২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সাংসদেরা হবেন দরিদ্র, সংখ্যালঘু ও আক্রান্তের রক্ষক -মমতাজ লতিফ

চাকরিতে থাকার সময় আমাদের সবরকম কর্মসূচীর, কি সরকারী কি বেসরকারী, লক্ষ্য ছিল- দরিদ্র ও অসুবিধাগ্রস্ত নারী, পুরুষ ও শিশু। কিন্তু কর্মসূচী বাস্তবায়নকালে দেখেছি- প্রকৃত টার্গেট বা সেবা-গ্রহীতার কাছে নির্দিষ্ট করা সেবাগুলো পৌঁছানো কি কঠিন কাজ? সরকারের প্রতিষ্ঠানে, বিশেষ করে শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডে, শিক্ষাক্রম, বিষয়বস্তু, পাঠ্যবইয়ের পা-ুলিপি প্রণয়নের সময় প্রাণপণ চেষ্টা করেছি যাতে শিক্ষাক্রম ও বিষয়বস্তু দরিদ্র শিশুদের কাছে ‘নিজে নিজে শেখার চাবি’ হতে পারে। শিক্ষকদের প্রশিক্ষণে মডেল পাঠ উপস্থাপন করে দেখিয়েছি, প্রশিক্ষণ ভিডিও তৈরি করেও শিক্ষকের পাঠদানের উন্নয়নের চেষ্টা করেছি, স্কুলের পাশে ক্ষেত, গাছ, পুকুর, নদী, কৃষক, তাঁতি, এমনকি স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাকে পাঠে ব্যবহার করেছি শিশুদের দেখার দৃষ্টির সঙ্গে সঙ্গে জ্ঞানের উৎস এবং ‘কেন, কি, কিভাবে হয়’ সে দক্ষতা আয়ত্ত করে তা ব্যবহার করতে পারার উদ্দেশ্যে। এখন ভাবলে অবাক লাগে, সে সময় পঞ্চান্ন মিনিটের ঐ প্রশিক্ষণ ভিডিওতে মুক্তিযোদ্ধার মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে কথা বলার পাঠটি প্রদর্শন বন্ধ করে দেয় সে আমলের শিক্ষকদের মুক্তিযুদ্ধবিরোধী প্রশিক্ষকের একটি দল।

আমার বিরুদ্ধে শতাধিক জামায়াতী শিক্ষক প্রশিক্ষকের স্বাক্ষর করা অভিযোগপত্রও এনসিটিবির চেয়ারম্যান বরাবর পাঠানো হয়েছিল যা উর্ধতন কর্তৃপক্ষ আমলে নেননি, কাউকে জানানওনি। ঘটনাচক্রে আমি দরখাস্তটি দেখে ফেলেছিলাম। যা হোক, এসব বৃত্তান্ত এ লেখার জন্য অপ্রয়োজনীয়, কিন্তু এ বিষয়টির অবতারণা করলাম এ কারণে যে, আমরা খুবই প্রতিকূল পরিবেশে একটুও বিচলিত বোধ না করে ঐ গ্রামের অপুষ্ট দরিদ্র শিশুদের শিক্ষার মানটা গ্রামের স্কুল শিক্ষকের সাহায্যে এবং তারা নিজে নিজেই যাতে অনেকটা ভাল ভাষা ও গাণিতিক এবং বিজ্ঞানের দক্ষতা শিখতে পারে, তার আন্তরিক চেষ্টা করেছি। তেমনই মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী সাংসদেরা হবেন দরিদ্র, সংখ্যালঘু ও আক্রান্তের রক্ষকÑ এটিই তাদের প্রধান শপথ, এ কথা মনে রাখতে হবে।

বর্তমানে ২০০৮ থেকে জনগণ বুঝতে পেরেছে দেশে তাদের ভাগ্যোন্নয়ন ঘটবে একমাত্র যে দল এ দেশের স্বাধীনতা এনেছে, যে দলের নেত্রী বঙ্গবন্ধুর কন্যা, যিনি দরিদ্র, অসহায়, আক্রান্তদের রক্ষক এবং দুর্নীতিবাজ, জঙ্গী, জেহাদী খুনী ও যুদ্ধাপরাধীদের দমনকারী। প্রশ্ন উঠেছেÑ এমন দলের সাংসদেরা কি প্রধানমন্ত্রীর চরিত্র ও নীতি অনুসরণ করে তাদের স্ব স্ব এলাকায় দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন করছেন কি?

আমার জানা নেই, সাংসদদের টার্মস অব রেফারেন্স বা দায়িত্ব, কর্তব্য কোন বই-পুস্তকে লেখা আছে কিনা। তবে সাংসদেরা স্ব স্ব এলাকার সমস্যাগুলো সম্পর্কে খুব স্বাভাবিকভাবেই অবহিত থাকবেন এবং সেগুলোর সমাধানের ‘কথা’ দিয়েই তো এলাকার জনগণের কাছে নিশ্চয় তারা ভোট প্রার্থনা করেছেন। বিজয়ী হওয়ার পর তাদের আরেকবার স্মরণ করতে হবে দরিদ্র, সংখ্যালঘু ও আক্রান্তদের কথা। কেননা ভোট প্রার্থনা করার সময় মানুষের মনে যে নমনীয়তা, বিনয় থাকে সেটি ভোট লাভ করে নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পর অবশ্যই ফিকে হয়ে যায়। ক্রমশ দিন যত যেতে থাকে, বিজয়ীরা সংবর্ধনা, ফুলের মালার সঙ্গে সঙ্গে যখন ‘রাষ্ট্র ক্ষমতা’র অংশীদার হতে থাকেন, তখন সত্যিই দরিদ্র, দীন, ক্ষমতাহীন নারী, পুরুষ, শিশুÑ যাদের কাছে সরকারের সবরকম সেবা পৌঁছে দেয়ার দায়িত্ব তাদের, তাদের মুখগুলো অস্পষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু এটি একেবারেই গ্রহণযোগ্য নয়। তাই সাংসদেরা আরেকবার স্মরণ করুনÑ

১. আপনাদের সব ক্ষমতার উৎস জনগণ, অর্থাৎ ঐ দরিদ্র নারী, পুরুষ, শিশুদের এক মুহূর্তের জন্যও ভুলে যাবেন না। স্মরণ রাখবেন, আপনার পরিবার-পরিজনের সেবার জন্য আপনি সাংসদ হননি, আপনার হাত দিয়ে সরকারের সব সেবা, আপনাকে ভোট দিয়েছে যারা, এমন কি যারা ভোট দেয়নি কিন্তু জীবন সংগ্রামে সমস্যায় পড়েছেÑ তাদের কাছে পৌঁছে দেয়া আপনার কাছে ধর্মীয় নির্দেশের সমান পবিত্র দায়িত্ব ও কর্তব্য।

প্রতিদিন একবার স্মরণ করুনÑ লাখ লাখ যুবক, শ্রমিক, কৃষক, ছাত্র, শিক্ষক, পেশাজীবী এ দেশকে স্বাধীন করার জন্য মানুষের সবচেয়ে প্রিয় প্রাণটিকে স্বাধীনতার বেদিতে উৎসর্গ করেছিল বলে আজ আপনি সাংসদ হয়েছেন।

২. সবসময় মনে রাখুনÑ এ দেশটির নাগরিক-হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রীস্টান, আদিবাসী- সবার অধিকার সমান। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সবচাইতে গৌরবজনক বৈশিষ্ট্য হচ্ছেÑ এটি একটি অসাম্প্রদায়িক ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র। অর্থাৎ রাষ্ট্র আধুনিক এবং সংসদে পাস হওয়া আইন দ্বারা পরিচালিত হবে আর ধর্ম পালিত হবে ব্যক্তির জীবনে, পরিবারে, নিজ নিজ ধর্মের রীতি অনুযায়ী- এখানে রাষ্ট্র হস্তক্ষেপ করবে না। এক কথায়- ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার।

