২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

অন্তরারে

  • তাপস মজুমদার

মসলিন কাহানি

লেখাটির শিরোনাম হওয়া উচিত ছিল মসলিনের কাহন। পরে ভেবে দেখলাম কাহন শব্দটির আক্ষরিক অর্থ হলো পণ। যেমন কন্যাপণ, বরপণ ইত্যাদি। অবশ্য কাহন শব্দটি হামেশাই ব্যবহৃত হচ্ছে কথাবার্তা, বাতচিত, কাহিনী ইত্যাদি অর্থে। জানি না এটি চলতি ব্যাকরণে ইতোমধ্যেই প্রয়োগসিদ্ধ হয়ে উঠেছে কিনা! অবশ্য বাংলাদেশে এবং উপমহাদেশেও বটে, বরপণ, কন্যাপণ ইত্যাদি দেয়ার প্রচলন ছিল এবং যৌতুকবিরোধী নানা আন্দোলন-সংগ্রাম সত্ত্বেও এখনও আছে, প্রকাশ্যে অথবা সঙ্গোপনে। আমরা অনেক বিয়ের আলাপ-আলোচনায় দেখেছি, তথাকথিত অর্থে প্রগতিশীল পাত্রপক্ষ এবং যেখানে বরপণ প্রচলিত, সেখানে কন্যাপক্ষ কিছুটা কায়দা বা চালাকি করে বলে থাকেন, আপনারা আপনাদের ছেলে বা মেয়েকে দেবেন সাজিয়ে-গুজিয়ে, আমাদের কোন দাবি নেই। এক্ষেত্রে যে যাই বলুক না কেন, পণ বা কাহন কিন্তু চাওয়া হয়ে গেল। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ক্ষেত্রে আরও একটি কুযুক্তি প্রায়ই দাঁড় করানোর প্রচেষ্টা চলে, যা অত্যন্ত কুৎসিৎ, দৃষ্টিকটু ও নিন্দনীয়। যেমন যৌতুকের সপক্ষে দাবি তোলার জন্য বলা হয়, হিন্দু মেয়েদের যেহেতু পৈত্রিক স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তিতে কোন অধিকার নেই এবং এ বিষয়ে সনাতন ধর্মে কোন আইনও নেই, সেহেতু বিয়েতে দাবি-দাওয়া উত্থাপন এবং আদায় করা যেতেই পারে। বুঝুন ঠ্যালা! যে বা যারা এহেন কুযুক্তি মেলে ধরে তারা একবারও ভেবে দেখে না যে, প্রত্যেকের ঘরেই কমবেশি ছেলের পাশাপাশি মেয়েও আছে। যে মেয়ে মেয়ে হয়ে জন্মাবার জন্য দায়ী নয় কোনমতেই, এমনকি মেয়ের মাও নয়, সেক্ষেত্রে জন্মদাতা বাবা হয়েও তিনি তার সম্পত্তির অধিকার আইনানুগ উপায়ে কন্যাকে দেবেন না কেন? অথবা না দিতে চান কোন্ যুক্তিতে? তবে আমাদের কথা এই যে, ভারত, নেপাল এবং হাল আমলে এমনকি পাকিস্তানেও হিন্দু মেয়েদের বিবাহ-বিচ্ছেদের অধিকারসহ সহায়-সম্পত্তির ন্যায্য অধিকার স্বীকৃত হয়েছে সাংবিধানিকভাবে। বাংলাদেশেও হওয়ার অপেক্ষায়।

এবার যাই মসলিনে। বিয়ে-শাদিতে যৌতুক বা কাহন হিসেবে না হলেও বঙ্গললনার জন্য শাড়ি চাই-ই চাই। আর সেক্ষেত্রে মসলিন বা জামদানির চেয়ে উত্তম শাড়ি আর কী হতে পারে? পরনে ঢাকাই শাড়ি, কপালে সিঁদুর বা টিপ- বঙ্গললনারা এই শ্বাশত পোশাকেই সর্বাধিক সুন্দর, সুবেশী, ব্রীড়ানতা ও আলোকোজ্জ্বল। সেক্ষেত্রে পণ বা কাহন হিসেবে মসলিনের প্রসঙ্গ তো আসতেই পারে।

মসলিন নিয়ে ইদানীং কেন যেন মাতামাতি হচ্ছে বেশ। রাজধানীতে আন্তর্জাতিক মানের শিল্পকলা প্রদর্শনী ঢাকা আর্ট সামিটের সঙ্গে প্রায় পাল্লা দিয়ে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল কয়েক দিনব্যাপী মসলিন প্রদর্শনী, ফ্যাশন শো, সেমিনার-সিম্পোজিয়াম ইত্যাদি। বিষয়টি সব রকম গণমাধ্যমে বেশ ভাল সচিত্র কভারেজ পেয়েছে। সেই সুদূরের ঐতিহ্যবাহী মসলিন বলে কথা, যার সঙ্গে ওতপ্রোত জড়িত রয়েছে আমাদের জাতির পূর্ব পুরুষের শিল্পরুচি, দক্ষতা, নৈপুণ্য, সর্বোপরি মেধা ও মনন। মসলিন নিয়ে বাঙালীর আবেগ-অনুভূতির বিষয়টি কোনভাবেই অস্বীকার করা চলে না, উপেক্ষা তো নয়ই।

দৃক, আড়ং ও জাতীয় জাদুঘরের সম্মিলিত আয়োজনে অনুষ্ঠিত হয়েছে এই মসলিন উৎসব ও ফ্যাশন শো। হয়েছে অনেক সারগর্ভ আলোচনা। আয়োজকদের ইচ্ছাটা আন্তরিক এবং আত্মবিশ্বাসী বলেই মনে হয়। তবে কতটা বাস্তবসম্মত সে বিষয়ে প্রশ্ন তোলাই যায়। তারা বাংলাদেশে মসলিন বস্ত্রের ‘পুনরুজ্জীবন’ ঘটাতে চান। উদ্যোগের অংশ হিসেবে তারা মসলিন তথা জামদানি শাড়ি তৈরিও করেছেন এবং তা প্রদর্শিত হয়েছে। তবে সেগুলো আদি মসলিনের তুলনায় কতটা সূক্ষ্ম ও মানসম্মত তা তারাই ভাল বলতে পারবেন। দামের বিষয়টিও অবশ্যই প্রাসঙ্গিক বটে।

মসলিনের ব্যাকগ্রাউন্ড বা পশ্চাৎপট কম-বেশি সবাই জানেন। সুতরাং পুনরাবৃত্তি নিষ্প্রয়োজন। তবে মসলিনের আদি নিবাস ঢাকা নয়, বরং ঢাকার পত্তনেরও অনেক আগে শীতলক্ষ্যা তীরবর্তী সোনারগাঁ ও আশপাশে। একেবারে পাথুরে প্রমাণ যোগাড় করা মুশকিল। তবে ঐতিহাসিকদের মতে, এক সময় গঙ্গা অববাহিকায় উর্বর দোআঁশ পলিমাটিতে মসলিনের সুতার অন্যতম কাঁচামাল ফুটি কার্পাস উৎপাদিত হতো। সেই তুলা আবার সমধিক মানসম্মত হতো নাব্য শীতলক্ষ্যার দু’পাড়ে। আর মসলিনের জন্য সুতাও নাকি বুনতেন বিশেষ করে মহিলারা, শীতলক্ষ্যার তীরে অথবা নৌকায় বসে হাতে কাটা চরকায়। বাতাসের তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা মসলিনের উপযোগী অতিসূক্ষ্ম সুতা তৈরিতে বিশেষ অবদান রাখত। সে সময় সূক্ষ্মতম বস্ত্রাদি তৈরির উত্তম কারিগর ও দক্ষতা বিশ্বের অন্যত্র মোটেও সহজলভ্য ছিল না। ফলে মসলিন প্রায় রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে ওঠে এবং তৎকালীন রাজারাজড়া, নবাব-বাদশাহসহ ধনীদের চাহিদা পূরণে স্থান করে নেয় অবলীলাক্রমে। অতিপ্রাচীন ঐতিহাসিক সিল্করুটের মাধ্যমে ব্যবসায়ীরা উপমহাদেশ থেকে মসলাপাতি, রেশম, গহনাপত্রের পাশাপাশি মসলিন নিয়ে যেতে শুরু করে সুদূর মধ্যপ্রাচ্য, ইরান-তুরান, মিসর, চীন, ইতালি, ইংল্যান্ড ও অন্যত্র। সোনারগাঁও ছিল মসলিনের অন্যতম প্রধান ব্যবসাকেন্দ্র ও বন্দর। ভাবতেও গা শিউরে ওঠে। গর্বে পুলকিত হয় মন।

কালের বিবর্তনে সেই মসলিনের কেন অবলুপ্তি ঘটল, কোথায় গেল সেসব মেধাবী বয়নশিল্পী ও কারিগর, কোথায় গেল ফুটি কার্পাসের সমারোহ, সেসব তোলা থাক গবেষকদের জন্য। আপাতত আমরা মসলিনের জন্য শুধুই হাহাকার ও দীর্ঘশ্বাস মোচন করতে পারি। চাই কি ফ্যাশন শো এবং সেমিনারও করতে পারি। কিন্তু মসলিনের পুনরুজ্জীবন নৈব নৈব চ। কেননা, বিষয়টি আদৌ বাস্তবসম্মত ও ব্যয়সাশ্রয়ী নয়। তবে ইতিহাস-ঐতিহ্য হিসেবে ঠিক আছে হয়তবা।

কেন নয়, সেটা সংক্ষেপে বলে শেষ করব। বাংলাদেশে বর্তমানে তুলা চাষ প্রায় হয় না বললেই চলে। যেটুকু হয় তাতে মসলিনের জন্য সূক্ষ্মতম সুতা হবে না কিছুতেই। আর আবহাওয়া তথা তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার বিষয়টি মনে রাখতে হবে। মিসরের নীলনদের অববাহিকায় অদ্যাবধি উত্তম তুলাচাষ হয়ে থাকে। ইজিপ্সিয়ান কটন তো ভুবনবিখ্যাত। তবে মিসরের গর্ব প্রাচীন মমির পরতে পরতে এবং ফারাওদের পরিহিত বস্ত্রখ- হিসেবে পাওয়া গেছে ঢাকাই মসলিন।

সুতার সূক্ষ্মতার পরিমাপ বা একককে বলা হয় কাউন্ট। যে সুতার কাউন্ট যত বেশি সেটি তত বেশি সূক্ষ্ম। হারিয়ে যাওয়া বিস্মৃতপ্রায় ঢাকাই মসলিনের সুতার কাউন্ট ছিল ৬০০ বা তারও বেশি। ৫০ বছর আগেও নারায়ণগঞ্জ, বাবুরহাটে ১০০ কাউন্টের সুতা কিনতে পাওয়া যেত। আর এখন ভাল সুতা, পাকা রং কোনটাই পাওয়া যায় না। এ বক্তব্য আমাদের নয়, তাঁতীদের, যারা মসলিন নয়, বরং অর্বাচীন জামদানি বুনে থাকেন। সুতরাং দীর্ঘশ্বাস মোচন ছাড়া গত্যন্তর নেই।

তবে ভুল বোঝারও কোন অবকাশ নেই। বিজ্ঞান গবেষণাগারে সর্বাধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে আরও সূক্ষ্ম সুতা যথা খালি চোখে দেখা যায় না, এমন ন্যানো সুতা, ন্যানো শাড়ি বা বস্ত্র প্রস্তুত করা খুবই সম্ভব। তবে খরচ বা ব্যয়! খুব বেশি, অত্যধিক। অত দামের শাড়ি কেউ পরবে না, কিনবেও না। তবে ভার্চুয়াল জগতে সম্ভব হলেও হতে পারে। আর তাই আমাদের স্বপ্নে দেখা রাজকন্যারাই কেবল মসলিন পরে থাক না কেন?

শিল্পকলায় চিতা বহ্নিমান

ঢাকা আর্ট সামিট-২০১৬ দেখা সত্যিই এক বিরল ও দারুণ অভিজ্ঞতা। তবে তার আগে শুরুতেই কবুল করা ভাল যে, চিত্রকলা এবং আরও বৃহত্তর অর্থে শিল্পকলা বোঝার সহজ-সরল কোন ভাষা নেই। সুতরাং শিল্পকলার ব্যাকরণ না বুঝে তা শেষ পর্যন্ত উপভোগ করাই ভাল। শিল্পকলা উঁচুদরের হোক অথবা নিচুমানের, তার জটিল অন্দিসন্ধি ও গলিঘুপচি না খুঁজে আনন্দ ও বিনোদনের উপায় হিসেবেই বিবেচনা করা বোধকরি শ্রেয়। সেদিক থেকে বলতেই হয়, সামদানি আর্ট ফাউন্ডেশন ও বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির উদ্যোগে অনুষ্ঠিত কয়েক দিনব্যাপী ঢাকা আর্ট সামিট দারুণভাবে সফল হয়েছে। প্রচুর দর্শক-শ্রোতা এ সময় ভিড় করেছেন শিল্পকলায়। বিশেষ করে সুবেশী ও স্মার্ট তরুণ-তরুণী এবং প্রাণোচ্ছল কিশোরীদের উচ্ছ্বাস ও আগ্রহ সত্যিই ছিল দেখার মতো। শিল্পকলার চারতলাব্যাপী প্রলম্বিত ও গোলাকার গ্যালারিগুলোতে বিশ্বের ৮০টি দেশের ছয় শতাধিক চিত্রকর্মসহ বিবিধ কর্ম প্রদর্শিত হয়েছে। সেই হিসেবে এটি প্রকৃত অর্থেই পেয়েছে একটি আন্তর্জাতিক চরিত্র ও মর্যাদা।

এবারে বিবিধ কর্ম শব্দটির একটু ব্যাখ্যা দেয়া দরকার। প-িত ও রসজ্ঞ ব্যক্তিরা হয়ত ভাল ব্যাখ্যা করতে পারবেন। তবে নিত্যনতুন প্রযুক্তির কল্যাণে চিত্রকলা বুঝি বর্তমানে শুধু ফ্রেমে বন্দী নেই। রংতুলি ও ক্যানভাসেই নয় সীমাবদ্ধ। বরং চিত্রকলা বা শিল্পকলা আজ একই সঙ্গে এক ও বহুধাবিভক্ত, বিচিত্র ও বহুগম্য। সর্বোপরি পার্থিব ও অপার্থিব, শূন্য থেকে মহাশূন্য, ব্রহ্মা- থেকে নিঃব্রহ্মা- বুঝি হেন কোন বিষয় নেই যা চিত্রকলা ও শিল্পকলার অনুগামী হতে পারে না। একেবারে মাল্টিমিডিয়া প্রেজেন্টেশন বলতে যা বোঝায় তাই। না, এও বুঝি যথার্থ শব্দ অর্থ নয়। মূলত শিল্পকলা সর্বগ্রাসী, সর্বভুক ও সর্বত্রগামী। তেলরং, জলরং, প্যাস্টেল, স্কেচ, কম্পোজিশন, রংতুলি-ক্যানভাস, কোলাজ, ট্যাপেস্ট্রি, গ্রাফিটি, ম্যুরাল, ফটোগ্রাফি, স্থিরচিত্র, চলচ্চিত্র, শর্টফিল্ম, কাগজের টুকরা, সাদা কাগজ, কালো কাগজ, অনুরূপ ক্যানভাস, দেয়াল, ভাস্কর্য, স্থাপত্য, স্থাপনাশিল্প, নাট্যাভিনয়, মূকাভিনয়, এমনকি পরিত্যক্ত আবর্জনা, বর্জ্য ইত্যাদি পর্যন্ত অবলীলাক্রমে স্থান করে নিয়েছে চিত্রকলা ও শিল্পকলায়। এক সময় তথাকথিত অর্থে বিশুদ্ধ শিল্পানুরাগী বা কলাকৈবল্যবাদীরা শিল্পের জন্য শিল্প বলে যতই চেঁচামেচি করুন না কেন, বাস্তবে এটা দেখে খুবই ভাল লাগছে যে, আসলে শেষ পর্যন্ত জীবনের জন্যই যাবতীয় শিল্প ও শিল্পকলা। শিল্পকলার মতো জীবনমুখী বুঝি আর কিছু নেই, আর কিছু হয়ও না। হওয়া সম্ভবও নয়। তর্ক-বিতর্ক তো করা যেতেই পারে। তবে একবাক্যে তো সবাই এটা স্বীকার করবেন যে, মানুষ না থাকলে, জীবন না থাকলে কিসের শিল্প, কিসের কলা? মানুষ বেঁচে না থাকলে পৃথিবীতে শেষ পর্যন্ত কোন শিল্পও থাকবে না।

ঢাকা আর্ট সামিটের যাবতীয় সাফল্য ও সার্থকতা বুঝি নিহিত রয়েছে এখানেই। অসংখ্য ও অগণিত দর্শক-শ্রোতা এই ক’দিন শত শত চিত্রকলা ও বহুমুখী শিল্পকলা উপভোগ করেছেন। আনন্দ ও বিনোদনের খোরাক পেয়েছেন। হয়ত সবটা বোঝেননি, বোঝার বুঝি দরকারও নেই; তবে যেটুকু ও যতটুকু বুঝেছেন, ততটুকুইবা কম কী?

এখানে প্রদর্শিত দ্রষ্টব্যসমূহ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার অবকাশ নেই; সেই যোগ্যতাও নেই আমাদের। যৎসামান্য সমঝদার হিসেবে বলতে পারি, চলমান বিশ্বের সমূহ সমস্যা-সঙ্কট, যুদ্ধ-বিগ্রহ, হানাহানি, মারামারি, কাটাকাটি, রক্তারক্তি, দুর্ভিক্ষ, দারিদ্র্য, অভিবাসন, নির্বাসন, মানুষের সুখ-দুঃখ-আনন্দ-বিনোদন-বিষাদ ও বিষণœতা, আবহাওয়া, জলবায়ু পরিবর্তনের তীব্র অভিঘাত, সর্বোপরি প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানের আশীর্বাদের পাশাপাশি পারমাণবিক যুদ্ধ, এর বিভীষিকা ও বর্জ্যজনিত অভিশাপের ভয়াবহতাÑ এসবই অবলীলায় জায়গা করে নিয়েছে প্রদর্শনী প্রাঙ্গণে। জঙ্গীবাদ, মৌলবাদী কার্যক্রমের বিরুদ্ধে মানুষের ঘৃণা ও বিদ্বেষের চিত্রণও বাদ যায়নি। সংক্ষেপে বলি, একদিকে যেমন ঘানা, কঙ্গো, কেনিয়া, জাম্বিয়াসহ কৃষ্ণ আফ্রিকার স্বাধীনতা ও মুক্তি সংগ্রামের বিরল ও দুর্লভ কিছু ফটোগ্রাফ স্থান পেয়েছে প্রদর্শনীতে, অন্যদিকে স্থান পেয়েছে ৯/১১-তে টুইন টাওয়ারে হামলা ও পরবর্তীতে তোলা কয়েক হাজার ছবির অসাধারণ এক কোলাজ ও কম্পোজিশন। এক কথায় অপূর্ব বা সুপার্ব।

তবে বুঝি সবচেয়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে নিষিদ্ধ নগরী তিব্বককে নিয়ে, তিব্বতকে ঘিরে। বিশ্বব্যাপী সবাই জানেন, তিব্বতীরা দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন-সংগ্রাম করছে স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধীনতার জন্য। এর প্রতিবাদে প্রতিবেশী দেশ ভারত, ভুটান, নেপাল ও সিকিমে অন্তত হাজার হাজার তিব্বতী আছেন নির্বাসনে বাধ্য হয়ে। প্রধান বৌদ্ধ ধর্মগুরু দালাইলামা নির্বাসিত ভারতে। তিব্বতীদের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের জন্য তিনি দেন-দরবার করে বেড়াচ্ছেন বিশ্বের দেশে দেশে। অনেক তিব্বতী ভিক্ষু ও সাধারণ নাগরিক চৈনিকদের নির্যাতন, নিপীড়নের বিরুদ্ধে শরীরে আগুন লাগিয়ে আত্মাহুতিও দিয়েছেন। এ রকম কিছু দুর্লভ নিদর্শন ছিল প্রদর্শনীতে। শিল্পী ছিলেন ভারতে নির্বাসিত তেনজিং সোনম, রিতু সারিন এবং আরও কেউ কেউ। নাম ছিল ‘লাস্ট ওয়ার্ডস’। এটি ছিল মূলত চীনা আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ও প্রতিবাদে আত্মাহুতি দেয়া তিব্বতীদের চিঠিপত্রের স্বহস্তলিখিত সঙ্কলন। ঢাকায় চীনা রাষ্ট্রদূত তা দেখে আপত্তি উত্থাপন করেন যথারীতি এবং তাৎক্ষণিকভাবে এটি ঢেকে দেয়া হয় সাদা কাগজ দিয়ে।

এখানেই অনিবার্য এসে পড়ে শিল্পীর স্বাধীনতার প্রশ্নটি, যা যুগে যুগে দেশে দেশে একটি বহুল আলোচিত ও বিতর্কিত বিষয়। এ নিয়ে অন্যদিন আলোচনা করা যাবে। তবে আমরা শিল্পীর নিরঙ্কুশ স্বাধীনতার সপক্ষে এবং যাবতীয় জঙ্গীবাদী, মৌলবাদী, ফ্যাসিস্ট কার্যক্রমের বিরুদ্ধে। বৌদ্ধ তিব্বতী শিল্পী নোরসের প্রেয়ার হুইল বা অলাতচক্র প্রদর্শিত হতে আমাদের আপত্তি নেই, তবে মানুষের স্বাধীনতার আকাক্সক্ষা ও সংগ্রামও আমাদের কাছে সমান মূল্যবান, আকর্ষণীয় ও আবেদনময়। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক হিউম্যান রাইটস ওয়াচ যথারীতি চীনা রাষ্ট্রদূতের হুমকির প্রতিবাদ জানিয়েছে। আমরা অতদূর যাব না। চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বর্তমান সম্পর্ক অত্যন্ত ভাল বললেও এটুকু অবশ্যই স্মরণ করব যে, ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা সংগ্রামে চীন বাংলাদেশের পক্ষে ছিল না; বরং বিরোধিতাই করেছিল।

সামদানি আর্ট ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে অবশ্য বলা হয়েছে, কারও মনে কষ্ট বা আঘাত দিতে চান না বলেই আত্মাহুতির চিঠি ঢেকে দেয়া হয়েছে। তবে মুক্তি তথা স্বাধীনতা তো ঢেকে দেয়ার কোন ব্যাপার নয়। মানুষ মুক্তি খোঁজে আলোয় আলোয়, আকাশে আকাশে, নিঃসীম নীলিমায়। সুতরাং তিব্বতীরাইবা থেমে থাকবেন কেন? বেশ মনে পড়ে, চীনের বেজিংয়ের ঐতাহিসক তিয়েনআনমেন স্কোয়ারে অকুতোভয় দুঃসাহসী সেই নিঃশঙ্ক একাকী তরুণের কথা, চীনা সেনাবাহিনীর সচল ও দুর্ধর্ষ ট্যাঙ্কের ঠিক সামনে সে দাঁড়িয়েছিল নির্ভীকচিত্তে। ততোধিক চতুর ও সাহসী এক ফটোগ্রাফারের সৌজন্যে সেই বিরল মুহূর্তের দুর্লভ ছবিটি দেখার সৌভাগ্য হয়েছে সমগ্র বিশ্ববাসীর। চিত্রকলা, শিল্পকলার এমনই শিল্পিত মহিমা যে, শুধু এই একটি ছবিই তাবৎ জগৎবাসীর চোখে পৌঁছে দিয়েছে মুক্তি তথা স্বাধীনতার মূল্য সোনালী বার্তা।

নির্বাচিত সংবাদ