১৯ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

শুরুতেই ধরা পড়লে শিশু ক্যান্সারের ৭৫ ভাগই নিরাময় সম্ভব

নিখিল মানখিন ॥ ফারজানা আক্তার, শেরপুর জেলা সদরের নয়াপাড়া লসমানপুর গ্রামের এক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর মেয়ে। বয়স মাত্র ৫ বছর। সে দুরারোগ্য ব্লাড ক্যান্সারে আক্রান্ত। বর্তমানে সে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডাঃ আফিকুল ইসলামের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসাধীন রয়েছে। চিকিৎসার পেছনে সহায় সম্বল হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে গেছেন শিশুটির পিতা মোঃ ফারুক হোসেন। দু’বছর আগে ক্যান্সার ধরা পড়ে তার। সেই থেকে টানা চিকিৎসা চলছে। ফারজানা সুস্থ হবে এমন নিশ্চয়তা দিতে পারছেন না চিকিৎসকরা। চিকিৎসা করাতে গিয়ে নিঃস্ব হয়েও চিকিৎসকদের এমন কথা বাড়িয়ে দিয়েছে শিশুটির মাতা-পিতার কষ্টের মাত্রা। এভাবে ফারজানার মতো ক্যান্সারে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েই চলেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে প্রতিবছর প্রায় ১৩ হাজার শিশু ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছে। প্রকৃত সংখ্যা অনেক বেশি। প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়লে শিশু ক্যান্সারের ৭৫ শতাংশ নিরাময় করা সম্ভব। দেশে যে হারে ক্যান্সার আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা বাড়ছে, তার মাত্র ১০ শতাংশেরও কম রোগী চিকিৎসার আওতায় আসছে। বাকি ৯০ শতাংশ ক্যান্সার আক্রান্ত শিশু যথাযথ চিকিৎসার আওতার বাইরে থেকে যাচ্ছে। এমন অবস্থার মধ্য দিয়ে আজ সোমবার পালিত হচ্ছে বিশ্ব শিশু ক্যান্সার দিবস।

সাত বছরের শিশু ইয়ামিন ব্লাড ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে। শুধু বোনম্যারো ট্রান্সপ্লান্ট করালেই বাঁচানো যাবে ইয়ামিনকে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের হেমাটোলজি বিভাগের প্রধান ডাঃ এবিএম ইউনূস ইয়ামিনের বাবা নূরুল আজিজকে বলেছেন- তাকে যত দ্রুত সম্ভব বোনম্যারো ট্রান্সপ্লান্টই করাতে হবে। তবে বেঁচে যাবে সে। এতে খরচও পড়বে অনেক। ভারতেই এ চিকিৎসা করালে লাগবে ৫০ লাখ টাকা। বর্তমানে বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ডি ব্লকের ১৫তলার হেমাটোলজি বিভাগে আছে ইয়ামিন। সিদ্ধিরগঞ্জ নয়াআটি এলাকার একটি স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণীতে পড়ত ইয়ামিন। গত বছরের ২২ ফেব্রুয়ারি স্কুল থেকে বাড়িতে এসে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে নারায়ণগঞ্জ মেডিপ্লাস মেডিক্যালে পরীক্ষা করা পর ডাক্তার ইয়ারি মাহাবুব তাকে রেফার করেন বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের হেমাটোলজি বিভাগের প্রধান ডাঃ এবিএম ইউনূসের কাছে। গ্রীন রোডের গ্রীন ভিউ ক্লিনিকে চিকিৎসারত অবস্থায় গত বছরের মার্চ মাসে ধরা পড়ে ব্লাড ক্যান্সার। এতদিন ক্যামোথেরাপি চলছিল। কিন্তু অবস্থা আরও খারাপ হওয়ায় তাকে নেয়া হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে। শিশুটির বাবা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী নূরুল আজিজ চৌধুরী এবং গৃহিণী মা সর্বস্ব দিয়ে চিকিৎসা খরচ চালিয়ে এখন নিঃস্ব। টাকার অভাবে ব্যাহত হচ্ছে শিশুটির চিকিৎসা কার্যক্রম। ব্যয়বহুল চিকিৎসা হওয়ায় এবং দেশে পর্যাপ্ত উন্নত চিকিৎসার অভাবে অনেক ক্যান্সার রোগী অকালে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। যে হারে শিশুররা ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছে তা খুবই উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন শিশু ক্যান্সার বিশেষজ্ঞরা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের পেডিয়াট্রিক হেমাটোলজি এ্যান্ড অনকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান শিশু ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডাঃ আফিকুল ইসলাম জনকণ্ঠকে বলেন, কয়েক বছর আগেও বাংলাদেশে ক্যান্সারে আক্রান্ত শিশুদের ৯০ শতাংশই মারা যেত। একই সময়ে উন্নত রাষ্ট্রে ক্যান্সারে আক্রান্ত ৯০ শতাংশ শিশুই চিকিৎসায় সুস্থ হয়েছে। তিনি বলেন, ২০১২ সালের আগে দেশে কত সংখ্যক ক্যান্সার আক্রান্ত শিশু রয়েছে তার কোন তথ্য ছিল না। ২০১২ সালে আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থার উদ্যোগে আমেরিকা ও কানাডা ইউনিভার্সিটি কলেজ হাসপাতালের সহায়তায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে আলাদাভাবে ক্যান্সার আক্রান্ত শিশুদের জন্য বিভাগ চালু হয়। সেই থেকে ওই দুই কলেজ হাসপাতাল থেকে শিশু ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ ডাক্তার ও নার্স বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশে এসে সংশ্লিষ্ট ডাক্তার ও নার্সদের প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছেন। অধ্যাপক ডাঃ আফিকুল ইসলাম বলেন, শিশুদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রবণতা ব্লাড ক্যান্সারের, এর পরে রয়েছে ব্রেন টিউমার, বোন টিউমার ইত্যাদি। ২০১২ সাল থেকে এ পর্যন্ত রেজিস্ট্রেশনকৃত শিশু ক্যান্সার রোগীর অধিকাংশ এখনও এ বিভাগে চিকিৎসাধীন রয়েছে। তিনি বলেন, চিকিৎসায় ৫৮ শতাংশ রোগী সুস্থ হলেও বাকি ৪২ শতাংশ রোগীকে সুস্থ করা সম্ভব হয়নি। যদিও আশার বিষয় শিশু ক্যান্সারের ৭৫ শতাংশ নিরাময় করা সম্ভব।

পেডিয়াট্রিক হেমাটোলজি এ্যান্ড অনকোলজি বিভাগের চিকিৎসক সূত্রে জানা গেছে, বিভিন্ন সমীক্ষায় যেটা দেখা যাচ্ছে সেটা বেশ আশ্চর্যজনক। ক্যান্সার আক্রান্ত শিশুদের মাত্র ৫ শতাংশ বংশগত সূত্রে জিন মারফত ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়। বাকি প্রায় ৯৫ শতাংশ কিন্তু জন্ম পরবর্তীকালে পারিপার্শ্বিক কারণে ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছে। শিশুদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রবণতা ব্লাড ক্যান্সারের, যা শতকরা ৬০ শতাংশেরও ওপরে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে চিকিৎসকরা (শিশু ক্যান্সার বিষয়ক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ছাড়া) ক্যান্সার ধরতেই পারছেন না। এর কারণ শিশু ক্যান্সারের আলাদা লক্ষণ, কখনও বা জ্বর, কখনও দেহে বিশেষ চিহ্ন বা মাড়ি থেকে রক্ত পড়া ইত্যাদি আলাদা উপসর্গ থেকে ক্যান্সার দেখা দিচ্ছে। বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের মতে, জিনগত ক্যান্সার ছাড়া নগরায়নের পরোক্ষ প্রভাবেই শিশুদের মধ্যে ক্যান্সারের ঘটনা বাড়ছে। ভাইরাস, দূষণ আর বিকিরণের মাত্রা বৃদ্ধি ক্যান্সারের মূল কারণ। শিশু ক্যান্সার বিশেষজ্ঞদের মতে, অধিক মাত্রায় শিল্পায়ন, উন্নয়ন শিশুদের শরীরে ক্যান্সার জন্ম দিচ্ছে। আমেরিকা আর কানাডায় শিশু মৃত্যুর প্রধান কারণ ক্যান্সার। ইউরোপে বছরে প্রায় ৭ শতাংশ শিশু ক্যান্সারে মারা যায়। এসব তথ্য থেকেও এটা পরিষ্কার যে, নগরায়ন আর শিশু ক্যান্সারের বৃদ্ধির মধ্যে সমানুপাতিক সম্পর্ক বিদ্যমান।

জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডাঃ মোঃ মোশাররফ হোসেন জনকণ্ঠকে বলেন, ক্যান্সার একটি জটিল রোগ যার কোন নির্দিষ্ট বয়সসীমা নেই। এখনও অনেকে মনে করেন ক্যান্সার বয়স্কদের রোগ, শিশুদের ক্যান্সার হয় না, যা একটা ভুল ধারণা। এটি শুধু বয়স্কদের জন্য নয় বরং শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে যে কোন বয়সেই হতে পারে। বাংলাদেশের জনসংখ্যার প্রায় ৪৯ শতাংশই ১৮ বছরের নিচে শিশু-কিশোর। ক্যান্সারের মতো জটিল রোগে তারাও আক্রান্ত হচ্ছে এবং প্রতিবছর দেশে অনেক সম্ভাবনাময় জীবন অকালে ঝরে পড়ছে। সঠিক চিকিৎসায় শিশুদের অনেক ক্যান্সার সম্পূর্ণ নিরাময় যোগ্য। আমাদের দেশসহ পৃথিবীর অনেক দেশে সংক্রামক রোগে শিশু মৃত্যুর হার কম।