২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

লাল রঙের উৎসব, বইয়ের জন্য ভালবাসা...

লাল রঙের উৎসব, বইয়ের জন্য ভালবাসা...
  • মোরসালিন মিজান

আগেরদিনের সঙ্গে বিশেষ কোন পার্থক্য ছিল না। শনিবার পহেলা ফাল্গুনে প্রচুর লোক সমাগম ঘটেছিল। বাসন্তী রঙে সেজে মেলায় এসেছিলেন বইপ্রেমীরা। পরেরদিন রবিবার তার রেশ। সেইসঙ্গে যোগ হয় ভালবাসা দিবস। পাশ্চাত্য সংস্কৃতির উৎসব হলেও, বঙ্গদেশে এ নিয়ে কৌতূহলের শেষ নেই। তরুণ-তরুণীরা মোটামুটি মাতিয়ে রেখেছিল ঢাকা। প্রভাবটি দৃশ্যমান হয়েছে অমর একুশে গ্রন্থমেলায়ও। ১৪তম দিনে লাল শাড়ি পাঞ্জাবি পরে মেলায় এসেছিলেন বিভিন্ন বয়সী মানুষ।

এদিন মেলা শুরু হয় বিকেল ৩টায়। তার অনেক আগেই লাইনে দাঁড়িয়ে যান পাঠক। দীর্ঘ লাইন। তবু কারও কোন ক্লান্তি নেই। প্রবেশদ্বার খোলা হলে একে একে মেলায় প্রবেশ করেন বিভিন্ন বয়সী মানুষ। সন্ধ্যার আগে আগে ভিড় বেড়ে কয়েকগুণ হয়ে যায়। হ্যাঁ, এদিনও ছিল ঘুরে বেড়ানো। প্রিয়জনের হাতটি ধরে মনের আনন্দে ঘুরে বেড়িয়েছেন অনেকেই। তাই বলে বই থেকে এই ঘুরে বেড়ানো বিচ্ছিন্ন ছিল না। বই দেখতে দেখতেই এক স্টল থেকে আরেক স্টল।

প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান কাকলীর প্যাভিলিয়ন থেকে সুমন্ত আসলামের উপন্যাস কিনে ফিরছিলেন জুয়েল ও সুনন্দা। এই যুগলের কাছে প্রশ্ন ছিল, বইয়ের জন্য কতটা প্রেম অনুভব করেন? নাকি কেনার জন্য কেনা? উত্তরে জুয়েল বলেন, বইয়ের জন্য প্রেম না থাকলে তো মেলায় আসতাম না। একান্তে সময় কাটানোর কত জায়গা এই শহরে। মেলায় কেন আসব? কী ধরনের বই বেশি পছন্দ? উপন্যাস? জানতে চাইলে প্রেমিকাকে দেখিয়ে বলেন, ও পড়ে। আমি রাজনীতি ও মুক্তিযুদ্ধের ওপর লেখা বেশি পড়ি। জনপ্রিয় অনুবাদ গ্রন্থ পড়ি। সুনন্দার বিপরীত পছন্দ। বললেন, উপন্যাস ছাড়া পড়তে মন চায় না। আর ভালবাসা দিবস হলে উপন্যাস কিনতেই হবে। অবশ্য আমি নিজে কিনি কম। জুয়েল কিনে দেয়।

ভালবাসা দিবস হওয়ায় কবিতার বইও ভাল বিক্রি হয়েছে। ভাল মানে, অন্য দিনের চেয়ে ভাল। যে প্রেমের সবচেয়ে সুন্দর প্রকাশ কবিতায়, সে কবিতা থেকে বাংলাদেশের প্রেমিক-প্রেমিকারা দূরে সরে যাচ্ছে। কেন? জানতে মেলায় কথা হয় কবি আসাদ চৌধুরীর সঙ্গে। তিনি স্বীকার করে নিয়ে বলেন, এখন সেই কবিতা হচ্ছে না। বাংলাদেশে নয় শুধু, বিশ্বের অনেক দেশে কবিতার পাঠক কমেছে। আমি সেসব দেশ ঘুরে দেখে এসেছি। ভালবাসা নিয়ে বহু কালোতীর্ণ কবিতার জন্ম দিলেও, এই কবি ভালবাসা দিবসকে অতো গুরুত্ব দিতে নারাজ। বললেন, ভালবাসাবাসি একদিনের নয়। প্রতিদিনের। প্রতি মুহূর্তের। একদিন ভালবাসব। ৩৬৪ দিন মারামারি করব, এটা হয় না। আমার কাছে প্রতিটি দিনই প্রেমের দিন। প্রতিটি দিনই পহেলা ফাল্গুন।

নতুন বই ॥ রবিবার অমর একুশে গ্রন্থমেলার ১৪তম দিনে এসেছে অনেক নতুন বই। বাংলা একাডেমির তথ্য কেন্দ্রে জমা পড়েছে ৯৩টি নতুন বই। অন্য প্রকাশ থেকে এসেছে নাসরীন জাহানের ‘সেরা দশ গল্প’। দেশের খ্যামিমান গল্পকারদের সেরা দশ গল্প নিয়ে সিরিজ গ্রন্থ প্রকাশের অংশ হিসেবে এটি প্রকাশ করা হয়েছে। আগামী থেকে প্রকাশিত হয়েছে প্রফেসর আবদুল খালেকের বই ‘রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ বুদ্ধিজীবী ও বধ্যভূমি’। একই প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান থেকে এসেছে ফরহাদ মজহারের ‘ব্যক্তি বন্ধুত্ব ও সাহিত্য’। এ্যাডর্ন থেকে এসেছে ‘একজন ক্যাপ্টেন দত্তের তিন শতাব্দীর গল্প’। সম্পাদনা করেছেন জয়নাল হোসেন।

ঐতিহ্য প্রকাশ করেছে ‘বাবর নামা ॥ জহির উদ্-দিন মুহম্মদ জালাল উদ্-দিন বাবর’। অনুবাদ করেছেন মুহম্মদ জালালউদ্দীন বিশ্বাস। অনুপ্রাণন প্রকাশনী থেকে এসেছে মাহতাব হোসেনের গল্পের বই ‘তনিমার সুইসাইড নোট’। মোট ১৪টি গল্পের সমন্বয়ে প্রকাশিত বইটি তরুণ এই সাংবাদিক লেখকের প্রথম বই। পাওয়া যাচ্ছে বাংলা একাডেমির লিটল ম্যাগ চত্বরে।

মেলা মঞ্চের আয়োজন ॥ গ্রন্থমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় ‘বাংলাদেশে রবীন্দ্রচর্চা : অতীত থেকে বর্তমান’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অধ্যাপক বিশ্বজিৎ ঘোষ। আলোচনা করেন অধ্যাপক করুণাময় গোস্বামী, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার ও রবীন্দ্র গবেষক ড. আতিউর রহমান। সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপক গোলাম মুরশিদ।

প্রাবন্ধিক বলেন, স্বাধীনতা-পরবর্তী কালখ-ে যে-প্রজন্ম রবীন্দ্রচর্চায় অগ্রগামী হলেন, তাদের কর্মকা-ে অনেক ইতিবাচক বৈশিষ্ট্যও পরিলক্ষিত হলো। অকারণ মুগ্ধতা ক্রমে দূরীভূত হলো, দেখা দিল রবীন্দ্র-অধ্যয়নের সুস্থ পরিম-ল। বিগত পঁয়তাল্লিশ বছরের প্রজন্ম রবীন্দ্রনাথকে যেভাবে দেখেছে, যেভাবে মূল্যায়ন করেছে, তার মৌল প্রবণতাগুলোর মধ্যে রয়েছে সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিতে রবীন্দ্রবজনের প্রয়াস দূরীভূত হলো। এতকাল যাঁরা রবীন্দ্রবর্জনের প্রবক্তা ছিলেন, অকস্মাৎ তারাই পরিণত হলেন প্রবল রবীন্দ্র-অনুরাগীতে। অকারণ তর্ক-বিতর্ক, আবেগ-উচ্ছ্বাস পরিত্যাগ করে এ-কালের প্রজন্ম রবীন্দ্রসৃষ্টি-সমুদ্রে অবগাহন করতে চাইলেন, তারা উদ্যোগী হলেন রবীন্দ্র-সৃষ্টিকর্মের নান্দনিক ব্যাখ্যা নির্মাণে। এ-প্রজন্মের একটি অংশ সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক প্রাসঙ্গিকতায় রবীন্দ্রনাথের সার্থকতা-সীমাবদ্ধতা আবিষ্কারে হলেন অধিক উৎসাহী। পঁচাত্তরের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে পুনরুজ্জীবিত একাত্তরের পরাজিত শক্তি রবীন্দ্রনাথকে আবার আক্রমণের প্রয়াস পেল, তাঁর রচিত ‘জাতীয় সংগীত’ আক্রান্ত হলো, তাঁকে দাঁড় করানো হলো কাজী নজরুল ইসলামের বিপরীতে।

আলোচকবৃন্দ বলেন, রবীন্দ্রনাথ তাঁর অসাধারণ সাহিত্য ও শিল্পচর্চার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মঙ্গলের জন্য তার সারা জীবন উৎসর্গ করেছেন। তাকে একদিকে নিজ ভাষার সাহিত্যের শ্রীবৃদ্ধি সাধন করতে হয়েছে আর অন্যদিকে নিজ ভূখ-ের প্রান্তিক মানুষের জীবনমান উন্নয়নের রূপরেখা প্রণয়ন করতে হয়েছে। তারা বলেন, পাকিস্তানী শাসকদের বিদ্বিষ্ট ভূমিকার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে রবীন্দ্রনাথকে ১৯৬১ সালে তাঁর জন্মশতবর্ষের সময়ে বাংলার মানুষ যেভাবে স্মরণ করেছে ঠিক তেমনি এখানকার কবি- লেখক-বুদ্ধিজীবী ও সংস্কৃতিকর্মীরা জাতীয় জাগরণ ও মুক্তির সংগ্রামী সূত্র হিসেবে রবীন্দ্রনাথকে একান্ত আপন করে নিয়েছেন। সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক গোলাম মুরশিদ বলেন, পাকিস্তানী আমল থেকে রবীন্দ্রনাথকে বর্জন ও বিকৃতির নানা অপপ্রয়াস চালানো হয়েছে। তবে এদেশের সাধারণ মানুষ তাদের ভালবাসায় রবীন্দ্রনাথকে যেভাবে নিজের করে নিয়েছে তাতে তিনি এ ভূখ-ে বারবার আবিষ্কৃত হয়েছেন নতুন করে, সম্মুখযাত্রার আলোকবর্তিকা হয়ে।

সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে আবৃত্তি পরিবেশন করেন আবৃত্তিশিল্পী সৈয়দ হাসান ইমাম, সায়েরা হাবীব এবং এএসএম সামিউল ইসলাম। নৃত্য পরিবেশন করেন ওয়ার্দা রিহাব ও তাঁর দল। সঙ্গীত পরিবেশন করেন খুরশিদ আলম, মাসুদা নার্গিস আনাম, নাসিমা শাহীন ফ্যান্সি, শরণ বড়ুয়া, স্বর্ণময়ী ম-ল, দেবাশীষ বসাক, নাহিদ নাজিয়া এবং সাহিনা।

নির্বাচিত সংবাদ