১৮ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

কম্পিউটার ভিশন সিনড্রম

কম্পিউটার বা কম্পিউটারের মতো এমন যন্ত্রপাতিতে নিয়মিত ও অনেকক্ষণ ধরে কাজ করলে চোখের নানা সমস্যা ও উপসর্গ দেখা দিতে পারে- এই অবস্থাকে বলা হয় কম্পিউটার ভিশন সিনড্রম।

সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় দেখা গেছে আমেরিকার ১৩৪ মিলিয়ন লোক প্রতিদিন কম্পিউটারে কাজ করে থাকেন এবং তাঁদের ৮৮% লোকেরই সামান্য থেকে বেশি- নানা মাত্রার চোখের উপসর্গ রয়েছে। সুতরাং কম্পিউটার ভিশন সিনড্রম সারা বিশ্বে একটি সাধারণ স্বাস্থ্য সমস্যায় পরিগণিত।

কম্পিউটার ভিশন সিনড্রমের উপসর্গসমূহ :

১. মাথা ব্যথা, চোখে ব্যথা;

২. চোখ জ্বালাপোড়া করা;

৩. চোখের ক্লান্তি বোধ করা;

৪. ঝাপসা দেখা বা মাঝে মাঝে দু’টি দেখা;

৫. ঘাড়ে ও কাঁধে ব্যথা।

কম্পিউটার ভিশন সিনড্রমের কারণ :

কম্পিউটার অক্ষরগুলো ছাপার অক্ষরের মতো নয়। ছাপার অক্ষরগুলোর মধ্যভাগ এবং পাশের ঘনত্ব একই রকম- এগুলো দেখার জন্য সহজেই চোখের ফোকাস করা যায়, অন্যদিকে কম্পিউটারের অক্ষরগুলোর মধ্যভাগ ভাল দেখা যায় কিন্তু পার্শ্বভাগের ঘনত্ব কম হওয়ায় পরিষ্কার ফোকাসে আসে না। কম্পিউটারের অক্ষরগুলোর এই ফোকাসের অসমতার জন্য চোখের নিকটে দেখার যে প্রক্রিয়া বা একোমোডেশন ঠিকমতো কাজ করতে পারে না। এভাবে দীর্ঘক্ষণ যাবত কম্পিউটারে কাজ করলে চোখের নানা উপসর্গ দেখা দেয়।

কম্পিউটারের চশমা :

সাধারণ লেখাপড়ার সময় ১র্র্র্র্৪র্ -১র্৬র্ দূরে পড়ার জন্য যে পাওয়ারের চশমা লাগে কম্পিউটারে কাজ করার সময় ১র্৮র্ -২র্৮র্ দূরে মনিটর রেখে সে পাওয়ার দিয়ে ভাল দেখা যায় না। চক্ষু বিশেষজ্ঞগণ কম্পিউটারে কাজ করার জন্য বিশেষ পাওয়ারের চশমা দিয়ে থকেন যার নাম কম্পিউটার চশমা বা ঈড়সঢ়ঁঃবৎ ঊুব এষধংং। পঁয়ত্রিশ বছরের কম বয়সী ব্যক্তিদের ইউনিফোকাল (ঁহরভড়পধষ) বা শুধু একটি পাওয়ারের চশমা দিলেই চলে কিন্তু পঁয়ত্রিশোর্ধ ব্যক্তিদের জন্য কোন কোন সময় ঐ ইউনিফোকাল চশমা দিয়ে তুলনামূলক নিকটে কপি পড়তে অসুবিধা হতে পারে, তাদের জন্য মাল্টি ফোকাল চশমা দিলে কপি পড়া এবং কম্পিউটার মনিটরে কাজ করার সুবিধা হয়।

কম্পিউটারে ভিশন সিনড্রম থেকে মুক্তি পাবার ৯টি উপায় :

১. চক্ষু পরীক্ষা : কম্পিউটার ব্যবহারের পূর্বে চক্ষু পরীক্ষা করে, চোখের কোন পাওয়ার থাকলে অবশ্যই চশমা ব্যবহার করতে হবে। চল্লিশোর্ধ ব্যক্তিদের জন্য বিশেষভাবে তৈরি কম্পিউটার আই গ্লাস ব্যবহার করতে হবে।

২. সঠিক আলোর ব্যবহার : রুমের ভিতরে বা বাইরে থেকে আসা অতিরিক্ত আলো চোখের ব্যথার কারণ হতে পারে। বাইরে থেকে আলো এসে চোখে না লাগে বা কম্পিউটার স্ক্রিনে না পড়ে সে জন্য পর্দা, ব্লাইন্ড ইত্যাদি ব্যবহার করা যেতে পারে। ঘরের আলো- টিউবলাইট বা ফ্লোরোসেন্ট স্ক্রিনে না পড়ে সে জন্য পর্দা, ব্লাইন্ড ইত্যাদি ব্যবহার করা যেতে পারে। ঘরের আলো- টিউবলাইট বা ফ্লোরেসেন্ট বাল্বের আলো হলে এবং স্বাভাবিক অফিসের আলোর চাইতে কিছুটা কম হলে চোখের জন্য আরামদায়ক।

