১৫ নভেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বেনারসি ॥ প্রযুক্তির কাছে অসহায়

  • আলাউদ্দিন আরিফ

ঢাকার মিরপুরের বেনারসি শাড়ি দেশের গণ্ডি পেরিয়ে খ্যাতি অর্জন করেছে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে। শোনা যায় মুম্বাইয়ের বিখ্যাত ‘দেবদাস’ সিনেমার জন্যও মিরপুর থেকে নেয়া হয় বেনারসি শাড়ি। ফুলকলি কাতান, দুলহান কাতান, মিরপুরি রেশমি কাতান, মিলেনিয়াম কাতান, বেনারসি কসমস, অরগেন্ডি কাতান, রিমঝিম কাতান, প্রিন্স কাতান, টিস্যু কাতান, মিরপুরী গিনিগোল্ড কাতান, জর্জেট গিনি গোল্ড কাতান, চুনরি কাতান, অপেরা, ফিগা কত যে বাহারি নাম। দামের বহরও বেশ চওড়া। দাম আড়াই-তিন হাজার টাকা থেকে তিন লাখ টাকা পর্যন্ত। এই বেনারসী এখন মার খাচ্ছে ভারতীয় শাড়ির কাছে। হাতে চালিত তাঁতগুলোর তুলনায় অনেক কম খরচে বিদ্যুতচালিত তাঁতে বেনারসি তৈরি হয়। প্রযুক্তির কাছে মার খাচ্ছে বেনারসির ঢাকাইয়া ঐহিত্য। দেখতেও আকর্ষণীয় চকচকে হওয়ায় মানুষ সেগুলোতে হামলে পড়ছে। কিনে প্রতারিতও হচ্ছে। মিরপুরের বেনারসি পাড়ার দোকানগুলোতেও এখন ভারতীয় খারাপ মানের শাড়িতে সয়লাব। সেখান থেকেও শাড়ি কিনে ঠকছেন অনেকে। এই প্রেক্ষিতে মিরপুরের বেনারসিকে দেয়া প্রয়োজন সরকারী বেসরকারী প্রণোদনা। জানা গেছে, বেনারসি শাড়ি বিশ্বের অল্প কয়েকটি জায়গাতেই তৈরি হয়। সেগুলো হচ্ছে বাংলাদেশের মিরপুর, ভারতের বেনারস, বিহার, উত্তরপ্রদেশ। এছাড়া পাকিস্তানে সীমিত পরিসরে কিছু বেনারসি শাড়ি তৈরি হয়।

বেনারসির বাহারি রূপ দেখে বোঝার উপায় থাকে না এগুলো তৈরির নেপথ্য কারিগরদের দুঃখ গাথা। নিদারুণ কষ্ট স্বীকার করে শুধু বেঁচে থাকার তাগিদে বেনারসি শ্রমিকরা রাত-দিন পরিশ্রম করেন। অক্লান্ত পরিশ্রম শেষে যে বেতন পান সেটাও খুবই সামান্য। তাদের নেই কোন বেতন কাঠামো, নেই ন্যায্য পারিশ্রমিক। ফলে দিন দিন মিরপুরের বেনারসি পল্লীতে তাঁতের সংখ্যা কমছে। তাদের মজুরি গার্মেন্ট শ্রমিকদের চেয়েও অনেক কম। ফলে শ্রমিকরাও বেনারসি তৈরির পেশা ছেড়ে চলে যাচ্ছেন অন্য পেশায়। সরকারীভাবে বেনারসি পল্লীর উন্নয়নে বেশ ক’টি প্রকল্প নেয়া হলেও সেগুলো বাস্তবায়িত হয়নি। সরকারের অবহেলা, বড় ধরনের বিনিয়োগ না হওয়া, দুর্বল অবকাঠামো, চকচকে নিম্নমানের ভারতীয় শাড়ির দাপট, সুতার অনিয়ন্ত্রিত দাম, নকল ও ভেজাল রং এবং রাসায়নিক দ্রব্য, নকশা ও বুনন সম্পর্কে আধুনিক কারিগরি উৎকর্ষতার অভাব, কাঁচামালের দাম দিন দিন বেড়ে যাওয়া, বিদেশী শাড়ির ব্যাপক আমদানি, তাঁতীদের আর্থিক সঙ্কট, বাজারজাতকরণের সমস্যা প্রভৃতি কারণে বেনারসি হারাচ্ছে তার ঐতিহ্য। পাওয়ার লুমে তৈরি চাকচিক্যময় শাড়ি বেনারসির তুলনায় অনেক কম দামে পাওয়ার কারণে মানুষ এখন আসল বেনারসির বিকল্প শাড়ির দিকে আগ্রহী হচ্ছে। খোদ বেনারসি পল্লীতেও পাওয়ার লুমে তৈরি ভারতীয় নিম্নমানের শাড়িতে সয়লাব হয়ে আছে। বিক্রেতারাও এসব শাড়ি মিরপুরের বেনারসি শাড়ি বলে বিক্রি করে গ্রাহকদের ঠকিয়ে আসছে। অনেকে তুলনামূলক কম দামে পেয়ে নিম্নমানের ভারতীয় শাড়ি আসল বেনারসি মনে করে কিনে নিচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এই দুর্বৃত্তায়ন বন্ধ না হলে বেনারসি তার ঐতিহ্য ও মানুষের আস্থা হারাবে। কারণ পাওয়ার লুমের শাড়ি বৈধ-অবৈধ পথে, বিনাশুল্কে চোরাইপথে আসায় দাম কম পড়ছে। ফলে দাম ও চাকচিক্যের প্রতিযোগিতায় হেরে যাচ্ছে বেনারসি। তার ওপর সরকার প্রতি বছরই বেনারসির কাঁচামাল সুতা বা সিল্কের ওপর নতুন নতুন কর ও ভ্যাট আরোপ করে যাচ্ছে। ফলে মার খেতে বসেছে এই বেনারসি শিল্প।

বেনারসি শাড়ি সংশ্লিষ্টরা জানান, ঐতিহ্যবাহী বেনারসি শিল্পের স্বর্ণালী দিন ফিরিয়ে আনার জন্য প্রয়োজন সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা। আর তা না হলে হয়তো মসলিনের মতো বেনারসিও হারিয়ে যাবে আর ঠাঁই নেবে পাঠ্যপুস্তক কিংবা জাদুঘরের উপকরণ হিসেবে।