১৫ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

এক সময়ের অজপাড়ায় এখন ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সুবিধা

  • বঙ্গবন্ধুর জন্মস্থান টুঙ্গিপাড়ায় গিয়ে বৃহত্তর ফরিদপুরের ৮০ ইউনিয়নে ইন্টারনেট সংযোগ উদ্বোধন করলেন প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম

ফিরোজ মান্না/নীতিশ চন্দ্র বিশ্বাস, টুঙ্গিপাড়া থেকে ফিরে ॥ মায়াবতী মধুমতির তীরেই টুঙ্গিপাড়ার অবস্থান। গোপালগঞ্জ জেলার একটি উপজেলা টুঙ্গিপাড়া। এক সময়ের অজপাড়া গাঁ। এখানেই জন্মগ্রহণ করেছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। দীর্ঘকাল অবহেলিত টুঙ্গিপাড়ার উন্নয়ন শুরু হয় ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর। এখন এলাকাটির প্রতিটি ইউনিয়নের সঙ্গে উপজেলা সদরের যোগাযোগের জন্য নির্মিত হয়েছে পাকা সড়ক। শুধু তাই না, এলাকার মানুষকে জ্ঞান-বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তিতে সমৃদ্ধ করে তোলার জন্য স্থাপন করা হযেছে ফাইবার অপটিক্যাল কেবল। তারা পাবেন ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সুবিধা। রবিবার বৃহত্তর ফরিদপুর জোনে ৮০টি ইউনিয়নে ইন্টারনেট সংযোগের উদ্বোধন করেছেন ডাক ও টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম। ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের মাধ্যমে গ্রামের মানুষ ৪৫ ধরনের সুযোগ-সুবিধা পাবেন বলে প্রতিমন্ত্রী তার বক্তব্যে তুলে ধরেন।

ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট উদ্বোধনের জন্য প্রতিমন্ত্রী যখন টুঙ্গিপাড়ায় পৌঁছান তখন বেলা ২টা। উদ্বোধনের অনুষ্ঠানের কথা ছিল বেলা ১২টায়। সময় বেশি গড়িয়ে গেলেও মানুষের আগ্রহে বিন্দু পরিমাণ ঘাটতি ছিল না। তারা অপেক্ষা করেছেন প্রাপ্তির শান্তি নিতে। প্রতিমন্ত্রী টুঙ্গিপাড়ায় পৌঁছেই প্রথমে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধিস্থলে যান। সেখানে তিনি বঙ্গবন্ধুর সমাধিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। এরপর কিছু সময় দোয়া-দরুদ পড়ে মোনাজাত করেন। এরপরই বর্নি ইউনিয়ন পরিষদ। যেখান থেকে বৃহত্তর ফরিদপুরের ৮০টি ইউনিয়নের ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সংযোগের উদ্বোধন করা হয়। গোপালগঞ্জ সদরের ২০টি, টুঙ্গিপাড়ার ৩টি, কোটালীপাড়ার ৭টি, ফরিদপুর সদরের ১০টি, মধুখালীর ৭টি, রাজবাড়ী সদরের ১৪টি, শরীয়তপুর সদরের ১১টি ও মাদারীপুরের ১৫টি ইউনিয়ন মিলে মোট ৮৭টি ইউনিয়ন রয়েছে। এর মধ্যে ৮০টি ইউনিয়ন ইন্টারনেট কানেক্টিভিটির আওতায় চলে এসেছে। বাকি ৭টি ইউনিয়ন এ মাসের মধ্যেই ইন্টারনেট সংযোগের আওতায় আসবে। ৮০টি ইউনিয়নে ব্রডব্যান্ড সংযোগ দিচ্ছে বিটিসিএল। রবিবার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সচিব মাহফুজুর রহমান, বিটিসিএলের এমডি গোলাম ফখরুদ্দিন আহমেদ, সদস্য পরিকল্পনা ও উন্নয়ন কবির হোসেন ভূঁইয়া, প্রকল্প পরিচালক মোঃ মইন উদ্দিন, বিসিএস টেলিকম সমিতির সভাপতি মোঃ এ তালেব, সহসভাপতি মোঃ শাহাবউদ্দিন, সাধারণ সম্পাদক হাম্মাদ মুজিব প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, তৃণমূল পর্যায়ে উচ্চগতির ইন্টারনেট সেবা পৌঁছে দেয়ায় গ্রামের মানুষ ও শহরের মানুষের মধ্যে পার্থক্য অনেকাংশে কমে গেল। গ্রামের মানুষ এখান থেকে ৪৫ ধরনের সেবা পাবেন।

টুঙ্গিপাড়া উপজেলার ৫টি ইউনিয়নের মধ্যে বর্নি ইউনিয়নটি তুলনামূলকভাবে উন্নত এলাকা। এখানে রবিবার থেকে ডিজিটাল সেন্টারের যাত্রা শুরু হয়েছে। সেবাদানের পাশাপাশি কর্মসংস্থানেরও সৃষ্টি করবে এ সেন্টার। ই-মেইল, ইন্টারনেট ব্রাউজিং, ভিডিও কনফারেন্সিং, বিভিন্ন পরীক্ষার ফলাফল, জেএসসি স্টুডেন্টদের ডাটাবেজ তৈরি, জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন, সরকারী ফরম ডাউনলোড, অনলাইনে বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানে আবেদন, জমির পর্চার আবেদন, চারিত্রিক ও ওয়ারিশ সনদপত্রের আবেদন, পাসপোর্টের আবেদন ও ফি জমা, চাকরির আবেদন, স্থানীয় জেলেদের জন্য সুনির্দিষ্ট পরিচয়পত্র, বিদেশ গমনেচ্ছুদের রেজিস্ট্রেশন, ভিজিডি-ভিজিএফ কার্ড ডাটাবেজ এবং প্রিন্টিং, স্ক্যানিং ও ফটোকপিসহ প্রযুক্তিগত নানা সুযোগ-সুবিধা পাওয়া যাবে এ সেন্টার থেকে। প্রান্তিক পর্যায়ের সাধারণ মানুষ এখন শহরে না গিয়ে সময়, শ্রম ও যাতায়াত ভাড়া বাঁচিয়ে খুব সহজেই তারা এ ডিজিটাল সেন্টার থেকে যার যার প্রয়োজন মেটাতে পারবেন। বহু পরিবার রয়েছে, যারা পল্লী বিদ্যুতের নতুন বা পুরনো বিল পরিশোধ করছেন এ ডিজিটাল সেন্টারের মাধ্যমে। সেন্টারের কর্মরত উদ্যোক্তাদের সহযোগিতায় ভিডিও-চ্যাটিংয়ের মাধ্যমে বিদেশে অবস্থানরত বহু মানুষ নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন তার দেশের বাড়িতে পরিবার-পরিজন ও আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে। উদ্যোক্তারাও এসব সেবা দিয়ে প্রতিদিন আয় করবেন ভাল অংকের টাকা। তবে পর্যাপ্ত কম্পিউটার নেই। ভাল কোন ক্যামেরাও দেয়া হয়নি। নেই কোন কালার প্রিন্টার। নেই লেমিনেটিং মেশিন। ফটোকপি মেশিন দিলেও সেটি অকেজো রয়েছে।

এ সেন্টারেও রয়েছেন দু’জন শিক্ষিত স্থানীয় যুবক ও মহিলা উদ্যোক্তা। যারা সর্বক্ষণিক সেবা দেবেন গ্রামাঞ্চলের খেটে-খাওয়া সাধারণ মানুষগুলোকে। এসব সেবাদানের বিপরীতে প্রতিদিন আয় করতে পারবেন ৫-৭’শ টাকা। তাদের বেকারত্বও দূর হবে। এর মধ্যে একজন উদ্যোক্তা হলেন রিংকু মিয়া। এসএসসি পাস করেই তিনি কম্পিউটার প্রশিক্ষণ নেন। ইউনিয়ন পরিষদের ব্যবহৃত কম্পিউটারের টুকিটাকি সমস্যা দূর করতে প্রায়শই তার ডাক পড়ত। আর এভাবেই সম্পৃক্ত হন ইউনিয়ন পরিষদের সঙ্গে এবং নির্বাচিত হন উদ্যোক্তা হিসেবে। গত ৩ বছর ধরে তিনি কাজ করছেন। বেকারত্ব ঘুচিয়ে এখন তিনি অনেকটাই স্বাবলম্বী হয়ে উঠেছেন। পাশাপাশি চালিয়ে যাচ্ছেন লেখাপড়া। কিছুদিনের মধ্যে তিনি হবেন একজন গ্র্যাজুয়েট। আরেকজন উদ্যোক্তা হলেন নূরুন্নাহার।

