১৭ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় নাটকের আয়নায় জীবনের প্রতিচ্ছবি

‘উহ! পায়ে প্রচ- ব্যথা গো। আর পাহারা দিতে পারছি না। রাজামশাই এমন একখানা জুতো দিয়েছে যে, বাপ-দাদা চৌদ্দগোষ্ঠী এরমধ্যে ঢুকে যাবে। আহা! পায়ে ঠোসা পড়ে গেছে গো।’ রাজ্যের পাহারাদারের একটা জুতোর প্রয়োজন। রাতের আঁধারে রাজ্যের মাতাল সুইপারকে বেছে নিয়েছে জুতো চুরির হাতিয়ার হিসেবে। মাতাল অবস্থায় করা কোন কাজই মনে থাকে না সুইপারের।

রাজশাহী ইউনিভর্সিটি ড্রামা এ্যাসোসিয়েশন (রুডা) আয়োজিত পথনাটক উৎসবের উদ্বোধনী প্রদর্শনী ‘মহাবিদ্যা’ নাটকে ফুটে উঠেছে এমনই দৃশ্য। রাজ্যের নিম্ন শ্রেণীর এক পাহারাদারের দুরবস্থার চিত্র এটি। রাজ্যের সব কর্মচারীর জন্য একই মাপের ‘একান্নবর্তী’ জুতো। ছোট পা, বড় পায়ের কোন তোয়াক্কা করা হয়নি। আর তাতেই পাহারাদারের এ দুরবস্থা। এ যেন সমকালীন জীবনেরই প্রতিচ্ছবি।

তারপর! তারপর কী হলো? গাঁয়ের খুপরিঘরে স্বামীহীন নতুন বধূ। হাতে, নাকে, গলায় ভরপুর গয়না। এতসব রেখে খাটের নিচের একজোড়া নতুন জুতোর দিকেই চোখ পড়ে পাহারাদারের। সিঁধ কাটতে বলে মাতালকে। কিন্তু ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে চুরি অভিযানে ফ্যাগড়া বাধায় পাহারাদারের প্রভু কোতোয়াল। বিবাহিত মেয়ে-জামাইকে খুশি রাখতে তার দরকার গয়না। পাহারাদারকে হটিয়ে গয়নার পুঁটলিটা তার চাই-ই। সেজন্যই মাতালকে দিয়ে বড় সিঁধ কাটার ফন্দি আঁটে কোতোয়াল।

নাটকের প্রত্যেক দৃশ্যে ভেসে ওঠে পোকাধরা রাজ্যের অসুখী মানুষের দুরবস্থা, যেন সুখে নেই কেউ-ই। মাস শেষে বেতনের বদলে কোতোয়ালের হাতে আসে চাঁদার সিøপ। তাইত এমন অন্যায় পথে পা বাড়ানো। জীবনের চাকা থেমে থেমে চলছে তার। রাষ্ট্রের সব স্তরেই যার যার চাহিদানুযায়ী অপকর্মে লিপ্ত সবাই।

অন্যদিকে বসে নেই পাহারাদারও। তিনি চুরির খবর পৌঁছে দিয়েছেন কোতোয়ালের প্রভু দেওয়ান মশাইয়ের কানে। ঘটনাস্থলে দেওয়ান মশাই এসে হাজির। সবকিছুসহ নতুন বউটিই তার চাই। অবশেষে দেওয়ান মশাইয়ের হুকুমে বউ চুরি করতে সিঁধ কেটে ঘরে প্রবেশ করে মাতাল। দেখা যায় ঘরের বউটি আর কেউ নয়, স্বয়ং রাজামশাই। রাতের আঁধারে তিনি বউ সেজে চুরি করতে বের হয়েছেন রাজ্যের ঋণ পরিশোধ করার জন্য। পাহারাদারের উপস্থিতিতে পালিয়ে আর শেষরক্ষাটুকু করতে পারেননি।

তার যত অভিযোগ বিদেশী ঋণদাতাদের প্রতি। ‘না চাইতেই ঋণ দেবে আর দুদিন বাদেই ক্ষমতা থেকে নামিয়ে দেয়ার হুমকি’Ñ রাজামশাইয়ের ভাষ্য।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনার মুক্তমঞ্চে ভারতের বিখ্যাত নাট্যকার মনোজ মিত্রের রচনা ও জিল্লুর রহমান টিটনের নির্দেশনায় নাটকটি মঞ্চস্থ হয়। নাটকে উঠে এসেছেÑ মানুষের তীব্র লিপ্সা আর অভাববোধ পূরণের আকাক্সক্ষা। আর সে আকাক্সক্ষা পূরণে প্রত্যেকে যেন মেতে উঠেছে শোষণ, নিপীড়ন আর অত্যাচারকে হাতিয়ার বানিয়ে। বাদ পড়েনি রাজ্যের অধিকর্তাও। রাজ্যের ভেতর যেমন প্রভুরা চুষে খাচ্ছে, তেমনি নির্লিপ্ত ছিল না রাজ্যের বাইরের প্রভুরাও। ঋণের খড়গে শোষণ করে ছোট রাজ্যগুলোকে। চুরির ‘মহাবিদ্যায়’ লিপ্ত হয় সবাই।

‘ধরো হাত কণ্ঠে রাখো জোর, জীর্ণতার আঁধারে ভেঙ্গে আসবে ভোর’ সেøাগানে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) তিন দিনব্যাপী পথনাটক উৎসব শুরু হয়। গত ৬ তারিখ সকাল ১০টায় উৎসবের উদ্বোধন করেন রুডার সাবেক সহ-সভাপতি এনামুল কবির বিশ্বাস। এ উৎসবে তিন দিনে নয়টি নাটক মঞ্চস্থ হয়।

‘মহাবিদ্যা’ নাটকের নির্দেশক জিল্লুর রহমান টিটন চারুকলা অনুষদের সহকারী অধ্যাপক। নিজের নির্দেশিত নাটকটি পরম আনন্দ নিয়ে দেখছিলেন তিনি। মঞ্চের পাশেই কথা হলো তার সঙ্গে। বললেন, ‘নাটক আমাদের সমাজ, রাষ্ট্র ও জীবনের দর্পণের মতো। এর ভেতর দিয়ে আমাদের কাছে ভাল-খারাপ সব দিক স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এছাড়া নাটক সত্যের পথ সৃষ্টি করে। আমরা নতুনভাবে এগিয়ে যাই সে পথ ধরে। এগিয়ে যাওয়ার সাহস পাই দৃঢ় প্রত্যয়ে।’ বলতে বলতে আত্মপ্রত্যয়ের ছাপ ফুটে উঠল তার চোখ-মুখে।

নাটকটির স্বার্থকতা কোথায়- এমন প্রশ্নে বলেন, ‘নাটকটি মূলত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে রচিত। সময়ের বাস্তব চিত্র ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করা হয়েছে।’ কথায় কথা বাড়ে। সময় থেমে থাকে না। গোধূলিবেলার শেষ আভাটুকু মিলিয়ে গেল পশ্চিম আকাশে। প্যারিসরোডের গায়ে ভর দিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে গগনশিরিষ গাছ। তার উপর দিয়ে ঢুপ করে ডুব দিল সূর্যটা। কালের অতলে হারিয়ে গেল আরও একটি দিন। হারিয়ে গেল মহাকালের মতো করে। নাটকের আয়নায় দেখা গেল সেই মহাকাল।

মিঠু