১৭ জানুয়ারী ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

একুশ শতক ॥ বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার চ্যালেঞ্জ বাড়ছে তবে সুখবরও আছে

  • মোস্তাফা জব্বার

স্বাধীন বাংলাদেশ, যে দেশ বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে জন্ম নিয়েছে এবং যে দেশের সংবিধানে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা বাংলা সেই দেশে ২০১৬ সালে এসে এমন দাবি করা চমকে দেবার মতো। তবুও আমি দাবিটা তুলছি এবং দৃঢ়ভাবে এই দাবির সপক্ষে আজীবন লড়াই করার অঙ্গীকার করছি। আমি মনে করি, রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলার নিরঙ্কুশ আধিপত্য সৃষ্টি করতে আমাদের সামনে রয়েছে পাহাড়সম চ্যালেঞ্জ। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই চ্যালেঞ্জ বাড়ছে। তবে আনন্দেও খবরও কিছু আছে। সেটি না হয় শেষে বলি। আগে চ্যালেঞ্জটার কথা বলা হোক।

বস্তুত বাংলাদেশে বাংলা ভাষা-সাহিত্য ও বাংলা হরফ নিয়ে প্রচুর মাতামাতি থাকলেও আসলে বাংলাদেশে বাংলার সেই মর্যাদা নেই। ২০১৬ সালে এসে জানলাম যে এটি কাগজে কলমে রাষ্ট্রভাষা হলেও তাতে নাকি ত্রুটি আছে এবং এজন্য বহু ক্ষেত্রে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে মর্যাদা দেয়া যায় না। আদালত তেমন একটি জায়গা। এর বাইরেও রাষ্ট্রভাষা হিসেবে এর প্রয়োগে আছে চরম অবহেলা। এজন্য বাংলাদেশে বাংলাকে বাঁচাতে হলে একে রাষ্ট্রভাষা করতে হবে।

এটি যে কেমন দুরবস্থায় আছে তার খবরটি পেলাম সেদিন। ২০১৪ সালে হাইকোর্ট তার এক রায়ে অফিস আদালতে, সাইনবোর্ডে, ব্যানারে বাংলা লেখার নির্দেশ দেয়ায় বাংলাদেশী বাঙালী দুই আইনজীবী (ব্যারিস্টার হামিদুল মিসবাহ ও ব্যারিস্টার তানজীব) সেই রায়ের বিরুদ্ধে আপীল করেছিলেন। খবরটি শোনার পর আমি বিস্মিত হয়েছি। কোন বাঙালী বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষাকে চ্যালেঞ্জ করে আদালতে যেতে পারে সেটি ভাবতেও পারিনি। তাদের মতে, বাংলা লেখা হলে সংবিধান লঙ্ঘন হবে। তাদের কথা শুনে আমার মনে হয়েছে, তাহলে বাংলা কি বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষা নয়? সংবিধানে কি এর অন্যথা আছে? যদি সেটি হয়ে থাকে তবে সবার আগে তো সংবিধানের সংশোধন করা দরকার। আমি ব্যক্তিগতভাবে দু’জন আইনজীবীকেই চিনি এবং তারা মেধাসম্পদ রক্ষার লড়াই করেন। তারা বাংলাভাষাবিদ্বেষী সেটি ভাবতে আমার গা শিউরে ওঠে।

অন্যদিকে আমাদের ভাষার অবস্থাটি কি তার একটি সাধারণ বিবৃতি পেলাম ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে। গত ৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ ঢাকার শেরে বাংলা নগরের বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত এক সেমিনারে ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভিার্সিটির কম্পিউটার বিজ্ঞান বিষয়ের অধ্যাপক ড. হাসান সারোয়ার একটি চমৎকার মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, আমরা ছেমেয়েদেরকে ইংরেজি শেখানোর জন্য অস্থির থাকি-কিন্তু ওরা তো বাংলাই জানে না। বাংলাদেশের শিক্ষার যখন এই অবস্থা তখন আমাদের উচ্চ স্তরের লেখাপড়ার জগতটা বাংলাবিহীন হয়ে পড়েছে।

