য অপেক্ষা করে থাকে মেলা। বাড়তি প্রস্তুতি নেন প্রকাশকরা। পাঠকও হাতে সময় নিয়ে আসেন। একই দৃশ্য দেখা গেল শনিবার। সকাল ১১টায় খুলে দেয়া হয় সব প্রবেশ দ্বার। চারুকলার বকুলতলায় সকাল বেলা কাটিয়ে অধিকাংশ মানুষ পথ ধরেন বইমেলার। বাকিরা সরাসরি মেলায় আসেন। আসেন, মানে আসতেই থাকেন কেবল। দেখেতে দেখতে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ভরে ওঠে। উদ্যানের বুক চিরে যে ইট বিছানো পথ সেটি অনেক প্রশস্ত। তাতেও কাজ হয় না। নিচ দিয়ে হেঁটে যেতে দেখা যায় বহু মানুষকে। বিভিন্ন দলে ভাগ হয়ে ছুটছিলেন বইপ্রেমীরা। প্রায় সকলের গায়ে বাসন্তী রং পোশাক। একটু বড় মেয়েরা, তরুণীরা শাড়ি পরেছিলেন। মাথায় ফুলেল সাজ। কাউকে আলাদা করে চেনা মুশকিল হয়ে পড়েছিল। তরুণরা এদিন পাঞ্জাবি পরে মেলায় আসেন। তাঁদের পোশাকেও বসন্ত। বন্ধুরা মিলে মেলা ঘুরে বেড়িয়েছেন। ঘন ঘন চোখে পড়েছে যুগল। ছোট ছোট কথা, উচ্ছ্বাস আর হুল্লোড়ের মধ্যে অনেক সময় কেটে যায় বটে। বইয়ের স্টলের সামনেও ছিল কাড়াকাড়ি অবস্থা!

এদিন সাহিত্যের জনপ্রিয় ধারার জয়জয়কার অবস্থা দৃশ্যমান হয়েছে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে হুমায়ূন আহমেদের বইয়ের বড় সংগ্রহ। জনপ্রিয় লেখকের শেষ জীবনের সব উপন্যাস অন্য প্রকাশের প্যাভিলিয়নে। এর চারপাশ খোলা। এর পরও কাছে যাওয়া যাচ্ছিল না। দুই মিনিট কথা বলার সময় পাচ্ছিলেন না স্টলের কোন কর্মী। পাঠক বইটির নাম মুখে বলছিলেন শুধু। অমনি প্যাকেট হয়ে যাচ্ছিল। সময় প্রকাশনের প্যাভিলিয়নের সামনে গিয়েও দেখা গেল অভিন্ন দৃশ্য। জীবিত লেখকদের মধ্যে মুহম্মদ জাফর ইকবাল শীর্ষে। তাঁর নতুন সাইন্স ফিকশন এসেছে তাম্রলিপি থেকে। এই স্টলটিতে পোকার মতো পাঠক! কাকলীর প্যাভিলিয়নেও জনপ্রিয় লেখকদের ছবি টানানো। পাঠক ভিড় করেন সেখানেও। অন্যান্য স্টলেও বিক্রি হতে দেখা যায় সুমন্ত ইসলাম, ইমদাদুল হক মিলনের মতো জনপ্রিয় লেখকদের বই। লেখক ও প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের নাম দেখে স্টলের সামনে দাঁড়াচ্ছিলেন পাঠক।

অনেকক্ষণ অপেক্ষা শেষে কথা বলার সুযোগ হয় সুস্মিতা শারমিন নামের এক তরুণীর সঙ্গে। একটি দলের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন তিনি। বললেন, বান্ধবীরা মিলে এসেছি। মেলায় ঢুকতে খুব কষ্ট হয়েছে। তবু, এসেছি। আর এসেছি যেহেতু, বই না কিনে যাব কেন? হাত ভর্তি হুমায়ূন দেখিয়ে তিনি বলেন, এই লেখকের বই এক নিশ্বাসে পড়ে ফেলতে পারি। আমি কঠিন বই পড়ি না!

