১৯ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ডেথ রেফারেন্স মামলার নিষ্পত্তির হার ক্রমেই বাড়ছে

ডেথ রেফারেন্স মামলার নিষ্পত্তির হার ক্রমেই বাড়ছে
  • মামলা জট (শেষ)

বিকাশ দত্ত ॥ উচ্চ আদালতসহ সারাদেশের আদালতগুলোতে ৩১ লাখ মামলার জট থাকলেও মৃত্যুদ- নিশ্চিতকরণ অনুমোদনের (ডেথ রেফারেন্স) মামলাগুলো তুলনামূলকভাবে দ্রুত নিষ্পত্তি হচ্ছে। গত বারো বছরের পরিসংখ্যানে দেখা যায় নিষ্পত্তির হার ক্রমেই বেড়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে যেসব অপরাধীকে মৃত্যুদ- দেয়া হয়েছে তাদের আপীলও দ্রুত নিষ্পত্তি হচ্ছে আপীল বিভাগে। ইতোমধ্যে ছয়জনের আপীল নিষ্পত্তি এবং চারজনের দ- কার্যকর করা হয়েছে। মীর কাশেম আলীর মামলার শুনানি শুরু হয়েছে। ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে আব্দুস সোবহান, এটিএম আজহারুল ইসলাম, সৈয়দ কায়সার ও মোবারকসহ ১০ জন আসামির আপীল শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে। মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এখন পর্যন্ত মোট ২২টি মামলার বিচারকাজ শেষ হয়েছে। এতে দ-িত হয়েছেন ২৬ জন। তাদের মধ্যে সুপ্রীমকোর্টে আপীল নিষ্পত্তির পর চারজনের মৃত্যুদ- বহাল ছিল। কাদের মোল্লা, কামারুজ্জামান, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ও সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর মৃত্যুদ- পর্যায়ক্রমে কার্যকর করা হয়েছে। এখন আপীলে শুনানি চলছে মীর কাশেম আলীর মামলা। মোবারক হোসেন, সৈয়দ কায়সার, এটিএম আজহার, আব্দুস সোবহান, ইঞ্জিনিয়ার আব্দুল জব্বার, মাহিদুর রহমান, আফসার হোসেন চুটু, কসাই সিরাজ মাস্টার এবং খান আকরাম হোসেনের আপীল শুনানির অপেক্ষায়।

