২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

উত্তরার হাসপাতালে ভুল চিকিৎসায় আদিবাসী ছাত্রের মৃত্যুর অভিযোগ

উত্তরার হাসপাতালে ভুল চিকিৎসায় আদিবাসী ছাত্রের মৃত্যুর অভিযোগ
  • এমডিসহ ৯ জনকে আসামি করে মামলা ॥ আটক ৩

স্টাফ রিপোর্টার ॥ রাজধানীর উত্তরার একটি হাসপাতালে ভুল চিকিৎসায় সাজু ম্রং (২০) নামে এক আদিবাসী ছাত্রের মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে। শুক্রবার সন্ধ্যা ৭টার দিকে উত্তরার কার্ডিও কেয়ার স্পেশালাইজড ও জেনারেল হাসপাতালে এ ঘটনা ঘটে। মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টা আগেও কথা বলা ও খাওয়া-দাওয়াসহ স্বাভাবিক অবস্থায় ছিলেন সাজু ম্রং। এ বিষয়ে হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ম্যানেজার, পরিচালকসহ ৯ জনকে আসামি করে রাজধানীর উত্তরা পশ্চিম থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। শনিবার বিকেলে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে সাজুর ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। এ ঘটনায় তিনজনকে আটক করেছে উত্তরা পশ্চিম থানার পুলিশ। গত ১ ফেব্রুয়ারি অভিযান চালিয়ে বিনা প্রয়োজনে আইসিইউতে রেখে বাড়তি টাকা আদায়সহ বিভিন্ন অভিযোগে ওই হাসপাতালকে সাত লাখ টাকা জরিমানা করে র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত। সাজুর মৃত্যুর সংবাদ পেয়ে বাংলাদেশ গারো ছাত্র সংগঠনের (বাগাছাস) নেতাকর্মীরা কার্ডিও কেয়ার হাসপাতালের সামনে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ করেছেন। সাজুর গ্রামের বাড়ি শেরপুর জেলার নালিতাবাড়ী উপজেলার কালা কুমার গ্রামে।

রাজধানীর উত্তরা পশ্চিম থানায় দায়ের করা মামলার আসামিরা হলেন- কার্ডিও কেয়ার স্পেশালাইজড ও জেনারেল হাসপাতালের ডাঃ কামরুল হাসান ফয়সাল (৩৮), ডাঃ কৌশিক (৩২), ডাঃ আহমদ শাহরিয়ার (৩০), হাসপাতালের পরিচালক শেখ খোরশেদ আলম (৪০), ব্যবস্থাপনা পরিচালক শেখ ফাইজুল মবিন (৩০), পরিচালক ডাঃ খায়ের (৩৮), পরিচালক ডাঃ সাকিল (৩৬), ম্যানেজার ইউসুফ মামুন (২৮) ও হাসপাতালের পরিচালক শেখ খোরশেদ আলমের ছোট ভাই মনির (৩০)। উত্তরা পশ্চিম থানার ডিউটি অফিসার এসআই আলমগীর হোসেন জনকণ্ঠকে জানান, এ ঘটনায় হাসপাতালের ডাঃ আহমদ শাহরিয়ার (৩০), ম্যানেজার ইউসুফ মামুন (২৮) ও মনিরকে (৩০) আটক করা হয়েছে।