রিংকু মিয়া জনকণ্ঠকে বলেন, এক সময় তিনিও বেকার ছিলেন। এ ডিজিটাল সেন্টারে কাজ শুরুর পর থেকে তার জীবনের মোড় ঘুরে গেছে। জীবন নিয়ে তিনি এখন নতুন করে স্বপ্ন দেখছেন। এখন ডিজিটাল সেন্টারে ব্রডব্যান্ড সংযোগ পেয়েছেন। এখান থেকে গ্রামাঞ্চলের দরিদ্র জনগোষ্ঠী এখন অল্প সময়ে ও স্বল্প ব্যয়ে নিয়মিত সেবা পাবেন বলে তিনি আশা করছেন। এখন তাদের আর শহরে ছুটে যেতে হয় না। ভোগান্তি কমেছে এবং সময় ও অর্থ দুটোই সাশ্রয় হবে। তাছাড়া ইন্টারনেট সুবিধাদির ব্যবহার ও খুব সহজেই দেশ-বিদেশে যোগাযোগের কারণে ইউনিয়নের জীবনযাত্রার মানও যথেষ্ট উন্নত হয়েছে।

গ্রামীণ মানুষের জীবনযাত্রার ধরন পাল্টে দেবে ইউনিয়ন তথ্য সেবা কেন্দ্র (ইউআইএসসি)। কৃষি, শিল্প, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, হাট-বাজার, আইনী পরামর্শ থেকে শুরু করে বিদ্যুত বিল প্রদানসহ ছেলেমেয়ের জন্য উপযুক্ত পাত্র-পাত্রীর সন্ধান সব সমস্যার সমাধান স্থলে পরিণত হবে ইউনিয়নগুলো। সাধারণ মানুষদের মধ্যে নিরন্তর তথ্যপ্রযুক্তির আলো ছড়িয়ে দিতে গড়ে তোলা হয়েছে উদ্যোক্তা। সরকার ঘোষিত ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণের স্বপ্ন বাস্তবায়নের সোনালী দিগন্তের দিকে নিয়ে যাচ্ছেন।

গ্রামে বসবাসকারী সর্ববৃহৎ জনগোষ্ঠীকে আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে তথ্যসেবা দিতে সরকার ইউনিয়ন তথ্যসেবা কেন্দ্র চালু করে। স্থানীয় সরকার বিভাগের উদ্যোগে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর লোকাল গবর্নমেন্টের (এনআইএলজি) সমন্বয় এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একসেস টু ইনফরমেশন (এটুআই) প্রোগ্রামের সহায়তায় দেশের ৪ হাজার ৫৪৭টি ইউনিয়নে তথ্যসেবা কেন্দ্র চালু করা হয়েছে এর আগেই। এখন এসব ইউনিয়নে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট কানেকশন দেয়া হয়েছে। এ পর্যন্ত সাড়ে ১১ কোটি (৭ কোটি অনলাইন জন্ম-নিবন্ধনসহ) সেবা প্রদানের মাধ্যমে ইউআইএসসি উদ্যোক্তারা ১৩৮ কোটি টাকার বেশি উপার্জন করেছেন। সাধারণ মানুষকে সেবা প্রদান ছাড়াও এসব কেন্দ্রের মাধ্যমে ৪ হাজার ৫১৬ জন নারীসহ মোট ৯ হাজার ৯৪ জনের কর্মসংস্থান হয়েছে।

উল্লেখ্য, দেশের ৬৪ জেলার ৯৮টি উপজেলায় ১০০৬টি ইউনিয়নে অপটিক্যাল ফাইবার কেবল সংযোগের মাধ্যমে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবা দেয়া হবে। ৫টি জেলার ১২টি উপজেলায় রেডিও লিংক ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট স্থাপন করা হবে। প্রকল্পটির সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে সাড়ে ৯শ’ কোটি টাকা। সরকারী অর্থে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে বিটিসিএল। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে ১০০৬টি ইউনিয়ন ইন্টারনেট সুবিধার আওতায় আসবে। এ বছরই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হবে। ৮০ ইউনিয়নের মাধ্যমে ব্রডব্যান্ড সুবিধা চালু হলো। পর্যায়ক্রমে সারাদেশেই ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট চালু হবে।