২০ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ফুল বাণিজ্যে নতুন সম্ভাবনা

  • এস এম মুকুল

ফুল শ্রদ্ধা, ভালবাসা, বন্ধুত্ব ও মননশীলতার প্রতীক। উপহার, সংবর্ধনা, বিয়ে, গায়ে হলুদ, পূজা-পার্বণ এমনকি সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আনুষ্ঠানিকতায় ফুলের ব্যবহার এখন জনপ্রিয় ও সৌন্দর্যম-িত বিষয় বটে। আধুনিক সমাজে ফুলের বহুমুখী ব্যবহারের কারণে শুধু সৌখিনতায় নয়- ফুল এখন বিরাট অর্থকরী ফসল। সময়ের চাহিদার আলোকে দেশের অর্থনীতিতেও ফুলের অবদান ক্রমাগতভাবে বেড়েই চলেছে। কিন্তু বাংলাদেশে ফুলের বাণিজ্যিক প্রসার খুব বেশি দিনের নয়। ৯০ দশকের আগে দেশের ফুলের চাহিদার প্রায় পুরোটাই ছিল আমদানিনির্ভর। বর্তমানে দেশে উৎপাদিত ফুল দিয়েই চাহিদার প্রায় ৭০ শতাংশ মেটানো হচ্ছে। মাত্র দু’দশকের পথচলায় ফুল বাণিজ্য অভাবনীয় সাফল্য দেখিয়েছে। জানা গেছে, ১৯৮২-৮৩ অর্থবছর থেকে দেশে ফুল অর্থকরী ফসল হিসেবে বিবেচিত করা হচ্ছে। এরপর থেকে বাড়ছে ফুলের বাণিজ্য। বাড়ছে কর্মসংস্থান। দেশের গ-ি পেরিয়ে বিদেশেও রফতানি হচ্ছে বাংলাদেশের ফুল। আয় হচ্ছে বৈদেশিক মুদ্রা। দেখা দিয়েছে নতুন সম্ভাবনা।

বিশ্বে ফুল বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র

বিশ্বে ফুল বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র নেদারল্যান্ডসের রাজধানী আমস্টারডাম থেকে ১৩ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে শত বছরের ঐতিহ্যবাহী ফুল বিক্রয় ও প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র ফ্লোরাহল্যান্ড। আন্তর্জাতিক নিলামের মাধ্যমে প্রতিদিন বেচাকেনা হয় ২ কোটি ১০ লাখ ফুল। বিশ্বজুড়ে বিক্রীত ফুলের প্রায় ৫২ শতাংশ রফতানি হয় এ বাজার থেকে। ভালবাসা দিবসের আগে সপ্তাহজুড়ে সেখানে হাট বসে কোটি কোটি গোলাপ, টিউলিপ ও অন্যান্য ফুলের। শুধু ফুল নয়, এ মৌসুমে চাহিদা বাড়ে হোম প্লান্টেরও। প্রায় ২ কোটি গাছ বিক্রি হয় এ সময়। ফুলের রানী শুধু নয়, ভালবাসার চিহ্ন হিসেবেও প্রথমেই বেছে নেয়া হয় গোলাপ, বিশেষ করে লাল গোলাপ। ১৩ হাজারকর্মীর কর্মতৎপরতায় মুখর হয়ে ওঠে এক বর্গকিলোমিটার আয়োজনের বিশাল এই ক্ষেত্র। উত্তর আমেরিকায় ফুলের সবচেয়ে বড় নিলাম অনুষ্ঠিত হয় কানাডার বারনাবির সাউথওয়েস্ট গার্ডেন সাপ্লিয়াসে। বছরে ভ্যালেন্টাইনস ডে ও মাদারস ডেতেই কানাডায় কাটতি হয় ১৫ কোটি ফুলের। ১২ ফেব্রুয়ারি ভারতের ব্যাঙ্গালুরু ফুলের বাজারে বসে লাল গোলাপের মেলা। প্রায় ৫০ লাখ গোলাপ আসে অন্ধ্র প্রদেশ, তামিলনাডু, কেরালা, মহারাষ্ট্র, পশ্চিমবঙ্গ ও দিল্লী থেকে। ১৪ ফেব্রুয়ারি চীনের ইউনান প্রদেশের রাজধানী কুনমিংয়ের দাওনান ফ্লাওয়ার মার্কেটের ব্যস্ততা থাকে মধ্যরাত থেকে ভোর ৪টা অবধি। এখান থেকে প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ৪ লাখ ফুল চীন ও বহির্বিশ্বের বাজারে সরবরাহ করা হয়। বিশ্ব ভালবাসা দিবস, শহীদ দিবস বা ২১ ফেব্রুয়ারি, নববর্ষ এসব দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশজুড়েও শত কোটি টাকার ফুল বাণিজ্য হয়। এসব আয়োজনকে সামনে রেখে ফুলের রাজধানী যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার গদখালীতে ফুল বিক্রির ধুম পড়ে যায়।

