২৩ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

স্বর্ণকন্যা সীমান্ত ও শিলার দায়িত্ব নিলেন প্রধানমন্ত্রী

স্বর্ণকন্যা সীমান্ত ও শিলার দায়িত্ব নিলেন প্রধানমন্ত্রী
  • অভাবের তাড়নায় বিক্রি করে দেয়া পদক ফিরিয়ে দেয়া হবে শিলাকে ;###;সংবর্ধনাও দেয়া হবে দু’জনকে

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ এবার এস এ গেমসে সোনার পদক জয়ী মাবিয়া আক্তার সীমান্ত এবং মাহফুজা খাতুন শিলার দায়িত্ব নিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আরও অনেকের মতো এখন থেকে তাদের আর কোন সমস্যাই রইল না। সোমবার মন্ত্রিসভা বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এস এ গেমসে সোনা জয়ী মাহফুজা খাতুন শিলা অভাবের তাড়নায় তার পদক বিক্রি করে দিয়েছে। তার পদকটা ফিরিয়ে দেয়া হবে। এছাড়া মাবিয়ার মায়ের চিকৎসার ব্যবস্থার পাশাপাশি তাদের দু’টি পরিবারের থাকার ব্যবস্থায় করে দেয়া হবে বলে জানিয়ে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। শুধু এখানেই শেষ নয়, তাদের এই অসামান্য কৃতিত্বের জন্য সংবর্ধনার আয়োজনও করা হবে।

দক্ষিণ এশিয়ান গেমসের (এসএ গেমস) এবারের আসরে বাংলাদেশকে প্রথম সোনার পদক এনে দিয়েছেন মাবিয়া আক্তার সীমান্ত। মেয়েদের ৬৩ কেজি ওজন শ্রেণীতে শ্রীলঙ্কা ও নেপালের প্রতিযোগীকে পেছনে ফেলে সোনার পদক জেতেন তিনি। ভারতের গুয়াহাটির ভোগেশ্বরী ফুকানানি ইনডোর স্টেডিয়ামে রবিবার স্ন্যাচ ও ক্লিন এ্যান্ড জার্ক মিলিয়ে ১৪৯ কেজি তোলেন মাবিয়া। এই ইভেন্টে শ্রীলঙ্কার আয়েশা বিনোদানী (১৩৮ কেজি) রুপা ও নেপালের জুন মায়া চান্তিয়াল (১২৫ কেজি) ব্রোঞ্জ পেয়েছেন।

সোনার পদক জিতে জাতীয় সঙ্গীতের সুরে পোডিয়ামে দাঁড়িয়ে অঝোর কান্নায় কেঁদেছিলেন মাবিয়া। জাতীয় পতাকাকে স্যালুট দেয়ার ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে তাঁর কান্না কাঁদিয়েছিল দেশের মানুষকেও। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সেই কান্নার দৃশ্য ছড়িয়ে উত্তাল এক আবেগ তৈরি করেছিল সবার মধ্যে। এসএ গেমস হয়ত বিশ্ব মানচিত্রে বড় কোন ক্রীড়া আসর নয়। কিন্তু তবুও দক্ষিণ এশিয়ার শ্রেষ্ঠত্বের সেই আসরেও বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত বেজে ওঠে খুব কমই। কেউ সোনা জিতলেই তবে পদক অনুষ্ঠানে গর্বিত ভঙ্গিতে ওড়ে লাল-সবুজ পতাকা। নেপথ্যে ভেসে আসে সেই সুর, যে সুরের মধ্যে কী যেন একটা আছে, বাংলার মানুষ আবেগতাড়িত হয়ে কেঁদে ফেলে। মাবিয়ার অর্জনটি আরও বড় ছিল। এবারের এসএ গেমসে বাংলাদেশের পক্ষে প্রথম সোনা এনে দিয়েছিলেন তিনিই।

‘কষ্ট’ শব্দটার সঙ্গে মাবিয়াদের পরিচয় যে শৈশব থেকেই। ভারোত্তোলন ফেডারেশনের সেক্রেটারি উইং কমান্ডার মহিউদ্দিন আহমেদ প্রতিদিন আসা-যাওয়ার ভাড়া দিতেন নিজের পকেট থেকে। টাকার অঙ্কটি খুবই ক্ষুদ্র, মাত্র ৫০ টাকা। কিন্তু মাবিয়ার জন্য সেটাই ছিল অনেক বড় কিছু। দোকানি বাবা কী যে কষ্ট করে তাঁদের তিন ভাইবোনকে বড় করেছেন, সেটা ভেবে আজও শিউরে ওঠেন এই নারী ভারোত্তোলক।

