২০ নভেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ওয়েস্ট ইন্ডিজ চ্যাম্পিয়ন ভারতকে হারাল ৫ উইকেটে

ওয়েস্ট ইন্ডিজ চ্যাম্পিয়ন ভারতকে হারাল ৫ উইকেটে

মিথুন আশরাফ ॥ এবার অনুর্ধ ১৯ ক্রিকেট বিশ্বকাপে সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় কোনটি? এ প্রশ্ন করা হলে, সবার চোখের সামনে একটি বিষয়ই ভাসবে। সেটি কী? স্প্রিঙ্গাড্যান্স। যে ড্যান্স কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে ফাইনাল পর্যন্ত দিয়েছেন ওয়েস্ট ইন্ডিজ যুব দলের অলরাউন্ডার স্প্রিঙ্গার। এক একটি করে ম্যাচ জিতেছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ আর লিকলিকে গড়নের শরীর নিয়ে স্প্রিঙ্গার দুই হাত ছড়িয়ে দিয়ে দুই দিকে হেলিয়ে দুলিয়ে নাচতেই থেকেছেন। রবিবার ভারতের বিপক্ষে বিশ্বকাপের ফাইনালে কার্টির ও পলের ৬৯ রানের জুটিতে ৫ উইকেটে জেতা নিশ্চিত হতেই, চ্যাম্পিয়ন হওয়া নিশ্চিত হতেই যেমন প্রায় পাগলের মতো হয়ে গেলেন স্প্রিঙ্গার। নাচছেন তো নাচছেনই! থামতেই যেন চাননি। তাতেই বোঝা যাচ্ছে, প্রথমবারের মতো যুব বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হওয়ায় কতটা আনন্দ পেয়েছেন ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেটাররা।

স্প্রিঙ্গারের সঙ্গে জোসেফ, হোল্ডার, পলরাও তাল মিলিয়েছেন। বাদ যাননি অধিনায়ক শিমরন হেটমায়ারও! দেশকে গৌরব এনে দিতে পেরে এতটাই আনন্দ করেছেন ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেটাররা যে ম্যাচ শেষ হতেই কেউ মাটিতে লুটিয়ে পড়েছেন, কেউ সতীর্থদের কাঁধে চড়ে বসছেন, কেউ বা মাঠ প্রদক্ষিণ করেছেন। পাগল প্রায় হয়ে যান ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেটাররা। তবে দিনের সেরা ছবি হতে পারে, দুই দলের অধিনায়কই যে কেঁদেছেন, সেই কান্নার ছবি। ওয়েস্ট ইন্ডিজ অধিনায়ক হেটমায়ার কেঁদেছেন শিরোপা জেতার আনন্দে। আর ভারত অধিনায়ক ঈষান কিশান কেঁদেছেন কষ্টে। ফেবারিট দল হয়েও চতুর্থবারের মতো শিরোপা জিততে না পারার কষ্টে। গ্রুপ পর্ব থেকে সেমিফাইনাল পর্যন্ত আধিপত্য বিস্তার করেও ফাইনালে এসে হারার যন্ত্রণায়!

সেই যন্ত্রণা ভারতকে দিয়েছেন কিয়াচি কার্টির ও কিমো পল। ওয়েস্ট ইন্ডিজ পেসাররা যে কি বিধ্বংসী তা আবারও বোঝা গেল। ওয়েস্ট ইন্ডিজ তো ফাইনাল ম্যাচে কোন স্পিনারই খেলাল নিই! পাঁচ পেসারকে দিয়ে বল করাল। সবাই উইকেটও পেল। ৩ উইকেট করে নেয়া জোসেফ ও জনের সঙ্গে ২ উইকেট নেয়া পলই ডুবিয়ে দিলেন ভারতকে। এ তিন পেসারের বোলিং গতির সামনে কুলিয়ে উঠতে না পেরে ৪৫.১ ওভারে ১৪৫ রান করতেই অলআউট হয়ে যায় ভারত। ৫১ রান করা সরফরাজ খান হাল না ধরলে আরও আগেই হয়ত গুটিয়ে যেত ভারত। সরফরাজের সঙ্গে বাথাম (২১) ও লমররই (১৯) কেবল দুই অঙ্কের ঘরে পৌঁছাতে পারেন। এমন অবস্থায় জয় কী কোনভাবে মিলে?