এদিন, জনপ্রিয় উপন্যাসের পাশাপাশি কবিতার বই ভাল বিক্রি হয়েছে। হেলাল হাফিজ, নির্মলেন্দু গুণ, সৈয়দ শামসুল হক, হুমায়ুন আজাদ, মহাদেব সাহা, শহীদ কাদরীর মতো কবিদের নতুন পুরনো কাব্যগ্রন্থ ও সংকলন সংগ্রহ করতে দেখা গেছে অনেককে। কবিতাপ্রেমী পাঠক তাহলে আছে? জানতে চাইলে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আরিফুল বললেন, কবিতার আলাদা সৌন্দর্য। আমি যা বলতে চাই, সবই কোন না কোন কবি কবিতায় বলে রেখেছেন। এবং খুবই সুন্দর ভাব ও ভাষায়। এ কারণেই কবিতার বই কিনতে আসা। মহাদেব সাহার নির্বাচিত কবিতার সংকলন ঘাটতে ঘাটতেই ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে যান এই কবিতাপ্রেমী।

গ্রাফিক নভেল ‘মুজিব’র দ্বিতীয় খ- ॥ গ্রাফিক নভেল সিরিজ ‘মুজিব’র দ্বিতীয় খ- এসেছে মেলায়। প্রকাশ করেছে গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর রিসার্চ এ্যান্ড ইনফরমেশন (সিআরআই)। শনিবার সকালে বাংলা একাডেমি চত্বরে নভেলটির আনুষ্ঠানিক মোড়ক উন্মোচন করা হয়। মূল উদ্যোগটি বঙ্গবন্ধুর দৌহিত্র ও সিআরআই ট্রাস্টি রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিকের। মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন তিনি। তাঁকে উৎসাহ যোগাতে আসেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর, বিদ্যুতও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক প্রমুখ।

অনুষ্ঠানে নভেল সিরিজের প্রকাশক রাদওয়ান মুজিব বলেন, আজ আমি আমার নানাকে নিয়ে প্রকাশিত গ্রাফিক নভেল নিয়ে আপনাদের কাছে এসেছি। এদিনটা কী যে আনন্দের! আমি জীবনেও ভুলব না। আমরা চাই, আমাদের নতুন প্রজন্ম এটা পড়ে ওনার গল্পটা জানুক। বঙ্গবন্ধুর জীবনকে ‘সাধারণ ছেলের অসাধারণ গল্প’ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই গল্পটা সকল কিশোরের কাছে নিয়ে যেতে চাই আমরা। জানাতে চাই, বঙ্গবন্ধু কীভাবে বেড়ে উঠলেন, কী ছিল তাঁর অবদান নভেলের মাধ্যমে জানাতে চাই। ব্যতিক্রমী উদ্যোগের সঙ্গে মাতৃসম খালা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং মা শেখ রেহানা সব সময় আছেন জানিয়ে তাঁদের ধন্যবাদ জানান রাদওয়ান।

নভেল সিরিজটি সম্পর্কে ধারণা দিয়ে তিনি বলেন, এর প্রথম পর্বে আমরা দেখেছিলাম, বঙ্গবন্ধুর ছেলেবেলা। তিনি তখন একটি গ্রামের সাধারণ ছেলে। তিনি কিভাবে দিন কাটাতেন, তিনি ফুটবল খেলতেন, মজা করতেন, দুষ্টুমি করতেন, ডক্টরের কাছ থেকে পালাতে চেষ্টা করতেনÑ সব ছেলেমেয়ের জীবনেই এমন ছোটখাটো অভিজ্ঞতা থাকে। আমরা সেগুলো চমৎকারভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। বঙ্গবন্ধুকে আগামী প্রজন্মের কাছে সরল সুন্দর ও আকর্ষণীয় করে তুলে ধরতে বাকি খ-গুলোর কাজ এগিয়ে চলেছে বলেও জানান বঙ্গবন্ধু পরিবারের গর্বিত এই সদস্য। গ্রাফিক নভেল মুজিব সম্পাদনা করেছেন শিবু কুমার শীল। কাহিনী বিন্যাস ও সংলাপ লিখেছেন সিদ্দিক আহমেদ। চিত্রণের কাজটি করেছেন সৈয়দ রাশাদ ইমাম তন্ময়। দ্বিতীয় খ-ের মূল্য ১৫০ টাকা।

নত্ ুবই ॥ ফাল্গুনের প্রথম দিনে মেলায় এসেছে অনেক নতুন বই। একাডেমির তথ্য কেন্দ্রে জমা পড়েছে ১৩৫টি।