মৃত সাজুর পিতা ইব্রিয় মানখিন জনকণ্ঠকে জানান, তার সন্তানকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার মাথা ও কোমরে আঘাত নিয়ে টঙ্গী হাসপাতালে ভর্তি হয় সাজু। ওই রাত ৯টার দিকে অজ্ঞাতনামা দুই ব্যক্তি তাকে কার্ডিও কেয়ার হাসপাতালে রেখে চলে যান। ওই দুই ব্যক্তি ০১৬৮০৬৯৭৩৯৩ মোবাইল নম্বরে কল করে বিষয়টি সাজুর স্বজনদের জানান। খবর পেয়ে সাজুর স্বজনরা উত্তরার কার্ডিও কেয়ার হাসপাতালে ছুটে যান। তখন সাজুর অবস্থা আশঙ্কাজনক ছিল না। স্বজনদের সঙ্গে স্বাভাবিক কথাবার্তা বলেন সাজু। তবে তার চোখে-মুখে আতঙ্কের ছাপ ছিল। ওই সময়ে হাসপাতালে কোন চিকিৎসক ছিলেন না। পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই সাজুকে বারবার বিভিন্ন ধরনের ওষুধ দেন নার্সরা। অবস্থা গুরুতর না হলেও একপর্যায়ে তাকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) রাখা হয়। হাসপাতালের বিষয়ে অনভিজ্ঞ সাজুর স্বজনদের পক্ষে কোনকিছু বোঝার আগেই এসব ঘটনা খুব দ্রুত ঘটে যায়। শুক্রবার সন্ধ্যা সাতটার দিকে সাজু মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। হাসপাতালে নিয়ে আসা দুই ব্যক্তি কল করে সাজুর মৃত্যুর বিষয়টি তার স্বজনদের জানিয়ে দেন। কিন্তু ওই দুই ব্যক্তি অদৃশ্য থেকে যান। এখন পর্যন্ত সাজুর অভিভাবকরা ওই দুই ব্যক্তির পরিচয় জানতে পারেননি। তবে চিকিৎসকদের সঙ্গে ওই দুই ব্যক্তির যোগাযোগ ছিল বলে অভিযোগ করেন সাজুর পিতা ইব্রিয় মানখিন। তিনি আরও জানান, তার ছেলে সাজু এইচএসসি উত্তীর্ণ হওয়ার পর লেখাপড়ার পাশাপাশি গাজীপুরের কালীগঞ্জ থানায় আরএফএল কোম্পানিতে কাজ করত। ঘটনার দিন সাজু কালীগঞ্জ থেকে তার পিতার কর্মস্থল মিরপুরে আসছিলেন। ঢাকায় গাড়ি থেকে নামার পর কে বা কারা তাকে হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে দিল, তা অজানা রয়ে গেল। এ ঘটনার প্রেক্ষিতে দায়ের করা মামলার আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে ঘটনার রহস্য বেরিয়ে আসবে বলে জানান সাজুর পিতা ইব্রিয় মানখিন। বাংলাদেশ গারো ছাত্র সংগঠনের ঢাকা মহানগর শাখার সভাপতি অলিক জানান, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অবহেলায় সাজুর মৃত্যু হয়েছে। পরিচয়হীন দুই ব্যক্তি ও হাসপাতালের কিছুসংখ্যক চিকিৎসক ও কর্মকর্তা এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত রয়েছেন। জড়িতদের গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন তিনি।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক (হাসপাতাল) অধ্যাপক ডাঃ সামিউল ইসলাম সাদি জনকণ্ঠকে জানান, বিভিন্ন সময়ে অভিযোগের ভিত্তিতে গত সপ্তাহে উত্তরার কার্ডিও কেয়ার স্পেশালাইজড ও জেনারেল হাসপাতালে মোবাইল কোর্ট পরিচালিত হয়। অভিযানে হাসপাতালের অনেক অব্যবস্থাপনার চিত্র ধরা পড়ায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে আর্থিক জরিমানা করা হয়। শর্ত ভঙ্গকারী হাসপাতাল ও ক্লিনিকসমূহের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে রয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। তিনি জানান, রাজধানীসহ সারাদেশে এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রেখেছে স্বাস্থ্য অধিদফতরসহ র‌্যাবের মোবাইল কোর্ট।

এদিকে গত ১ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর ওই হাসপাতালকে সাত লাখ টাকা জরিমানা করে র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত। অভিযান পরিচালনা শেষে র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোঃ ফিরোজ আহমেদ সাংবাদিকদের জানান, কার্ডিও কেয়ার স্পেশালাইজড এ্যান্ড জেনারেল হাসপাতাল নামে ওই হাসপাতালের বিরুদ্ধে রোগীদের কাছ থেকে বাড়তি টাকা আদায়ের প্রমাণ পাওয়ার পাশাপাশি আরও কয়েকটি অভিযোগে এ জরিমানা করা হয়েছে। ওই হাসপাতালে অভিযান পরিচালনার দিন (১ ফেব্রুয়ারি) ১১ জন রোগী আসেন, যাদের মধ্যে ছয়জনকেই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নিবিড় পরিচর্চা কেন্দ্রে (আইসিইউ) ভর্তি করা হয়। রোগীদের সঙ্গে প্রতারণা করে বাড়তি টাকা আদায় করার জন্য এটা করা হয়েছে। তিনি বলেন, এছাড়া হাসপাতালে মেয়াদোত্তীর্ণ রি-এজেন্ট পাওয়া গেছে; ছিলেন না প্রয়োজনীয় সংখ্যক চিকিৎসকও। এসব অপরাধের কথা আদালতে স্বীকার করায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে সাত লাখ টাকা জরিমানা করা হয় বলে জানান ফিরোজ আহমেদ।