৩. স্মরণ রাখুন, চার লাখ বীরাঙ্গনা স্বাধীনতার বেদিমূলে সম্ভ্রম দিয়েছে। তাদের, শহীদ পরিবারের স্ত্রী, সন্তানদের জীবন ধারণের জন্য সরকার প্রদত্ত ভাতা, চিকিৎসা, শিক্ষাবৃত্তি, ইত্যাদি কৃষক-শ্রমিকের প্রাপ্য সুবিধাগুলো সঠিকভাবে দ্রুত সময়ের মধ্যে পৌঁছে দিন। আমাদের একবেলা আহার বাদ গেলে কত কষ্টবোধ করি। অথচ তারা দিনে এক বেলা খেতে পেলেই খুশি থাকে। অনেকে দিনের পর দিন না খেয়ে থাকতে বাধ্য হয় যেহেতু কাজ নেই, কাজ না থাকলে আয় হয় না- এ তো জানা কথা।

৪. আপনাদের হাত দিয়ে সম্ভবত ভিজিএফ, ভিজিডি কার্ডসহ সরকারের আরও নানা সুবিধা এলাকার দরিদ্রদের কাছে পৌঁছানোর কথা। এ বিষয়ে নানাজনের মুখে খুবই অপমানজনক কথা শোনা যায়, যা আমি কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারি না, করতে চাই না। এটা হতে পারে না যে, এলাকার জনপ্রতিনিধিরা দরিদ্রের জন্য বরাদ্দ চাল, গম, টিন, ভাতা ইত্যাদির একটি অংশ নিজেরা গ্রহণ করে তা বিক্রি করে অর্থ আয় করেন। এর চাইতে অবমাননাকর জনপ্রতিনিধিদের জন্য আর কোন কাজ পৃথিবীতে আছে বলে মনে করি না। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, নিশ্চয় আমাদের কোন সাংসদ এত নীচ কাজ করে সমাজে, এলাকায় নিজেকে অসম্মানিত করেন না।

৫. সাংসদদের স্মরণ করতে বলব- তাদের ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেছেন হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রীস্টান ও আদিবাসীরাও। যারা সবসময় মুক্তিযুদ্ধের প্রার্থীদের স্থানীয় যুদ্ধাপরাধী-মিত্র দুর্বৃত্ত-গু-াদের হাতে তাদের জীবন, জীবিকার ওপর চরম হামলা, নারী ধর্ষণ, খুন, নির্যাতন সহ্য করেও আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের জয়ী করেছে। তাদের জীবন-জীবিকা, জমি, বসতভিটা, পুকুর, মন্দির, গির্জার দেবোত্তর সম্পত্তির ওপর তাদের মালিকানা সংরক্ষণে প্রয়োজনে কঠোর ও দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করবেন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী দলের, বঙ্গবন্ধুর দ্বারা সূচিত অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির অনুসারীদের আর যাই হোক, কোনক্রমেই হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রীস্টান-আদিবাসীর ভূমি, ক্ষেত, বসতভিটা, মন্দির, গির্জার ভূমি দখল বা ক্যাডার দ্বারা ভয়ভীতি প্রদর্শন করে কম মূল্যে বিক্রি করতে বাধ্য করা একেবারেই সাজে না। এই মানবতাবিরোধী অপরাধ একমাত্র বঙ্গবন্ধুর, শেখ হাসিনার এবং অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির শত্রুরাই সংঘটিত করতে পারে বলে সবার বিশ্বাস। আর মুক্তিযুদ্ধপন্থী দলে থেকে যদি কোন সাংসদ, নেতাকর্মী এই কলঙ্কজনক ঘটনা ঘটান, তাহলে প্রমাণ হয় তারা বঙ্গবন্ধুর এবং শেখ হাসিনার অসাম্প্রদায়িক রাজনীতিতে বিশ্বাসী নন বরং সাম্প্রদায়িক রাজনীতিতে বিশ্বাসী। তারা বঙ্গবন্ধুর মুখে, শেখ হাসিনার মুখে এবং সর্বোপরি অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির মুখে চুনকালি মাখাচ্ছেন। আমি বিশ্বাস করি না, করতে চাই না যে বঙ্গবন্ধুর ’৭২-এর সংবিধানে দেশকে ফিরিয়ে আনতে যারা শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রতি আস্থা রেখে সরকারী দলের সাংসদদের বিজয়ী করতে অবদান রেখেছে, সেই বিজয়ী সাংসদেরা স্ব স্ব এলাকার হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রীস্টান ও আদিবাসীদের দখল হয়ে যাওয়া জমি ফেরতের ব্যবস্থা দ্রুত গ্রহণ করছেন না। এ ব্যবস্থা তো তারা নেবেনই, নিশ্চয় নিচ্ছেন, উপরন্তু তাদের জানমালের সুরক্ষা দিতে যা যা করণীয় তা করবেন। অনেক বেশি দেরি হয়ে যাওয়ার আগে, নাক কাটা পড়ার আগে।