আমরা ভুলে গেছি যে, বাংলাদেশে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য ১৯৪৮ সালে যে আন্দোলনের সূচনা হয় তার অন্যতম দুটি কারণ ছিল; বাঙালীর ভাষাপ্রীতি ও ন্যায্য অধিকার আদায়। পাকিস্তানীরা যখন কেবল উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা করে তখন পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ লোকের ভাষা বাংলার পক্ষে একটি যুক্তিসঙ্গত বিষয় ছিল বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেবার। যদিও ১৯৫২ সালে বাঙালীরা সেই লড়াইতে জয়ী হয় তবুও ভাষার আন্দোলন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে রূপ নেয় এবং ১৯৭২ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য প্রশাসনিক ও কারিগরি ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। তৎকালে অপটিমা মুনির টাইপরাইটার প্রস্তুত করা ও সরকারী অফিসে বাংলা প্রচলন করার সকল উদ্যোগ গ্রহণ করা একটি ঐতিহাসিক কাজ ছিল। কিন্তু এত বছর পরও বাস্তবতা হচ্ছে বাংলাদেশে বাংলা তার ন্যায্য মর্যাদা পায় না। এখন তো আমরা ভাষা আন্দোলনের উল্টো পথে হাঁটছি। আমাদের জীবনের সকল স্তরে বাংলা প্রচলনের বদলে এখন লড়াই হচ্ছে কত দ্রুত আমরা জীবন থেকে বাংলা ভাষাকে বিদায় করতে পারি। রাষ্ট্র থেকে ব্যক্তিজীবন-সর্বত্র বাংলা ভাষার বিদায়ের ঘণ্টা। সেজন্যই বলতেই হচ্ছে, বাংলা ভাষার বেঁচে থাকার পথটা মোটেই আর মসৃণ নয়।

এখানে দেশের অতি সাধারণ মানুষ, দরিদ্র মানুষ, স্বল্পশিক্ষিত বা গ্রামের মানুষ বাংলা চর্চা ব্যাপকভাবে করে। কিন্তু বাংলা ভাষা শহুরে বাংলাদেশীর জীবন-জীবিকা, উচ্চশিক্ষা ও উচ্চ আদালতে ‘বেঙ্গলি’ হয়েই আছে। একুশের প্রভাতফেরিতে আসা বিত্তবানদের অনেকেই শহীদ মিনারে ফুল দিলেও মাতৃভাষার প্রতি কোন দরদ পোষণ করেন না। দিনে দিনে সেই অবস্থার আরও অবনতি হচ্ছে। শতভাগ আমন্ত্রিত বাংলাদেশী বাঙালী হলেও এমনকি বিয়ের দাওয়াতেও এখন আর বাংলা হরফ ও ভাষা বিরাজ করে না। এমনকি ডিজিটাল করার নামে বাংলা ভাষা বিদায় হচ্ছে। সরকারী ওয়েবসাইটগুলোতে সবার আগে ইংরেজী ঠাঁই পায়। সরকারী অফিসেও কাজে কর্মে সুযোগ পেলেই ইংরেজীকে প্রাধান্য দেয়া হয়। এক সময়ে আমাদের সরকারী ব্যাংকগুলো বাংলায় কাজ করত। ডিজিটাল করার নামে এখন সেগুলো ইংরেজী হয়েছে। বাংলা ভাষার সফটওয়্যার উন্নয়নে যেসব উদ্যোগ নেয়া হয়েছে সেগুলো মুখথুবড়ে পড়ে আছে। সরকারী তহবিলে টাকা রেখেও বাংলা ভাষার জন্য সেই টাকা ব্যয় করা সম্ভব হয়নি। ভাষার উন্নয়নে যেসব কাজ করা উচিত সেইসব কাজের দিকে নজর না দিয়ে সরকার এমনসব কাজ করছে যা না করলেও কোন ক্ষতি নেই। সরকারের নানা অঙ্গ বিড়ম্বনা সৃষ্টি করা ছাড়া ভাল কিছু করছে না। যেখানে আমাদের এখন ওসিআর, টেক্সট টু স্পীচ, স্পীচ টু টেক্সট, স্পেল ও গ্রামার চেকার ইত্যাদি সফটওয়্যারের প্রয়োজন সেখানে তারা বাংলা হরফ বানিয়েছে। ওরা জানে যে, বাংলা হরফ বানানোর কাজটি বেসরকারী খাত অনেক আগেই করে ফেলেছে। বিজয়-এর ফন্টের সংখ্যা শয়ের বেশি। তবুও প্রধানমন্ত্রীকে দিয়ে উদ্বোধন করানোর জন্য হরফ বানানোর একটি তামাশা তৈরি করা হয়েছিল। এর প্রধান উদ্যোক্তা ছিল এটুআই।

