২০ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুত

নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুত
  • প্রয়োজনে সার কারখানা বন্ধ ও সিএনজিতে রেশনিং

স্টাফ রিপোর্টার ॥ সেচে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুত সরবরাহে গ্যাসের পর্যাপ্ত সরবরাহ দিতে অপারগতা প্রকাশ করেছে পেট্রোবাংলা। রবিবার বিকেলে বিদ্যুত জ্বালানি এবং খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে পেট্রোবাংলা পিডিবির চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুত সরবরাহে অপারগতার কথা জানায়। যদিও মন্ত্রণালয় সিএনজি স্টেশন এবং সার কারখানা বন্ধ রেখে বিদ্যুত কেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহ করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছে। অন্যদিকে বিদ্যুত বিভাগের অপর এক বৈঠকে ইন্টারনেট এবং ডিশ লাইনের ঝুলন্ত তার কেটে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

রবিবার বিদ্যুত বিভাগের বৈঠক সূত্র জানায়, এবার সেচ মৌসুমে সর্বোচ্চ বিদ্যুত চাহিদা নির্ধারণ করা হয়েছে আট হাজার মেগাওয়াট। এ জন্য পিডিবির তরফ থেকে দৈনিক এক হাজার ২৬০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের সরবরাহ চাওয়া হয়েছে। তবে পেট্রোবাংলা বলছে তাদের পক্ষে বিদ্যুত উৎপাদনে দৈনিক ৯১৪ মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি গ্যাস দেয়া সম্ভব নয়। বৈঠকে পিডিবির তরফ থেকে বলা হচ্ছে প্রায় সাড়ে ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের সরবরাহ কমে বিদ্যুত কেন্দ্রে সঙ্কট বাড়বে। এতে সেচে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ বিঘিœত হবে। বৈঠকে বিদ্যুত প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু বলেন, যে করেই হোক অতীতের মতো সেচে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুত সরবরাহ করা হবে। এ জন্য প্রয়োজনে সার কারখানা বন্ধ এবং সিএনজিতে রেশনিং করা হবে। এ জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে তিনি পেট্রোবাংলাকে নির্দেশ দেন।

ডিসেম্বর থেকে সেচ মৌসুম শুরু হলেও মার্চ থেকে এপ্রিলের শেষ পর্যন্ত সেচে বিদ্যুত চাহিদা বেশি থাকে। একই সময়ে গ্রীষ্ম মৌসুম থাকায় বিদ্যুতের চাহিদাও সর্বোচ্চ পর্যায়ে থাকে। এবার সেচসহ গ্রীষ্মের সর্বোচ্চ বিদ্যুতের চাহিদা নির্ধারণ করা হয়েছে আট হাজার মেগাওয়াট। তরল জ্বালানি এবং গ্যাস চালিত বিদ্যুত কেন্দ্র কেন্দ্রগুলো পুরোদমে না চালালে সঙ্কট সামাল দেয়া কঠিন হবে। বৈঠক সূত্র বলছে গত বছর বা তার আগের বছরগুলোতেও গ্রীষ্ম মৌসুমে শহরাঞ্চলে সরবরাহ অনেকটা স্বাভাবিক ছিল। সরকার সারাদেশে স্বাভাবিক সরবরাহের কথা বললেও গ্রামে চাহিদা এবং সরবরাহে মারাত্মক ঘাটতি ছিল। এই অবস্থায় পেট্রোবাংলা পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ না দিতে পারলে গ্রীষ্মে লোডশেডিংয়ের কবলে পড়তে হবে।

এখন সিএনজি স্টেশনে বিকেল পাঁচটা থেকে রাত নটা পর্যন্ত রেশনিং চালু রয়েছে। তবে ঢারা বাইরে কোন সিএনজি স্টেশনই রেশনিং মানে না। এতে করে পিক আওয়ারে পেট্রোবাংলা যে গ্যাস পিডিবিকে দিতে চায় তাও পারে না। সিএনজি স্টেশনগুলোর ওপর কোন নিয়ন্ত্রণও নেই গ্যাস বিতরণ কোম্পানির। উল্টো ঘুষ গ্রহণের মধ্যে দেদার গ্যাস বিক্রির সংযোগ দিয়ে থাকে বিতরণ কোম্পানির প্রতিনিধিরা। সঙ্গত কারণে সিএনজি স্টেশনে গ্যাস রেশনিং করা হলে মাঠ পর্যায়ে তদারকি না হলে প্রকৃত পক্ষে কোন কাজ হবে না বলে মনে করছে সংশ্লিষ্টরা।