খেলাটিতে শরীর থেকে যে প্রাণশক্তি ক্ষয় হয়, সেটা পুষিয়ে দিতে প্রতিদিন খাদ্য-তালিকায় আমিষের উপস্থিতি আবশ্যক। দুপুরে মাছ হলে রাতে মাংস, কিংবা দুপুরে মাংস হলে রাতে মাছ। সকাল-বিকেল দুধ-ডিমের খরচটা তো আছেই। কিন্তু মাবিয়ার বাবা কষ্ট হলেও মেয়েকে এগুলো জুগিয়ে গেছেন। রক্ষণশীল সমাজ ব্যবস্থায় মেয়েদের খেলাধুলাকে নিরুৎসাহিত করার যে প্রবণতা আছে, পাড়াপ্রতিবেশী কিংবা হঠাৎ বেড়াতে আসা আত্মীয়-স্বজনের ঠোঁট উল্টে করা কটুকাটব্যগুলো পোডিয়ামে দাঁড়িয়ে বারবারই মনে পড়ছিল মাবিয়ার।

মাবিয়া আক্তার সীমান্ত মাদারীপুরের মেয়ে। বাবা খিলগাঁওয়ে মুদির দোকান চালান। আর্থিক প্রতিকূলতায় একসময় বন্ধ হয়ে যায় লেখাপড়া। মামা বক্সিং কোচ শাহাদাত কাজী জোর করেই ভাগনিকে ভারোত্তোলন অনুশীলন করাতে শুরু করেন। এর আগে কমনওয়েলথ ভারোত্তোলনে রুপা জেতেন, আফ্রো-এশিয়ায় রুপা, আরও দুটো ব্রোঞ্জ আছে তাঁর থলেতে। গুয়াহাটিতে এসএ গেমসে গিয়েছিলেন কনুইতে ব্যথা নিয়ে। আগের রাতেও বেশ ব্যথা করছিল। এই অবস্থায় নামলেন তিনি প্রতিযোগিতায়। ভারতকে হারিয়ে এই তরুণী জিতে নিলেন সোনা। বাংলাদেশের প্রথম সোনা এবারের এসএ গেমসে। উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী মাবিয়া আক্তার সীমান্ত বিজয়স্তম্ভে উঠেছেন। গলায় সোনার মেডেল। সামনে জাতীয় পতাকা। তিনি অভিবাদন জানাচ্ছেন। এমন সময় বেজে উঠল সেই সুর, আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালবাসি। তিনি হুহু করে কাঁদতে লাগলেন। সেই ভিডিও ছড়িয়ে পড়ল ইন্টারনেটে। বাংলাদেশের মানুষ, পৃথিবীর যে প্রান্তেই থাকুন না কেন, যিনিই এই ভিডিও দেখেছেন, তিনিই চোখ মুছেছেন।

আমাদের মেয়েরা সোনা এনে দিচ্ছেন এসএ গেমসে। কোন প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে উঠে এসেছেন তাঁরা। কতই না প্রতিকূলতা পেরিয়ে তাঁদের আজকের এই জয়। আমাদের বাংলাদেশও অনেক প্রতিকূলতা পেরিয়ে এখন জয়ের পথে, জয়ের রথে, এগিয়ে যাচ্ছে সামনের দিকেই।

রবিবার বিকেলে পুলে ঝড় তোলেন মাহফুজা খাতুন শিলা। ১০০ মিটার ব্রেস্ট স্ট্রোকে দিনে দ্বিতীয় স্বর্ণ এনে দেন এই সাঁতারু। বিকেলে সোনা জেতেন জলকন্যা মাহফুজা খাতুন শিলা। ১০০ মিটার ব্রেস্ট স্টোকে স্বর্ণ জিতে নিজের প্রত্যাশাকে ছাড়িয়ে গেলেন। আগে দেশে সোনা জয়ী এই শিলা সংসার চালাতে পদকটি বিক্রি করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, শিলার বিক্রি করা এই পদক ফিরিয়ে এনে দেয়া হবে। এছাড়া তাদের এই দু’টি পরিবারের প্রতি বিশেষ নজর দেয়া হবে। যাতে অভাবের কথা ভুলে তারা আরও বেশি করে অনুশীলন করতে পারে।

নির্বাচিত সংবাদ