অন্যদিকে বাংলা ভাষার নামে প্রতিষ্ঠিত দেশে উচ্চ আদালতে বাংলা ভাষার প্রবেশ পুরোপুরি নিষিদ্ধ। উচ্চশিক্ষা বা বিজ্ঞান শিক্ষায় বাংলা ভাষা প্রবেশ করতে পারে না। বাংলা একাডেমি এক সময়ে এসব বিষয়ে পাঠ্য বই প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছিল। কিন্তু এখন সেই ধারাটিও ক্ষীণ হয়ে পড়েছে।

কোন একটি সরকারী অনুষ্ঠানেও যদি একজন বিদেশীও না থাকে তবে সেই অনুষ্ঠানের ভাষা হয়ে যায় ইংরেজী। বেসরকারী প্রতিষ্ঠানগুলো তো বাংলা ব্যবহার করলে তাদের অপমান হয় তেমন একটি ভাব দেখায়। যত বড় বড় কথাই বলা হোক না কেন, বাংলাদেশে অফিস আদালতে বাংলার ব্যবহার দিনে দিনে বাড়ার বদলে কমছে। উচ্চশিক্ষায়ও বাংলা নিষিদ্ধ। ফেব্রুয়ারি মাসের বইমেলা ছাড়া আর কোথাও বাংলা ভাষা নিয়ে মাতামাতিও নেই। বরং এই কথাটি বলা ভাল যে ডিজিটাল করার প্রথম ও প্রাথমিক উদ্দেশ্য হচ্ছে বাংলাকে বিদায় করা।

বাংলা ভাষার চরম বিকৃতি এফএম রেডিওগুলোতে করা হয়। টিভির অনুষ্ঠানগুলোতে ইংরেজী বাংলার মিশ্রণে এমনসব নামকরণ করা হয় যা শুনলে কষ্ট লাগে। মোবাইলের এসএমএস তো ইংরেজীতেই হয়। কম্পিউটারেও রোমান হরফে বাংলা লেখা হয়। দুর্ভাগ্যজনক হচ্ছে সরকারের কোন কোন প্রতিষ্ঠান রোমান হরফে বাংলা লেখাকে উৎসাহিত করে।

আমরা দেশে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট গড়ে তুলেছি। কিন্তু সেই ইনস্টিটিউটটি বাংলা ভাষা বা বিশ্বের কোন ভাষার কোন কাজে লেগেছে বলে এখনও প্রতীয়মান হচ্ছে না। দেশের ক্ষুদ্র জাতিসত্তার ভাষাগুলোর প্রতিও এই প্রতিষ্ঠানের কোন দৃষ্টি নেই।

বাংলাদেশে বাংলা ভাষার গুরুত্ব কতটা তার একটি নমুনা আমি এখানে উল্লেখ করতে পারি। একটি টিভি চ্যানেলে সম্প্রতি বিয়ের কার্ড বিক্রির ওপর একটি জরিপ প্রকাশ করা হয়েছে। তাতে দেখা গেছে ধনী ও শিক্ষিত পরিবারের বিয়ের কার্ডে বাংলা হরফের কোন অস্তিত্বই থাকে না। বাংলা ভাষা ও হরফ ব্যবহার করে স্বল্পশিক্ষিত, গ্রামের মানুষ বা গরিব মানুষ। এতে প্রতীয়মান হয় যে বাংলা ভাষার প্রতি এই দেশের বাংলা ভাষীদের একটি শ্রেণীর দরদ নেই।

যে দেশ ভাষার নামে সৃষ্টি হয়েছে, যে দেশ ভাষার জন্য রক্ত দিয়েছে সেই দেশে বাংলা ভাষা চরমতম অবহেলার বিষয় হয়ে থাকবে সেটি মেনে নেয়া কেমন যেন ভীষণ কষ্টের মনে হয়। মনে হয় আবারও বরকত, সালাম, রফিক, জব্বারের রক্তের আহ্বান জানাচ্ছে এই মাতৃভাষা।