২০১০ সালে মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচারের জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয়। ট্রাইব্যুনাল গঠনের পর এ পর্যন্ত ২২টি মামলার রায় হয়েছে। তার মধ্যে ২৬ জনকে বিভিন্ন দ- প্রদান করা হয়েছে। যাদের দ- দেয়া হয়েছে তাদের মধ্যে রয়েছেন- জামায়াতের সাবেক রুকন বাচ্চু রাজাকার হিসেবে পরিচিত আবুল কালাম আজাদ (মৃত্যুদ-), জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল কাদের মোল্লা (আমৃত্যু কারাদ-) আপীলে মৃত্যুদ-, পরবর্তীতে রায় কার্যকর, জামায়াতের নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী (মৃত্যুদ-) আপীলে আমৃত্যু কারাদ-, জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামান (মৃত্যুদ-) আপীল বিভাগেও মৃত্যুদ- বহাল, পরবর্তীতে রায় কার্যকর। জামায়াতের সাবেক আমির গোলাম আযম (৯০ বছরের কারাদ-) অসুস্থ হয়ে মৃত্যুবরণ, জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদ (মৃত্যুদ-), পরে তার রায় কার্যকর। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী (মৃত্যুদ-), পরে তার দ- কার্যকর। এছাড়া বিএনপির সাবেক মন্ত্রী আব্দুল আলীম (আমৃত্যু করাদ-) অসুস্থ হয়ে মৃত্যুবরণ, বদর বাহিনীর নেতা চৌধুরী মাঈনুদ্দিন এবং মোঃ আশরাফুজ্জামান খান (মৃত্যুদ-), জামায়াতে ইসলামীর আমির মতিউর রহমান নিজামী (মৃত্যুদ-), জামায়াতে ইসলামীর নির্বাহী কমিটির সদস্য মীর কাশেম আলী (মৃত্যুদ-), বিএনপি নেতা নগরকান্দা পৌর মেয়র জাহিদ হোসেন খোকন ওরফে খোকন রাজাকার (মৃত্যদ-), আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কৃত মোঃ মোবারক হোসেন (মৃত্যুদ-), জাতীয় পার্টির সাবেক মন্ত্রী কাযসার বাহিনীর প্রধান সৈয়দ মোহাম্মদ কায়সার (মৃত্যুদ-), জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এটিএম আজহারুল ইসলাম (মৃত্যুদ-), জামায়াতের নায়েবে আমির আব্দুস সুবহান (মৃত্যুদ-) ও জাতীয় পার্টির আব্দুল জব্বার (আমৃত্যু কারাদ-), মাহিদুর রহমান এবং আফসার হোসেন চুটু (আমৃত্যু কারাদ-), হাসান আলী (মৃত্যুদ-), ফোরকান মল্লিক (মৃত্যুদ-), কসাই সিরাজ (মৃত্যুদ-) ও খান আকরামকে আমৃত্যু কারাদ- প্রদান করা হয়েছে। সর্বশেষ আতাউর রহমান ননী ও ওবায়দুল হক তাহেরকে মৃত্যুদ- প্রদান করা হয়েছে। যাদের ট্রাইব্যুনাল মৃত্যুদ- দিয়েছে তারা আপীল বিভাগে আপীল করেছেন। আর যারা পলাতক রয়েছেন তারা আপীলের সুযোগ পাননি। মৃত্যুদ-ই বহাল রয়েছে।

এদিকে মতিউর রহমান নিজামীর ট্রাইব্যুনালের দেয়া মৃত্যুদ- বহাল রেখেছে আপীল বিভাগ। পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ হলে আসামিপক্ষ রিভিউ করবে।

এদিকে পিলখানায় বিডিআর হত্যা মামলার রায় শেষে হাইকোর্টের স্পেশাল বেঞ্চে ডেথ রেফারেন্সের শুনানি চলছে। রমনা বোমা হামলা ও চট্টগ্রামের চাঞ্চল্যকর ১০ ট্রাক অস্ত্র চোরাচালান মামলার ডেথ রেফারেন্সও হাইকোর্টে এসেছে। জঙ্গী শায়খ আবদুর রহমান, বাংলা ভাইসহ ছয় জঙ্গীর ফাঁসি কার্যকর হওয়ার পর এখনও ২১ জঙ্গী কারাগারে আছে। তাদের ডেথ রেফারেন্স দীর্ঘদিন ধরে শুনানির অপেক্ষায় আছে হাইকোর্টে। সুপীমকোর্ট সূত্রে জানা গেছে, আনুষঙ্গিক কাগজপত্র প্রস্তুত হলেই এ সমস্ত মামলার শুনানি শুরু হবে। এদিকে আইন কমিশন মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য আরও বিচারক নিয়োগের পরামর্শ দিয়েছে।

এ প্রসঙ্গে সুপ্রীমকোর্টের রেজিস্ট্রার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, তুলনামূলকভাবে ডেথ রেফারেন্স মামলার শুনানি দ্রুত নিষ্পত্তি হচ্ছে। এর অন্যতম কারণ সুপ্রীমকোর্টের প্রশাসনও কঠোরভাবে মনিটর করছে। সেকশন থেকে মামলার দ্রুত নথি দেয়া, পাশাপাশি পেপারবুক তৈরিতে যাতে বিলম্ব না হয় সেদিকে নজর রাখা হচ্ছে। সুপ্রীমকোর্টের ডেথ রেফারেন্স শাখা সূত্রে জানা যায়, ২০০৪ সালে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ৩৩৮টি, নিষ্পত্তি হয়েছে ১০১টি। ২০০৫ সালে বিচারাধীন ৪৬৪টির নিষ্পত্তি হয়েছে ৪৯টি, ২০০৬ সালে বিচারাধীন ৫১১টির নিষ্পত্তি হয়েছে ৬৫টি, ২০০৭ সালে বিচারাধীন ৪৬৫টির নিষ্পত্তি হয়েছে ১৪৮টি, ২০০৮ সালে বিচারাধীন ৪৭৪টির নিষ্পত্তি ১২৮, ২০০৯ এ বিচারাধীন ৫০৯টির নিষ্পত্তি ৪৮টি, ২০১০ সালে বিচারাধীন ৫৪২টির নিষ্পত্তি হয়েছে ৪৩টি, ২০১১ সালে বিচারাধীন ছিল ৫৩৫ নিষ্পত্তি হয়েছে ৭৪টি, ২০১২ সালে বিচারাধীন ছিল ৪৫০ নিষ্পত্তি হয়েছে ১৪৫টি, ২০১৩ সালে বিচারাধীন ৪০৬টির নিষ্পত্তি ১১১টি, ২০১৪ সালে বিচারাধীন ৩৬৩টির নিষ্পত্তি হয়েছে ১৩৫টি, ২০১৫ সালের ৩১ মে পর্যন্ত বিচারাধীন ছিল ৩৭৯টি নিষ্পত্তি হয়েছে ৩১টি। সূত্র জানায়, পদ্ধতিগত কারণে মামলা দীর্ঘ জটযুক্ত হচ্ছে। সনাতনী পদ্ধতির কারণে মামলাজট বেড়ে যাচ্ছে। বিচার বিভাগ পৃথকীকরণ হয়ে গেছে। এখন মামলা জট দূর করতে আইনমন্ত্রী বা সরকারের কোন ভূমিকা নেই।

সুপ্রীমকোর্টের আইনজীবীগণ জানিয়েছেন, পর্যায়ক্রমে ডেথ রেফারেন্স মামলার শুনানি হচ্ছে। শুনানির আগে তো পেপারবুক প্রস্তুত করতে হবে। পেপার বুক তৈরি করতে একটু সময় বেশি লাগছে। এরপর তালিকায় এলে শুনানি শুরু হয়। কনডেম সেলে ফাঁসির আসামিরা মৃত্যুর প্রহর গুনছেন। তাদের অধিকার রয়েছে যাতে দ্রুত এসব মামলার বিচার শেষ হয়। কারণ যত দ্রুত নিষ্পত্তি হবে ততই মঙ্গল।

উল্লেখ্য, কোন ফৌজদারি মামলায় নিম্ন আদালত কাউকে ফাঁসি দিলে ওই আসামির মৃত্যুদ-াদেশ অনুমোদনের জন্য সংশ্লিষ্ট জেলা ও দায়রা জজ সুপ্রীমকোর্টের রেজিস্ট্রার বরাবর চিঠি দেন। ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৭৪ ধারা মোতাবেক দেয়া এই চিঠিতে ফাঁসির রায়ের অংশ বিশেষ তুলে ধরে বলা হয়, হাইকোর্ট বিভাগের অনুমোদনসাপেক্ষে উক্ত মৃত্যুদ-ের রায় কার্যকর করার আদেশ হলো। তাই হাইকোর্টের সদয় অনুমোদনের জন্য মামলার কাগজপত্র, সিডি, মূল নথি ও যাবতীয় প্রসিডিংস পেশ করা হলো। এরপর রায়ের কপি প্রাপ্তির ৩০ দিনের মধ্যে আসামিরা আপীল দায়ের করেন। পরবর্তীকালে মামলার এজাহার, অভিযোগপত্র, নিম্ন আদালতের আদেশনামা ও রায়, রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষীদের জবানবন্দী ও জেরা, সিআরপিসির ৩৪২ ধারা মোতাবেক অভিযুক্ত ব্যক্তির পরীক্ষা, আসামির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী, সুরতহাল রিপোর্ট, ময়নাতদন্ত রিপোর্ট, ফরেনসিক ও কেমিক্যাল রিপোর্ট, জব্দ তালিকা, খসড়া মানচিত্র ও সূচীপত্রসহ বিস্তারিত নথিপত্র যুক্ত করে বিজি প্রেস থেকে পেপারবুক প্রস্তুত করা হয়। এরপর মামলাটি শুনানির জন্য প্রস্তুত হয়।