দেখা যায় বিগত সেচ মৌসুমে এক হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের সরবরাহ প্রয়োজন বলে জানানো হয় পেট্রোবাংলাকে। যদিও গত বছর ওই সরবরাহ অনেকটাই স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু এখন এসে নতুন করে ১৬০ মিলিয়ন ঘনফুটের বাড়তি চাহিদা মেটাতে অপারগতা প্রকাশ করছে পেট্রোবাংলা। উল্টো এই সরবরাহ গত কয়েক বছরের তুলনায় কম বলে মনে করা হচ্ছে।

অন্যদিকে প্রতিবছর গ্রীষ্ম এবং রমজানে সারকারখানা বন্ধ রাখা হয়। যদিও তরল জ্বালানিতে বিদ্যুত উৎপাদন বৃদ্ধির পরে এই সঙ্কট কেটে যাওয়ার আশা করা হয়েছিল। দেশে সামগ্রিকভাবে বিদ্যুত উৎপাদন বৃদ্ধি পেলেও জ্বালানি সঙ্কটের চিত্র এর মধ্য দিয়ে ফুটে উঠেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী বড় কয়লা চালিত বিদ্যুত কেন্দ্র উৎপাদনে না আসার কারণে সঙ্কটে পড়তে হবে আগামী গ্রীষ্মে বিদ্যুত কেন্দ্র থাকলেও জ্বালানির অভাবে উৎপাদনে রাখা কতটা সম্ভব হবে তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে পিডিবিরই।

দেশের বিদ্যুত কেন্দ্রগুলোর এখন দৈনিক মোট গ্যাসের চাহিদা রয়েছে এক হাজার ৫১৩ মিলিয়ন ঘনফুট। এর বিপরীতে পেট্রোবাংলা কোন সময়ই ৯৫০ মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি সরবরাহ করতে পারে না। বিশেষ পরিস্থিতিতে রেশনিং করে অতিরিক্ত গ্যাস বিদ্যুতে সরবরাহ করা হয়। এর বাইরে দেশে দুই হাজার মেগাওয়াটের ক্যাপটিভ বিদ্যুত কেন্দ্র রয়েছে। এসব কেন্দ্রের জ্বালানিও গ্যাস। শিল্প-কারখানা গ্যাস জেনারেটর ব্যবহার করে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুত উৎপাদন করলেও আরা এক-তৃতীয়াংশ গ্যাস অপচয় করে। সরকার নীতিগতভাবে ক্যাপটিভে সংযোগ দেয়ার সিদ্ধান্ত নিলেও কার্যত ক্যাপটিভ বিদ্যুত কেন্দ্র সম্প্রতি ২৮টি নতুন সংযোগ দেয়া হয়েছে। এ ছাড়াও ঢাকার আশপাশের অনেক শিল্প-প্রতিষ্ঠানই সিএনজি স্টেশন থেকে গ্যাস কিনে শিল্প-কারখানার জন্য বিদ্যুত উৎপাদন করে। প্রচলিত গ্রিড থেকে শিল্পগুলোকে সংযোগ দিতে চাইলেও তারা সাশ্রয়ের জন্য সিএনজি স্টেশন থেকে গ্যাস কিনে থাকে, যা অবৈধ। পেট্রোবাংলা এবং এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের বিষয়গুলো দেখার কথা থাকলেও তা আমলেই নেয় না তারা। সামগ্রিক অবস্থা বিবেচনায় গ্যাস বিতরণ পর্যায়ে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে, যা সঙ্কটকে উস্কে দিচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে আগামী গ্রীষ্ম মৌসুমে সেই সঙ্কটের ধাক্কা লাগবে বিদ্যুত বিতরণেও। সঙ্গত কারণে এখন ফের নতুন করে রেশনিংয়ের চিন্তা করছে সরকার।