আমি আশা করব বাংলাদেশে বাংলা ভাষার প্রকৃত মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করার জন্য কিছু জরুরী পদক্ষেপ নেয়া হবে। অতি সংক্ষেপে তার কয়েকটির কথা আমি এখানে উল্লেখ করতে চাই। ক. সরকারী-বেসরকারী কোন প্রতিষ্ঠানে দেশীয় যোগাযোগের ক্ষেত্রে বাংলা ছাড়া অন্য কোন ভাষা ব্যবহার করা যাবে না। সংবিধানে যদি সেটি স্পষ্ট না থাকে তবে সংবিধান সংশোধন করতে হবে। খ. যেখানে বিদেশী ভাষা ব্যবহার অত্যাবশ্যক সেখানেও সেই ভাষার সঙ্গে বাংলা ভাষা ব্যবহার করতে হবে। গ. দেশের কোথাও কোন সাইনবোর্ড, ব্যানার, পোস্টার বা প্রকাশ্যে প্রদর্শিত হয় এমন সকল কিছুতে বাংলা ব্যবহার করতে হবে। এমনকি অন্য ভাষা ব্যবহার করা হলেও তাতে বাংলা ভাষা বাংলা হরফেই প্রকাশ করতে হবে। ঘ. বিশেষ প্রয়োজন ব্যতীত কোথাও বাংলা হরফ ছাড়া অন্য কোন হরফে বাংলা লেখা যাবে না। ঙ. উচ্চশিক্ষাসহ শিক্ষার সকল স্তরে শিক্ষার বাহন হিসেবে বাংলা ব্যবহার করতে হবে। বিদেশী ভাষায় বিশেষ বিষয় পড়ানো হলেও সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বাংলা শেখাতেই হবে। জ. বাংলাদেশের সকল দূতাবাসে বিদেশীদের বাংলা শেখার ব্যবস্থা করতে হবে। ঝ. ডিজিটাল যন্ত্রে ও ডিজিটাল রূপান্তরের নামে বাংলার বদলে অন্য কোন ভাষা ব্যবহার করা নিষিদ্ধ করতে হবে। ঞ. রাষ্ট্র বাংলা ভাষার উন্নয়নে সকল উদ্যোগ গ্রহণ করবে।

সুখবর : ২০১৬ সালের বইমেলার গিয়েছি মাত্র দুদিন। তবে প্রতিদিনই মিডিয়ায় বইমেলার খবর পড়ি। আগে যখন যেতাম তখন বুকের মাঝে একটা কষ্ট কাজ করত। কখনও কলকাতা পুস্তকমেলার সঙ্গে বা দুনিয়ার আর কোন বইমেলার সঙ্গে আমাদের নিজেদের মেলাটির তুলনা করার সাহস পেতাম না। এবার বইমেলা দেখে মনটা ভরে গেছে। কেবল মানুষের ঢলের জন্য নয়। বইমেলার প্রথম দিন থেকেই আগত দর্শকদের হাতে হাতে বই-এর প্যাকেট দেখে মনটা ভরে যাচ্ছে। আমার নিজের জন্য এটি এক অসাধারণ অনুভূতি। বইমেলার প্রতিটি সাইনবোর্ড, ব্যানার আর বইয়ের প্রতিটি বাংলা হরফ দেখে বুকটা উঁচু হয়। কার এমন সৌভাগ্য যে একটি বই মেলার সকল বাংলা হরফ আমারই হাতে তৈরি এ কথা বলতে পারে। একমাত্র আমি পারি। এবার আমার বিশ্বাস জন্মেছে- বাংলা হরফকে কেউ বিলুপ্ত করতে পারবে না।

ঢাকা, ১২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬

লেখক : তথ্যপ্রযুক্তিবিদ, দেশের প্রথম ডিজিটাল নিউজ সার্ভিস আবাস-এর চেয়ারম্যান, বিজয় কীবোর্ড ও সফটওয়্যারের জনক ॥

mustafajabbar@gmail.com, www.bijoyekushe.net, www.bijoydigital.com