২০ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সেই বিচারপতি নজরুল অবশেষে মীর কাশেমের মামলা ছাড়লেন

সেই বিচারপতি নজরুল অবশেষে মীর কাশেমের মামলা ছাড়লেন
  • এ্যাটর্নি জেনারেলের সাধুবাদ

স্টাফ রিপোর্টার ॥ অবশেষে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক মৃত্যুদ-প্রাপ্ত বদরবাহিনীর তৃতীয় শীর্ষ মীর কাশেম আলীর পক্ষের আইনজীবী হিসেবে সরকার সকল সুবিধায় থাকা হাইকোর্ট থেকে সদ্য অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরী নিজের নাম প্রত্যাহার করে নিলেন। সোমবার মীর কাশেমের আপীল মামলার তৃতীয় দিনের শুনানিতে উপস্থিত হয়ে তিনি আদালতের কাছে নিজেদের প্রত্যাহার করে নেয়ার কথা বলেন। পরে তিনি বেরিয়ে এসে সাংবাদিকদের বলেন, “প্রচ- বৈরী পরিবেশের কারণে আমি এ মামলার কার্যক্রম থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নিতে বাধ্য হয়েছি।” মীর কাশেমের আইনজীবীর দায়িত্ব থেকে সরে যাওয়ার কথা জানিয়ে আদালতকে তিনি বলেন, “স্যরি মাই লর্ড। অন্য দুজন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী রয়েছেন। আমি নিজেকে প্রত্যাহার করতে চাইছি।”এ সময় প্রধান বিচারপতি বলেন, “আপনি এই মামলা থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করছেন?” উত্তরে বিচারপতি নজরুল বলেন, “ইয়েস।”

পরে আদালত কক্ষ থেকে বেরিয়ে এসে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি ও আইনজীবী হিসেবে মামলায় অংশ নেয়ার অধিকার আমার রয়েছে। এটি অসাংবিধানিক বা অনৈতিক নয়।” ১০ ডিসেম্বর প্রথম মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে কোন মামলায় একজন অবসর প্রাপ্ত বিচারপতি হিসেবে নজরুল ইসলাম চৌধুরী শুনানিতে অংশগ্রহণ করেন। এ নিয়ে রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান আইনকর্মকর্তাসহ অন্যদের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। এমনকি খোদ আইনমন্ত্রীও ক্ষোভ প্রকাশ করেন। এ সময় প্রধান বিচারপতি সরকারী সুযোগ-সুবিধা থাকা অবস্থায় অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিদের নিয়ম-নীতি (কোড অব কন্ডাক্ট) মেনে চলার পরামর্শ দেন। এ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, তিনি (বিচারপতি নজরুল) যেটা করছেন, সেটা অনৈতিক।

সোমবার মীর কাশেমের তৃতীয় দিনের শুনানিতে নিজের নাম প্রত্যাহার করে নেন নজরুল ইসলাম চৌধুরী। তিনি এক চিঠিতে বলেছেন প্রচ- বৈরী পরিবেশের কারণে আমি এই মামলার কার্যক্রম থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নিতে বাধ্য হচ্ছি। এদিকে সরকারী সকল সুবিধায় থাকা অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরী যুদ্ধাপরাধী মীর কাশেম আলীর মামলা থেকে সরে দাঁড়ানোয় তাকে সাধুবাদ জানিয়েছেন এ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম।

হাইকোর্ট থেকে সদস্য অবসর প্রাপ্ত বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরী মীর কাশেমের মামলা শুনানি থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে এক বিবৃতি দিয়েছেন। বিবৃতিতে বলেছেন, আমি এ মামলায় অংশগ্রহণ করেছিলাম। অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি ও আইনজীবী হিসেবে এটা করার অধিকার আমার রয়েছে। এটি অসাংবিধানিক নয় কিংবা অনৈতিকও নয়। হাইকোর্ট থেকে ২০১৫ সালের ১২ ডিসেম্বর অবসর গ্রহণ করি। এবং ২০১৬ সালের ৩ জানুয়ারি থেকে আমি নিয়মিত আপীল বিভাগে বিভিন্ন মামলায় শুনানিতে অংশগ্রহণ করে আসছি। আমি ইতোমধ্যে অন্তত দুটি মামলায় একই মক্কেল ও তিনটি মামলায় অপর পক্ষে এ্যাটর্নি জেনারেল এর সঙ্গে অংশগ্রহণ করেছি। উক্ত মামলাগুলোর শুনানি চলা কালে এ্যাটর্নি জেনারেল আমার প্র্যাকটিস এর বৈধতা বা নৈতিকতা নিয়ে কোন আপত্তি উত্থাপন করেননি। কিন্তু শুধুমাত্র মীর কাশেম আলীর মামলায় পারিচলানা করতে গেলেই তিনি আমার প্র্যাকটিস এর বৈধতা ও নৈতিকতার প্রশ্ন তুললেন যা অনাকাক্সিক্ষত। আইন ও সাংবিধানসম্মতভাবে আমি মীর কাশেমের আপীল এ অংশগ্রহণ করেছিলাম। কিন্তু প্রচ- বৈরী পরিবেশের কারণে আমি এই মামলার কার্যক্রম থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নিতে বাধ্য হচ্ছি।