৩. গ্লেয়ার কমানো : কম্পিউটার মনিটরের এ্যান্টি গ্লেয়ার স্ক্রিন ব্যবহার করে এবং চশমার এ্যান্টি রিফ্লেকটিভ প্লাস্টিকের কাঁচ ব্যবহার করলে গ্লেয়ার কমানো যায়।

৪. কম্পিউটার মনিটরের ‘ব্রাইটনেস’ বাড়ানো বা কমানো : ঘরের আলোর সঙ্গেূ সামঞ্জস্য বজায় রেখে কম্পিউটার মনিটরের আলো কমনো বা বাড়ানোÑ যাতে মনিটরে লেখাগুলো দেখতে আরামদায়ক হয়।

৫. ঘন ঘন চোখের পলক ফেলুন : কম্পিউটারে কাজ করার সময় চোখের পলক পড়া কমে যায়। এর ফলে চোখের পানি কমে যায় ও চক্ষু শুষ্কতা বা ড্রাই আই হতে পারে। এ অবস্থায় চোখ শুষ্ক মনে হবে। কাটা কাটা লাগবে। চোখের অস্বস্তি ও ক্লান্তি আসবে। কম্পিউটার কাজের সময়- ঘন ঘন চোখের পলক ফেলুন। এর পরও সমস্যা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে চোখের কৃত্রিম পানি (অৎঃরভরপরধষ ঞবধৎং) ব্যবহার করুন।

৬. চোখের ব্যায়াম : ৩০ মিনিট কম্পিউটারে কাজ করার পর অন্যদিকে দূরে তাকান। সম্ভব হলে ঘরের বাইরে কোথাও দেখুন এবং আবার নিকটে অন্য কিছু দেখুন। এভাবে চোখের বিভিন্ন ফোকাসিং মাংসপেশীর ব্যায়াম হবে। এভাবে কয়েকবার করে আবার কিছুক্ষণ কাজ করুন।

৭. মাঝে মধ্যে কাজের বিরতি দিন : কাজের মাঝে কয়েক মিনিটের জন্য বিরতি দিন। এক ঘণ্টা কম্পিউটারে কাজ করে ৫-১০ মিনিটের বিরতি দিয়ে অন্য কোন দিকে দেখুন, বা অন্য কোন কাজে সময় কাটিয়ে আবার কম্পিউটারের কাজ শুরু করতে পারেন। অনেক বিশেষজ্ঞের মতে ২ ঘণ্টা একটানা কম্পিউটারে কাজ করে ১০-২০ মিনিটের বিরতি দিলেও একই রকম ফল পাওয়া যায়।

৮. কাজের জায়গার কিছু পরিবর্তন : কম্পিউটারে কাজ করার চেয়ারটি হাইড্রলিক হলে ভাল হয়, যাতে কাজের সময় চোখের উচ্চতা কম্পিউটার মনিটরের চাইতে সামান্য উঁচুতে থাকে। মনিটর চোখের বরাবর থাকতে হবে। মনিটর বাঁকা থাকলে অক্ষরগুলোর পরিবর্তন (ফরংঃড়ৎঃরড়হ) হতে পারে যা চোখের ব্যথার কারণ হতে পারে। অনেক সময় টাইপ করার কপিটি এখানে সেখানে রেখে বারবার মনিটর থেকে অনেকখানি দূরে কপি দেখতে হয়। এতেও মাথা ব্যথা ও চোখে ব্যথা হতে পারে। মনিটরের পাশেই পরিমিত আলো ফেলে কপি স্ট্যান্ডে এই লেখাগুলো রাখা যেতে পারে। তাতে বারবার চোখের একোমোডেশনের পরিবর্তন কম হবে ও কাজ আরামদায়ক হবে।

৯. কাজের ফাঁকে ফাঁকে ব্যায়াম : কম্পিউটারে কাজের সময় শুধু চোখের বা মাথার ব্যথা হয় নাÑ অনেকেরই ঘাড়ে ব্যথা, কাঁধে ব্যথা, কোমরে ব্যথা এসব উপসর্গ হতে পারে। কাজের ফাঁকে ফাঁকে যদি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হাত পা ও কাঁধের নাড়াচাড়া করা হয় বা ব্যায়াম করা হয় তাহলে উপরের উপসর্গসমূহ থেকে মুক্ত থাকা সম্ভব।

ডা. এম. নজরুল ইসলাম

সহযোগী অধ্যাপক ও কনসালট্যান্ট

চক্ষু বিভাগ, বারডেম হাসপাতাল, ঢাকা।

ফোন : ০১৭১৫-০০৯২৩৪, ০১৫২-৩৩৭৫৬৭