ফুলের রাজধানী- গদখালী

যশোর থেকে বেনাপোলের দিকে যেতে ছোট জনপদ গদখালী। ঝিকরগাছা উপজেলা সদর থেকে পশ্চিমে অবস্থিত এই জনপদটির মাঠের যেদিকে চোখ যায় শুধু ফুল আর ফুল। এখানকার প্রায় ৪০টি গ্রামে উৎপাদিত হয় রজনীগন্ধা, গোলাপ, গ্ল্যাডিওলাস ও জারবেলাসহ বিভিন্ন ফুল। অন্যান্য অর্থকরী ফসলের পাশাপাশি ফুল চাষ করেও যে ব্যাপক সাফল্য পাওয়া যায় তা করে দেখিয়েছেন গদখালীর মানুষ। ফুলচাষে শের আলী সরদারের ব্যাপক অবদানের জন্য তাকে স্থানীয়ভাবে ফুলচাষের জনকও বলা হয়। সারাদেশে যে ফুল উৎপন্ন হয় তার অন্তত ৭০ ভাগ হয় এই গদখালীতেই। আশির দশকে যে গদখালীতে এক বিঘা জমিতে ফুলের চাষ হয়েছিল সেখানে এখন প্রায় ১৮শ’ বিঘা জমিতে ফুলের চাষ হচ্ছে। তবে ঝিকরগাছার গদখালী এলাকা ছাড়াও পার্শ্ববর্তী শার্শা উপজেলাতেও ফুল চাষ ছড়িয়ে পড়েছে। তবে ফুলচাষীরা বলছেন- বর্তমানে ওই এলাকায় প্রায় ৪ হাজার বিঘা জমিতে ফুলের চাষ হচ্ছে। এসব জমি থেকে ভরা মৌসুমে প্রতিদিন অন্তত ২ লাখ রজনীগন্ধার স্টিক, ৪ লাখ গাঁদা ফুল, ৩০ হাজার গোলাপ, ৫০ হাজার গ্ল্যাডিওলাস ফুলের স্টিক উৎপন্ন হয়। অন্যান্য ধরনের ফুল উৎপন্ন হয় প্রায় ৩০ হাজার।

রফতানি বাজারে সম্ভাবনার হাতছানি

বিশ্ব ফুলের বাজারে চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় ফুল বাংলাদেশের রফতানির তালিকাতেও স্থান করে নিয়েছে। দেশে বাণিজ্যিকভিত্তিতে ফুল ও বাহারি লতাপাতার গাছ উৎপাদন স্থানীয়ভাবে বাজারজাতকরণ এবং রফতানির তালিকায় একটি সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে আশা জাগিয়েছে। জানা যায়, ১৯৯১-৯২ বছর থেকে ফুল রফতানির জন্য উদ্যোগ নেয়া হয়। রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর সূত্র মতে, ১৯৯৩-৯৪ অর্থবছরের ১২ হাজার টাকা, ১৯৯৪-৯৫ সালে ১৬ হাজার টাকা ফুল রফতানি হলেও ২০০৫ সালে রফতানির পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়ে ৪০০ কোটিতে দাঁড়ায়। ২০০৮-২০০৯ অর্থবছরে এদেশ থেকে ফুল রফতানি হয়েছিল ২৭৬ কোটি ৯ লাখ টাকা, ২০০৯-২০১০ সালে ৩২৬ কোটি ৬৮ লাখ টাকা এবং ২০১০-২০১১ সালে ৩৬২ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। বাংলাদেশের কাঁচাফুল মধ্যপ্রাচ্য, মালয়েশিয়া, ব্রিটেন, পাকিস্তান, ভারত, ইতালি, কানাডা, চীন, সিঙ্গাপুর, নেদারল্যান্ড, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও ফ্রান্সে রফতানি করা হচ্ছে। বিশ্বে ১৬ হাজার কোটি ডলারের বিশাল ফুলের বাজারে আরও বড় আকাড়ের রফতানি প্রবেশের সুযোগ অপেক্ষা করছে বাংলাদেশের জন্য। তবে উদ্যোক্তাদের অভিমত, কাঁচাফুল রফতানি করে ৫০০ কোটি টাকা আয় করা সম্ভব।

জীবিকা, চাষাবাদ ও হাট-বাজার

বর্তমানে বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় প্রায় ১২ হাজার হেক্টর জমিতে ফুলের চাষ করা হচ্ছে। বছরে দেশে ৭৮৪ কোটি টাকার ফুলের বাণিজ্য হয়। তার মধ্যে অভ্যন্তরীণ ফুলের বাজার আছে ৪০০ কোটি টাকা। সারাদেশে খুচরা বিক্রেতার সংখ্যা প্রায় ২০ হাজার দেশের ২০টি জেলায় বিভিন্ন জাতের বিপুল পরিমাণ ফুল উৎপাদিত হচ্ছে। প্রায় ২০ লাখ মানুষ ফুল চাষের সঙ্গে জড়িত। ফুল চাষে অনেক সমস্যা ও সীমাবদ্ধতা থাকলেও মানুষ ফুল চাষে আগ্রহী হচ্ছে। ঢাকা ফুল ব্যবসায়ী কল্যাণ বহুমুখী সমবায় সমিতির তথ্যানুযায়ী, সারা ঢাকায় ফুটপাথসহ অভিজাত ফুল বিক্রয়কেন্দ্রের সংখ্যা এখন প্রায় এক হাজার। আর সারাদেশে এই সংখ্যা চার হাজারের বেশি। বাংলাদেশে ফুল চাষে অগ্রগামী যশোর ও ঝিনাইদহ। জানা যায়, দেশের মোট ফুল চাষের সিংহভাগই এ জেলা দুটি থেকে আসে। এখানকার ফুল ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেটসহ দেশের ৫৪টি জেলায় পৌঁছে যাচ্ছে। আশার খবর হলোÑ বর্তমানে নতুন করে মুন্সীগঞ্জ, ঢাকা ও বগুড়াও ফ্লাওয়ার জোন হিসেবে গড়ে উঠছে। ফুল কেনাবেচাকে কেন্দ্র করে দেশে গড়ে ওঠছে অসংখ্য ছোটবড় বাজার ও দোকান।

কলাম লেখক ও উন্নয়ন গবেষক