শিশুদের সকাল ॥ অমর একুশে উদ্যাপন উপলক্ষে সকাল ১০টায় বাংলা একাডেমির মূল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় শিশু-কিশোর সাধারণ জ্ঞান ও উপস্থিত বক্তৃতা প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত পর্ব। প্রতিযোগিতায় বিচারক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলা একাডেমির পরিচালক শাহিদা খাতুন, শিশুসাহিত্যিক সুজন বড়য়া ও নাট্যজন মাসুম রেজা। উপস্থিত বক্তৃতা প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়েছে অনিশা দাস, দ্বিতীয় হয়েছে আনান আবরার ইসলাম ও রেজা শাওয়াল রিজওয়ান। তৃতীয় হয়েছে সিরাতুল মোস্তাকিম শ্রাবণী। সাধারণ জ্ঞান প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়েছে আকিবা আফরোজ রাকা, দ্বিতীয় হয়েছে তাসফিয়া চৌধুরী এবং তৃতীয় হয়েছে আদনান বিন আলমগীর।

মেলা মঞ্চের আয়োজন ॥ গ্রন্থমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় ‘বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধচর্চা : অতীত থেকে বর্তমান’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অধ্যাপক মেসবাহ কামাল। আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন ইতিহাসবিদ অধ্যাপক ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন, ড. মোহাম্মদ সেলিম এবং দিব্যদ্যুতি সরকার। সভাপতিত্ব করেন বিশিষ্ট লেখক অধ্যাপক সনৎকুমার সাহা।

প্রাবন্ধিক বলেন, বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ চর্চার নানা মাত্রা রয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে ও ব্যক্তিগত উদ্যোগে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে গবেষণা হয়েছে। আবার রাষ্ট্রক্ষমতায় মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তি থাকাকালে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতও হয়েছে। নয় মাসের রক্তাক্ত মুক্তিযুদ্ধ, গেরিলাযোদ্ধা, যুদ্ধাপরাধ, বধ্যভূমি, গণহত্যা, নারী নির্যাতন ইত্যাদি নানা বিষয়ে গবেষণা হলেও মুক্তিযুদ্ধের লাখ লাখ শরণার্থী নিয়ে আরও বিস্তৃত গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে। সেই সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের জাতীয়তাবাদী ও বামপন্থী রাজনৈতিক শক্তির ভূমিকা এবং একই সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী পক্ষ, যেমন জামাতে ইসলামী, নেজামে ইসলামসহ অন্যান্য দলের ভূমিকা নিয়েও গবেষণা জরুরী। তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর গৌরবময় ভূমিকাও ব্যাপক বিশ্লেষণের দাবি রাখে।

আলোচকরা বলেন, মুক্তিযুদ্ধ চর্চা কেবল ইতিহাস চর্চা নয়, একই সঙ্গে চেতনার চর্চাও বটে। মহান মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী পক্ষ রাজাকারদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রণয়ন প্রয়োজন যেন ভবিষ্যৎ প্রজন্ম জানতে পারে এদেশের মহান মুক্তি সংগ্রামে কারা বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। তারা বলেন, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ কোন সামরিক বাহিনীর যুদ্ধ মাত্র নয়, এটি এক জনযুদ্ধের নাম। তাই এই জনযুদ্ধের গণযোদ্ধাÑ কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র ও সর্বস্তরের সাধারণ মানুষের অবস্থান ও আকাক্সক্ষার ইতিহাস প্রণীত হলেই সম্ভব মুক্তিযুদ্ধের পূর্ণাবয়ব ইতিহাস নির্মাণ।

সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক সনৎকুমার সাহা বলেন, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সাড়ে চার দশক অতিক্রান্ত হয়েছে। সঙ্গত কারণেই মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার দাবি উঠছে। আমরা আশা করি, বস্তুনিষ্ঠভাবে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস প্রণয়নের মধ্য দিয়ে আলোকিত আগামীর পথে আমাদের যাত্রা শুরু হবে।

সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে আবৃত্তি পরিবেশন করেন আবৃত্তিশিল্পী নিমাই ম-ল এবং তামান্না নীপা। সোহেল রহমানের পরিচালনা নৃত্য পরিবেশন করেন নৃত্য সংগঠন ‘শিখর কালচারাল অর্গানাইজেশন’র শিল্পীরা। সংগীত পরিবেশন করেন কণ্ঠশিল্পী জিনাত রেহানা, বদরুন্নেসা ডালিয়া, শ্যামা সরকার, জয় শাহরিয়ার, পল্লব গোমেজ, রাজু আহমেদ এবং জুলি শারমিলী।