সাধুবাদ জানালেন এ্যাটর্নি জেনারেল ॥

সরকারী সুবিধায় থাকা অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরী যুদ্ধাপরাধী মীর কাশেম আলীর মামলা থেকে সরে দাঁড়ানোয় তাকে সাধুবাদ জানিয়েছেন এ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। সোমবার নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ সাধুবাদ জানান। এর আগে বিতর্কের মুখে সকালে মীর কাশেম আলীর পক্ষের আইনজীবী হিসেবে নিজেকে প্রত্যাহার করে নেন নজরুল ইসলাম চৌধুরী। এ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরী যখন অবসরে গেছেন তখন আমার বদ্ধমূল ধারণা ছিল তিনি সরকারী বাড়ি ছেড়ে দিয়েছেন এবং গানম্যান ছেড়ে দিয়েছেন। এরপর যেদিন তিনি মীর কাশেম আলীর পক্ষে মামলায় শুনানি করছেন সেদিন এক সহকর্মী (সাবেক অতিরিক্ত এ্যাটর্নি জেনারেল) বিষয়টি আমাকে অবহিত করেন। তখন আমি পরের দিন সকালে আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ করি।

বৈরী চাপে বিচারপতি নজরুল নিজেকে প্রত্যাহার করেছেন এ বিষয়ে এ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, আমি আপত্তি জানানোর পরেও বিচারপতি চৌধুরী মামলার কার্যক্রমে অংশ নিয়েছেন। এখন উনি কেন এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন সেটা তিনি ভাল জানেন। এখানে সরকারের পক্ষ থেকে কোন চাপ নেই।

মাহবুবে আলম সাংবাদিকদের বলেছেন, আপনারা দুই অবসরপ্রাপ্ত (বিচারপতি) চৌধুরীকে এক করবেন না। অবসরে যাওয়ার পর বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক মিডিয়ার সঙ্গে কথা বলে ঠিক করেননি। কিন্তু বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরী মিডিয়াতে কিছু বলেননি। তাই বলছি, দুই চৌধুরীকে এক করবেন না।

শুনানি অব্যাহত

সোমবার মীর কাশেমের রায়ের বিরুদ্ধে করা আপীলের তৃতীয় দিনের শেষ হয়েছে। আজ মঙ্গলবার আবারও শুরু হবে। সোমবার মীর কাশেম আলীর পক্ষে আদালতে ৪, ৬, ৭ ও ৯ নম্বর চার্জের ওপর যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন তার আইনজীবী এসএম শাহজাহান। আজ আবারও যুক্তিতর্ক শুরু হবে। প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহার নেতৃত্বে ৫ সদস্যবিশিষ্ট বেঞ্চে এ শুনানি অনুষ্ঠিত হচ্ছে। বেঞ্চের অন্য বিচারপতিরা হলেন- বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী, বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার ও বিচারপতি মোহাম্মদ বজলুর রহমান। এর আগে সদ্য অবসরে যাওয়া বিচারপতি নজরুল ইসলাম এ মামলায় আইনজীবী হিসেবে গত ১১ ফেব্রুয়ারি কাজ শুরু করলেও সোমবার নিজের নাম প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়ে দুজন আইনজীবী মীর কাশেমের পক্ষে মামলা করবেন বলে আদালতকে অবহিত করেন।

বিচারপতি নজরুল ইসলাম বলেন, ‘আইন ও সংবিধানসম্মতভাবে আমি মীর কাশেমের মামলায় অংশগ্রহণ করেছিলাম। কিন্তু বৈরী পরিবেশের কারণে আমি এই মামলার কার্যক্রম থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নিতে বাধ্য হচ্ছি।’ প্রসঙ্গত, মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ২০১৪ সালের ২ নবেম্বর মীর কাশেম আলীকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদ-াদেশ দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। এ রায়ের বিরুদ্ধে ওই বছরের ৩০ নবেম্বর মীর কাশেম আলী আপীল করেন। এ আপীলের মামলার সারসংক্ষেপ আগেই দাখিল করেছেন রাষ্ট্র ও আসামিপক্ষ। গত ৬ জানুয়ারি শুনানির দিন ২ ফেব্রুয়ারি ধার্য করেছিলেন আপীল বিভাগ। আর ২ ফেব্রুয়ারি আসামিপক্ষের সময়ের আবেদনের প্রেক্ষিতে শুনানি পিছিয়ে ৯ ফেব্রুয়ারি পুনর্নির্ধারণ করেন সর্বোচ্চ আদালত।