১২ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

চিত্রাপারে আরেক সুন্দরবন

  • পরিবেশের জন্য শুভবার্তা ॥ স্রোতে ভেসে আসছে বীজ

স্টাফ রিপোর্টার, বাগেরহাট ॥ খরস্রোতা চিত্রা মরতে বসেছে। তবে তার দু’কূলজুড়ে এখন কেবলই সবুজের হাতছানি। নদীতে ভেসে আসা বীজ থেকে জন্ম হচ্ছে সুন্দরীসহ নানা প্রজাতির গাছপালা। বিভিন্ন পত্রিকার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে ‘আগামী ২০ বছরের মধ্যে সুন্দরবন থেকে সুন্দরী গাছ বিলুপ্ত হয়ে যাবে’। পরিবেশবিদরা আগাম এমনই সতর্কবার্তা দিয়েছেন। গত ৭ ফেব্রুয়ারি বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকায় এমনই প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পর বিষয়টি অনেককে ভাবিয়ে তুলেছে। ঠিক এমনই মুহূর্তে চিত্রার চরে প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা নতুন সুন্দরবনে দেখা যাচ্ছে আশার আলো। এখানে নতুনভাবে রাতারাতি বনাঞ্চল গড়ে উঠছে। সুন্দরবনের বিভিন্ন গাছপালা প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে উঠছে। পাশাপাশি যেখানে সেখানে গজিয়ে উঠছে সুন্দরীর চারা। সতেজ-সবুজ এসব চারাগাছ প্রকৃতির জন্য শুভবার্তা বহন করছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞ মহল। তবে সরকারীভাবে এ বনাঞ্চল রক্ষণা-বেক্ষণের অভাবে এসব গাছপালা কতদিন টিকে থাকবে সে ব্যাপারে সংশয় প্রকাশ করেছেন অনেকে।

সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, বদলে যাচ্ছে চিত্রা পাড়ের দৃশ্যপট। সুুন্দরবন থেকে চিত্রা নদী দিয়ে বিভিন্ন গাছের বীজ পানিতে ভেসে এসে এখানে নতুন গাছের জন্ম হচ্ছে। এখানকার বিস্তীর্ণ চর ও গ্রামজুড়ে গড়ে উঠছে সবুজ অরণ্য। সুন্দরবনের অসংখ্য প্রজাতির উদ্ভিদ, বন্যপ্রাণী ও বিভিন্ন প্রকার গাছের দেখা মিলেছে এখানে। পাশাপাশি মৌমাছিরা এখানে মধু আহরণ করতে তৈরি করছে মৌচাক। এছাড়া পাখিদের বসবাসের জন্য অভয়ারণ্য বলা চলে। গাছ, পাখি ও প্রাণীদের কারণে নতুন সুন্দরবন হিসেবে পরিচিতি লাভ করছে এলাকাটি। এতে আশার আলো দেখা যাচ্ছে। বিশ্ব ঐতিহ্যের অন্যতম ম্যানগ্রোভ বন হিসেবে এটি বিস্তৃতি লাভ করায় অনেকটা সম্ভাবনার দার খুলে যাচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞ মহল। এ বনের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ হতে যাচ্ছে। পাশাপাশি পরিবেশের জন্য এটি এখন আর্শিবাদ বলে মনে করছেন অনেকে। এ বনকে যথাযতভাবে রক্ষণা-বেক্ষণের দাবি জানিয়েছেন এলাকার সচেতন মহল। সম্প্রতি বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় ‘চিত্রার চরে আরেক সুন্দরবন’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পর থেকে বন বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট দফতরসহ এলাকাবাসীর মধ্যে ব্যাপক সাড়া পড়েছে। বিষয়টি নিয়ে উৎসাহ প্রকাশ করেছেন অনেকে। এছাড়া এ বনকে ঘিরে দর্শনার্থীদের ভিড় বাড়ছে। বিভিন্ন বন বিশেষজ্ঞ দল পরিদর্শন করেছেন। নতুন সুন্দরবনকে এক নজর দেখার জন্য দূর-দূরান্ত থেকে লোকজন ছুটে আসছেন এখানে।