সাংসদেরা একটি শপথ নিয়ে নিজেদের গৌরবান্বিত করতে পারেন- স্ব স্ব এলাকাকে মুসলিম-সংখ্যালঘু-ধর্ষণ, বাল্যবিয়ে, যৌতুক, অপহরণ, খুন-মুক্ত এলাকায় পরিণত করতে পারেন। শিক্ষার মান বৃদ্ধি খুবই দুরূহ কাজ, কিন্তু একটি এলাকার রাস্তাঘাট, সেতু নির্মাণ, বাল্যবিয়ে বন্ধ করা, জন্মনিবন্ধন করা, দরিদ্র ও সংখ্যালঘুর জমি দখল বন্ধ করা, সব ধর্মের নারীর ধর্ষণ, অপহরণ ও খুন বন্ধ করা, যৌতুক দেয়া-নেয়া বন্ধ করা কিন্তু অনেক সহজ কাজ, যদি সাংসদের আন্তরিক ইচ্ছা থাকে। প্লিজ এ কাজগুলো করে নিজেদের গৌরবান্বিত করুন। এর ফলে আপনার সম্মান আকাশকে স্পর্শ করবে!

এর পাশে, সরকার প্রধান একটি প্রতিযোগিতার আয়োজন করতে পারেন। যদি কোন সাংসদের এলাকায় হিন্দু ও সংখ্যালঘু এবং দরিদ্র মুসলিম পরিবারের কোন ভূমি দখল হয়নি এবং দখল হওয়া জমি ফেরত দেয়া হয়েছে, কোন সাংসদের এলাকায় এক বছরে কোন মুসলিম বা সংখ্যালঘু ধর্ষিতা হয়নি, কোন বালক-যুবক-শিশু-নারী অপহরণের শিকার ও খুন হয়নি, কোন এলাকায় যৌতুকের কারণে এক বছরে কোন নারী খুন হয়নি, বাল্যবিয়ে হয়নি, সেই সাংসদকে ‘বছরের শ্রেষ্ঠ সাংসদ’ পুরস্কারে ভূষিত করতে পারেন। এটি করা হলে সার্বিক পরিস্থিতির অনেকটাই উন্নতি হবে বলে মনে করি।

সবশেষে সাংসদদের বলব, যখন ধর্ষিতা, ভূমি দখল হয়ে যাওয়া হিন্দু-সংখ্যালঘুকে তাদের কারা ধর্ষণ করেছে বা কারা তাদের ভূমি দখল করেছেÑ জানতে চাইলে ওরা যখন অদূরে থাকা প্রতিবেশী, ক্ষমতাশালীদের দুর্বৃত্ত-গু-াদের ভয়ে নীরব থাকে অথবা বলে ‘কেউ না’- তখন কিন্তু প্রধানমন্ত্রী, সরকারের সব সাংসদ এবং আমরা শিক্ষিত অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির সমর্থক বুদ্ধিজীবী ও সব রাজনীতিক চূড়ান্তভাবে পরাজিত হই। নিজেদের পরাজিত হতে দেবেন না। আপনারা নিজেরা গৌরবান্বিত হওয়ার একবার সুযোগ পেয়েছেন, সেটিকে হেলায়, নীচ কাজ মনে করে ধ্বংস করবেন না। সুযোগ কিন্তু বার বার আসে না।