এদিকে বিশেষ বেঞ্চে বিডিআর হত্যা মামলার ডেথ রেফারেন্স ও আপীলের শুনানি চলছে। প্রসঙ্গত, ২০১৩ সালের ৫ নবেম্বর পুরান ঢাকার আলিয়া মাদ্রাসাসংলগ্ন স্থানে স্থাপিত অস্থায়ী আদালতে ঢাকা মহানগর তৃতীয় দায়রা জজ ড. আক্তারুজ্জামান পিলখানা হত্যাকা-ের রায় ঘোষণা করেন। রায়ে ১৫২ জনকে মৃত্যুদ-, ১৬০ জনকে যাবজ্জীবন কারাদ-, ২৫৬ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদ- ও ২৭৮ জনকে খালাস দেয়া হয়। বিচারিক আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে ১১৯টি ফৌজদারি আপীল, ১৪১টি জেল আপীল ও ১৫২ জনের মৃত্যুদ- নিশ্চিত করার জন্য একটি ডেথ রেফারেন্স হাইকোর্টে দায়ের করা হয়। খালাসপ্রাপ্ত ২৭৮ জনের মধ্যে ৬৯ জনের বিরুদ্ধে আপীল করেছে রাষ্ট্রপক্ষ। সকল আপীল ও ডেথ রেফারেন্সের শুনানি হাইকোর্টের একটি বিশেষ বেঞ্চে একসঙ্গে অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

জঙ্গী শায়খ আবদুর রহমান, বাংলা ভাইসহ ছয় জঙ্গীর ফাঁসি কার্যকর হওয়ার পর এখনও ২১ জঙ্গী কারাগারে আছে। ২০০৮ সালের ২৩ ডিসেম্বর নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গী সংগঠন হরকাতুল জিহাদের নেতা মুফতি আবদুল হান্নান ওরফে মুফতি হান্নানকে মৃত্যুদ-ের নির্দেশ দেয়া হয়। এছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থানে বোমা হামলায় ২৯ জঙ্গীকে মৃত্যুদ- প্রদান করেছে বিভিন্ন আদালত। মৃত্যুদ-প্রাপ্ত জঙ্গীদের মধ্যে আরিফুর রহমান ওরফে হাসিব ওরফে আকাশ, সাউদুল মুন্সী ওরফে ইমন ওরফে পলাশ, মাসুদ ওরফে আনিসুল ইসলাম ওরফে ভুট্টু, আবদুল্লাহ আল সোয়াইল ওরফে ফারুক ওরফে জাহাঙ্গীর ওরফে আকাশ, এনায়েতুল্লাহ জুয়েল ওরফে ওয়ালিদ, তৈয়বুর রহমান ওরফে হাসান, মামুনুর রশিদ ওরফে জাহিদ, আশরাফুল ইসলাম ওরফে আব্বাস খান ও আদনান সামী, হুজির জঙ্গী আরিফ হাসান সুমন ও জেএমবি সদস্য মোঃ নিজামউদ্দিন ওরফে রনি ওরফে রেজা, জঙ্গী আমজাদ হোসেন বাবু, এইচএম মাসুমুর রহমান, কামারুজ্জামান ওরফে স্বপন, আক্তারুজ্জামান, আসাদুজ্জামান ও আবুল কালাম ওরফে শফিউল্লাহ কারাগারে আছে। এদের ডেথ রেফারেন্স শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে।