১৭ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ট্রেড ইউনিয়নের মতোই সংগঠন করার অধিকার ইপিজেডে

  • মন্ত্রিসভায় খসড়া অনুমোদন

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ দেশের বিভিন্ন রফতানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকার (ইপিজেড) শ্রমিকদের চাইলেই ছাঁটাই করতে পারবে না মালিক কর্তৃপক্ষ। প্রয়োজনের অতিরিক্ত শ্রমিক ছাঁটাই করতে হলে সংশ্লিষ্ট কারখানা মালিককে অবশ্যই ইপিজেড কর্তৃপক্ষের সঙ্গে পরামর্শ করে অনুমতি নিতে হবে। এছাড়া ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা বা অন্য কোন আইনী পদক্ষেপ নেয়ার সুযোগ নিয়ে ইপিজেডের কার্যক্রম স্থবির করার সুযোগ থাকছে না। শুধু তাই নয়, ইপিজেডে শ্রমিকদের সংগঠনও করা যাবে। এসব বিষয় সংযোজন করে ইপিজেড শ্রম আইনের খসড়া চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে সোমবার সচিবালয়ে মন্ত্রিসভার নিয়মিত বৈঠকে এই আইনের খসড়া অনুমোদন দেয়া হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ইপিজেডগুলোয় শ্রমিকদের সংগঠন করার সুযোগ দিতে দীর্ঘদিন ধরেই তাগিদ দিয়ে আসছিল বাংলাদেশে তৈরি পোশাকের ক্রেতা দেশগুলো। মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত খসড়া আইনে সে সুযোগ দেয়া হয়েছে। আইনটি মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের হওয়ায় বিদেশী ক্রেতা ও দাতাদের উদ্বেগ দূর হওয়ার পাশাপাশি দেশের ভাবমূর্তি আরও বাড়বে বলে আশা প্রকাশ করেন সরকারের সংশ্লিষ্টরা।

২০১৪ সালের ৭ জুলাই ইপিজেড আইন সংক্রান্ত খসড়াটিতে নীতিগত অনুমোদন দেয় মন্ত্রিসভা। এরপর খসড়াটি লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগে ভেটিংয়ের জন্য পাঠানো হয়। সেখান থেকে তা আবার আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় পাঠানো এবং পুনঃভেটিং করা হয়। সে অনুযায়ী প্রস্তাবিত ইপিজেড আইনের ধারা ১৯ (১)-এ শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ক্ষেত্রে ‘কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমতি গ্রহণ’-এর পরিবর্তে ‘কর্তৃপক্ষের সঙ্গে পরামর্শক্রমে’ সংযোজন করা হয়। এছাড়া ধারা ১৯৬-এর ‘সরল বিশ্বাসে কৃত-কাজকর্ম রক্ষণ’ সংযোজন করা হয়। এর মানে হচ্ছে, এই আইন ও এর অধীনে প্রণীত বিধি, প্রবিধান, প্রশাসনিক আদেশ বা নির্দেশনার অধীন সরল বিশ্বাসে সম্পাদিত বা সম্পাদনে কোন কাজের জন্য ব্যক্তি বা কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে কোন দেওয়ানি বা ফৌজদারি মামলা বা অন্য কোন আইনগত কার্যক্রম গ্রহণ করা যাবে না। ব্যাখ্যায় আরও বলা হয়, এর ফলে শ্রম বিরোধ নিষ্পত্তিতে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি কার্যক্রম চলবে। এ বিধান না থাকলে কোন কোন শিল্প মালিক মামলার মাধ্যমে ইপিজেডের স্বাভাবিক কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত করতে পারে।

সূত্রমতে, ইপিজেডের শ্রমিকরা সাধারণত বেশি বেতন, অর্জিত ছুটি নগদায়নের সুবিধা, দুটি বোনাস, খাদ্যভাতা, বিনামূল্যে চিকিৎসা ইত্যাদি বাড়তি সুবিধা পেয়ে থাকেন। নতুন আইনে বলা হয়েছে, ইপিজেড শ্রমিকরা ‘শ্রমিক কল্যাণ সমিতি’ নামে শ্রমিক সংগঠন করার স্বাধীনতা পাবে, তাদের যৌথ দর কষাকষির সুযোগও থাকছে। এ আইন প্রচলিত শ্রম আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। সমিতি করার ক্ষেত্রে কোন প্রতিষ্ঠানের ৩০ ভাগ শ্রমিককে ইপিজেড কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করতে হবে। এরপর আবেদনকারীদের মধ্যে ভোটের ব্যবস্থা করা হবে। এর মধ্যে ৫০ ভাগ শ্রমিক সমিতি করার পক্ষে ভোট দিলে অনুমোদন পাবে সমিতি। এছাড়া শ্রমিক কল্যাণ সমিতি করতে চাইলে ইপিজেডে নিবন্ধন করতে হবে।

বেপজা সূত্র জানায়, বর্তমানে বিভিন্ন ইপিজেড শ্রমিকদের অধিকার ও শৃঙ্খলা রক্ষা বিষয়ক কার্যক্রম বেপজা নির্দেশিকা-১ ও ২, ১৯৮৯ এবং ইপিজেড শ্রমিক কল্যাণ সমিতি ও শিল্প আইন, ২০১০ অনুযায়ী পরিচালিত হচ্ছে। অর্থাৎ ইপিজেড শ্রমিকরা বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর আওতাবহির্ভূত এবং পৃথক দুটি নির্দেশিকা শ্রমিক কল্যাণ সমিতি ও শিল্প সম্পর্ক আইন অনুযায়ী পরিচালিত হয়।

সূত্র জানায়, ইপিজেড শ্রমিকদের স্বার্থ নিশ্চিত ও কল্যাণে স্বয়ংসম্পূর্ণ আইন করার প্রয়োজন থেকেই এ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে দুটি বিষয় বিবেচনা করা হচ্ছে। প্রথমটি হলোÑ শ্রম আইন ২০০৬-কে বিবেচনায় এবং ইপিজেডের আলাদা বৈশিষ্ট্য অক্ষুণœ রাখা। এ আইনে ১৬টি অধ্যায়, ২০২টি ধারা ও পাঁচটি অনুচ্ছেদ রয়েছে।

ইপিজেড আইনে আছেÑ শ্রমিকদের চাকরির নিয়োগ শর্ত; প্রসূতি কল্যাণ সুবিধা; পেশাগত স্বাস্থ্য রক্ষা ব্যবস্থা; নিরাপদ কর্মপরিবেশ, নিরাপত্তা ও কল্যাণমূলক ব্যবস্থা; কর্মঘণ্টা ও ছুটি; মজুরি; মজুরি পরিশোধ; ইপিজেড মজুরি বোর্ড; দুর্ঘটনাজনিত কারণে জখমের জন্য ক্ষতিপূরণ; শ্রমিক কল্যাণ সমিতি; অন্যায় আচরণ, চুক্তি ও যৌথ দর কষাকষি; মীমাংসা এবং সালিশ; ইপিজেড শ্রম আদালত, ইপিজেড শ্রম আপীল ট্রাইব্যুনাল; দ- ও বিচার; ভবিষ্যত তহবিল গঠন; প্রশাসন, পরিদর্শন।

জানা গেছে, বাংলাদেশ ইপিজেড শ্রম আইন ২০১৫-এর খসড়ার বিল বেপজার মতামতের আলোকে পুনর্গঠন করে ইপিজেড শ্রম আইন, ২০১৬-এর খসড়া চূড়ান্ত করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে তা মন্ত্রিসভা বৈঠকের চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছে।

মন্ত্রিসভা বৈঠকের পর মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম সাংবাদিকদের বলেন, শ্রম আইন ইপিজেডের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়, তাই নতুন এ আইন করা হচ্ছে। ২০১৪ সালের ৭ জুলাই ইপিজেড শ্রম আইনের খসড়ায় নীতিগত অনুমোদন দিয়েছিল মন্ত্রিসভা। তাতে বলা হয়েছিল, সমিতি করতে চাইলে কোন প্রতিষ্ঠানের ৩০ ভাগ শ্রমিককে ইপিজেড কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করতে হবে। আবেদনকারীদের মধ্যে ভোটের ব্যবস্থা করা হবে এবং তাদের মধ্যে ৫০ ভাগ সমিতি করার পক্ষে ভোট দিলে সমিতি অনুমোদন পাবে।

খসড়া এ আইনের ১৬ অধ্যায়ে ২০২টি ধারা রয়েছে জানিয়ে শফিউল বলেন, আইন অনুযায়ী শ্রমিকরা অবসর সুবিধা, মৃত্যু ও দুর্ঘটনাজনিত ক্ষতিপূরণ, বাধ্যতামূলক গ্রুপ ইন্স্যুরেন্স, ভবিষ্যত তহবিল, অর্জিত ছুটির নগদায়ণ, পূর্ণ বেতনের সমান হারে বছরে দুটি উৎসব বোনাস এবং ১৬ সপ্তাহের প্রসূতি কল্যাণ সুবিধা পাবেন। ইপিজেডে সংগঠন করার অধিকার আগে ছিল না। দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে এটা আইনে আনা হয়েছে। সংগঠনের অধিকারকে ‘শ্রমিক কল্যাণ সমিতি’ নামে অভিহিত করা হয়েছে।

এই শ্রমিক কল্যাণ সমিতি ও ট্রেড ইউনিয়ের মধ্যে তেমন কোন পার্থক্য নেই জানিয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, নামটা একটু শ্রুতিমধুর।

তিনি বলেন, শ্রম আইন অনুযায়ী ট্রেড ইউনিয়ন বা সিবিএ এবং ইপিজেড শ্রম আইন অনুযায়ী শ্রমিক কল্যাণ সমিতির মধ্যে যৌথ দর কষাকষির এজেন্টের কাঠামো গঠন, পরিষদের মেয়াদ বা কার্যাবলির মধ্যে মৌলিক কোন পার্থক্য নেই।

শ্রমিকদের সংগঠন করার অধিকার, শ্রমিক কল্যাণ সমিতি গঠন, যৌথ দর কষাকষিতে প্রতিনিধিত্বের অধিকার, শিল্পবিরোধ উত্থাপন ও নিষ্পত্তি, ধর্মঘট করার অধিকার এবং চাকরির নিরাপত্তা প্রদানের বিষয়গুলো যুক্ত করে ইপিজেড শ্রম আইনকে ‘সুসংহত’ করা হয়েছে বলে মন্তব্য করেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব।

ইপিজেড শ্রম আইনে শ্রমিকদের যৌথ দর কষাকষির অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। অর্থাৎ, শ্রমিক প্রতিনিধিরা মজুরি, কর্মঘণ্টা, নিয়োগ ও নিয়োগের শর্ত, ধর্মঘটের অধিকার রক্ষাসহ বিভিন্ন বিষয়ে সরাসরি মালিকদের সঙ্গে দর কষাকষি করতে পারবেন।

আইএলওসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা ও দেশ বাংলাদেশের ইপিজেডগুলোতে শ্রমিকদের সংগঠন করার অধিকার দেয়ার আহ্বান জানিয়ে আসছিল জানিয়ে শফিউল বলেন, আইএলও কনভেনশনে স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে ওই সনদকে ‘সম্মান দেখিয়েই’ বাংলাদেশ এ আইন করছে।

আন্তর্জাতিকভাবে দেশে শ্রমিকদের জন্য সুন্দর পরিবেশ তৈরি করা, শ্রমিকদের গণতান্ত্রিক অধিকারকে প্রতিষ্ঠিত করার কথা সংবিধানেই বলা আছে। শুধু দাতাদের চাহিদার প্রেক্ষিতে নয়, আমাদের সিনসিয়ারিটিও আছে, সরকারের আন্তরিক উদ্যোগ আছে।

শ্রম মন্ত্রণালয়ের ন্যূনতম মজুরি বোর্ড সব ধরনের শ্রমিকদের জন্য যে মজুরি কাঠামো ঠিক করে দেয়, এতদিন সেই কাঠামোতেই বেতনভাতা পেয়ে আসছিলেন ইপিজেডের শ্রমিকরা। নতুন আইন হলে ইপিজেডের শ্রমিকদের জন্য একটি স্থায়ী মজুরি বোর্ড গঠন করা হবে বলে মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানান।

খসড়ায় বলা হয়েছে, শ্রমিক ও বিনিয়োগকারীদের প্রতিনিধি ছাড়াও নিরপক্ষে উৎস থেকে প্রতিনিধি নিয়ে এই স্থায়ী মজুরি বোর্ড গঠন করা হবে। বাংলাদেশ রফতানি প্রক্রিয়াকরণ কর্তৃপক্ষের (বেপজা) নির্বাহী চেয়ারম্যান এই বোর্ডের প্রধান হবেন।