জানা গেছে, সুন্দরবনের মূল ভূখ- থেকে প্রায় শত কিলোমিটার উত্তরে বাগেরহাট সদর উপজেলা ও চিতলমারী উপজেলার সদর ইউনিয়নের সীমান্ত ঘেঁষে বয়ে যাওয়া খরস্রোতা চিত্রা নদীর বিস্তীর্ণ চর ও আশপাশে নদীর দু’পাড়ে ২০-২৫টি গ্রামজুড়ে গড়ে উঠেছে এই বন। চিতলমারী উপজেলার সদর ইউনিয়নের রায়গ্রাম, শুরিগাতী, খিলিগাতী, করাতদিয়া, ডুমুরিয়া, ঝালডাঙ্গা, আড়ুলিয়া, খড়িয়াসহ গ্রায় ১০-১৫টি গ্রাম ও বাগেরহাট সদর উপজেলার উজলপুর, হদেরহাট, চাঁপাতলা, হালিশহর, খালিশপুর, সিঙ্গাসহ অসংখ্য গ্রাম মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে এখন বনাঞ্চলে পরিণত হয়েছে। এখানকার অধিকাংশ বাড়ির আঙিনাসহ আশপাশে আবাদি-অনাবাদি জমিতেও এখন গোলপাতা, কেওড়া, ওড়া, সুন্দরীসহ নানা প্রজাতির গাছ প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে উঠছে। এছাড়া নদীর দু’কূলজুড়ে চিত্রা নদীর বিস্তীর্ণ চর এলাকায় দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে গাছের সংখ্যা। বাঘ-হরিণের দেখা না মিললেও সুন্দর বনের নানা ধরনের বন্য প্রাণীর দেখা মিলেছে এখানে। এছাড়া এখানে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে অরণ্য। ঠিক যেন সুন্দরবনেরই একটা অংশ বলে মনে করা হচ্ছে। মেছো বাঘ, বাঘডাসা, খাটাশ, বিষধর সাপ, তক্ষক, বন বিড়াল, শিয়াল, গুইসাপসহ বিপন্ন প্রজাতির বন্যপ্রাণির বিচরণ ভূমিতে পরিণত হয়েছে এলাকাটি। মাছরাঙা, ঘুঘু, শালিক, টিয়া, বাদুুর, চামচিকা, পানকৌড়ি, বক, দোয়েল, ঘড়িয়াল, টুনটুনিসহ প্রায় অর্ধশত প্রজাতির পাখির সন্ধান মিলেছে এখানে। এসব পাখিদের কলকাকলিতে বন এখন মুখরিত। এছাড়া সুন্দরী, গোলপাতা, কেওড়া, ওড়াসহ নানা প্রজাতির গাছ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।

অসংখ্য প্রকার সুন্দরবনের উদ্ভিদ জন্মেছে এখানে। বর্তমানে এলাকার লোকজন তাদের নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে হাজার হাজার টাকার গোলপাতা বিক্রি করছেন এখান থেকে। এছাড়া জ্বালানিসহ প্রয়োজনীয় কাঠের চাহিদা মেটানো হচ্ছে এসব গাছ থেকে। পাশাপাশি এখানকার মনোরম দৃশ্য মুগ্ধ করছে অনেককে। বর্তমানে এখানকার প্রাকৃতিক পরিবেশ পুরোপুরি রূপ নিয়েছে সুন্দরবনে। প্রকৃতির এক অপরূপ লীলা ভূমিতে পরিণত হয়েছে এলাকাটি। বর্তমানে দর্শনার্থীরা এখানে আসতে শুরু করেছেন। এছাড়া এলাকার লোকজন অনায়াসে বাড়িতে বসে সুন্দরবনের মনোরম দৃশ্য উপভোগ করছেন। এ বিষয়ে বাংলা একাডেমি পদকে ভূষিত পরিবেশবিদ প্রাণি ও পাখি বিশেষজ্ঞ শরীফ খান জানান, বর্তমান সময়ে আমাদের পরিবেশ হুমকির মুখে। এ অবস্থায় সুন্দরবনে সুন্দরীসহ বিভিন্ন গাছপালা ও উদ্ভিদ বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। চিত্রার চরে প্রাকৃতিকভাবে যে বনাঞ্চল গড়ে উঠেছে এটিকে রক্ষা করতে পারলে বিলুপ্ত প্রজাতির পাখি ও প্রাণীদের জন্য আশ্রয়স্থল তৈরি হবে। পাশাপাশি পরিবেশের জন্য এসব গাছপালা খুবই উপকারে আসবে। এ ব্যাপারে সামাজিক বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা হারুন আর রশীদ মজুমদার জানান, চিত্রা পাড়ের এ বনাঞ্চলকে রক্ষার উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে। যেহেতু প্রাকৃতিকভাবে লোকালয়ে সুন্দরবনের গাছপালা জন্ম নিয়েছে এটি আমাদের পরিবেশের জন্য খুবই শুভবার্তা বয়ে এনেছে।