ঝুলন্ত তার কাটার সিদ্ধান্ত ॥ কয়েক দফা সময় দিলেও ঢাকার রাস্তার ঝুলন্ত তার পরিষ্কার হয়নি। বিদ্যুত মন্ত্রণালয়ে রবিবার আবারও এ বিষয়ে একটি বৈঠক করেছে ডিশ ব্যবসায়ী সমিতি এবং ইন্টারনেট সার্ভিস প্রভাইডারদের সঙ্গে। বৈঠকে বলা হয় রাস্তার ঝুলন্ত তার মাটির নিচে দিয়ে সঞ্চালনের জন্য সামিট এবং ফাইবার এ্যাট হোম কাজ পেয়েছিল। কিন্তু তারা ঠিকমতো কাজ করতে না পারায় এখনও ঝুলন্ত তার রয়ে গেছে। বৈঠকে বিদ্যুত ডিশ এবং ইন্টারনেট ব্যবসায়ীরা আরও দুই মাস সময় চান। কিন্তু বৈঠকে বলা হয় এক সময় দেয়া আর সম্ভব নয়। তারা সিঙ্গেল লাইন চাইলেও বৈঠকে তা না দেয়ার পক্ষেই সকল মতামত দেন। প্রতিমন্ত্রী বৈঠকে বলেন পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (পিজিসিবি)-এর ইন্টারনেট ব্যবসার অনুমোদন রয়েছে। প্রয়োজনে আমরাই ইন্টারনেট সরবরাহের ব্যবসা করব। বৈঠকে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলক ছাড়াও ডিস এবং ইন্টারনেট ব্যবসায়ীরা উপস্থিত ছিলেন।

বিদ্যুত ও গ্যাস চোরদের ছবি তুলে ফেসবুকে দেয়া হবে ॥ এদিকে রবিবার সকালে রাজধানীর বিদ্যুত ভবনে আয়োজিত এক সেমিনারে বিদ্যুত-গ্যাস চোরদের ছবি ফেসবুকে দেয়ার পরার্মশ দিয়েছেন বিদ্যুত, জ্বালানি এবং খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী। বিদ্যুত ভবনের বিজয় হলে পাওয়ার সেল আয়োজিত বিদ্যুত ও জ্বালানি খাতের সামগ্রিক কার্যাবলীর তথ্য মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে ‘সামাজিক যোগাযোগ’ বিষয়ক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। এ সময় বিদ্যুত মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. আহমেদ কায়কাউস, পাওয়ার সেলের মহাপরিচালক মোহাম্মদ হোসাইন, স্রেডার চেয়ারম্যান মোঃ আনোয়ারুল শিকদারসহ বিদ্যুত বিভাগের সংস্থা প্রধানরা উপস্থিত ছিলেন।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, মানুষ দিন দিন অনলাইননির্ভর হয়ে পড়ছে। দেশে এখন প্রায় এক কোটি ৮০ লাখ মানুষ ফেসবুকের সঙ্গে সম্পৃক্ত। মানুষ খবরের কাগজও অনলাইনে পড়ছে। ফলে যে কোন প্রচার অনলাইননির্ভর হতে হবে, যাতে অনেক বেশি মানুষের কাছে তথ্য পৌঁছায়। আয়োজিত সেমিনারে একটি বেসরকারী সংস্থা অনলাইন কার্যক্রমের বিভিন্ন বিষয়ের ওপর তথ্য উপস্থাপন করে।

এ সময় বিদ্যুত ও জ্বালানি বিভাগের আওতাধীন সংস্থাগুলোর ওয়েবসাইটে হালনাগাদ তথ্য প্রকাশের পাশাপাশি অনলাইন কার্যক্রমকে আরও শক্তিশালী করার নির্দেশ দেন প্রতিমন্ত্রী। বিশেষ করে বিদ্যুত বিলের রিডিং সংগ্রহ, গ্রাহকদের বিদ্যুত বিল প্রদান, বিদ্যুত সংযোগ সংক্রান্ত সব কার্যক্রম অনলাইননির্ভর করার পরামর্শ দেন তিনি।