এরপরও ভারতের জয়ের আশা জাগে, যখন ৭৭ রানে ৫ উইকেট হারায় ওয়েস্ট ইন্ডিজ। স্পিনার মায়াঙ্ক ডাগার একাই ততক্ষণে ৩ উইকেট নিয়ে নেন। এরপর? শুধুই ওয়েস্ট ইন্ডিজ কাব্য যেন লেখা হয়। কার্টির ও পল মিলে যে কিভাবে দলকে জয়ের বন্দরে নিয়ে গেলেন, তা খেলা না দেখলে বোঝার উপায় নেই। কোনভাবেই উইকেট হারালেন না। আর কোন উইকেটই পড়তে দিলেন না। চেষ্টাই ছিল, উইকেটে থাকলে রান হবেই। জয় মিলবেই। এ ফর্মুলাতেই কাজ হয়ে গেল। পলকে ২ বার আউট করার সুযোগ পায় ভারত। কিন্তু দুইবারই পলের ক্যাচ ধরতে পারেননি ভারতীয় ফিল্ডাররা। ৯৫ রানের সময় একবার সরফরাজ, আরেকবার শেষ মুহূর্তে আভেস খান তালুবন্দী করতে পারেননি। ভারতের কাছে এটি দোষ হতে পারে। তবে ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছে বিষয়টি খেলারই অংশ। এ সুযোগ যখন মিলল, তখন কী আর হাতছাড়া করা যায়। পল তা করলেনও না। শেষ পর্যন্ত টিকে থাকলেন। অপরাজিত ৪০ রানও করলেন। তবে পলের চেয়েও ফাইনাল ম্যাচে কার্টির ইনিংসটিরই প্রশংসা হচ্ছে বেশি। কারণ, কার্টি যে শেষমুহূর্ত পর্যন্ত চরম ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছেন।

১২৫ বলে ২ চারের সাহায্যে অপরাজিত ৫২ রান করেছেন কার্টি। তাতেই বোঝা যাচ্ছে, কী কঠিন পরিস্থিতি সামাল দিয়ে দলকে জিতিয়েছেন কার্টি। শেষের ৯ ওভারে কোন বাউন্ডারি না মেরে শেষপর্যন্ত দলকে ১৮ বলে জিততে ১৪ রান, ১২ বলে জিততে ৯ রান ও ৬ বলে জিততে ৩ রানের দরকারের পরিস্থিতিতে নিয়ে আসেন কার্টি। জয়সূচক রানটি অবশ্য পলের ব্যাট থেকেই আসে। তবে উইকেটরক্ষকের পেছন দিয়ে যখন বল যেতে থাকে, দৌড়ে ১ রান নিতে থাকেন পল; ৪৯.৩ ওভারে ১৪৬ রান করে জয় নিশ্চিত হয়ে যায়, কার্টিই যেন বেশি আনন্দ করেছেন। শূন্যে লাফ দিয়ে উঠেছেন। দুই হাত মেলে দিয়ে যেন আকাশেও উড়তে চেয়েছেন। উড়েছেনই তো। প্রথমবারের মতো আইসিসি সভাপতি জহির আব্বাসের কাছ থেকে নিয়ে যুব বিশ্বকাপের শিরোপা ঘরে তুলেছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। স্নায়ুচাপ, প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ, উত্তেজনাকর ম্যাচে নায়ক যে তিনিই!

কার্টির এ নায়কোচিত ইনিংসের পর আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে এসে পড়েন একজন। তিনি সামার স্প্রিঙ্গার। যিনি শুধু নাচতেই থাকেন। ৬ বলে জিততে যখন ৩ রানের প্রয়োজন, তখন থেকেই মাঠের বাইরে নাচতে থাকেন স্প্রিঙ্গার। ম্যাচে জয় নিশ্চিত হতেই মাঠে দৌড়ে এসে নাচতে থাকেন। যখন তাকে ক্রিকেটাররা ঘিরে ধরেছে তখনও নাচতে থাকেন। ধারাভাষ্যকার তার সঙ্গে কথা বলতে গেলেও নাচতে থাকেন। সে কী আনন্দ ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেটারদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। তা স্প্রিঙ্গারের ‘স্প্রিঙ্গড্যান্সে’ই বোঝা গেছে। এমন ড্যান্স কেনইবা হবে না। প্রথমবারের মতো যুব বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন যে হয়েছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ।